somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের আমি

২৭ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষের ভাষায় সম্ভবত সবচে’ কঠিন শব্দ ‘আমি’। শব্দটি আমি জানি – অথবা আমার মনে হয় আমি জানি; কিন্তু আমি জানি না শব্দটি যে-জানে কিংবা জানে বলে ভাবে, সেই তাকে। মানে আমি আমাকে জানি না। সকালে সূর্য ওঠে, আমি দেখি। দেখে জানা হয়। পাখি গায়, আমি শুনি। শুনে আমি গানকে জানি। আমি ঘ্রাণকে জানি, শুঁকে। ছুঁয়ে আর চেখে জানি তাপ ও স্বাদ। এভাবে ইন্দ্রিয় দিয়ে চারপাশের জগৎকে আমি আমার মধ্যে গ্রহণ করি। কিংবা আসলে কিছুই ঠিক গ্রহণ করি না। বরং নির্মাণ করি। ইন্দ্রিয়ের পাঠানো তথ্য দিয়ে নির্মাণ করি তথ্যের উৎসের অনুরূপ রূপ। এ রূপ স্বরূপের হুবহু অনুরূপ হয়তো নয়, কেননা আসলে কোনোকিছুর স্বরূপ আমি কখনোই জানতে পারি না। আমার চোখ বর্ণালির সাতটি রঙই শুধু গ্রহণ করতে পারে, তাই আমার জগৎ সপ্তবর্ণা। আরো অনেক রঙ, অসংখ্য দৃশ্য আমি দেখি না। যা দেখি, তা-ও খাটো করে, অপূর্ণ করে, চোখের ক্ষুদ্র খিড়কি গ’লে যেটুক আলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, তা-ই। কতো সহস্র বিচিত্র শব্দে মুখর এ বিশ্বজগৎ। আমি তার খুব কমই শুনতে পাই, সেকেন্ডে বারো থেকে কুড়ি হাজার কম্পাঙ্ক মাত্র। ফলে সামান্য বাঁদুড়ের ডাকও আমার কান পর্যন্ত পৌঁছুয় না, একে তাই নাম দিয়েছি আলট্রাসোনিক। একইভাবে আমার ঘ্রাণশক্তি কুকুরের চে’ এবং স্বাদশক্তি গরুর চে’ কম। তাপানুভবও মাত্র -১০০ থেকে +১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।



এতো সীমিতি সত্ত্বেও ইন্দ্রিয়গুলিই আমার প্রধান সহায়। এদের সমবায়েই আমি জগৎকে জানি। অতি জটিল ও শক্তিমান মস্তিষ্ক দিয়ে আমি চিন্তা করি, অনুভব করি এবং ইন্দ্রিয়লব্ধ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিই। সিধে কথায় এটাই জীবন, যা আমি যাপন করছি। আমার মধ্যে প্রতিনিয়ত বহুবিচিত্র আবেগ তৈরি হচ্ছে, সবগুলির নামও জানি না। কিন্তু যে-ভাবটি আমি সবসময় ভাবি, আশ্চর্য হয়ে ভাবি আর ভেবে আশ্চর্য হই, সারাক্ষণই শিহরিত হতে হতে চমকিত হতে হতে উপলব্ধি করতে থাকি কেবলই নতুন করে – আমি বেঁচে আছি! অসম্ভবরকম বেঁচে আছি! বিশ্বভুবনে আমার বেঁচে থাকার চে’ গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা নেই। কিন্তু, আসলে কে বেঁচে আছে?





দেহ

আমি। আমার মনে হয় না যে, আমি মানে একটি দেহ, যা তার যন্ত্রপাতি নিয়ে সচল আর একেই বলছি ‘আমি’। বরং আমি বেঁচে আছি শরীরসমেত। আপাতত আমি শরীরের মধ্যেই আছি। মানুষ শরীর দেখে আমাকে চেনে। শরীর আমাকে ধারণ করে, আনন্দ দেয়, দুঃখও। এ এমন এক জরুরি জিনিস, যা আমি কোথাও রেখে যেতে পারি না, এর থেকে আলাদা করে নিজেকে ভাবতে পারি না। ফলে জরুরি জিনিসের মতোই আমি এর যত্ন নিই, ভেবেচিন্তে একে নির্দেশ দিই। হ্যাঁ, শরীরটা জিনিস, একটা জৈবযন্ত্র। আমার এমনই বোধ হয়। অন্য দেহধারী মানুষেরাও তা-ই ভাবে। শরীরকে কেউ মানুষ বলে না। শবযাত্রা দেখে লোকজন জিজ্ঞেস করে : ‘কার লাশ?’ বলা হয়, ‘রফিকের’। এটি রফিকের লাশ, কিন্তু রফিক নয়। আমরা রফিকের লাশ গোসল দিই, লাশ দাফন করি – কিন্তু প্রার্থনা করি রফিকের জন্যে। তাহলে, যে-রফিককে আমরা চিনতাম, ওই যে ঢেউ খেলানো চুলের ফর্সা গোলগাল চেহারার যুবকটি, কোথায় সে? আসলে ‘চিনতাম’ কথাটি ঠিক নয়। কেননা রফিককে আমরা কখনোই দেখি নি। ফর্সা মুখ আর সুন্দর চুল যে-শরীরের অংশ – দেখেছি সেই শরীর, যার মধ্যে রফিক ছিলো। এখন সে তাতে নেই, ফলে দেহটি নিছক বর্জ্য। আমরা বর্জ্য মাটিচাপা দিই, যেন পরিবেশ নষ্ট না হয়। কিন্তু রফিক কোথায়, যাকে সমাহিত করা হয় নি? কোথাও না কোথাও আছে। দৃশ্যদেহী নয়, কিন্তু আছে।



