হেসপারঃ
আমাদের অতীত ছিল সম্ভ্রান্ত। সারা দেশের মত আমাদের রাজধানীও ছিল প্রাকৃতিক সুন্দর্য্যমন্ডিত। প্রকৃতির ঔদার্য আর ভারসাম্য আমাদের সমাজজীবনের সুখ, সমৃদ্ধি ও সাম্যের সাথে মিশে একাকার হয়ে যেত। প্রকৃতি আমাদের শুধু সুন্দর্য্যই নয় নিরাপত্তা বলয় তৈরী করেছিল। প্রাকৃতির এই সুবিধাই মুঘলদের ঢাকায় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহ যুগিয়ে ছিল। এ শহরের চারিপাশ দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা, শিতলক্ষা, তুরাগ ও বালু নদী আর অভ্যন্তরে ছিল শতাধিক খাল। নদী আর খালগুলো শুধু নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছিল বা প্রাকৃতিক সুন্দর্য্যের অভয়াশ্রম করেছিল তা নয়। এগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম ছিল না। এ দেশে বাণিজ্য প্রসারের অন্যতম কারণ ছিল আমাদের সমৃদ্ধ জালাভূমি। সে সময় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। ঢাকার খাল দিয়ে নৌকা ও স্টিমার করে অলিতেগলিতে যাওয়া যেত।
বহিশত্রুর আক্রমণ থেকে রাজপ্রাসাদ , দুর্গ ও রাজধানী রক্ষাসহ রণকৌশল নির্ধারণেও নদী ও খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পরেও রাজধানীতে খালের সংখ্যা ছিল ৪৭ টি বর্তমানে তা দাড়িয়েছে ২৬টিতে। এক কথায় আমাদের জলাভূমি ছিল আমাদের গর্বের। তা ঘিরে যেমন আবর্তিত হত আমাদের জীবিকা তেমনি আমাদের জীবনধারনের জন্য যে খাদ্যের দরকার তার একটা বিশাল অংশ আসতো এই জলাভূমি থেকে। সময় গড়ানোর সংগে সংগে প্রচলিত উন্নয়নের নামে অধীকাংশ খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্টগুলিও সঙ্কটাপূর্ণ। আমাদের অদূরদর্শী কর্মকান্ডের জন্য প্রকৃতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আমরা খালগুলো ভরাট করে বানিয়েছি রাস্তা। কখনো বা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাদের পরামর্শে খালগুলোকে বক্স কালভার্টের নামে করেছি ধ্বংস। যে পানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার হত তা এখন এতটাই দূষিত যে সেখানে মাছ বা কীটপতঙ্গও বসবাস করতে পারেনা। খালের পানি আর নদীতে গড়ায় না। ফলে আমাদের নগরজীবনে বেড়েই চলছে জলাবদ্ধতা, পানি সঙ্কট, তাপমাত্রা আর হারিয়ে যাচ্ছে মৎস সম্পদ ও জীববৈচিত্র। আমরা এতটাই বেহাল দশার প্রত্যক্ষদর্শী যে জলাবদ্ধতা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট একই সাথে চলে আমাদের রাজধানীতে।
ওয়াসার তথ্যমতে, ঢাকা শহরে বর্তমানে প্রায় ৮৭% শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে উত্তোলিত হচ্ছে প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ কোটি লিটার যার ৩০% হচ্ছে অপচয় । এখনো প্রায় ৫০ কোটি লিটার দৈনিক পানির সঙ্কট থেকে যাচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিশুদ্ধ পানি চাহিদা পূরণ করা উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
বিশুদ্ধ পানির সমস্যা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা তা নয়, বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন আলোচ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। তাদের বেশিভাগই দূষিত খাল ও জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করে যা তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনকে ঝুকির মুখে ফেলছে। উন্নয়নশীল দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ(২.৬ বিলিয়ন) পর্যাপ্ত স্যানিটেসন সুবিধা পায় না। ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড.ডগলাস ক্রাওফর্ড-ব্রন বিশ্ব জুড়ে চলমান বিশুদ্ধ পানির সংকট সম্পর্কে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময় নিরাপদ পানি সর্বরাহ করা একটি বিরাট সমস্যা। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরণের বিনিয়োগ সম্ভব নয় সেখানে নিরাপদ পানির সমস্যা আরও প্রকট।’ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য সাশ্রয়ী দীর্ঘস্থায়ী কৌশল আবিস্কারের জন্য প্রতিনিয়তই গবেষণা চলছে। ঠিক তেমনি এক সফল গবেষণা নিয়ে আলোচনা করবো যা আমাদের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে।
