somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভয়হীন আনন্দনগরে

১৯ শে জুন, ২০১১ রাত ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যখন সময় হলো বিকেল পাঁচটা ঠিক তখন আমরা বেনাপোল পোর্টে এসে পৌছালাম। বেনাপোল পোর্টে পৌছানোর একটা আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। পোর্টের কাছে রয়েছে বিশালাকার গুড়ির গাছ। এসকল গাছ কোলকাতা যাওয়ার রাস্তায় অর্থাৎ যোশর রোডে অনেক মিলবে। ওরা এখনও এ গাছগুলো আগেরমতই রেখে দিয়েছে। আমাদের এদিকে অনেক গাছ কাটা পড়েছে। কাটা গুড়ি দেখেই আমি অকারণে গাছগুলোর জন্যই হয়তো বেদনা অনুভব করি।

পোর্টের কাস্টমস এর কাজে আমাদের বিশেষ দেড়ি হলো না। ছটার সময় নাকি ইন্ডিয়ান বোর্ডার বন্ধ হয়ে যায়। তাই দুই পাশের বোর্ডারের কর্মকর্তারা কোনরকম চেকিং ছাড়াই আমাদেরকে ছেড়ে দিলো। বোর্ডারে নেমেই আমাদের ডলার ভাঙ্গিয়ে রুপি করে নিলাম।

এরপর বাসে চাপলাম। বাস কিছু দূর গিয়ে বিএসএফ এর হেডকোয়ার্টারের সামনে থামলো। সেখানে নাকি চেকিং হয়। কিন্তু আমাদের বেলাতে ব্যাতিক্রম ঘটলো। কোনরকম চেকিং ছাড়াই আমরা পেড়িয়ে গেলাম বোর্ডার। বাস যখন চলতে শুরু করলো পুরোদমে, দেখলাম যোশর রোডটা অনেক সরু। একটা বিশালাকার বাস যদি সেটা দিয়ে যায় তাহলে ওপাশের গাড়ি আসার আর রাস্তা থাকে না। বাংলাদেশের বিশালাকার রাস্তা ছেড়ে এই সরু গলিতে ঢুকে মনটা একটু গতির জন্য আকুপাকু করছিলো। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি। বাস মন্থর গতিতেই চলতে লাগলো। বাসের সুপারভাইজার বলে গেল, কোলকাতা পৌছাতে আমাদের মোটামুটি রাত দশটা বেজে যাবে।

কি আর করার? অন্ধকার ততক্ষণে ঘনিয়ে এসেছে। এই অন্ধকারের ভেতর ইন্ডিয়ান গ্রামগুলো একটার পর একটা পার হতে লাগলাম। বেনাপোল থেকে কোলকাতা ৮৪ কিলোমিটারের রাস্তা। বেশ বেগ পেতে হয় এই রাস্তা যেতে।

বারাসাতের একটা হোটেলে বাস যাত্রাবিরতি করলো। তখন বাজে রাত আটটা। সেখানের খাবারের হোটেলে আমার মা আর আমি মিলে ঠিক করলাম রাতের খাবারটা এখানেই সেড়ে নেওয়া ভালো। নেমেই ভাত, মুরগী, ডালের অর্ডার দিলাম। বড়ো একটা স্টিলের থালে আমাদের বেশ করে ভাত দেওয়া হলো। আর ভাত ডালের সাথে দেওয়া হলো আরো দুইটি পদ। একটা হলো টক, আরেকটা হলো মিষ্টি। টকটা ডালের মতই। ভাতের সাথে নিয়ে খেতে হয়। এটা হজমের জন্য ভালো। আর খাবারের পর মিষ্টি খাওয়া পশ্চিম বঙ্গের একটা রেওয়াজ। আমরা সবই খেলাম। তবে বলতেই হবে, মুরগীর মাংস আর ডালের স্বাদটা ছিল অসাধারণ। এখনও এখানে বসে যেন তার গন্ধ পাই।

