এতদিন আমার ধারণা ছিলো আমরা বাংলাদেশীরাই মনে হয় শুধু আমাদের দেশের ইতিহাস বিকৃতি করি। আর তার প্রমাণ হিসাবে গত ১২ তারিখে (জানুয়ারী, ২০১০) একুশে টিভিতে "একুশে রাত" অনুষ্ঠানে গত জোট সরকারের শিক্ষামন্ত্রি এবং বিএনপি নেতা এহসানুল হক মিলন বলেন, "সব ভারতের চক্রান্ত, এই ভারতের চক্রান্তের কারনেই পাকিস্তান ভাগ হয়ে বাংলাদেশ তৈরী হয়েছিলো। তারা (ভারত) ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানকে ভাগ করেছিলো"। আর জামাতের ইতিহাস বিকৃতির কথা নতুন করে কিছু না বললেও চলবে।
কিন্তু সম্প্রতি একটা বই পড়ে জানলাম শুধু বিএনপি-জামাত নয় বিদেশীরাও আমদের ইতিহাস বিকৃতি করে। আর সেটা যে সম্পূর্ন তাদের একক প্রচেষ্টার ফসল সে ব্যাপারে সন্দেহ করার যথেষ্ঠ কারণ আছে। আমেরিকান পাবলিশিং হাউস গ্যারেথ স্টিভেনস পাবলিশিং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী দের জন্য "Welcome to my country" নামে একটা সিরিজ বের করে থাকে। আর এ সিরিজেরই একটা বই আছে বাংলাদেশকে নিয়ে। ঘটনাক্রমে কিছুদিন আগে বইটার একটা কপি আমার হাতে আসে। প্রচ্ছদের ছবিটা খুবই সুন্দর, দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। অনেক আগ্রহ সহকারে বইটার পাতা উল্টাতে শুরু করতেই সেই ভালো লাগাটা বিস্ময়ে রুপান্তরিত হতে বেশি সময় লাগলো না।
সংক্ষেপে বাংলাদেশের পরিচিতি দিয়ে শুরু। আর প্রথমেই বাংলাদেশের পতাকার পরিচিতি পড়ে ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেলাম। তবে এখানেই ধাক্কা খাওয়ার শেষ ছিলো না। পতাকার পরিচিতিতে লেখা আছে "The green is for Bangladesh's official religion, Islam, and for rich plant life." বাংলাদেশের বর্তমান পতাকার রঙ এবং ডিজাইন দুটো সরকারী ভাবে গ্রহণকরা হয় ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারী। সে সময় বাংলাদেশের সংবিধান ছিলো ধর্ম নিরপেক্ষ এবং সে সময় আমাদের কোন রাস্ট্রধর্মও ছিলোনা। ১৯৮৮ সালে এরশাদের আমলে ইসলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পায়। তাইলে পতাকার সবুজ রঙ কিভাবে রাস্ট্র ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে?
এইবার বইটা ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখা শুরু করলাম। লেখকের নাম আইলিন খু (Eileen Khoo). বইটা ২০০৫ সালে প্রকাশিত। প্রকাশক কোম্পানীর নাম Gareth Stevens Publishing. এইপর্যন্ত দেখে আবার বইয়ের ভিতরে ঢুকে গেলাম। বাংলাদেশের ইতিহাস পড়তে যেয়েতো রীতিমত চক্ষু চড়কগাছ।
"In 1947, British India was divided into India and Pakistan. Pakistan had two parts. East Pakistan (now Bangladesh) was separated from west Pakistan (now Pakistan) by India.
