মঙ্গলবার সকালে অফিসে এসেই প্রতিদিনের রুটিনমাফিক বিরক্তিকর সব মেইলগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। ম্যানেজার জন বর্তমানে যে প্রজেক্টে কাজ করছি সেটার স্ট্যাটাস জানতে চেয়ে মেইল করেছে। উত্তরটা কিভাবে লিখব সেটা নিয়ে যখন ভাবছি সেসময় আই.এসের দুই এ.ভি.পি'র একজন জ্যানিস আমার কিউবে এসে বলল, "হোরাস, আমার অফিসে একটু আসো।" কিছু বলার আগেই জ্যানিস হনহন করে হাটা দিলো ওর অফিসের দিকে। জ্যানিসের সাথে সরাসরি আমার কখনও কথা হয় না। চলতে পথে দেখা হয়ে গেলে হাই-হ্যালোর মধ্যেই আমাদের কথা-বার্তা সীমাবদ্ধ থাকে। তাই আজকে একটু অবাকই হলাম। এদেশের ইকোনমি এবং চাকরী বাকরীর বাজারের যা দুরাবস্হা সেটা মনে পরতেই বিরক্তিটা শংকায় পরিণত হলো। হঠাৎ এমন কি হলো যে জ্যানিসের আমাকে তার অফিসে ডাকতে হলো? উঠে দাড়িয়ে ওর অফিসের দিকে রওনা হতেই দেখলাম শুধু আমি না আমাদের টিমের সবাই সহ এই ফ্লোরে জ্যানিসের আন্ডারে যতজন কাজ করে সবাই ওর অফিসের দিকে যাচ্ছে। এবার মনে একটু সাহস পেলাম, যাক খারাপ কিছু তাহলে না।
জ্যানিসের অফিসটা শুধু বড় না বরং বিশাল। তারপরও আমাদের সবাইকে বেশ গাদাগাদি করে দাড়াতে হলো। সবার শেষে আমার ম্যানেজার জন এসে দরজা বন্ধ করে দাড়াতেই জ্যানিস বলল, "দেয়ার ইজ নো ইজি ওয়ে টু ব্রেক এ ব্যাড নিউজ।" শুনেই আবার ভড়কে গেলাম। ঘটনা কি? বড়সড় কোন ছাটাই হবে নাকি! কিন্তু এরপর জ্যানিস যে কথাগুলো বললল সেটা শুনে মোটামুটি থম মেরে গেলাম।
"শার্লি হ্যাজ প্যাসড এওয়ে", এটুকু বলেই একটু থামলো জ্যানিস। আমি মনে মনে বাকিটা শেষ করলাম, "টুডে"। ধরেই নিলাম ঘটনাটা আজকেরই। শার্লি মেহান আমার প্রথম ম্যানেজার। এই কোম্পানীতে প্রথম যে পোস্টের জন্য ইন্টারভিউ দেই সেটা ছিলো শার্লির আন্ডারে। সেই আমার মূল ইন্টারভিউটা নিয়েছিলো এবং চাকরীটা অফার করেছিলো। এরপর প্রায় বছর দুয়েক আমি ওর আন্ডারে কাজ করেছি। বয়স ৫৫ থেকে ৬০ এর মধ্যে। এদেশিদের তুলনায় বেশ ছোটখাট এবং ভারিক্কী গড়নের। বিয়ে শাদী করেনি, কোন সন্তানও নেই। আদি বাড়ি সাচক্যাচুয়্যানে। নিকট আত্বীয় বলতে একটা ভাই আছে সেও রেজিনা, সাচক্যাচু্য়্যানে থাকে। এ শহরে একা একটা বাড়ী নিয়ে থাকত।
গতবছর আগস্টে আমি সপ্তাহ দুয়েকের ছুটি শেষে যখন অফিসে ফিরলাম দেখি শার্লির অফিস খালি। ভেবেছিলাম হয়ত ছুটিতে আছে। কয়েক দিন চলে যাওয়ার পরও যখন সে ফিরলো না তখন আমি কৌতুহলী হয়ে খোজ নিয়ে জানতে পারলাম ওর ক্যান্সার ধরা পরেছে। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ছুটিতে আছে। চিকিৎসা শেষ হলে আবার কাজে যোগ দেবে। এইত সপ্তাহ দুয়েক আগে সে একদিন অফিসে এসেছিলো সবার সাথে দেখা করতে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঘন কালো চুলগুলো রেডিয়েশনের কারণে পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে। বলল চিকিৎসা ভালো মতই চলছে। সম্পূর্ন সুস্হ হতে আর কয়েক সপ্তাহ লাগবে। আগামী মাস থেকেই কাজে জয়েন করতে পারবে বলে সে আশা করে।
সেই মহিলার হঠাৎ করেই এমন কি হলো যে একেবারে মারাই গেলো! এরপর জ্যানিস যা বলল তা শুনে মনটা এতটাই খারাপ হলো যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। গত শনিবার আমার আরেক প্রাক্তন ম্যানেজার গ্রাহাম, শার্লি এবং তাদের এক কমন ফ্রেন্ডের কোন এক রেস্টুরেন্টে মিলিত হওয়ার কথা ছিলো। শেষ পর্যন্ত শার্লি না আসায় ওরা ফোনে যোগাযোগের চেস্টা করে। কিন্তু সোমবার সকালেও কোন খোঁজ খবর করতে না পেরে গ্রাহাম পুলিশকে ফোন করে।
আজ সকালে পুলিশ গ্রাহামকে ফোন করে খবর দিয়েছে শার্লির মৃতদেহ পাওয়া গেছে তারই বাসায়। পুলিশ আপাততঃ আর কোন ডিটেইলস বলেনি। হয়ত গত তিনদিন ধরেই সে মরে পরে ছিলো নিজের বিছানায়! মৃত্যু শয্যায় একা, নিঃসঙ্গ একজন মানুষের অনুভূতি কি হতে পারে সেটা ভাবতেই চোখের কোণে একটু জলের উপস্হিতি টের পেলাম। কাছের একজন মানুষও নেই যে তৎক্ষনাৎ তার দায়িত্ব নেবে, ফেলবে দু'ফোটা চোখের জল । মনটা খুব উদাস হয়ে গেলো ...... কেন জানি জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটা লাইন মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে শুরু করল! লাইনটার মর্মাথের সাথে শার্লির জীবনের কোন মিল আছে কিনা তাও আমি জানি না তবে লাইনটা ক্রমাগতই আমার মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকলো।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০১০ ভোর ৪:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