আমার দেহও একদিন বর্জ্য হবে, সমাহিত হবে। একদা এর জন্ম হয়েছে দুই মানব-মানবীর সহযোগে। কিন্তু আমার কখনো জন্ম হয়েছে বলে মনে হয় না। আমার উদ্‌যাপন করবার কোনো দিন নেই। আমার মাতাপিতা নেই, সন্তান নেই, কথিত আদিপিতা আদমও আমার কেউ নন। আমি কে – সে এক রহস্য। দেহস্থ হবার আগে কেমন ছিলাম, কোথায় ছিলাম, ফের নানা সম্পর্কের জালে জড়ানো এ দেহ ত্যাগ করে ‘কোন্‌ সারথির উধাও মনোরথে’ কোথায় উড়ে যাবো কিংবা লীন হবো – আমি জানতে পারি না। আমি নিজেকে জানি কি জানি না, তা-ই জানি না। যুক্তিবিচারে ‘আমি আমাকে জানি না’ অকল্পনীয় কথা, কারণ তাতে কর্তা-কর্ম এক হয়ে যায়। একই কারণে ‘আমি আমাকে জানি’ পানির সলিলসমাধি কিংবা আগুন দিয়ে আগুন পোড়ানোর মতো। ‘আমি’ তবে কে, ‘আমি’ বোধটির তাৎপর্যই বা কী – এ প্রশ্নের বিপরীতে বস্তুত এমন কোনো উপকূল আমি খুঁজে পাই না, যেখানে দাঁড়িয়ে বলা যেতে পারে : ‘পেয়েছি’! আমি কেবল লিখতে পারি ঝরাপাতার মতো বিস্রস্ত পঙ্‌ক্তিমালা – যারা কোনো সঞ্চার রেখে যাবার দায় নেবে বলে মনে হয় না।





প্রাণ

মহাপৃথিবীর সকলকিছুকে দু’ভাগে আলাদা করে বিবেচনা করা হয়ে থাকে – জীব ও জড়। এ দুয়ের পার্থক্য স্পষ্ট। রসগোল্লার ওপর মাছি বসে আছে – এখানে রসগোল্লা ও মাছি যে একই রকম অস্তিত্ব নয়, তা যে-কোনো সহজবুদ্ধির লোকও বুঝবেন এবং বেশকিছু ব্যবধান বলতে পারবেন, যেগুলি দিয়ে দু’টিকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই শ্রেণী অর্থাৎ জীব ও জড় নামে আখ্যায়িত করা যায়। কিন্তু একজন বিজ্ঞানী এসব পার্থক্যকে তুলনামূলকভাবে স্বীকার করলেও চূড়ান্তভাবে মৌলিক বলে হয়তো মানবেন না। কারণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, যে-অপরিমেয় শক্তি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়, বস্তুমাত্রই সেই শক্তির আংশিক ও সাময়িক সংহত রূপান্তর। বস্তুর ক্ষুদ্রতম একক হলো পরমাণু – জগতের সমস্ত প্রাণী ও পদার্থ এক-একটি পারমাণবিক সংগঠন। কাজেই ‘ফুটবল’ মানে হলো কতকগুলো পরমাণু পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে এমন একটি আকার তৈরি করেছে, যাকে ফুটবল বলা যেতে পারে। যে-ছেলেটি ফুটবল খেলছে, সে-ও তেমনি কিছু পরমাণুর সমষ্টি। তবে আমরা যে খেলনাটিকে জড় ও খেলোয়াড়কে জীব বলি, তার কারণ, খেলোয়াড়ের মধ্যে জৈবগুণ আছে, যা পরমাণুরই উন্নততর বিন্যাস ও বিকাশের ফল।



