তোমাদেরকে আজকে একটা গল্প বলি। বেশ ছোট মানুষদের নিয়ে একটা বড় গল্প। এই গল্পের শুরু কোথায় বা শেষ কোথায় কেউ বলতে পারে না। তবে এইটুকু জেনো এইটা একটা গল্প। ছোটবেলায় ছোট চাচার গায়ের উপর পড়তাম একটা গল্প শোনার জন্য, আর ঠিক তখনই চাচা জুড়ে দিত "এক দেশে ছিল এক রাজা আর আরেক দেশে ছিল এক রানী"-এর গল্প, আর আমি তখন স্বপ্নে হারাতাম। মনে হত ছোট রানী বড় রানী হয়তো আমাকে নিয়ে যেতেই দিগন্ত পাড়ি দিয়ে মহা কাব্যের পাতা ছেড়ে নামবে।
গল্পটা শুরু করতে হয়, যেখানে একটি ছেলে বসেছিল...একটি বারান্দার রেলিং ধরে, আর বারান্দার ওপাশে ছিল আরেকটি সুন্দর বারান্দা। আর ঐ বারান্দাটায় একটা ফুলের টব ছিল। ছোট ছোট কাটাযুক্ত পাতা। গোলাপ গাছ, সেখানে দুইটি গোলাপ ফুটে আছে। হ্যা, এই গোলাপ ফুলের হাত দিয়েই গল্পের শুরু। ছেলেটা ভোর বেলা উঠে ঐ বারান্দার ধারে যেত, গোলাপ গাছটাকে দেখবে বলে। টবের গাছটার কিছু ডালপালা বের হয়ে গেছে বারান্দার গ্রীলের ফাঁক ফোকড় দিয়ে। আর একটা প্রস্ফুটিত গোলাপ কী ভয়ংকর ভাবে ঝুকে আছে ছ'তলার বারান্দা থেকে সরাসরি নিচে মুখ দিয়ে, যেন এখনই ঝরে পরবে।
ভাবনায় অধীর হয়ে ছেলেটা বারান্দা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে, গোলাপ ফুলটি ঠিক যে স্থানে তাকিয়ে আছে সেই দিকে। জীবন্ত কাঁটায় আকীর্ণ গোলাপটি এখনই আত্মহত্যা করে বসতে পারে। ঐ বারান্দায় কেউ নেই তেমন কিন্তু নয়। ঐ গোলাপ ফুল গাছটার যত্ন নিত এক বুড়ো কিছিমের লোক। খবরের কাগজ নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসত, আর একটার পর একটা সিগারেট পুরাত। দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে ঠিক দশটার সময় লোকটা উঠে পরত। রাজ্যের কাজ করতে হয় কিনা!
আমাদের গল্পের শুরুটা এইখানেই থেমে থাকে। যখন ভোর রাতের কোন একসময় আকাশের ঐকান্তিক ইচ্ছার বশবর্তি হয়ে একটা তারকা খোসে পরে। আর কোন একটা জোড়া চোখ সেই তারার খোসে পরা দেখে ফেলে, আর কোন একটি মন একটা ইচ্ছার কথা ভেবে দেখে। ভেবে দেখ, গোলাপটার আত্মহত্যা করার খুব বেশি বাকি নেই। আজ বাদে কাল যেকোন দিন তার বোটা আলগা হয়ে মাটিতে পরে যাবে। হয়ত পথচারীর অলস হাটার মুহূর্তে সেটা পায়ের নিচে পরে থেতলে যাবে। বের হয়ে পরবে লাল রস, পীচ ঢালা রাস্তায় একটু দূর গিয়ে শেষ হয়ে যাবে লাল রঙ। অর্থাৎ গোলাপের গল্পের সমাপ্তি হবে হয়ত।
তারা পরার শব্দ কেউ পায় না। তবু ঘরে বন্দী ছেলেটার বুকের কোণে বেঁধে আছে ইচ্ছা প্রকাশ করাটা। সে ঠিকই জানে, তার ইচ্ছেটা পুরণ হবেই। কারণ আজকাল তারকা এভাবে পরে যায় অনেক স্থানে, তবু শহরের বালুকণায় এই পতন কারও চোখে পরেনি। শুধু একটা ইচ্ছা করার জন্যই তারকার পতন হলো গতরাতে।
পরের দিন সকালের কথা। গোলাপের গাছটাতে ফুল উধাও। একেবারেই নেই। কোথাও নেই, রাস্তার ধারে কোথাও পরে নেই, অথবা মধ্যবিত্তের দেয়ালের ওপারে এপারে কোথাও নেই। ফুলটা গেল কোথায়? ছেলেটা হন্যে হয়ে খুজে। যদিও কাল তার ইচ্ছেটা এমন ছিল না। সে জানত এমনটার ঠিক উল্টোটা হবে। ফুলটা ঠিক তারই হয়ে যাবে। যাবতীয় চোখের ভালবাসা যদি এই তল্লাটে কেউ ফুলটিকে দিয়ে, থাকে তাহলে তা একমাত্র সেই ছেলেটিই দিয়েছে। কিন্তু এ কী হলো? গোলাপের কোন চিহ্নই নেই? কোথাও একটা ভুল হয়েছে। বাড়ির বুড়ো ফুলখানা ছিড়ে নেয়নি তো? অথবা ঐ খাটো করে চাকরটা? তাদের বাড়ি, তাদের বাগান নিতেও পারে। তাতে তো দোষের কিছু কেউ দেখবে না। কিন্তু ছেলেটির ইচ্ছের কী হবে? কোথায় দাঁড়াবে সে? কাকে বলবে এমনই এক সৌভাগ্যের কথা?
নিজের বারান্দায় ফিরে এসে, ঐ পারের বারান্দায় চোখ মেলে চেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তায় ঠায় তাকিয়ে থাকে ছেলেটা। যদি গোলাপের রংটুকুও দেখা যায়। যদি চোখের ভুল হয়...যদি যদি যদি...কিন্তু নাহ! গোলাপটি কে কোথাও দেখা গেল না। বারান্দায় ঠিক সময়মত বুড়োটি এসে বসে। সিগারেট শেষ করে, টবে অলস পরে থাকে গোলাপ গাছটি, আর একটি দু'টি ফুলের কলি পাপড়ি মেলবার পথে, আর নতুন কতগুলো কুড়ি পাপড়ি মেলার পথে!
গল্পের শেষ তো জানা যায় না। সব গল্প সব সময় শেষও হয়না। একটি গোলাপের সাথে মানুষের সম্পর্ক হতে পারে এত নিবিড়, শুধু এইটুকুর জন্য গল্পের সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ যাবতীয় কাজের ভীড়ে, পৃথিবীর আকাশ যখন ব্যাস্ত, এরকম একটা ঘটনার তো মূল্য নেই। একটি গাছের সমস্ত প্রাণ ঐ গোলাপের চিহ্নটা থাকা প্রয়োজন ছিল। ছেলেটার বুকের ভেতর একটা তারার খোসে পরা আর গোলাপের খসে যাওয়া এক সমান্তরালে মনে হয়। ছেলেটার গল্প আরেকদিন বলি...আজকে এইটুকুই!
একটি তারকার খোসে পরা, আর একটি ভালবাসার গল্প
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।