ক্যামব্রীজ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে যেসকল জায়গায় ময়লা ও দূষিত পানি দিয়ে মানুষ রান্নাবান্না, পরিস্কারের কাজ এমনকি খাবারের কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে সেসকল স্থানে তাদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আমরা এখন তাদের আবিস্কৃত এমন এক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো যা দ্বারা পানি নিরাপদ করা সম্ভব সেগুলো।
শামুক দিয়ে পানি পরিস্কারঃ প্রাণীবিজ্ঞানী ড. ডাভিড আলড্রিজ ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলোজি বিভাগের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক। পানির পরিস্কারক হিসেবে শামুকের ব্যবহার করা সম্ভব এই ধারনার তিনিও একজন অন্যতম প্রবক্তা। চীনে তার এক গবেষনায় তিনি শামুক ব্যবহার করে পানিকে দূষণ মুক্ত করে দেখিয়েছেন । কম খরচে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী পানি বিশুদ্ধকরণের এই পদ্ধতি শামুক চাষের খামার সৃষ্টির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
চীনের ইউনান প্রদেশের মারাত্বক দূষিত পানির খাল ডিয়ানচি। ডিয়ানচি এক সময় জলজ প্রাণীতে সমৃদ্ধ ছিল কিন্তু বর্তমানে অধীক মাত্রায় দূষণের ফলে এখানের পানির স্বাভাবিক গুনাগুন নষ্ট হয়েছে। শহরের ময়লা-আবর্জনা ও কারখানার বর্জ এখানকার পানিতে প্রাণী বসবাসের অনুপযুক্ত করে ফেলেছে। বর্তমানে এখানের পানি যেকোন রকম ধৌত কাজের জন্য অনুপযোগী। এখানে বসবাসকারী বেশিভাগ প্রাণী আজ আর নেই। একসময় এখানে খালিচোখে পানির ১০ মিটার গভীর পর্যন্ত দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে তা ৩০ সেন্টিমিটারে নেমে এসেছে।
ড. ডাভিড আলড্রিন গবেষণার জন্য দূষিত পানির খাল ডিয়ানচিকেই বাছাই করলেন। শামুক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে দূষিত পানিকে দূষণমুক্ত করা সম্ভব এমন দৃঢ় মনোবল ও অনঢ় সিদ্ধান্ত তার গবেষায় প্রেরণা জুগিয়েছিল। ক্যামব্রীজ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড.আল্ড্রিন ও চাইনিস এ্যাকাডেমী অব সাইন্স বৃহৎ প্রজাতির শামুক কিভাবে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে যৌথভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেল শামুক ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লিটার পানি দূষণমুক্ত করা সম্ভব। শামুকের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানিকে সহজে ক্ষতিকর জীবানুমুক্ত করা যায়। ড.আল্ড্রীনের মতে তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন এতে শুধু পানি পরিস্কারই হয়নি বরং কয়েক মাসের মধ্যেই জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছরা জন্ম নিচ্ছে। এমনকি তিনি লক্ষ করেছেন যে প্রায় এক দশক আগের জলজ উদ্ভিদও বেড়ে উঠতে শুরু করেছে ডিয়ানচিতে। তাছাড়াও বিভিন্ন প্রাণী ও মাছ চাষাবাদের জন্য জলাশয় উপযুক্ত হয়ে উঠছে।