বৈজ্ঞানিক বলয়ে বিশ্বসৃষ্টি ও প্রাণের উৎপত্তি বিষয়ে প্রচলিত প্রধান মতবাদ হলো ‘মহাবিস্ফোরণতত্ত্ব’। প্রায় পনেরো শো কোটি বছর আগে সহসা এক মহাবিস্ফোরণে সৃষ্টি হয় ফোটন, ইলেকট্রন, কোয়ার্ক ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা, এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে এই ফোটন আর ইলেকট্রন এবং ইলেকট্রন আর কোয়ার্ক জমে গিয়ে সৃষ্টি হয় নিউট্রন ও প্রোটন। এসব ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন বিভিন্ন সংখ্যায় একত্রিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু এবং প্রোটন ও নিউট্রন মিলে নিউক্লিয়াস গঠন করে। নিউক্লিয়াস হলো জীবকোষের নিয়ন্ত্রক। আর কোষ হচ্ছে জীবের সাংগঠনিক ও কার্যকর একক। জীবমাত্রেই একটি কোষ বা একাধিক কোষের সমষ্টি। ব্যাকটেরিয়া ও এরকম সামান্য কিছু অণুজীব এককোষী, এছাড়া মানুষসহ বেশিরভাগ জীবই বহুকোষী। মানবদেহ প্রায় একশো ট্রিলিয়ন কোষের সমষ্টি। অবাক ব্যাপার হলো, জীবদেহের প্রত্যেকটি কোষই আলাদা আলাদাভাবে জীবিত। জীবকোষের এই ‘জীবন’কে যদি ‘প্রাণ’ বলা যায়, তবে মানতে হবে যে, মানবদেহে ‘অনেক’ প্রাণ আছে। আর তা না মানলে বিজ্ঞানের কৌষিক ব্যাখ্যা ভুল প্রমাণ করে শুদ্ধ সত্যটি উদ্ধার করতে হবে, যাতে এ প্রশ্নগুলির জবাব থাকবে : প্রাণ বস্তু, না শক্তি? বস্তু হলে তার উপাদান কী; শক্তি হলে তা লৌকিক না অলৌকিক, সাকার না নিরাকার, সৃষ্ট না অসৃষ্ট? কোষ ছাড়াও একটি পুরুষ জীবদেহে কোটি কোটি জীবন্ত শুক্রাণু থাকে, মানুষের প্রাণের সঙ্গে সেসবের প্রাণের তফাত কী? একটি গাছের বহু ডাল কেটে রোপণ করে দেখা গেলো, ডালগুলি নতুন গাছে পরিণত হয়েছে; এক্ষেত্রে গাছের প্রাণ বহু, নাকি বিভাজ্য এক? স্বীকার্য যে, অন্ধকারে কালো বিড়াল খোঁজার আনুমানিক দর্শন এখানে কিছুই খুঁজে পায় না। আর ধর্ম এই বলে প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চায় যে, প্রাণ হলো আল্লাহর আদেশ বা তাঁর নিজস্ব বিষয়, আর মানুষকে খুবই সামান্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে যা দিয়ে প্রাণের রহস্য বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। কুরআনের এ বাণীর মর্ম আল্লাহ্ই ভালো জানেন, আমরা তো দেখছি যে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে মানুষ যথেষ্ট শক্তিমান, ইতোমধ্যে কৃত্রিম প্রাণ তৈরির প্রাথমিক পরীক্ষায় সে সফল হয়েছে এবং মানুষের অগ্রসরতার সম্ভাবনা জগতের কোনোকিছুকেই চূড়ান্তভাবে অস্পৃশ্য বলে প্রমাণিত করে না। কিন্তু কুরআন সবসময়ই একটু বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে, ফলে কুরআনের রূহসম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতিটি হয়তো প্রাণতত্ত্বানুসন্ধানের পথে এমন কোনো সম্ভাব্য বিরামচিহ্নের ইঙ্গিতবাহী, যেখানে পৌঁছে মানুষকে থেমে যেতে হবে; অথবা প্রাণকর্তার উদ্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি অনুধাবন ও অনুসরণের জন্যে প্রাণের প্রকৃতি বর্ণনা প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিক মনে না করা কিংবা আয়াতটির নিরুৎসাহ সর্বজনীন না হয়ে প্রেক্ষাপটে উপস্থিত প্রশ্নকর্তা দল পর্যন্ত সীমিত হওয়া ইত্যাদি নানা অর্থ ও উদ্দেশ্য ধারণ করতে পারে। সুতরাং বিকল্পহীন কারণেই প্রাণের প্রকৃতি, উদ্ভব, বিকাশ, সাময়িকী, ক্ষমতা, সীমা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণই আমাদের প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রাহ্য, কেননা এই জায়গায় বিজ্ঞান ছাড়া মানবজাতির আর কোনো জ্ঞানমাধ্যমই নিশ্চয়তা তৈরির সামর্থ রাখে না।





মন

আমার মন আছে। মন যে আছে, এর প্রমাণও আছে। তা হলো, আমি ‘মনে করি’ আমার মন আছে। মন আছে বলেই আমি মনে করি। মন না থাকলে মনে করা যায় না। কিন্তু আপনি, আমার মনে করা আপনার মনমতো না হলে দ্বিমত করতেই পারেন, তবে মনে হয় এমন কথা বলবেন না যে, আপনার মনে হয় না মন বলে কিছু আছে। কেননা তাতে, যা আপনি মনে করতে চান না, তা-ই মেনে নেয়া অনিবার্য হবে।



অতীতের দিকে তাকিয়ে এমন কোনো সময়ের সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায় না, যখন মানুষ ছিলো কিন্তু তার মন ছিলো না অথবা মানুষের মধ্যে মন বিষয়ে কোনো ধারণা ছিলো না। বরং অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুমান করা যায় যে, নিকট-অতীতের টুকটাক ব্যতিক্রম বাদ দিলে দীর্ঘ মানবেতিহাসে মন নিয়ে কখনোই আদৌ কোনো সংশয় ও তর্ক ছিলো না। এমনকী ওই প্রাচীন ব্যতিক্রমী চিন্তকরাও মন বা আত্মার অস্তিত্বের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নি, তাঁরা আলোচনা করেছেন এর উৎস, প্রকৃতি ও স্বভাব নিয়ে। প্লেটো আত্মার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো দুনিয়াকেই মুগ্ধ ও প্রভাবিত করে রেখেছেন, জ্ঞানের জগতে আজো তিনি আলোকিত। তারপর থেকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা হয়েছে, নতুন নতুন চিন্তা ও ব্যাখ্যা এসেছে স্রোতের মতো। সেসব লিপিবদ্ধ আছে দর্শনগ্রন্থাদিতে, সেই ফিরিস্তি ‘আমাদের আমি’ অন্বেষার এ ক্ষুদ্র নিবন্ধে উদ্ধৃত করবার অবকাশ নেই। আমি শুধু আমার ‘আমি’কে আমার মতো করে খোঁজার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো দু’একটি নাম ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাই, তাতে এরা সরে না গেলেও সমস্যা নেই, আনমনে ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই হেরি তায় সকল খানে’ গাইতে গাইতে পাশ কাটিয়ে চলে যাবো।



