দীর্ঘদিন যাবৎ বাম রাজাকারেরা বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল নিয়ে মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাম রাজাকারেরা বঙ্গবন্ধু মুজিবের সরকার উচ্ছেদে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। এটা অনস্বীকার্য যে, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উচ্ছেদে ১৯৭২ থেকেই বাম রাজাকাররা যে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক শুরু করে তাতে তারা দেশী-বিদেশী চক্রান্তকারীদের বিশেষ করে পাকিস্তানীদের সহায়তায় এ কু-কর্মে সফল হয় এবং ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে স্বপরিবারে হত্যা করে।
বিশিষ্ট বাম রাজাকার আবদুল হক এ কুকর্মে পৌরহিত্য করেন। তার স্যাঙ্গাৎ হিসেবে এ-কুকর্মে যারা মালকোঁচা বেধে নেমেছিলেন তাদের অন্যতম জাসদ, সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) আর আবদুল হুক্কা হুয়ার পার্টির নাম ছিল "পূর্ব পাকিস্তানের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)।" স্বাধীন বাংলাদেশ অথচ পার্টির নাম পূর্ব পাকিস্তানের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)।
১৯৭৪-এ ভুট্টোকে লেখা এক চিঠিতে আবদুল হুক্কা হুয়া স্বাধীন হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ বিষয়ে নিজ আক্ষেপ প্রকাশ করে সাধের ফাকিস্তানের জন্য কান্নাকাটি করে এক দীর্ঘ পত্র লেখেন। তাতে আবদুল হুক্কা হুয়া ভুট্টোর নিকট অস্ত্র ও সৈন্যবল সাহায্য প্রার্থণা করেন এবং পুনরায় সাধের অখণ্ড ফাকস্তান কায়েম করবার মনোবাঞ্ছা তুলে ধরেন। অপরদিকে জাসদ উগ্র ভারত বিরোধীতার নামে ভারত বিদ্বেষী প্রচারণায় এমন মাত্রায় মেতে ওঠে যেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ফাকস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নয়, ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
আর কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের খুন করে কেন্দ্রীয় কমিটি দখল করে তা ১ সদস্য বিশিষ্ট করে নিজ মালকানায় নিয়ে নেন সর্বহারা পার্টির মালিক খুনী, ব্যাভিচারে মত্ত সর্বোপরি ফ্যাসিস্ট সিরাজ সিকদার। যার কাজ ছিল একটাই। "জয় বাংলা" শ্লোগান দিয়ে কী করে থানা লুট, ফাড়ি লুট, পাটের গুদামে আগুন আর জাতীয় শত্রু খতমের নামে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গুম করা খুন করা ইত্যাদি করে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলা। যখন সিরাজ সিকদার ধরা পড়েছিল তখন তার স্যুটকেস ভর্তি ছিল ডলার।
এইসকল ইতরেরা মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র, মাওবাদ ইত্যাকার বাদের নামে সিআইএ'র চালু করা প্রোজেক্ট "লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঠেকাও" কর্মসূচী প্রতিপালনে সচেষ্ট ছিল। ১৯৬৭ সনে মূল ইপিসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্তির পর থেকে নক্সালপন্থীদের একটাই টার্গেট ছিল আর সেটা হচ্ছে "শ্রেণী শত্রু" বা "জাতীয় শত্রু" খতম করার নামে "ট্রু ন্যাশনালিস্ট"দের খতম করা, কতল করা। পরম নিষ্ঠার সাথে লেগে থেকে বিরতীহীনভাবে এরা এটা করে গেছে ১৯৭৫ সন পর্যন্ত। আর জেনারেলদ্বয় ক্ষমতায় আসার পরপরই নিজদের কর্মসূচী যেহেতু বাস্তবায়িত হয়ে গেছে; সুতরাং এখন পার্টি-ফার্টি বিলুপ্ত অথবা খণ্ডীকৃত করে বিশেষ সংস্থার সহায়তায় জাসদীরা জার্মানীতে, সর্বহারারা লন্ডনে আর হুক্কা হুয়ার বিপ্লবীরা মার্কিন মুল্লুকে পাড়ি জমিয়েছে। অর্থাৎ জাগার মাল জাগায় গিয়ে উঠেছে। অপরদিকে এঁটো-কাটার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাদবাকীরা হয় বিএনপি-জামাত অথবা জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছে।
