সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো। ওদিকে মা তো আগেভাগে রেডি। সেদিন ছিল রবিবার। সুতরাং সবই বন্ধ। আমরা ঠিক করেছিলাম আজ ঘুরতে বের হবো। ঘুম থেকে উঠে আমি রেডি হই। ওদিকে মা তাড়া দেন। এখনই নাস্তা খেতে যেতে হবে। মা কে নিয়ে কোলকাতায় আসার বিশেষ কারণটা আপনাদের বলিনি এতক্ষণ। মা কে প্রতিবছর এখানে চেক-আপ করাতে আনা হয়। কোন বছর মার সাথে বাবা আসেন, কোন বছর আমার বোন। আমিই প্রথম গ্রীষ্মের ছুটি পেয়ে মার সঙ্গে চলে এলাম।
আমার মায়ের ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে ২০০৭ সালে। তারপর বাংলাদেশেই এর চিকীৎসার বড় অংশ শেষ হয়। কোলকাতায় আমরা মা কে ক্রস চেক করাতে আনি। উনি অবশ্য অনেক ভালো আছেন এখন।
সেদিন রবিবার। কোথায় আগে যাবো? মা সাথে সাথে বলল, আগে নিউমার্কেট। নিউমার্কেট যদিও বন্ধ থাকে রবিবার। তবুও সেখানকার হকাররা দোকান খোলে। আর নিউমার্কেটের আসেপাশের রাস্তায় পাওয়া যায় হরেক রকমের খাবার। সেই খাবারের ভক্ত মা।
হোটেল থেকে নিচে নেমে 'দাওয়াত' নামক একটা খাবার দোকানে ঢুকলাম। এটা বাংলাদেশিদের জন্য করা হয়েছে। এটার মালিক সম্ভবত এপার বাংলারই কেউ। দাওয়াতে পরোটা আর মুরগী ভর্তা খেলাম। মুরগী ভর্তা শুনে মনে হচ্ছে মুরগী চটকে দেওয়া হয়েছে? আসলে তা নয়। কোরমার ঝোলের মধ্যে মুরগীর হাড়বিহীন মাংস। খেতে বেশ লাগলো। দুইটা পরোটা খেয়ে নিলাম। এরপর দেখি আর হাটতে পারছি না।
মার্কুইস স্ট্রীট থেকে হাটাপথ নিউমার্কেট। নিউমার্কেটের হকারদের দেখে মা তো খুশিতে আপ্লুত। মায়ের হাসিমুখ দেখতে কার না ভালো লাগে। যদিও আমি মার্কেট পছন্দ করি না। মায়ের জন্য এতটুকু কষ্ট করা আমার জন্য কিছুই না। তিনি ঘুরে ঘুরে একটা ব্যাগ কিনলেন নিজের জন্য। আর এই ছিটেফোটা ব্যাগ, ছোট খাট জিনিস কেনা হলো। এবং নিউমার্কেট ঘুরতে ঘুরতেই আমাদের দুপুর হলো। ওদিকে ঠাটা রোদ, যেন কোলকাতার আকাশে এক নিমিষের জন্যও উধাও হবে না।
দুপুরের খাবার আবার দাওয়াতেই খেলাম। এবার ভাত খেলাম মুরগীর মাংসের ভূনা দিয়ে। তবে ভাতটা মজা লাগলো না। কেমন একটা চাল দিয়ে রান্না করা। এই চালের নাম বাসমতি। অতিউচ্চমানের চাল। তাই হয়তো পেটে সয় না।