কুত্তাওলা পাভলভ (১৮৪৯-১৯৩৬) একজন রুশ শরীরবিদ ছিলেন। তবে মানবশরীর নয়, তাঁর গবেষণা ছিলো ইতর জীবদেহ নিয়ে। তাই প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন পশুবিদ। আরো বিশেষ করে, সমস্ত চর্চাই কুকুরকেন্দ্রিক বলে, তাঁকে কুত্তাবিদ বলা যায়। যদিও পৃথিবীর বিদ্যালয়সমূহে এখনো Dogology নামে কোনো বিভাগ নেই, তবু যে-কোনো সময়ই তেমন কিছু একটা চালু হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। কেননা নিত্যদিন বিদ্যার শাখা গজাচ্ছে। সেই শাখা থেকে প্রশাখা। তার থেকে প্রপ্রশাখা। এভাবে ‘প্র’ বাড়তেই থাকবে। তো, এই পাভলভ সাহেব এমনই মস্ত শরীরবিদ ছিলেন যে, শরীর ছাড়া আর কিছু তিনি বিশ্বাস করতেন না। আমরা জানি যে, চেয়ার-টেবিলের অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাকতেই পারে, কিন্তু চেয়ার-টেবিলের নিজের কোনো বিশ্বাস-অবিশ্বাস নেই। এগুলি জড়বস্তু, যাদের মন নেই। মন না থাকলে অবিশ্বাস সম্ভব নয়। কিন্তু পাভলভ নিজের মনকে অবিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের যে মন আছে, এ নিছক এক অমূলক ধারণা। কিন্তু মন ছাড়া কীভাবে তিনি মনে করতেন যে, মন বলে কিছু নেই? শরীরবিদ হিসেবে এই নাস্তির ধারণা তিনি কি শরীর দিয়েই ধারণ করেছিলেন? নাকি আমরা যে মনে করি যে, আমরা ‘মনে করি’, একেও ভিত্তিহীন মনে করতে হবে?



ইভান পাভলভ তাঁর কুত্তা নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে মনের অস্তিত্ব অপ্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন। আমরা তাঁর এ পরীক্ষাটি পরীক্ষা করে দেখবো। তবে তার আগে দেখা দরকার তিনি আসলে কী অপ্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন – মনের অস্তিত্ব, নাকি মনের অস্তিত্বে বিশ্বাসের অস্তিত্ব? এখানে ‘অপ্রমাণ’ করা মানে প্রমাণ না-করা নয়, বরং কোনোকিছু ভুল বলে প্রমাণিত করা। এ অর্থে শব্দটি কোন্ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – বিষয়, বিষয়ের ধারণা, নাকি দু’টোতেই? কেউ যখন বলে ‘ইমরান সাহেব শাহবাগ মাদরাসায় পড়ান’, তখন এটি একটি ধারণা ও উক্তি। যদি বাস্তবে দেখা যায় শাহবাগে ইমরান নামে একজন শিক্ষক আছেন, তাহলে সেই ধারণাটিই সত্য বলে স্বীকার্য হবে, ইমরান সাহেব নন। কেননা যদি বিবৃত হয় যে, ইমরান নামে কেউ এখানে নেই, অথচ বাস্তবে তিনি থেকে থাকেন, তবে বিবৃতিটি মিথ্যা হবে, কিন্তু ইমরান সাহেবের বিদ্যমানতায় এ মিথ্যার কোনো প্রভাব পড়বে না, তিনি বহাল তবিয়তেই থাকবেন। ফলে আমরা খুব সহজভাবেই বুঝতে পারছি যে, অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যের মতোই সত্য, ব্যক্তির জ্ঞাননির্ভর সত্য বা ব্যক্তির জানার মতো সত্য নয়। কাজেই মনময় ভাববাদের এই প্রান্তিক বক্তব্য – ‘আমি দেখি বলেই জগৎ আছে’ যেমন সত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বস্তুবিজ্ঞানের অণুবীক্ষণে খুঁজে পাওয়া যায় নি বলেই মনের অস্তিত্ব মিথ্যে হয়ে যাবার কোনো কারণ ঘটে না। একইভাবে এটি সত্য যে, আমার টেবিলে একটি জর্দার কৌটা আছে; ইচ্ছে করলে কৌটাটি ধ্বংস করে ফেলা যায়, কিন্তু সারা দুনিয়ার মানুষ মিলেও একে মিথ্যায় পরিণত করা সম্ভব নয়। সুতরাং ‘মন ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করার পেছনে কোনো যুক্তি ও সম্ভাবনা নেই, আর তা করলেও তাতে মনের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই মনকে নয়, বাস্তবভিত্তিক যুক্তি দিয়ে মানুষের মন থাকার ধারণাকে অবাস্তব প্রমাণ করবার চেষ্টা করা যেতে পারে, যদিও বাস্তবকে অবাস্তব প্রমাণ করবার পক্ষে বাস্তবভিত্তিক কোনো যুক্তি খুঁজে পাবার আশা করা যায় না।



ইভান পাভলভ কীভাবে তাহলে প্রমাণ করলেন যে, মানুষের মন বলে কিছু নেই?



