এ ব্লগে আর কোন মৌলিক লেখার দরকার নেই, যেহেতু আমি আমার নিকৃষ্টতম লেখার স্বত্ব ও কাউকে দিতে রাজী নই

। । গুল্ম ও কুঠার । ।
২০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৫৯
।1।
খেলাটা আমি প্রথম শিখেছিলাম হাসানের কাছে ।
সেদিন আমার তেমন কোনো কাজ ছিলনা । যেমন থাকেনা কখনোই ।
ভর দুপরে হাজির হয়েছিলাম ওর অফিসে ।
ও বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাকে বলেছিল --'একটা জিনিস দেখবি '
---দ্যখা । আমার আসলে আগ্রহ ছিলনা তেমন ।
তবু ওর কথামতো চোখ রেখেছিলাম কম্পিউটার স্ক্রীনে । তেমন কিছুনা । কটা আবছায়া রেখা শুধু ।
---'রেখাগুলোর মাঝখানে চারটা বিন্দু দেখছিস? ওখানে চোখ রাখ । একেবারে 30 সেকেন্ড । একটু ও নড়বিনা ।চোখের পলক ফেলবি না । '
আমি তাই করলাম ।
---'এবার চোখ বন্ধ কর । ঘাড়টা একটু পেছনে হেলিয়ে দে '
আমি ওর নির্দেশ শুনি ।
প্রথমে অন্ধকার । প্রিয় অন্ধকার । একটু ফিকে ক্রমশঃ ।
একটা গোলাপী বলয় ।
তার ভেতরে কিযেন একটা । কে যেন এক!
একটা চেহারা । আসছে... যাচ্ছে... ভাসছে । ধরতে পারছিনা, পারছিনা । হঠাৎ.. স্থির ।
যেশাস! যীশুর মুখচ্ছবি । মানুষের সমস্ত পাপ ধারন করে যে ক্রুশ কাঠে বিদ্ধ করেছিল নিজেকে ।
সেদিন পরপর তিনবার কম্পিউটারে খেলাটা খেলেছি আমি । হাসান কম্পিউটারের লোক । ও কিসব লজিক টজিক দিয়ে খেলাটার একটা ব্যখ্যা দিয়েছিল আমাকে । বোঝিনি । সবকিছুর ব্যখ্যা আমার ভাল্লাগেনা ।
সেদিন পুরোটাই যেন ছিল আমার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ।
হাসানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়াতেই প্রতীতি ও তার চার চাকার মোটর যান । ওটা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
শালার দেশটা কি আইসল্যান্ড হয়ে যাচ্ছে নাকি ? নাকি মানুষের চর্বি জমছে বেশী, তাই গরম ও বেশী বেশী!
গাড়ীতে উঠার পর প্রতীতি জানালো ও আমাকে সকাল বেলা থেকে খুঁজছে । আজ আমার জন্ম দিন ।
আহ্ হা ! এই মাত্র মনে পড়ল । Happy Birthday to myself!
ঘুম থেকে উঠে মনে পড়লে তো নিজের গালে নিজেই একটা চুমো দেবার চেষ্টা করতাম । যায় নাকি ওরকম? নিজের গালে নিজে চুমো দেয়া? আমি কারো গালে এখনো চুমো দেইনি । আমাকে ও কেঊনা । বলবো নাকি প্রতীতিকে?
