মানুষ কী কারণে মানুষ? উত্তর -- অনেক কারণে। প্রধান কারণ চিন্তা। মানুষিক মাপের চিন্তা। চিন্তা নিয়ে চিন্তা করলে আমরা দেখবো যে, চিন্তা করতে পারার ভেতরেই জেগে আছে মনুষ্যত্ব। এই যে এখন বসে বসে আপনি এ লেখাটা পড়ছেন, আসলে আপনি কিন্তু বসে নেই। এ দ্বিতীয় আপনি, মানে আপনার মস্তিষ্ক, চিন্তা করছে। পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে চারদিকে যেভাবে ঢেউয়ের পর ঢেউ ছড়িয়ে যায়, এ মুহূর্তে আপনার বেশুমার নিউরন জুড়ে তেমনি ছড়িয়ে পড়ছে অনুরণন। এটাই চিন্তা। একটি ক্রমিক প্রবাহ। চিন্তাবিষয়ক চিন্তা এ পর্যন্ত যদি ঠিকঠাক থাকে, তবে আমরা চিন্তার মাপজোখ নিয়ে এবার এগুতে পারি। আমরা চিন্তা করি যে, শেয়াল খুব বুদ্ধিমান। প্রাণিজগতের বিশেষ একটি প্রজাতির রক্ষণশীল গতিবিধি নিয়ে সে সারাক্ষণই চিন্তিত থাকে। কিন্তু ওই প্রজাতিটির উৎপত্তি নিয়ে তার চিন্তা নেই। কাজেই ‘ডিম আগে, না মুরগি আগে’, এ প্রশ্নের উত্তরে মানুষসমাজ চিন্তার গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেলেও শেয়াল চট করে বলবে -- মুরগি আগে। কারণ সে ডিম খায় না। এই চিন্তাটি একটি বিশুদ্ধ শেয়ালসম্মত চিন্তা। কিন্তু মানুষ এ প্রশ্নের জবাব দিতে হলে তাকে মুরগিতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, যাবতীয়তত্ত্ব ঘাঁটতে হবে। মানুষিক চিন্তাই তাকে এ ঘাঁটাঘাটিতে বাধ্য করে।
চিন্তার উৎকর্ষের সীমা নেই। বাঁধা ছক নেই তার স্বাধীনতার। ফলে আমরা দেখি যে, দুনিয়ায় যাঁরা যতো স্বাধীনভাবে, যতো গভীরভাবে চিন্তা করতে পারতেন, তাঁরা ততো বড় মনীষী। মুক্তচিন্তার একটি দৃষ্টান্ত দিই : ইমানুয়েল কান্ট সত্তার সত্য নিয়ে সংশয়ে পড়ে গেলেন। ভাবলেন, আমি যে আছি, তার প্রমাণ কী? বিষম সমস্যা! অনেক ডুব-সাঁতার। অবশেষে সংশয় থেকেই সত্যের সোনাদানা নিয়ে তীরে উঠলেন। বললেন -- যেহেতু আমি সন্দেহ করি, তাই আমি আছি। কেননা সন্দেহকারী না থাকলে সন্দেহ থাকতে পারে না। চিন্তাটি সবার পছন্দ হলো। জগত কান্টকে মহাপুরুষের আসনে বসালো।
এবার মূল জায়গায় আসি। ইসলামে মুক্তচিন্তার বিষয়টি কী রকম -- নিষিদ্ধ, অবাঞ্ছিত, বৈধ, উৎসাহিত, নাকি নির্দেশিত? মুফতিকে প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করলে তিনি আঙুল তুলে একটি দেয়াল দেখিয়ে দেবেন, যা পার হওয়া যাবে না। মুহাদ্দিসকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন, বর্ণিত আছে যে, সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো, স্রষ্টা বা ভাগ্য নিয়ে নয়। ইমাম সাহেব বলবেন, ক্বলবে উল্টাপাল্টা চিন্তা এলে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ্ পড়ে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে পানা চান। সবার কথাই হয়তো ঠিক। যা ঠিক নয় তা হলো যে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে বলছেন, সে জায়গাটি দেখছেন না। খুব উঁচু দালানের দিকে তাকালে আপনার মাথা থেকে টুপি পড়ে যাবে, কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে ওই প্রাসাদটি দেখাবে উঁইপোকার ঢিবির মতো। অথবা ধরুন, আপনার টেবিলে কাঁচের গেলাসে খানিকটা পানি। আপনি আশাবাদী হলে বলবেন, গেলাসটি অর্ধেক পানিতে ভর্তি। নেতিদৃষ্টিতে ওই একই পাত্র অর্ধেক খালি। দেখার ধরনে এমন ঢের তফাত থাকে। সমস্যা হলো, আমরা জিনিস দেখি; কিন্তু দেখার ধরনটি দেখি না। কারো চশমার রং যদি বেগুনি হয়, তার জগতও বেগুনি হবে। আপনি যতোই বলুন, পৃথিবী সবুজ। সে এর চে’ জোরে চেঁচিয়ে বলবে, উঁহু, আপনি একদম ঠিক বলছেন না। পৃথিবী বেগুনি, লা রাইবা ফি। তর্কের কারণ, যে চশমার ভেতর দিয়ে সে দুনিয়া দেখছে, সেই চশমার রং সে দেখছে না। এ তাবৎ মতপার্থক্যের কারণ, একটিমাত্র শব্দে -- আপেক্ষিকতা। আপেক্ষিকতা একটি সীমাবদ্ধতা। আর আপেক্ষিকতা বিষয়ে উদাসীনতা হলো ক্ষুদ্রতা। ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতার বৈধতার বিপক্ষে যাঁরা বলেন, তাঁরা আবদ্ধ। আর চশমার রং যিনি দেখেন না, তিনি ক্ষুদ্র। সঙ্গত কারণেই, ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতা আছে কি নেই, এ বিষয়ে আমরা এখন দেখবো তিনি কী বলেন, যিনি সব সীমিতি থেকে পবিত্র। কুরআনে ইউনূসের ৯৯ আয়াতে তিনি বলছেন -- ‘আর তোমার পালনকর্তা ইচ্ছে করলে পৃথিবীর সকলকেই একসঙ্গে ঈমানদার বানিয়ে ফেলতে পারতেন, (কিন্তু তিনি তা করেন নি); অতএব তুমি কি মানুষের সঙ্গে জোরজবরদস্তি করতে থাকবে, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করছে?’
কুরআন একটি স্বাধীন চিন্তাময় গ্রন্থ। এর প্রত্যেকটি বাক্যই মানুষকে মুক্তচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। রাসূল মুহাম্মদ সা. দিনের পর দিন একাকী পাহাড়ের গুহায় বসে ভাবতেন। তিনি নীরব নির্জন স্থান বেছে নিয়েছিলেন। কেন? ঘরে শুয়ে বা উটের পিঠে বসেও তো যা খুশি চিন্তা করা যায়। হ্যাঁ যায়, তবে স্বাধীনভাবে যায় না। সংসারের কোলাহল মনকে ব্যস্ত রাখে। স্বাধীন চিন্তাকে ব্যাহত করে। নবী তাই নীরবে চিন্তায় মগ্ন হলেন। সে মগ্ন মুহূর্তেই এলো ঐশী চিন্তা, প্রত্যাদেশ। "পাঠ করো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" কী প্রমুক্ত প্রশান্ত বাণী! কী অবাধ সুন্দর চিন্তা! কেন পাঠ করবো পালনকর্তার নামে? এ কারণেই যে তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি দয়াময়। পাঠ করবার পক্ষে সুন্দর সহজ যুক্তি। মুক্তচিন্তা সবসময়ই যুক্তিময় হয়। মুক্ত মন নিয়ে দেখলে, কুরআনের প্রত্যেকটি পঙ্ক্তিই যুক্তিময়, মুক্তচিন্তার স্মারক। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে তারপরই আল্লাহ তাঁর মনোনীত বান্দাদেরকে নবুওয়াতের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। স্বয়ং কুরআনই আমাদের বলে যে, ইবরাহীম আ. স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে করতেই প্রভুকে খুঁজে পেয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ চিন্তার বিপ্লব সাধন করেছেন মহানবী মুহাম্মদ সা.। পাহাড়ের ওপরে উঠে চিৎকার করে ডাকলেন তাঁর সম্প্রদায়কে। লোকজন জড়ো হলে বললেন, যদি বলি পাহাড়ের ওপাশে তোমাদের শত্রুদল আক্রমণোদ্যত হয়ে আছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে? বস্তুত সেদিন পাহাড় কোনো শত্রুকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিলো না, বরং জড়তার দেয়াল মানুষের হৃদয় থেকে সত্যকে আড়াল করে রেখেছিলো। রাসূল প্রজ্ঞার শক্তিতে সে দেয়াল ভেঙে দিলেন। মানুষ জেগে উঠলো। তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখলো। ফলে জ্ঞানের আলোয় উপলব্ধি করলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। দলে দলে মানুষ মুসলিম হলো। জয় হলো সত্যের। ক্রমে ইসলাম ছড়ালো বিশ্বময়। এ জয়ের পেছনে ছিলো চিন্তার স্বাধীনতা। সত্যের এই প্রতিষ্ঠা স্বাধীন চিন্তারই ফল।
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