কোনোভাবেই না। তিনি আসলে মন নিয়ে কোনো পরীক্ষাই করেন নি, মন তো বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষণীয় কোনো বস্তু নয়। তিনি প্রাণীর সামান্য একটি আচরণ শুধু লক্ষ করেছেন। তারপর সে আচরণকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করেছেন। অবশেষে এই দিয়ে একটি তত্ত্ব দাঁড় করাতে চেয়েছেন, যার নাম ‘সাপেক্ষ প্রতিবর্তী ক্রিয়া’। আমরা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবো, আদতে ওটা কোনো তত্ত্বই নয়, বরং আচরণের সরল ও যৌক্তিক একটি পরিবর্তন মাত্র, যা সকল প্রাণীতেই ঘটে; ফলে হইচই করবার কিছু তো এতে নেই-ই, মূলত এ কোনো তত্ত্বই নয়।



প্রতিবার কুকুরকে মাংস খেতে দেবার আগে তিনি ঘণ্টা বাজাতেন। দীর্ঘদিন এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ফলে ঘণ্টা শুনলেই সে খাবারের অপেক্ষা করতো। কেননা স্বভাবত কুকুরটি ধরেই নিয়েছিলো যে, ঘণ্টা বাজা মানেই খাবারের সময় হয়েছে। খাদ্যগ্রহণের জন্যে ক্ষুধার্ত প্রাণদেহের স্বাভাবিক যে-প্রস্তুতি, সে তো সকল প্রাণীতেই ঘটে। কুকুরেরও ঘটলো। একসময় দেখা গেলো, শুধু ঘণ্টার আওয়াজ শুনেই কুকুরটির মুখে লালা ঝরতে শুরু করেছে। কেচ্ছা শেষ। পাভলভ সাহেব তৈরি করে ফেললেন সাপেক্ষ প্রতিবর্তন। শুরু হলো তাঁর কীর্তন!



কথিত তত্ত্বটির ব্যাখ্যা : যে-উদ্দীপকটি স্বাভাবিকভাবেই প্রাণীদেহে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তা হলো স্বাভাবিক উদ্দীপক। স্বাভাবিক উদ্দীপকে তৈরি প্রতিক্রিয়া হলো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যে-উদ্দীপক সাধারণত কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না, সেটি হলো সাপেক্ষ উদ্দীপক। আর স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে সাপেক্ষ উদ্দীপকের পৌণঃপুণিক সংঘটনে শুধু সাপেক্ষ উদ্দীপক যদি স্বাভাবিক উদ্দীপকের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেই প্রতিক্রিয়াই সাপেক্ষ প্রতিবর্তী ক্রিয়া বা সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া। উল্লিখিত কুত্তাকাহিনীতে স্বাভাবিক উদ্দীপক মাংস, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া লালা নিঃসরণ; সাপেক্ষ উদ্দীপক ঘণ্টা, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ঘণ্টাধ্বনি শোনা; একত্রে স্বাভাবিক ও সাপেক্ষ উদ্দীপকে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া লালা নিঃসরণ; বারবার একসঙ্গে স্বাভাবিক ও সাপেক্ষ উদ্দীপকের ফলে শুধু সাপেক্ষ উদ্দীপকে নিঃসৃত লালা সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া।



পরীক্ষার ফল : পূর্বে যে-প্রতিক্রিয়াটি একটি স্বাভাবিক উদ্দীপক দ্বারা তৈরি হতো, স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে একটি সাপেক্ষ উদ্দীপক জুড়ে দেবার ফলে সাপেক্ষ উদ্দীপকটিও ওই প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়।



সমালোচনা : মানুষের আচরণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার চেষ্টা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পাভলভের অনুকরণে পরবর্তীকালে থর্নডাইক, ওয়াটসন, স্কিনার, পিয়াজেঁ, ক্রনার, মরগ্যান, বার্নার্ড প্রমুখ মনস্তাত্ত্বিক এই ধারাকে আরো এগিয়ে নেন, যার ফলে মনোবিজ্ঞান নিছক অনুমাননির্ভর গণ্ডি ভেঙে ভৌত ভিত্তি ও অধিক কার্যকরতা লাভ করে। তবে এ ইতিবাচকতা সত্ত্বেও আচরণবাদ তাত্ত্বিকভাবে গোড়া থেকেই একটি বিভ্রান্ত প্রয়াস। কারণ এর প্রবক্তারা তাঁদের পরীক্ষালব্ধ ফলাফল ছাড়াও এমন সব সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে থাকেন, যেগুলোর সঙ্গে তাঁদের পরীক্ষার কোনো সম্পর্ক তো নেই-ই, এমনকী বৈজ্ঞানিক সমর্থনও ছিলো না :



“Pavlov believed, as Watson was later to emphasize, that humans react to stimuli in the same way.



…Like Watson, however, Skinner denied that the mind or feelings play any part in determining behavior.” – (‘Behaviorism’, by Gary DeMar).



দেখুন, পাভলভ পরীক্ষা করলেন তাঁর কুকুর নিয়ে, কিন্তু ‘বিশ্বাস’ করে বসলেন যে, মানুষও এরকমই। মানুষের যে-কোনো আচরণই কোনো না কোনো উত্তেজকের প্রতিক্রিয়া। এখানে মন, আত্মা ইত্যাদি কাল্পনিক কোনো ব্যাপার নেই।



“তাঁদের মতে, মানুষের আচরণ পরিচালনার মূলে আধ্যাত্মিক আত্মা কিংবা অভ্যন্তরীণ মন বলে কিছু নেই। মানুষের আচরণ তথা সমগ্র কর্মকাণ্ড সর্বতোভাবে নির্ধারিত হয় বাহ্য পরিবেশ থেকে আগত উদ্দীপক দ্বারা।” – (আমিনুল ইসলাম, ‘দর্শন ভাবনা’, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২০০৯, পৃ ১৩২)।



