
সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ: এই পোস্ট পড়ার পর বাবাদেরকে বই অনুযায়ী কোন পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অনুৎসাহিত করা হলো। আর ছেলেরা এরকম আব্দার করলে বাংলাদেশী স্টাইলে কান বরাবর চপেটাঘাত করার জন্য উৎসাহিত করা হলো।
সন্তান জন্ম গ্রহণ করার পর এই পৃথিবীর প্রতিটা বাবাই সম্ভবতঃ যে প্রশ্নটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী বিচলিত বোধ করেন সেটা হচ্ছে কিভাবে এই সন্তানকে সঠিক শিক্ষাদান করে ভবিষ্যতে একজন মানুষের মত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা যায়। আমার ধারণা প্রশ্নটা একজন পিতার কাছে সন্তান বিষয়ক সবচাইতে কঠিন একটি প্রশ্ন।গভর্ণর জেনারেল পুরস্কার পাওয়া কানেডিয়ান ঔপ্যনাসিক, টেলিভিশন প্রডিউসার, এবং মুভি সমালোচক ডেভিড গিলমোরও কোন ব্যতিক্রম নন। একদিন তিনি জানতে পারলেন সদ্য কৈশোর পেরুনো তার একমাত্র সন্তানের, জেসি গিলমোর, হাইস্কুলে যেতে ভালো লাগে না এবং সব বিষয়েই তার রেজাল্ট খুবই খারাপ। ছেলের সাথে কথা বলে আরও জানতে পারলেন যে সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে চায়। এটা শুনে তিনি যেটা করলেন আমি নিশ্চিত পৃথিবীর আর কোন দ্বিতীয় বাবা সেই পদক্ষেপটি কখনই নেবেন না বা সেটার সমর্থনও করবেন না।

তিনি জেসিকে বললেন সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে তবে একটা শর্ত সাপেক্ষে। জেসিকে তার সাথে প্রতিসপ্তাহে অন্ততঃ তিনটি মুভি দেখতে হবে তার (ডেভিডের) পছন্দ অনুযায়ী এবং কোন প্রকার ড্রাগ ব্যবহার করা যাবে না। করলেই তাকে আবার স্কুলে ফিরে যেতে হবে। জেসিও তাতে রাজী হতে দ্বিধা করেনি এক মুহূর্তও।
দ্য ফিল্ম ক্লাব হচ্ছে পিতা-পুত্রের মধ্যে অদ্ভূত এক ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠার গল্প। বয়ঃজ্যেস্ঠের কাছ কাছ থেকে বয়ঃকনিষ্ঠের কাছে জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান প্রবাহিত হওয়ার গল্প। এবং সর্বোপরি পিতা তার পুত্রের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের সম্পর্কে যে বিস্ময়কর সব জিনিষগুলা আবিষ্কার করেন তার বর্ণনা সমৃদ্ধ একটি অসাধারণ গল্প। ডেভিড গিলমোর নিজেরও খুব একটা ভালো সময় যাচ্ছিলো না স্হায়ী একটি চাকরীর অভাবে। স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন হয় তবে তাদের মধ্যে যোগযোগটা ঠিকই ছিলো, বিশেষ করে জেসি বিষয়ক যেকোন ব্যাপারে। পারিবারিক এতসব ঝামেলার মধ্যে থেকেও ডেভিড এরকম একটা ডিসিশন কেন নিলেন এই প্রশ্নটির খুব একটা সদু্ত্তর যদিও বইটি থেকে পাওয়া যায়না তবুও মানতেই হবে এতে তিনি অন্তরিক ভাবেই চোখের সামনে তার সন্তানকে বেড়ে উঠতে দেখা এবং কখনও কখনও এটা যে কতটা কঠিন একটা বিষয় তার বর্ননা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই বর্ননা করেছেন।
বইটার অনেকখানি অংশ জুড়েই ডেভিড ও জেসি তাদের একসাথে দেখা মুভিগুলোর মাধ্যমে, বিশেষকরে তাদের একসাথে বসে মুভি দেখার সময় তাদের মধ্যে চলা আলাপচারিতার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করেছেন একে অপরকে। তাদের এই ক্লাবের অস্তিত্ব ছিলো তিন বছর।এই তিন বছরে তিনি ছেলেকে বেসিক ইনস্টিংক্ট থেকে শুরু করে দ্য বাইসাইকেল থিফের মত সব ধরণের মুভিই দেখিয়েছেন। বইটিতে তিনি যে মুভিগুলা তার ছেলেকে দেখি্যেছেন সে গুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ননা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে মুভি দেখার সময় মুভি এবং অন্যান্য বিষয়ে যে আলাপচারিতা হতো সেগুলো নিয়ে আলাপ করেছেন। আরও আলাপ করেছেন ছেলের জীবনের মেয়ে বন্ধু, ড্রাগস এবং তার (জেসির) নিজেকে নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দগুলি নিয়ে।
বইটির শেষ পর্যায়ে জেসির একটি কনসার্ট দেখতে যেয়ে আপত্য স্নেহে মুগ্ধ বাবার মনে পরে "True Romance" সিনেমার একটি লাইনের কথা, “You’re so cool, You’re so cool, You’re so cool.” আরেকবার মু্গ্ধ হতে হয় ছেলের প্রতি তার ভালবাসায়। অবাক হয়ে ভাবি এ কেমন বাবা? এরকম বাবা আমাদের সবার জীবনে আসলে ক্ষতি কি?
আরেকটি বিষয় লক্ষনীয় বইটিতে ডেভিড নিজেকে প্রাধান্য না দিয়ে সারাক্ষনই ছেলের গুরুত্বটাকেই সামনে রেখেছেন। যেটা অনেক কঠিন একটা কাজ। সব ভালো যার শেষ ভালো। বইয়ে বলা না থাকলেও আমরা পরে জানতে পারি যে জেসি তিন বছর পর হাইস্কুল পরীক্ষা দেয় এবং সেটা পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে যায় পড়তে। সেখানকার পড়াশুনা শেষ করে সে নিজেও একজন টিভি প্রডিউসার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। পরিশেষে এই বলব, যারা মুভি দেখতে পছন্দ করেন তারা আর কিছু না হলেও শুধু বেশ কিছু নতুন-পুরোনো ক্লাসিক মুভির নামের জন্যই বইটা পড়ে দেখতে পারেন। বইয়ের একদম শেষে বইয়ে আলোচনা করা সব মুভিগুলোর একটা লিস্ট দেয়া আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