বিকেল বেলা যখন বের হলাম, তখন কোন কথা নাই। এইবার তো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে যেতেই হবে। হেটে যেতে বেশ সময় লাগে। মা ব্যাটা মিলে আমরা হেটে যাবারই সিদ্ধান্ত নিলাম। ওদিকে রোদ পড়ে গেছে, আকাশ এবার মেঘলা হলো। রাস্তায় খেলাম লেমন ওয়াটার। কোলকাতার রাস্তায় লেমন ওয়াটারের তুলনা হয় না। বিট লবণ, কিছু পরিমাণ মিষ্টি দিয়ে আর লেবুর রস থেকে অনন্য এক পানীয় তৈরী করা হয়। এটা খেলে অনেক শান্তি লাগে। আমরা অনেক হেটেছি বিধায় এই লেবুর রস আমাদের সত্যিই অমৃতের মত লাগলো। তারপর আবার হাটা ধরলাম।
এবার কোলকাতা শহরের একটা বর্ণনা দেওয়া যাক। সেদিন রাতে যখন এসেছি, ঝকঝকে রাতের নিয়ন আলোতে কিছুটা চোখে পড়েছিল শহর। এ শহরে অনেকগুলো ফ্লাই ওভার আছে। আমরা যে স্থান দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে যাচ্ছিলাম, তার পাশেই একটা বিশালাকার ফ্লাই ওভার। রাস্তায় কোন জ্যাম নেই। রাস্তাগুলো বেশ চওড়া। কয়েকটা গাড়ি মাত্র। আসলে রাস্তা বড় হলে গাড়ি বেশি হলেও সেটাকে বেশি মনে হয় না। এসব দেখে ঢাকা শহরের দৈন্যতার কথা মনে উদয় হলো। একবার খুব ঈর্ষা হলো, আমার শহরটাকে আমরা তো তিলোত্তমা করতে পারিনি। ২০০২ সালে যখন এসেছিলাম তখন শহরটা অনেক নোংরা ছিল। কিন্তু এবার এসে দেখলাম বেশ ছিমছাম করে রাখা হয়েছে।
গলির আনাচে কানাচে ঝুলে আছে মমতা ব্যানার্জির ছবি আর পোষ্টার। একটা বিশালাকার ব্যানারের মধ্যে দেখলাম লেখা, "ঐ নতুনের কেতন ওড়ে"। ঝট করে নজরুলের এই গানটা মনের মধ্যে একবার বেজে গেলো। ক'দিন আগে কোলকাতায় নির্বাচন গেলো। তার রেশ এখনো কাটেনি বুঝা যায়। ওদিকে ৩৪ বছরের মসনদ ভেঙ্গে ওপার বাংলার মানুষেরা আনন্দ করছে নতুন সরকারের আগমনে। মমতার অনেকদিনের ফসল এই তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। তবে আমার কাছে এই আনন্দের কোন মানে নেই। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকার খারপ কি করেছে? ফ্লাই-ওভার, মেট্রো রেল, রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা, জ্যামহীন রাস্তা...সবই তো দেখার মত। ভাবলাম, আমাদের দেশে বামফ্রন্টের মতই যদি একটা সরকার থাকতো, হয়তো কিছু হলেও পেতাম।
বিশাল এভ্যিনু পেড়িয়ে আমরা যখন গড়ের মাঠে একটা গাছের নিচে বসলাম, তখন বিকেল হলো মাত্র। গড়ের মাঠে অনেক ঘোড়া আনা হয়। এখানে তারা ঘাস খায়। ঘোড়াগুলোর সাইজ কোনটা বড়, কোনটা বাচ্চা, আবার কোনটা মাঝারি গড়নের।
গড়ের মাঠে একটা গাছের নিচে বসতেই, একটা ঘোড়া আমার দিকে মুখ বাড়িয়ে দিলো। তাকে আদর করলাম কিছুটা সময়!