প্রমাণহীন আচরণবাদীদের অসদাচরণ এখানেই থেমে থাকে নি, তাঁরা সীমালঙ্ঘনের সকল সম্ভাবনা অতিক্রম করে গেলেন। বস্তুবাদ মানুষকে উন্নত পশু বলেছিলো – এঁরা বললেন, মানুষ নিছক এক যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। অতঃপর বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা দেখলাম, পাভলভের কুকুর, থর্নডাইকের বিড়াল, স্কিনারের ইঁদুর ও ওয়াটসনের শিশু পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল উপেক্ষা করে আচরণবাদের মূলকথা হয়ে দাঁড়ালো এই অবৈজ্ঞানিক অস্বীকৃতি যে, মানুষ স্রেফ এক জৈবযন্ত্র, এদের মন বলে কিছু নেই; চেতনাও নেই, এরা যা-কিছু করে অবচেতনভাবেই করে, উদ্দীপকে সাড়া দিতে গিয়েই করে :



“The central tenet of behaviorism is that thoughts, feelings, and intentions, mental processes all, do not determine what we do. Our behavior is the product of our conditioning. We are biological machines and do not consciously act; rather we react to stimuli.” (David Cohen, “Behaviorism”, Oxford University Press, 1987, P. 71).



এসব ‘মত’ ও ‘বিশ্বাস’ যে বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবগ্রাহ্য নয়, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ বিজ্ঞানের অভিধানে ‘বিশ্বাস’ বলে কিছু নেই; আর যে-কোনো বিষয়ে যে-কোনো ‘মত’ পোষণ করবার অধিকার সবারই আছে, কিন্তু সেই ‘মত’কে বৈজ্ঞানিক বলতে হলে একে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ ও প্রমাণিত হতে হয়। অথচ আচরণবাদীদের কেউ-ই মানুষের মন বা আত্মা না-থাকা সংক্রান্ত তাঁদের বিশ্বাসটি সেভাবে যাচাই করে দেখেন নি। বরং ইতর জীবজন্তু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেসব ফলাফল পাওয়া গিয়েছে, তার ভিত্তিতে তাঁরা অনুমান করেছেন যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষেরও মন বা আত্মা বলে কিছু থাকতে পারে না। আমরা জানি, কোনো বিষয়ে মতবাদ দাঁড় করাতে হলে তার পেছনে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা কিংবা বাস্তবিক যুক্তি থাকতে হয়। আচরণবাদীদের মতামতের পেছনে এ দু’টির একটিও নেই। সঙ্গত কারণেই আচরণবাদকে ‘মতবাদ’ বা ‘তত্ত্ব’ ভাবারও দরকার নেই।



বস্তুত অস্তিত্ব দু’রকম : ফেনোমেনাল রিয়্যালিটি, কনসেপ্চুয়্যাল রিয়্যালিটি। বস্তুবিজ্ঞানের কারবার প্রথমটি নিয়ে। তার মানে এই নয় যে, বিজ্ঞান আধ্যাত্মিক ও মানসিক শক্তি ও সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে। বরং বিজ্ঞান যা অস্বীকার করে, তা হলো সম্ভাবনা নাকচ করে দেবার একরোখা নীতি। বিজ্ঞান তার নাগালের ভেতরের জিনিস নিয়ে কাজ করে, আর বাইরের বিষয়ের জন্যে অপেক্ষা করে। আগেভাগেই কোনোকিছু অস্বীকার করে বসলে বিজ্ঞান এতোটা এগুতে পারতো না। বিজ্ঞানের দ্বারা যতো তথ্য আমরা জেনেছি, তার সবই তো ইতোপূর্বে অজানা ও আওতাবহির্ভূত ছিলো। অজ্ঞাত বিষয়ে তখন কিন্তু বলতে পারতাম যে, না, এমন হতেই পারে না। আজ সেসব হয়েছে। সম্ভাবনা স্বীকার করবার ফলেই হয়েছে। মানুষের সমস্ত বৈশিষ্ট্য যে ক্ষুদ্র একটি ডিএনএ অণুর মধ্যে ধারণ করে রাখা থাকে, এ-ও মাত্র কিছুদিন আগে অকল্পনীয় ছিলো। সেসময় এ অণুর কথা কেউ যদি বলতো, তবে তা নিরেট রূপকথার মতোই শোনাতো। ১৯৫৩-তে সেটি আবিষ্কৃত হলো, ক্রমে বিজ্ঞানীরা অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার উদ্ঘাটন করতে থাকলেন। এরকম অজস্র ঘটনা সাক্ষ্য দেয় যে, জগতের অসংখ্য সত্য আমাদের জানার বাইরে। আমরা যতো জানতে পারছি, ততোই মনে হচ্ছে অজানার জগৎটা এর চে’ বড়। কাজেই অজানা সবসময়ই সম্ভাবনাময় সত্য, সেই সত্যকে অস্বীকার করবার মধ্যে বিজ্ঞান নেই। মন তেমনই এক সত্য। কতিপয় ব্যক্তি জড়ো হয়ে যদি চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘মন বলে কিছু নেই’ – তবে সেটি অবশ্যই একটি অবৈজ্ঞানিক আচরণ, যাতে স্রেফ একগুঁয়েমিরই পরিচয় দেয়া হয়। কোনোকিছুকে মিথ্যা বলতে হলে আগে তাকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করতে হয়। এইখানে সেটি বিজ্ঞানের সাধ্য নয়। কারণ মন ও আত্মা আধ্যাত্মিক সত্য, যাকে রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায় না।