কিন্তু একটা সমস্যা গবেষক হিসেবে অল্ড্রিনকে বিচলিত করে ফেলল। আর তা হল চীনের মানুষ এই শামুক খাদ্য মনে করে এবং দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় শামুক একটা বিরাট অংশ দখল করে আছে। তিনি মনে করলেন শামুক যদি খাদ্য হিসেবে খাওয়া হয় তবে তা হয়তো পানি বিশুদ্ধ করনে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের অন্তরায় হতে পারে। তাই তিনি ও তার গবেষনা দল এই সমস্যা জন্য উপযুক্ত সমাধান খুঁজতে পুণরায় গবেষণায় মনোনিবেশ করলেন। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হল শামুক থেকে বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তা আহরণের সহজ কোন পদ্ধতি খুজতে হবে। তারপর সাধারণ মানুষের কাছে এই কৌশল পৌছাতে হবে। এ লক্ষে গবেষক দল শামুকের মুক্তা আহরনে সবাইকে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিল।
শামুক থেকে মুক্তা আহরণ করার জন্য ড. অল্ড্রিন যে পদ্ধতির কথা প্রচার করতেন তা খুব জটিল কোন পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। শামুক থেকে মুক্তা আহরণের জন্য চ্যাপিসস্টিক দিয়ে শামুকের ভেতরে মৃত শামুকের ছোট্ট একটুকরা খোলস ঢুকিয়ে রাখলে কয়েক মাসের ব্যবধানে তার চারিপাশে মুক্তা জড়িয়ে থাকে। এভাবে বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। ড.অল্ড্রিনের এই চাঞ্চল্যকর আবিস্কার ও মুক্তাচাষে এই সম্ভাবনার স্বীকৃতি স্বরুপ বিশ্বব্যাংক ড.আল্ড্রীনকে ডেভেলপ্ড মার্কেট প্লেস অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।
ড.অল্ড্রীনের এই গবেষণা আমাদের জলাশয়ের হারানো জীববৈচিত্র ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। অথবা এই বিষয়ে আমাদের আরো গবেষণায় উৎসাহ যোগাতে পারে। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা আমাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। তাই পানি সংকট মোকাবিলায় সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে।
আমাদের অতীত ছিল সম্ভ্রান্ত। সারা দেশের মত আমাদের রাজধানীও ছিল প্রাকৃতিক সুন্দর্য্যমন্ডিত। প্রকৃতির ঔদার্য আর ভারসাম্য আমাদের সমাজজীবনের সুখ, সমৃদ্ধি ও সাম্যের সাথে মিশে একাকার হয়ে যেত। প্রকৃতি আমাদের শুধু সুন্দর্য্যই নয় নিরাপত্তা বলয় তৈরী করেছিল। প্রাকৃতির এই সুবিধাই মুঘলদের ঢাকায় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহ যুগিয়ে ছিল। এ শহরের চারিপাশ দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা, শিতলক্ষা, তুরাগ ও বালু নদী আর অভ্যন্তরে ছিল শতাধিক খাল। নদী আর খালগুলো শুধু নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছিল বা প্রাকৃতিক সুন্দর্য্যের অভয়াশ্রম করেছিল তা নয়। এগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম ছিল না। এ দেশে বাণিজ্য প্রসারের অন্যতম কারণ ছিল আমাদের সমৃদ্ধ জালাভূমি। সে সময় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। ঢাকার খাল দিয়ে নৌকা ও স্টিমার করে অলিতেগলিতে যাওয়া যেত।
বহিশত্রুর আক্রমণ থেকে রাজপ্রাসাদ , দুর্গ ও রাজধানী রক্ষাসহ রণকৌশল নির্ধারণেও নদী ও খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পরেও রাজধানীতে খালের সংখ্যা ছিল ৪৭ টি বর্তমানে তা দাড়িয়েছে ২৬টিতে। এক কথায় আমাদের জলাভূমি ছিল আমাদের গর্বের। তা ঘিরে যেমন আবর্তিত হত আমাদের জীবিকা তেমনি আমাদের জীবনধারনের জন্য যে খাদ্যের দরকার তার একটা বিশাল অংশ আসতো এই জলাভূমি থেকে। সময় গড়ানোর সংগে সংগে প্রচলিত উন্নয়নের নামে অধীকাংশ খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্টগুলিও সঙ্কটাপূর্ণ। আমাদের অদূরদর্শী কর্মকান্ডের জন্য প্রকৃতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আমরা খালগুলো ভরাট করে বানিয়েছি রাস্তা। কখনো