somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন আহমেদিনেযাদ

০৮ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাঁচটি ক্ষমতাধর দেশের ভেটো ক্ষমতাকে 'যুলুম' বলে ভাষণ দিলেন আহমেদিনেযাদ; সেইসব দেশের প্রতিনিধিরা তখন তাঁর বক্তৃতার বিপক্ষে 'ভেটো' দিতে যান নি, বরং কেউ কেউ চাপা ক্ষোভে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এ ভেটো ক্ষমতা কতোখানি অন্যায়, অযৌক্তিক আর নিষ্ঠুর ব্যাপার তা বুঝবার জন্যে আইনবিদ হবার দরকার নেই, কেননা দুনিয়ার চোখের সামনে মধ্যপ্রাচ্যের বুকের ওপর উড়ে এসে জুড়ে বসা ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্লজ্জের মতো একাধারে প্রায় চল্লিশবার এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। তা না হলে ইসরাইল টিকতো না, সারা পৃথিবী এই পাতানো রাষ্ট্রের বিপক্ষে ছিলো উচ্চকণ্ঠ। তাতে লাভ হয় নি, সাম্রাজ্যবাদ তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে স্রেফ প্রতিবাদের মুখে নস্যাৎ হয়ে যেতে দিতে পারে না। ফলে টিকে যায় ইসরাইল এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বমুসলিমের প্রাণস্পন্দন বাইতুল মুকাদ্দাসে আগুন ধরিয়ে দেয় এই দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র। পরিণামে তৈরি হয় ওআইসি, আরব দেশগুলো একত্র হয়ে বাধ্য হয় যুদ্ধ ঘোষণা করতে। কিন্তু ইঙ্গ-মার্কিন মদদে হারতে হয় আরবদের। সেই ইতিহাস স্মরণ করে অদ্যাবধি ইসরাইলের চালিয়ে যাওয়া মানবাধিকারবিরোধী অপরাধগুলি খতিয়ে দেখলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় আজকের বিশ্বে "ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা উচিত" এই সাহসী উচ্চারণটির জন্যে একজন আহমেদিনেযাদের কতোটা প্রয়োজন।

গত ১২ জুনের নির্বাচনে ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ফের জয়ী হয়েছেন মাহমূদ আহমেদিনেযাদ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মীর হুসেইন মুসাভি পেয়েছেন ৩৫ শতাংশ ভোট। ইরানের আশির দশকের দীর্ঘ সময়কার প্রধানমন্ত্রী মুসাভির জনপ্রিয়তার তুলনায় তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার স্বাভাবিকের চেয়ে কম মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারচুপির অভিযোগে ঘোষিত ফল বাতিলের দাবি উঠেছে। অপপ্রচার ও অতিপ্রচারের দায়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনলাইনে দেখা গেছে 'আমার ভোট কোথায়' ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড ও বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও চিত্রের ব্যাপক ছড়াছড়ি। তবু ধরে নিয়েছিলাম এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনোত্তর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। আমার নিজের দেশেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করে স্থূল কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তার ওপর ইরানে আন্তর্জাতিক কোনো পর্যবেক্ষক ছিলেন না। ফলে নির্বাচন কতোটা সুষ্ঠু হয়েছে তা বাইরের কারো পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যা সম্ভব তা হলো একজন সৎ, কঠোর আদর্শবাদী ও অসম সাহসী দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে আহমেদিনেযাদের বিজয় সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া।