উপরোল্লিখিত চরম প্রতিক্রিয়াশীল অতিবিপ্লবী পাতিবুর্জোয়া রোমান্টিক এইসব দঙ্গলদের জন্ম থেকে অদ্যাবধি একটাই আরাধ্য কাজ যা তারা পরম নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে, আর তা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু মুজিব ও আওয়ামী লীগের উঠোন চষে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজাকারের পত্তন বাড়ানো। পরিস্থিতি দৃষ্টে এটাই অনুমিত যে, এ কুকর্মে তারা ভালো সাফল্যও পেয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল সম্পর্কে সীমাহীন মিথ্যা প্রচারণা। এই প্রচারণা গোয়েবলসীয় প্রচারণাকেও হার মানিয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রচারণার এবংবিধ কুকর্মে যারা পৌরহিত্য করেছেন তাদের অন্যতম আইয়ুব খানের মৌলিক স্পীকার জব্বার খানের কুপুত্র প্রয়াত এনায়েত উল্লাহ খান, শাহাদাত চৌধুরী প্রমুখ। এদের মৌল আলোচ্য বিষয়ই ছিল বঙ্গবন্ধুর চারিত্র-বৈশিষ্ট্যকে কলুষিত করণ এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষাড়যন্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ চালানো। এনায়েতউল্লাহ খান, সাদেক খান, শাহাদাত চৌধুরী, আহমেদ হুমায়ুন, আহমেদ ছফা, আহমেদ মুসা সহ তাবৎ আহাম্মক এবং বুরবকের দল হলিডে, বিচিত্রা ইত্যাদি পত্রিকার মাধ্যমে লাগাতার এসব কুকর্মে লিপ্ত ছিল। দেশের স্বল্প শিক্ষিত সহজ মানুষদের বোকা বানানোর মতলবে এসকল দঙ্গল বাকশাল সম্পর্কে একটিই প্রচারণা সর্বব্যাপী করে তুলেছিল আর তা হচ্ছে, "মুজিব, আমরণ প্রেসিডেন্ট থাকার জন্য এই ব্যবস্থা করেছে" আর "মুজিবের মৃত্যুর পর তার ছেলে বা বংশধরদের মনোনীত কেউ না কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হবে" ইত্যাদি। এই মিথ্যা প্রচারণাটি অতিবিপ্লবী দঙ্গলদের সকলেই ফেরী করে বেড়িয়েছে। গেরাম দিয়ে শহর ঘেরাও করাবার অভিপ্রায়ে ব্যর্থ দঙ্গলটির মনোভাব ছিল অনেকটা এরকম "অভিলাষী মন চন্দ্র না পাক জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই।"
সশস্ত্র বিপ্লবের চীনেবাদাম ফেরীওয়ালাদের তত্ত্ব থেকে '৭১-এর গেরিলা কায়দার বিপ্লবটি হস্তচ্যুত হয়ে তা মুজিবের হস্তগত হওয়ায় হুক্কা হুয়া ও তদীয় দোসর বদ উমর মুজিবের উপর যার পর নাই ক্ষিপ্ত ছিলেন।
উপরন্তু, বিপ্লব নামক এই মহার্ঘ্য বস্তটি যারা জন্ম থেকেই ইজারা নিয়েছেন সেই সব অতিবিপ্লবীদের হাত থেকে বিপ্লব চলে যাবে ফরিদপুরের জনৈক সেরেস্তাদারের ছেলের হাতে। এ অসহ্য! হুক্কা হুয়া পীর বাড়ীর বনেদী, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। আর বদ উমর! ওরে ব্বাপ! সৈয়দ বংশের সন্তান। খোদ কুরাইশ বংশ। উপায় আছে। সুদূর মক্কা থেকে যার পূর্ব পুরুষ উটের দড়ি সম্বল করে এদেশে হিজরত করেছিলেন। তাদের বাদ দিয়ে বিপ্লব চলে যাবে মুজিব-তাজউদ্দীন এদের দখলে। আবার এই কাজে সহায়তা করছে পৌত্তলিক কাফের হিন্দুস্থান। সুতরাং, এবার স্বাধীন বাংলাদেশে যেভাবে যে করেই হোক মুজিবকে উৎখাত করতেই হবে। ব্যাস, নাম ভিন্ন থাকলে কী হবে এই ইস্যুতে এক কাট্টা হয়ে নামতে হবে। নেমেও পড়লো সকলেই এবং কামিয়াব হলো।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আবদুল হুক্কা হুয়া ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টে জামাই আদরে থাকতেন। বদ উমর গ্রাম্য মৌলভীর বেশে ঢাকা শহরেই বহাল তবিয়তে চলাফেরা করতেন এবং পাক বাহিনীর বিশেষ বিশেষ তত্ত্বীয় কুকর্মে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধারা বদ উমরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল চাঁদনী ঘাট এলাকায় শাস্তি দিতে। পিতা কানা হাশিমের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর কৃপায় বদ উমরের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। হুক্কা হুয়া, তোয়াহা, আলাউদ্দীন আর ভাষা মতিন এরা সকলেই হয় মুজিব নতুবা তাজউদ্দীনকে ধরে জীবন রক্ষা করেছেন। জীবন থেকে রক্ষা পেয়েই "উপকারীরে বাঘে খায়", "বাঙালী যে পাতে খায় সে পাতে হাগে" এসব প্রবচন প্রমাণে এরা মেতে উঠিছিল মুজিব নিধনে। কামিয়াব হয়েছে বটে! তবে তা সাময়িক। মুজিবকে মেরেছে ঠিকই, কিন্তু মুজিবের দলটিকে মারতে পারেনি।
জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব অনেক শক্তিশালী এটা প্রমাণ করে মুজিবের প্রতিষ্ঠিত দল ঠিকই টিকে আছে; পক্ষান্তরে বাম রাজাকাররা চক্রান্ত করে, ষড়যন্ত্র করে, জেনারেলদের শয্যাসঙ্গী হয়ে, তাদের পদলেহন করে, মলদ্বার ভাড়া দিয়ে পার্টিকে শতধা বিভক্ত করে, পোন্দের চাড়া খাপছাড়া করে ঝুলে আছে উল্টো হয়ে শূন্যে।
এখন না আছে পার্টি, না আছে তত্ত্ব !
আছে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার,
খিস্তি-খেউড় আউড়াবার অক্ষম পিঁচুটি।
---- লেখাটি সংগ্রিহিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


