৬ কুরআনে মুসলিম জাতীয়তানীতি ও সম্পর্কসূত্র
আমাদের সার্বভৌম প্রভু মহান আল্লাহ্ একমাত্র ঈমানকেই আমাদের পারস্পরিক সামাজিক ও জাতীয় যাবতীয় সম্পর্কের সূত্র বলে আমাদেরকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা এ সতর্কবার্তা ভুলে গিয়ে বংশ ও আঞ্চলিকতা ইত্যাদি মনগড়া সম্প্রীতি-নীতির অজুহাতে আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তারা যালিম বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ্ বলছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতা যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে শ্রেয় জ্ঞান করে, তবে উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তাহারাই যালিম।” (কুরআন, ৯:২৩)।
বিশ্বব্যাপী আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্যেই মুসলিম উম্মাহ্র উদ্ভব। এই উম্মাহর লক্ষ্য যেমন বড়, তেমনি এর আদর্শ, অবস্থান ও কর্মনীতিও সকল দুর্বলতা, নেতিবাচকতা, সঙ্কীর্ণতা ও ক্ষুদ্রতার উর্ধে। ভাষার পার্থক্য তাদেরকে বিভক্ত করে না। অবস্থানের দূরত্ব তাদের ভালোবাসার কাছে পরাস্ত হয়। বর্ণের বৈচিত্র বা গঠনের তারতম্য তাদের ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বে কোনো খাদ তৈরি করতে পারে না। হাজার হাজার মাইল দূরের এক সাধারণ মুসলিম প্রজাকে সামান্য অপমান করায় মুসলিম খলীফা তাই সমগ্র খ্রিস্টসাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কেননা যে- মুসলিম, সে আমার ভাই; সে কোথায় থাকে, কোন্ ভাষায় কথা বলে, তাতে কিছুই যায় আসে না। সে আমার প্রাণের সুহৃদ, কারণ সে মুসলিম। যে- মুসলিম, নিগ্রো হোক স্প্যানিশ হোক আরবী হোক, সে আমার সহোদরের চে’ নিকটজন। সে আমার অনন্তকালের আত্মার আত্মীয়। এই তো ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। অথচ হে মুসলিম, হে আমার আত্মভোলা ভাই, হে শান্তি-সম্প্রীতির পথিকৃৎ, কোথায় তুমি আজ? আর কোথায় তোমার আত্মপরিচয়ের সোনালি ইতিহাস?
আল্লাহর চোখে আমাদের সবচে’ বড় পরিচয় তো এটাই যে আমরা তাঁর বান্দা। আল্লাহ্ আমাদের একমাত্র ইলাহ, মা’বূদ ও হুকুমকর্তা। হযরত মুহাম্মদ সা. আমাদের একমাত্র মৌলিক শিক্ষক। এসব কথা আন্তরিক ও কার্যকরভাবে নির্দ্বিধায় স্বচ্ছন্দে মেনে নিয়েই তো আমরা মুমিন ও মুসলিম হয়েছি। তাই ঈমানের দাবি হলো, আমাদের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান, সব প্রশ্নের উত্তর এবং সমস্ত চাহিদার সম্পূরক আমরা কুরআন এবং সুন্নাহ্ থেকেই গ্রহণ করবো। তা না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো কিছু বিষয় শরীয়া থেকে আর কিছু নিজের বুদ্ধি ও রুচির সিদ্ধান্ত অথবা বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠির মতামত থেকে বেছে নেয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। এমনটি করলে আমরা আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ ‘তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর’ (২:২০৭) এর অমান্যকারী, সুবিধাবাদী এবং আল্লাহর একক আনুগত্য ও সার্বভৌমত্বে অংশী সাব্যস্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পরিণামে নিগৃহীত হবো। অতএব আমাদের সামাজিক ভ্রাতৃবন্ধনের সূত্র কী, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের নির্ণায়ক কোন্ জিনিস, কীসের ভিত্তিতে আমরা পরস্পর প্রীতিবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে জীবনযাপন করতে সক্ষম হবো – এসব প্রশ্নের উত্তরও কুরআন-সুন্নাহ্ থেকেই খুঁজে নিতে হবে।
আগের আয়াতে আমরা দেখেছি যে, ঈমানী মিল ছাড়া আপন পিতা বা সহোদর ভাইকেও অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতে বারণ করা হয়েছে। এখন আমরা যা পাঠ করবো, তাতে ঈমান ও সদাচার ছাড়া বৃহৎ জাতিসত্তার সদস্য দূরের কথা, ক্ষুদ্র পরিবারেরও অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট হযরত নূহ আ. এর সময়কার মহাপ্লাবন। দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে ধ্বংসের ঢেউ। গুটিকয়েক ঈমানদারকে নিয়ে নূহ কিশতিতে উঠেছেন। সম্মুখে তাঁর ছেলে ডুবে যাচ্ছে। তিনি ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে ডাকছেন– “ইরকাব মাআনা, হে প্রিয় সন্তান! জলদি উঠে এসো আমাদের সঙ্গে..। তুমি তো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছো.. এসো... এসো....!” সেই সঙ্গে নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আসুন, দৃশ্যটা সরাসরি দেখি:
“নূহ তাহার প্রতিপালককে সম্বোধন করিয়া বলিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্র“তি সত্য; আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।