থাক্- বেচারা হাসান মাইন্ড করবে । নারী আর নদী কেবলি ভাংগে । গড়ে ও । কিন্তু সেতো ভাংগনের পর প্রলেপ মাত্র ।
সেই দুপুরে, আমার জন্মদিনের দুপুরে প্রতীতি আমাকে খাইয়েছিল একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেঁস্তোরায় ।
প্রতীতি আমার প্রেমিকা না। প্রতীতি কবিতা বোঝেনা। প্রতীতি প্রীতিলতাকে চেনেন া। প্রতীতি হিন্দী সিরিয়ালের পোকা। প্রতীতি আমার মাথাব্যথা।
।2।
একবার আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য।
আসলে আমি চলে গিয়েছিলাম শহর ছাড়িয়ে বেশ দুরের এক চা-বাগানে। আমার এক বন্ধু ছিল ওখানে। সেই চা-বাগানের ভেতর খ্রীস্টানদের একটা কবরস্থান । রাবার গাছ ঘেরা । কি ভীষন নির্জনতা ছিল সেখানে। টুপটাপ অক্সিজেন ঝরে পড়ার শব্দ শুনেছিলাম আমি । রাবার গাছের বিচিগুলো অদ্ভুত সুন্দর । যেন আল্পনা আঁকা । কার কথা ভেবে যেনে কটা নিয়ে এসেছিলাম পকেটে করে ।
শহরে ঢুকতেই প্রতীতির সাথে দেখা । আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলাম । ও গ্রহন করেছিল । হেসেছিল । হয়তো হাসিতে ভালবাসাই ছিল । কিন্তু আমি কেন যেন তাচ্ছিল্য দেখেছিলাম।
ওর বড় বেশি ভালোবাসা । শরীরে, মনে, সবকিছুতে । বালিকা বাস করে বায়ুমাঝে । বালিকা জানেনা ঘৃনা করতে না জানলে সত্যি করে ভালবাসা যায়না । যেমন চাঁদ তারাকে ঘৃনা না করলে ভালোবাসা যায়না লালসবুজকে । মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ঘৃনা,কানকুনের বনিক সভায় ঘৃনা,ধর্ম গ্রন্থগুলোর পাতায় পাতায় ঘৃনা । প্রতীতি ওসবের খোঁজ রাখেনা ।
রেস্তোঁরায় মুখোমুখি বসে আমার চোখ পড়েছিল ওর রাজ হংসীর মত গলায় । ওখানে একটা চমৎকার তিল । ইচ্ছে হয়েছিল ওখানে চোখ রেখে ওই খেলাটা শুরু করি আবার ।প্রতীতি চোখ নামিয়েছিল কিন্তু আমার আর মনঃসংযোগ হয়নি।
।3 ।
সেদিন বাড়ি ফিরি আমি মাঝরাতে ।
দেয়াল টপকে ভেতর বাড়ি । শেওলা ধরা সিড়ি বেয়ে আমার দেড়তলার খুপড়িঘরে। নীচে বড়ভাইয়ের ঘরে বাতি নেভানো।নিষিদ্ধ শব্দমালা, ভালোবাসা অথবা ঘৃনার পদাবলী। পাশের ঘরে বাবার কাশির শব্দ । জীবনের দায়শোধ । জননী তা শোধ করে চলে গেছেন আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে ।
বহুদিন পর সেই রাতে আমার মনে পড়েছিল- এক সময় আমি ছবি আঁকতাম । পাখী,মাছ,ফুল,প্রজাপতি,ঘোমটা দেয়া বউ। সবল মাঝি,ভালোবাসা । বিছানার নিচে তখনো য়ে যাওয়া রংতুলি, শুকিয়ে যাওয়া রং্যের কৌটা ।
শুকিয়ে যাওয়া রংয়ের কৌটায় জল ঢেলে ক্ষয়ে যাওয়া তুলি ভিজিয়ে আবছায়া কটা টান দিয়েছিলাম কোনার দেয়ালে । না পাখী,না মাছ,না ফুল,না প্রজাপতি,না ঘোমটা দেয়া বউ,না সবল মাঝি,না ভালোবাসা ।
আমি কেবল কটা টান দিয়েছিলাম ঘৃনার । আর তার ভেতর কটা বিপরীত ফোঁটা ছিল । ভালোবাসার ।
তারপর শুরু করেছিলাম সেই খেলাটা ।
ঘৃনার দাগের ভেতর ভালবাসার কটা ফোঁটা । সেগুলোতে চোখ রাখা একটানা । তারপর চোখ বন্ধ করে ঘাড়টা একটু পেছনে হেলে দেয়া । একটা আবছায়া গোলাপি বলয় । কিন্তু এবার আর যিশু নয় । ওখানে এক বালিকার মুখ । সেই বালিকা ফ্রেম বন্দী হয়ে আছে আমার বাবার সাথে বিয়ের ছবিতে ।
সেই রাত থেকে প্রতিরাতে এই খেলাটা খেলি আমি । সেই একই খেলা । মাঝে মাঝে মুখগুলো বদলায় শুধু ।
কখনো সে মুখ মার্গারেট ম্যাতিউস,কখনো প্যালেস্টাইনের কোনো অচেনা কিশোরী- যে বুকে বোমা বাঁধছে প্রবল ঘৃনায় তার তীব্র ভালোবাসাকে বাঁচাবে বলে ।
আমি ওখানে একটা মুখ দেখতে চাই । সে কারনেই আমার প্রতিরাতের আয়োজন ।
জানি একদিন সে মুখ আমি দেখবো নিশ্চিত । আর সেদিনই শেষ হয়ে যাবে আমার এ খেলা ।
আমার আশ্চর্য উদ্ধার । ।
[ছবির নাম:: The speed of pain ।
সুত্র: ইন্টারনেট
]
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
অতিথি বলেছেন:
আরেকটু বড় হলে কি দোষ হত? আরো কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতাম...না থাক, শেষ হয়ে যাবার পরের ঘোরটাও তো অনেক পাওনা..।
অতিথি বলেছেন:
জটিল।পইড়া কইলাম।কসম।
নূর-ই-হাফসা বলেছেন:
অসাধারন জীবন কাহিনী।
অতিথি বলেছেন:
অদ্ভুত সুন্দর শৈল্পিক বর্ণনা। এক দমে পড়ে শেষ করেছি। সুন্দর.......সুন্দর.......সুন্দর.......