আসলে মন স্বীকারনিরপেক্ষ সত্য। স্বতঃসত্য। এ সত্যের পক্ষে অনেকে অনেক প্রমাণ হাজির করেছেন, যদিও সেসবের কোনোই দরকার ছিলো না। কেননা মন সতত স্বপ্রমাণিত। মন সত্যের চে’ বেশি, আল্লাহর চে’ বেশি সত্য। আল্লাহকে অবিশ্বাস করে দিব্যি বেঁচে থাকা চলে, কিন্তু মন এমনই বিস্ময়কর সত্য যে, একে অস্বীকারের চেষ্টা করাও অসম্ভব। কারণ আমরা দেখি যে, কেউ যখন মনকে অস্বীকার করবার চেষ্টা করেন, তখন সেই চেষ্টারও প্রকৃত কর্তা এক ‘মন’। কাজেই মন অস্বীকারের সমস্ত চেষ্টাই পরিণামে মনের সত্যের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। তেমন ব্যর্থ চেষ্টা যাঁরা করেছেন, তাঁরা দুঃখজনকভাবে বিভ্রান্ত। বিজ্ঞান মানেই যে পদার্থবিজ্ঞান নয়, কনসেপ্চুয়্যাল রিয়্যালিটি বা ভাবসত্য বলে যে কিছু থাকতে পারে, এঁরা তা ভাবেন নি। চিরাগত মানুষের কাছে, আলোকিত মন ও মননের মহত্ত্বের কাছে, এঁদের জন্যে ক্ষমার প্রার্থনা – করুণার প্রার্থনা সকল মনের সঞ্চারক মহামনের কাছে!



অতএব এই যে ‘আমি’ – এ দেহ নয়, তবে দেহময়; প্রাণ শুধু নয়, প্রাণময়; কেবলই মন নয়, কিন্তু মন্ময়। আমি বলতে পারি আমার দেহ আছে, প্রাণ আছে; কিন্তু ‘আমার মন আছে’ বাক্যটি বক্তব্য নয় ( বক্তব্য মানে যা বলা যায় বা বলা হবে)। কেননা মন নিজেকে ‘আমি’ বলতে বা ভাবতে পারে, কিন্তু ‘আমার’ ভাবতে পারে না। যদিও ভাবনা, পরিকল্পনা, স্মৃতি, আবেগ, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি সবই মনের কাজ। বোঝার জন্যে কল্পনা করুন, একটি গ্লাস বলছে : ‘আমার গ্লাসে আপনাকে পানি খেতে দেবো না’। এটি কি কোনো সম্ভব বাক্য হলো? উঁহু। বরং গ্লাস বলতে পারে : ‘আমাতে আপনাকে পানি খেতে দেবো না’। ঠিক তেমনি মনের জন্যে ‘আমার মন’ চিন্তাও সম্ভব নয়। এসব কথা থেকে সাধারণত মনে হবে যে, মনই আমি। কিন্তু আমি তা মনে করি না। আমার মনে হয়, আমার মধ্যে ‘আমার মন’ চিন্তাটি কল্পনীয় ও বক্তব্য না হলেও শুদ্ধ। এই চিন্তার চিন্তক নেই, এই ব্যক্তের বক্তা নেই – কিন্তু এই সত্যের কর্তা আছে। ‘আমার’ শব্দটি যে-অধিকারের অর্থ ধারণ করে, সেই অর্থে সেই কর্তাই এই দেহ-প্রাণ-মনের অধিকর্তা। সে-ই ‘আমি’, আমার চিরকালের ‘আমি’। কে সে?





আত্মা

আমি মানুষ। আমি দেহে অভিব্যক্ত, প্রাণে প্রাণিত, মনে উপলব্ধ – এ দেহ-প্রাণ-মন তাই আমার, কিন্তু ‘আমি’ নই। দেহ জড়ীয় সংগঠন, আগুনের মতো – প্রাণ তার উত্তাপ। ‘অস্তিত্ব’ বা ‘সত্তা’ বললে যা বোঝায়, প্রাণ সেরকম কিছু নয়, মনও নয়। তবু প্রাণ একটা শক্তি, মন সেই শক্তির উচ্চতম গুণ। প্রাণ দেহময় বিস্তৃত, মন মূলত মস্তিষ্কাশ্রয়ী। কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করলে, মোটামুটিভাবে – দেহ ইনপুট-আউটপুট ডিভাইস, প্রাণ পাওয়ার ইউনিট, মস্তিষ্ক মাইক্রো প্রসেসর, মনের স্মৃতি হার্ডডিস্ক, কিন্তু চিন্তা-আবেগ-সৌন্দর্যবোধের উৎস ও আধার হিসেবে মনের তুলনা হয় না। প্রাণ সম্পূর্ণ দেহনির্ভর, দেহহীন প্রাণ হয় না। দেহ, প্রাণ ও মন একে অন্যকে প্রভাবিত করে : দেহে ক্লোরোফর্ম প্রয়োগে চেতনা অবশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, মন দুঃখে কাতর হলে দেহের চোখে অশ্রু গড়ায়, আর জীবনীশক্তির অভাবে দেহ-মন দুই-ই হারিয়ে যায়। প্রাণ দেহের মতো জড়ীয় বা আত্মার মতো অজড়ীয় সত্তা নয়, সে শুধুই এক শৃঙ্খলার ফল। তাই প্রাণ সৃষ্ট নয়, অসৃষ্টও নয় – বরং উদ্ভূত। যে-কোনো বস্তুতে এই শৃঙ্খলা তৈরি করতে পারলে তাতে প্রাণের উৎপত্তি হবে। মস্তিষ্ক তৈরি করাও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাধ্য, কিন্তু মস্তিষ্কাশ্রয়ী মন নয়। মনের একটা অতিবর্তী মাত্রা আছে, আত্মাসমন্বিত। মন নানা কাজ করতে পারে, কিন্তু ‘আমি’ মনকে দিয়ে যা করিয়ে নিই, একা মন তা পারে না। কেননা মনের আছে বুদ্ধিমত্তা, আর ‘আমার’ প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার বলেই আমি অর্থাৎ মানুষের আত্মসত্তা মহান, আর প্রজ্ঞাময় আত্মা আছে বলেই মানুষ মহীয়ান।