তিনি বলিলেন, হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ন। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও।” (কুরআন, ১১:৪৫-৪৬)।
হযরত নূহ বললেন তাঁর ছেলে তাঁর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। জবাবে আল্লাহ্ বললেন, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এটা আল্লাহর ফায়সালা। এটাই ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সূত্র হিসেবে পরিবার, বংশ, গোত্র, বর্ণ, ভাষা, দৈহিক গঠন, সহাবস্থান ও ভৌগোলিক সীমারেখা ইত্যাদির কোনো মূল্য নেই। ইসলামে সম্পর্কের ভিত্তি ও ঐক্যের একমাত্র সূত্র হলো আদর্শ। শুধুই ঈমান ও তাক্বওয়া।
মুশরিক ও দুর্বৃত্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে কোনো মুসলিমের ভ্রাতৃসম্পর্ক হতে পারে না, কেননা তারা আল্লাহর দ্বীনের ও তার অনুসারীদের কল্যাণকামী নয়। ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ শ্লোগান অথবা এ গান ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ নিছকই অজ্ঞতাপূর্ণ আবেগ। জ্ঞানীদের জন্যে আল্লাহ্ বিধান বিবৃত করেছেন যে, ভাই ভাই সম্পর্ক কেবল ঈমান ও সদাচারের ভিত্তিতেই হতে পারে:
“তাহারা কোন মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না, তাহারাই সীমালঙ্ঘনকারী। অতঃপর তাহারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তাহারা তোমাদের দ্বীনী ভাই; জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বিবৃত করি।” (কুরআন, ৯:১০-১১)
“তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদেরকে এমনি ছাড়িয়া দেওয়া হইবে যখন পর্যন্ত আল্লাহ্ না প্রকাশ করেন তোমাদের মধ্যে কাহারা মুজাহিদ এবং কাহারা আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণ ব্যতিত অন্য কাহাকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করে নাই?” (কুরআন, ৯:১৬)
ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ হিন্দু-খ্রিস্টান-ইহূদী-বৌদ্ধ-নাস্তিক সবার সঙ্গেই সৌহার্দপূর্ণ বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের প্রেরণা দেয়। ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয়তাবাদীরাও হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে স্বাধীনতা আন্দোলন না করলে মুসলিম জনগোষ্ঠির ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কাবার্তা উচ্চারণ করে মুসলিম স্বায়ত্তশাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ আল্লাহ্ বলছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না, তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাহাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে সে তাহাদেরই একজন হইবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।”
“এবং যাহাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রহিয়াছে তুমি তাহাদেরকে সত্বর তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইতে দেখিবে এই বলিয়া, ‘আমাদের আশঙ্কা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটিবে।’ ” (কুরআন, ৫:৫১-৫২)
কংগ্রেসপন্থী মুসলিমরা পৌত্তলিকদের ঐক্য ও সম্প্রীতি-প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ আমাদেরকে আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম ও তাঁর উত্তরসূরীদের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি পৌত্তলিকদেরকে বলেছিলেন, কাফারনা বিকুম– আমরা তোমাদেরকে মানি না।
“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাহার অনুসারীদের মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ। যখন তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাহার ইবাদত কর তাহার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হইল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যদি না তোমরা এক আল্লাহ্তে ঈমান আন।’ ” (কুরআন, ৬০:৪)
সর্বোপরি কাফির-মুশরিক-মূর্তিপূজকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন ইসলামের চেতনা ও ঈমানের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের নিয়মেই যা করতে বাধ্য হয়:
“তুমি পাইবে না আল্লাহ্ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়, যাহারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে– হউক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাহাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা ইহাদের জ্ঞাতি-গোত্র।” (কুরআন, ৫৮:২২)।
(চলবে)...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