বা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাদের পরামর্শে খালগুলোকে বক্স কালভার্টের নামে করেছি ধ্বংস। যে পানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার হত তা এখন এতটাই দূষিত যে সেখানে মাছ বা কীটপতঙ্গও বসবাস করতে পারেনা। খালের পানি আর নদীতে গড়ায় না। ফলে আমাদের নগরজীবনে বেড়েই চলছে জলাবদ্ধতা, পানি সঙ্কট, তাপমাত্রা আর হারিয়ে যাচ্ছে মৎস সম্পদ ও জীববৈচিত্র। আমরা এতটাই বেহাল দশার প্রত্যক্ষদর্শী যে জলাবদ্ধতা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট একই সাথে চলে আমাদের রাজধানীতে।
ওয়াসার তথ্যমতে, ঢাকা শহরে বর্তমানে প্রায় ৮৭% শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে উত্তোলিত হচ্ছে প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ কোটি লিটার যার ৩০% হচ্ছে অপচয় । এখনো প্রায় ৫০ কোটি লিটার দৈনিক পানির সঙ্কট থেকে যাচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিশুদ্ধ পানি চাহিদা পূরণ করা উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
বিশুদ্ধ পানির সমস্যা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা তা নয়, বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন আলোচ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। তাদের বেশিভাগই দূষিত খাল ও জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করে যা তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনকে ঝুকির মুখে ফেলছে। উন্নয়নশীল দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ(২.৬ বিলিয়ন) পর্যাপ্ত স্যানিটেসন সুবিধা পায় না। ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড.ডগলাস ক্রাওফর্ড-ব্রন বিশ্ব জুড়ে চলমান বিশুদ্ধ পানির সংকট সম্পর্কে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময় নিরাপদ পানি সর্বরাহ করা একটি বিরাট সমস্যা। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরণের বিনিয়োগ সম্ভব নয় সেখানে নিরাপদ পানির সমস্যা আরও প্রকট।’ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য সাশ্রয়ী দীর্ঘস্থায়ী কৌশল আবিস্কারের জন্য প্রতিনিয়তই গবেষণা চলছে। ঠিক তেমনি এক সফল গবেষণা নিয়ে আলোচনা করবো যা আমাদের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে।
ক্যামব্রীজ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে যেসকল জায়গায় ময়লা ও দূষিত পানি দিয়ে মানুষ রান্নাবান্না, পরিস্কারের কাজ এমনকি খাবারের কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে সেসকল স্থানে তাদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আমরা এখন তাদের আবিস্কৃত এমন এক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো যা দ্বারা পানি নিরাপদ করা সম্ভব সেগুলো।
শামুক দিয়ে পানি পরিস্কারঃ প্রাণীবিজ্ঞানী ড. ডাভিড আলড্রিজ ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলোজি বিভাগের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক। পানির পরিস্কারক হিসেবে শামুকের ব্যবহার করা সম্ভব এই ধারনার তিনিও একজন অন্যতম প্রবক্তা। চীনে তার এক গবেষনায় তিনি শামুক ব্যবহার করে পানিকে দূষণ মুক্ত করে দেখিয়েছেন । কম খরচে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী পানি বিশুদ্ধকরণের এই পদ্ধতি শামুক চাষের খামার সৃষ্টির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