কনফুসিয়াস বলেছেন:
দূর্দান্ত!
নজমুল আলবাব বলেছেন:
ভাগছে... হাসান ভাগছে... সে ভাবছিল পড়বেনা কেউ। বাজে সন্দেহ করছিল। এখন লজ্জা পায়া ভাগলপুরে গেছে। শরম পায়না মামু।
অতিথি বলেছেন:
অসাধারণ!অবশ্য 'হাসানের গল্প'-তে আগেই পড়েছিলাম। সতেরো সেপ্টেম্বরের একটা ব্যাপার ছিল না!
পথিক!!!!!!! বলেছেন:
অর্ধেক পড়েছি ...
অতিথি বলেছেন:
সংশয়ে সংকল্প কভু নাহি টলে @বড়মিয়া অ:র:পি ।কৃতজ্ঞতা @সবার প্রতি যারা সময় করে পড়েছেন ।
অসাধারন জীবন কাহিনী? মজা পাইছি @ নুর-ই-হাফসা ।
ফিরে এলাম @আলবাব মামু
হাসানের গল্প বেঁচে আছে এখনো? ঢুঁ দেইনি অনেকদিন , আপডেট ও না , বিখ্যাত অলসতার জন্য। হুম সতের সেপ্টেম্বর ছিলো একদা
ওকেলা@পথিক কবি
নজমুল আলবাব বলেছেন:
আমার খবর কী @ মামু
অতিথি বলেছেন:
আমি এই গল্পটা একটুও পড়ি নাই। যেখানে রাবার গাছ থেকে টুপ করে অক্সিজেন পড়ার কথা আছে সেটা দেখার সাধও জাগে নাই। খেলাটার কথাও জানালাম না। ফ্রেমবন্দী বালিকার কথাও যার জন্য পড়া হলো না। অদ্ভুত, ঠিক করেছি এভাবে আপনার প্রত্যেকটা গল্প আর পড়বো না!
অতিথি বলেছেন:
হাহাহা ,এই না হলে ওয়ান ন অনলি আমাদের কৌশিক!খবরদার ভুলে ও পড়বেননা... ঘোষিত হলো জরুরী আইন ।
নজমুল আলবাব বলেছেন:
হ্যা, প্রায়, প্রস্তুত বলা চলে।সেতু ভাই তোমাকে বই দিতে চাইছেন। আমার কাছে দেবেন দু-এক দিনের মধ্যে।
অতিথি বলেছেন:
গ্রেট !মামু, একটা কাজ করো প্লিজ ।
সেতু ভাই এর বই, 'মাস্তুল' এর এই ইসু্য, 'শস্যপর্ব' যা বেরুবে--- সব তুমি কষ্ট করে বাসায় দিয়ে দিও ।
শাহীন( আশার আলো গ্রুপ) দেশে গেছে । মার্চে আসবে । আমি হাতে হাতে পেয়ে যাবো । পড়ার সব শেষ হয়ে গেছে । তৃষ্ণার্ত হয়ে আছি মারাত্নক ।
নজমুল আলবাব বলেছেন:
ওকে। দেখি এর আগেও যদি কাউরে পাই, তবে পাঠিয়ে দেব। আমার ফিরিঙ্গিরা কয়েকজন মনে হয় আছে এখন দেশে।বিদেশী গন্ধ পাই বাসায়!!!
ঝরা পাতা বলেছেন:
অসাধারণ।
অলস ছেলে বলেছেন:
সুন্দর।
বিষাক্ত মানুষ বলেছেন:
অনেক আগে পড়েছিলাম
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














কবে যে আপনার মতো লিখতারুম


দেখি লোকজন পড়ে কিনা