ইন্ডিয়ায় যেতে যেতে বাসে আরেকটি ঘটনা ঘটলো। আমাদের বাসে একটা ভারতীয় ফ্যামিলি ছিল। তারা গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশ ঘুরতে গিয়েছিলো। তো তিনি বেশ ভালোই হিন্দীতে বাতচিৎ করে যাচ্ছিলেন, তার স্ত্রী ও পুত্র-কণ্যার সাথে। এমন সময় বাংলাদেশের এক বাঙ্গালী তাকে জিজ্ঞেস করলো, দাদা রাত তো অনেক হয়ে এলো, কোলকাতায় নেমে হোটেল পাবো তো?

লোকটি উত্তরে বলল, কই বাত নেহি। কোলকাতায় এসময়ে হোটেলের ক্রাইসিস নেই। আপনি আলবৎ পাবেন। এখানেই কথা শেষ হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশের ভদ্রলোক আবার একটু ভয় প্রকাশ করে বললেন, এতো রাতে কোন সমস্যা হবে না তো?
এইবার ভারতীয় লোকটি বেশ গর্ব করে বললেন, আপনাদের ঢাকায় দাদা রাত এগারটার পর পুলিশকেই ভয় আছে। আমাদের কোলকাতায় রাত দুটো তিনটে কোন ব্যাপার না। আপনাকে কেউ ছুয়েও দেখবে না।

কথাটা বলার পর বাংলাদেশী ভদ্রলোক অকপটে ভারতীয় লোকটির কথা স্বীকার করে নিলেন। এবং অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন। এদিকে আমিও ভাবলাম, আমাদের দেশে যখন পুলিশের হাতে নিরীহ লোক ক্রসফায়ারে মারা যায়, যখন লিমনের মত কোন কলেজ ছাত্রের পা র‍্যাবের গুলিতে চলে যায়, তখন আমাকেও এই রূঢ় সত্যটা মেনে নেওয়া ছাড়া আর করার কিছু থাকে না। হ্যা, আমাদের দেশে রাত এগারটার পড়ে, নিশ্চুপ হয়ে পড়ে ঢাকা। পুলিশের টহলের সাথে সাথে গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া ভদ্রগোছের কাউকে চোখে পড়ে না।

ভাবলাম, মেনে নিলেও, কোলকাতাকে পরখ করে দেখতে হবে। আসলেও কি কোলকাতা এমনই ভয়হীন?

তার উত্তর পেলাম ক্ষাণিক পড়েই। আমরা সোহাগ কাউন্টারের সামনে নামতেই একজন গাইড, আমরা তাকে চাইনি, তবু তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন হোটেল ঘুড়িয়ে দেখালেন। বললেন, কোনটাতে থাকা যায়...এইসব। হোটেলের ক্রাইসিস নেই, কথাটা ভুল ছিল। আমরা সহসাই কোন হোটেল খুজে পাচ্ছিলাম না। এরপর রাত এগারটার দিকে পেলাম একটা। সেটাতে উঠে পড়লাম। এই রাত এগারটা পর্যন্ত আমি আর আমার মা কোলকাতার মার্কুইস স্ট্রীটে নির্ভয়ে হেটে বেড়িয়েছি, হোটেল থেকে হোটেলে গেছি। কেউ আমাদের দিকে একবার বাকা চোখে তাকিয়েও দেখেনি। আর কোলকাতায় প্রত্যেকটি রাস্তায় এত কড়া আলো দেওয়া যে কখনই এ নগর নিরালো হয়না মনে হলো।

রাত বারোটার সময় রুম থেকে বের হলাম। মোবাইলের একটা সিম কিনে বাসায় বাবা আর বোনকে খবরটা তো দিতে হবে। গেলাম একটা দোকানে। সেটা বন্ধ হই হই করছিলো। সেখান থেকে একটা সিম কিনে মোবাইল করে বাসায় খবর দেওয়া গেল। আর সেদিনের মত রুমে গিয়ে ঘুম দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০১১ রাত ১২:১৪
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×