চীনের ইউনান প্রদেশের মারাত্বক দূষিত পানির খাল ডিয়ানচি। ডিয়ানচি এক সময় জলজ প্রাণীতে সমৃদ্ধ ছিল কিন্তু বর্তমানে অধীক মাত্রায় দূষণের ফলে এখানের পানির স্বাভাবিক গুনাগুন নষ্ট হয়েছে। শহরের ময়লা-আবর্জনা ও কারখানার বর্জ এখানকার পানিতে প্রাণী বসবাসের অনুপযুক্ত করে ফেলেছে। বর্তমানে এখানের পানি যেকোন রকম ধৌত কাজের জন্য অনুপযোগী। এখানে বসবাসকারী বেশিভাগ প্রাণী আজ আর নেই। একসময় এখানে খালিচোখে পানির ১০ মিটার গভীর পর্যন্ত দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে তা ৩০ সেন্টিমিটারে নেমে এসেছে।
ড. ডাভিড আলড্রিন গবেষণার জন্য দূষিত পানির খাল ডিয়ানচিকেই বাছাই করলেন। শামুক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে দূষিত পানিকে দূষণমুক্ত করা সম্ভব এমন দৃঢ় মনোবল ও অনঢ় সিদ্ধান্ত তার গবেষায় প্রেরণা জুগিয়েছিল। ক্যামব্রীজ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড.আল্ড্রিন ও চাইনিস এ্যাকাডেমী অব সাইন্স বৃহৎ প্রজাতির শামুক কিভাবে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে যৌথভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেল শামুক ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লিটার পানি দূষণমুক্ত করা সম্ভব। শামুকের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানিকে সহজে ক্ষতিকর জীবানুমুক্ত করা যায়। ড.আল্ড্রীনের মতে তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন এতে শুধু পানি পরিস্কারই হয়নি বরং কয়েক মাসের মধ্যেই জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছরা জন্ম নিচ্ছে। এমনকি তিনি লক্ষ করেছেন যে প্রায় এক দশক আগের জলজ উদ্ভিদও বেড়ে উঠতে শুরু করেছে ডিয়ানচিতে। তাছাড়াও বিভিন্ন প্রাণী ও মাছ চাষাবাদের জন্য জলাশয় উপযুক্ত হয়ে উঠছে।
কিন্তু একটা সমস্যা গবেষক হিসেবে অল্ড্রিনকে বিচলিত করে ফেলল। আর তা হল চীনের মানুষ এই শামুক খাদ্য মনে করে এবং দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় শামুক একটা বিরাট অংশ দখল করে আছে। তিনি মনে করলেন শামুক যদি খাদ্য হিসেবে খাওয়া হয় তবে তা হয়তো পানি বিশুদ্ধ করনে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের অন্তরায় হতে পারে। তাই তিনি ও তার গবেষনা দল এই সমস্যা জন্য উপযুক্ত সমাধান খুঁজতে পুণরায় গবেষণায় মনোনিবেশ করলেন। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হল শামুক থেকে বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তা আহরণের সহজ কোন পদ্ধতি খুজতে হবে। তারপর সাধারণ মানুষের কাছে এই কৌশল পৌছাতে হবে। এ লক্ষে গবেষক দল শামুকের মুক্তা আহরনে সবাইকে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিল।
শামুক থেকে মুক্তা আহরণ করার জন্য ড. অল্ড্রিন যে পদ্ধতির কথা প্রচার করতেন তা খুব জটিল কোন পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। শামুক থেকে মুক্তা আহরণের জন্য চ্যাপিসস্টিক দিয়ে শামুকের ভেতরে মৃত শামুকের ছোট্ট একটুকরা খোলস ঢুকিয়ে রাখলে কয়েক মাসের ব্যবধানে তার চারিপাশে মুক্তা জড়িয়ে থাকে। এভাবে বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। ড.অল্ড্রিনের এই চাঞ্চল্যকর আবিস্কার ও মুক্তাচাষে এই সম্ভাবনার স্বীকৃতি স্বরুপ বিশ্বব্যাংক ড.আল্ড্রীনকে ডেভেলপ্ড মার্কেট প্লেস অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।
ড.অল্ড্রীনের এই গবেষণা আমাদের জলাশয়ের হারানো জীববৈচিত্র ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। অথবা এই বিষয়ে আমাদের আরো গবেষণায় উৎসাহ যোগাতে পারে। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা আমাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। তাই পানি সংকট মোকাবিলায় সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