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ঠিক যেন এহসানুল হক মিলনের বক্তব্যের প্রতিধ্বণি। এরপরের অংশটুকু আরও বেশি মজাদার। Two Pakistans লেখা প্যারাগ্রাফে লেখা আছে, "Fighting broke out after West Pakistan tried to make it’s language, Urdu, the language of both parts of Pakistan”। কসকি মমিন!!!! পরের পৃষ্ঠায় আরও আছে, "In 1971, after 20 years of fighting between east and west Pakistan, the Pakistan army entered East Pakistan. They killed more than 100,000 people. মজার ব্যাপার হলো এই জায়গাটুকু পড়লে মনে হয় সেই ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্হানীরা পশ্চিম পাকিস্হানীদের ২০ বছর ধরে উত্যক্ত করে আসতেছিলো। একসময় পশ্চিম পাকিস্হানীদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তারা পূর্ব পাকিস্হানে প্রবেশ করে। আর মৃতের সংখ্যাটাও মাত্র ১০০,০০০।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যাইহোক, স্বভাবতই আমার মাথায় যে চিন্তাটা আসলো সেটা হলো লেখক এই তথ্যগুলো কোথায় পেলেন। সারা বই ঘেটেও খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। কোথাও পরিস্কার করে বলা নেই তথ্যের উৎস। তবে ভিতরের প্রথম পাতায় acknowledgemet এ অগ্রনী এক্সচেঞ্জ হাউসের ডিরেক্টর মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম কে তারা কারেন্সি এবং আর্টিফেক্টস ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে।
ইন্টারনেটে অনেক চেষ্টা করলাম লেখকের পরিচয় বের করার। খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। নামটা পাই কিন্তু কোন ই-মেইল বা ফোন নাম্বর পাই না। অবশেষে গ্যারেথ পাবলিশিংয়ের কাস্টমার সার্ভিসে ই-মেইল করলাম তাদের এই বইয়ের তথ্যের উৎস জানতে চেয়ে। অবাক করে কাস্টামার সার্ভিসের মেয়েটা আমাকে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই রিপ্লাই দিলো। জানালো এডিটোরিয়াল স্টাফকে আমার কনসার্নের কথা জানানো হয়েছে। তারা আরও স্পেসিফিক তথ্য চায়। আবার মেইল দিলাম, এবার স্পেসিফিক তথ্য দিয়ে। তো এবার সে আমার ই-মেইল এডিটোরিয়াল ডিরেক্টরকে ফরওয়ার্ড করলো। আমাকে সিসি করে দিলো। কয়েকদিন পরে এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর জানালো সে এখানে নতুন জয়েন করেছে আর তারা আর্কাইভ হিসাবে যে হার্ড ড্রাইভ পেয়েছে তাতে বইটার তথ্যের উৎস বা লেখকের তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সে আমাকে কথা দিচ্ছে যে লেখকের কন্টাক্ট খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে এবং আমার দেয়া তথ্যগুলো সহ তার ব্যক্তিগত Errata (সংশোধনী ফাইল) ফাইলে রাখবে এবং বইটা রিপ্রিন্ট করলে অবশ্যই আমার সাজেশন অনুযায়ী তথ্যগুলো পরিবর্তন করবে।
আমি এরপর আর এটা নিয়ে বেশি ঘাটালাম না। আমাদের দেশে এহসানুল হক মিলনদের মত শিক্ষামন্ত্রী (প্রাক্তন) যেখানে দেশের ইতিহাস বিকৃতি করে সেখানে বিদেশীরা করলেই বা কি এমন ক্ষতি। তবে তারা যে তাৎক্ষণিক আমার ই-মেইলের উত্তর দিয়েছে এবং তাদের ভুল স্বীকার করেছে তাতেই আমি খুশী। তবে এরকমটা চলতে থালে যুদ্ধাপরধীদের বিচারের ব্যাপারে অন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলাটা যে কস্টকর হয়ে পড়তে পারে সেটা বলাই বাহুল্য। বইটার প্রকাশকাল, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য এবং গ্যারেথ পাবলিশিংয়ের কোন তথ্য খুঁজে না পাওয়াকে কাকতালীয় যোগাযোগ হিসাবে দেখাটা আমার জন্যে একটু কস্টকরই বটে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