কম্পিউটার মস্তিষ্কের তৈরি, মানুষের মেধাই সভ্যতার নির্মাতা, ‘নাসা’র কৃত্রিম উপগ্রহগুলিও সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তার কাজ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে-গানগুলি লিখেছেন, কেবল মেধা বা মস্তিষ্ক দিয়ে তা সম্ভব ছিলো না। তাই কবির মস্তিষ্কের নিউরন ব্যবচ্ছেদ করে গানগুলি বের করে আনা যেমন সম্ভব হতো বলে কেউ ভাবেন না, তেমনি সমস্ত বাঙালির মন জড়ো করেও সেইরকম অপূর্ব বাণী ও সুরের ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারা’ উৎসারণ সম্ভবপর মনে হয় না, যতোক্ষণ না তাতে ‘অলোক লোকে’র আলো এসে পড়েছে। গানগুলি আসলে রচনা করেছেন ‘মানুষ রবীন্দ্রনাথ’, আর ‘ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ’ সেগুলি মনের শিল্পরসে সুষমিত করে খাতায় টুকে নিয়েছেন।



মনসুর হাল্লাজ শেষ পর্যন্ত তাঁর ‘আমি’কে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই বললেন, ‘আমিই সত্য’। কিন্তু প্রজ্ঞার আলো যাঁদের ছিলো না, সেই কেতাবি আলেমদের ফতোয়ায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো। মনের জ্ঞান মনসুরকে বুঝতে ব্যর্থ হলো। জাগ্রত আত্মার প্রজ্ঞার অভাবে তাঁরা খেয়ালই করলেন না যে, মনসুর বলেন নি, ‘মনসুর সত্য’।



এই মানবাত্মার সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের যোগসূত্র বাঁধে মন। তাই আমাদের সাধক লালন সাঁই তাঁর ‘অচিন পাখি’র জন্যে ‘অপার হয়ে’ বসে থাকেন, আকূল হয়ে গান ধরেন :



“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়,

তারে ধরতে পারলে মন-বেড়ি দিতাম পাখির পায়।”



পরমাত্মার প্রেরিত মহামানব পুণ্যাত্মা মুহাম্মদ সা. এ আমি সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে শুধু বলেন : ‘আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিজের মতো করে।’ এ তাৎপর্যপূর্ণ বাণীটি হাদীস গ্রন্থাদিতে বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে। সমস্ত পণ্ডিত হাদীসটির শুদ্ধতায় একমত, কিন্তু ব্যাখ্যায় দ্বিধান্বিত।



দুর্দম প্রাণবেগোন্মত্ত নজরুলকে জীবনে কখনোই দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা যায় নি। কাব্যে-সঙ্গীতে-গদ্যে-যুদ্ধে-দাবা খেলায় সর্বত্রই তিনি উল্লসিত ‘মরুনির্ঝর ঝরঝর’। একদিন হঠাৎ বলে উঠলেন – ‘আমি চিনেছি আমারে’। তাঁর সেই আত্মপ্রকাশ ছিলো বিস্ফোরণের মতো :



“আমি মৃন্ময় আমি চিন্ময়,

আমি অজর অমর অক্ষয় আমি অব্যয়,

বিশ্বের আমি চির দুর্জয়,

জগদীশ্বর ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,

আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্য!

আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ,

আমি চিনেছি আমারে আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!



এই আমি অনন্ত আমি, জগদীশ্বরের ইচ্ছা থেকে সৃষ্ট। ইহজীবনের পরীক্ষাপর্ব শেষে পুনরায় আল্লাহর ইচ্ছার কাছেই নীত হবে। এ-ই মানুষের আত্মসত্তা, প্রকৃত মানুষ। তবে মর্তের মানুষ হলো দেহ, প্রাণ, মন ও আত্মার সমন্বিত ঐক্য। এ ঐক্যের ‘কুঠুরি’ থেকে পরমলোকের দিকে খুলে দেয়া একটি জানলা হলো আত্মা। মানবাত্মা তাই মানুষ হয়েও অতিমানুষ, ঐশ্বরিক প্রেরণায় প্রদীপ্ত এক সত্তা। মানুষের এই অতিমাত্রাকে স্পর্শ করবার মতো দীর্ঘ বাহু যার আছে, সে-ই বলতে পারে : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ অথবা ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’। সহজাত ইন্দ্রিয় নয়, জটিল মস্তিষ্ক নয় – মানুষ যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, তারও রহস্য এইখানেই।


--------------------------------------------------------------------------------


আবদুল হক -- কবি ও প্রাবন্ধিক; শিক্ষক : শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া ক্বাসিমুল উলূম, জকিগঞ্জ, সিলেট।

[email protected] 01735530000
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×