কিন্তু গত রোববারের একটি ঘটনার খবর পড়তে গিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ আটকে গেলো। রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। বিক্ষোভ মিছিল থেকে আটজন ইরানস্থ ব্রিটেন দূতাবাসের কর্মকর্তা আটক হয়েছে। অথচ বিক্ষোভে ইরানী কর্তৃপক্ষের পশ্চিমা উস্কানীর দাবিকে ওবামা-মার্কেল-ব্রাউনরা বরাবর অস্বীকার করে আসছিলেন। যদিও তাঁদের বিবৃতিগুলো উল্টো সাক্ষ্য দেয়। ২১ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বললেন, ইরানী জনগণকে তিনি জানাতে চান যে ইরানের পরিস্থিতি তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এ আন্দোলনে ইরানী জনগণ একা নয়। এই 'একা নয়' কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ, বিক্ষোভে পশ্চিমা ইন্ধন ফাঁস হবার পর আমরা বুঝতে পারছি যে ওবামা আক্ষরিক অর্থেই সত্য বলেছেন। কেননা দাঙ্গার পেছনে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর দূতাবাসের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও প্রচারমাধ্যমের অতি-আগ্রহ ও পক্ষপাতমূলক অপপ্রচার বেশ নগ্নভাবেই চোখে পড়ছে। যুক্তরাজ্যের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দায়ী করে ইরান সরকার বলেছে, এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলোয় মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। ২১ জুন ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয় বিবিসির সংবাদদাতা জন লাইনকে। একই অভিযোগে এ যাবৎ ২৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। উদ্বেগের ব্যাপার বৈকী!

আরো একটি ব্যাপার রহস্যময়। নির্বাচনের ফল নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলেও প্রথমদিকটায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে নি এবং তার ততোটা আশংকাও ছিলো না। সহিংস হত্যাকাণ্ড শুরু হলো এর তিনদিন পর। প্রতিক্রিয়ার এ অস্বাভাবিক পরিণতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে নেপথ্যের চক্রান্তকারীরা জনগণকে প্ররোচিত করতেই এ সময় নিয়েছে কি না।

বিশ্ব-অর্থনীতির এক প্রধান প্রভাবক খনিজসম্পদসমৃদ্ধ ইরান বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদের সবচে' বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত একরোখা আহমেদিনেযাদ পরাশক্তিগুলোর সকল অবরোধের হুমকিকে সমানে আঙুল দেখিয়ে চলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের আত্মবিক্রীত একনায়কদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা রক্ষা ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একলাই লড়ে যাচ্ছেন অবিচল। ওরা বিলক্ষণ ঠাহর করতে পারছে যে ইরানের পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার অর্থ হলো বিশ্বব্যবস্থার মোড় ঘুরে যাওয়া, মার্কিন বিশ্বায়নের নকশা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং মুসলিম দেশগুলোকে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের অবসান। কাজেই ইরানকে থামাতেই হবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আপাতত যুদ্ধ ঘোষণা করা না গেলেও সাম্রাজ্যবাদ যে কোনো ছুতোয় অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ইরানে একজন তাবেদার শাসককে ক্ষমতায় বসাতে চায়। ১৯৭৯-র ইসলামী বিপ্লবের আগে দেশটি যেভাবে তিরিশ বছর ধরে সিআইএ ও মোসাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো, সেই সময়কে তারা ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, ইরানে এখন আর কোনো রেজা শাহ পাহলভী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ মন্দের ভালো হিসেবে মীর হুসেইন মুসাভিকে তারা মিত্র মনে করছে, অথচ এই ব্যক্তিটিই তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় হিযবুল্লাহ ও হামাসের শক্তিবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত মুসাভি ক্ষমতাশীন হলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের তুলনামূলক ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হবার সম্ভাবনা ছিলো।

এবারের নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ইরানের ইতিহাসে প্রথম। এর আরো একটি প্রচ্ছন্ন কারণের দিকে আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হলো, মূলত শহুরে ধনিক শ্রেণীর জনগণই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কেননা নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি কামারের ছেলে আহমেদিনেযাদ ইরানের দরিদ্র জনগণের প্রতি অতিমাত্রায় সহানুভূতিশীল। তিনি সম্পদ পুনর্বন্টন করে ইরানী জনগণের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের ফারাক ঘুচিয়ে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন এমন আশঙ্কায় পুঁজিপতিরা ভীত হয়ে পড়েছে। আমরা লক্ষ করছি ভোট পুনর্গণনা শুরু হয়েছে এবং ক্রমেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। একজন মেরুদণ্ড টান করে দাঁড়ানো আহমেদিনেযাদের নেতৃত্বে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক ইরান _ এটাই প্রত্যাশা।
১৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×