গড়ের মাঠের ঠিক ওপাশেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। সেখানে ঢুকতে অবশ্য দশ টাকার টিকিট কাটতে হয়। টিকিট কেটে ঢুকলাম বৃটিশ সাম্রাজ্যের এই মহা সুন্দর নিদর্শন দেখতে। এটা বানানো হয়েছিল রানি ভিক্টোরিয়ার এই দেশে আগমনের সময়। ইতিহাসের বিবেচনায় বেশিদিন বয়স হয়নি এই স্থাপনার। এইতো সেদিন, বিংশ শতকের শুরু দিকের কথা। এটা এখন যাদুঘর হিসেবে কাজ করছে। এর ভেতরে লর্ড ক্লাইভের আবক্ষ মূর্তি দেখলাম। দেখলাম পলাশীর যুদ্ধের নকশা। আওরঙ্গজেবের তলোয়ার। লর্ড ক্লাইভের তলোয়ার। নবাব আলীবর্দি খান একটা সুন্দর কারুকার্য করা কামান বানিয়েছিলেন। সেটাও দেখা হলো। এছাড়া পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত বন্দুক, তলোয়ার সবই সংরক্ষিত আছে এই যাদুঘরে।
সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর থেকে বৃটিশদের কাজকারবার নিয়ে ওয়ালে সাজানো আছে ইতিহাস। সেগুলো পড়তে গেলে সময় হবে রাত। তাই আর পড়লাম না। শুধু ছবি থেকে যা কিছু বোঝা যায়। সিরাজউদ্দৌলার পতনে ভালোই বোধ হয়। নাহলে বৃটিশদের আগমন হতো না। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভ্যতা গড়ে উঠতো না। আর মানুষের সাথে অনেক দূরত্বে থাকা নবাব থাকার থেকে না থাকাই ভালো নয় কি? যাহোক, এটা নিতান্তই আমার নিজের কথা।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে বের হতে বেশ ভালই সময় লাগলো। বের হয়ে গড়ের মাঠে বসে থাকা এক লোকের কাছ থেকে ভেলপুরী খেলাম। ঘোড়ার গাড়ি দেখলাম। তারপর একটা ট্যাক্সি নিয়ে ফিরলাম মার্কুইস স্ট্রীটে।
ভেলপুরি
ফিরতে ফিরতে ট্যাক্সি চালকের সাথে কথা হলো। তিনি এপার বাংলার লোক ছিলেন। নাম তার রহমান। আমাদেরকে বাংলাদেশের খবর জিজ্ঞেস করলেন। হাসলেন। হাসালেন। আমাদেরকে নিয়ে তিনি মার্কুইস স্ট্রীতে নিয়ে এক অদ্ভূত কথা বললেন। বললেন, এই নাও তোমাদের বাংলাদেশ, চলে এসছি।
তখন মার্কুইস স্ট্রীটে নেমে অবাক হয়ে আসপাশটা দেখলাম। এখানে বাংলাদেশি ভর্তি। কেউ চিকীৎসার কাজে এসেছে, কেউ এসেছে পড়াশোনার খাতিরে, কেউ ঘুরতে। মা কে হোটেলে রেখে এবার আমি একা বের হলাম। কোলকাতা নিউমার্কেটে যাবো বলে। তবে আমার ইচ্ছে অন্য। আমার ইচ্ছে, কসমোপলিটন এই নগরটাকে একটু আবিষ্কার করা।
কোলকাতায় প্রচুর বিদেশিদের সমাগম হয়। নিউমার্কেট এলাকায় বিদেশিই ভর্তি। চাইনিজ, জাপানিজ, থেকে শুরু করে ম্লেচ্ছ দেশের অধিবাসী পর্যন্ত আছে। তারা ঘুরে ফিরছে খেয়াল খুশি মতন। কোলকাতা যেন এক স্বাধীন নগরী। অবশ্য যে যার কাজ করছে, কেউ কারও সাথে সমস্যায় জড়ায় না। বিদেশি ছেলেরা একটা হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পড়ে নেমে পড়েছে শহর বিক্ষণে, ওদিকে মেয়েরাও পড়েছে ইউরোপিয়ান পোষাক। কোলকাতার অদিবাসীদের পোষাকেও পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। সর্ট কামিজই বেশি। আর ছেলেরা সার্ট পেন্ট। অনেক মেয়ে কেই দেখলাম স্লিভলেস জামা পড়তে। কিন্তু কেউ তাদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে না, আমাদের দেশে যেমন করে। ভাবলাম, ভালোই এ শহর। এমনটাই তো আমরাও স্বপ্ন দেখি। রাত প্রায় ৯টা পর্যন্ত নিউমার্কেটের একটা প্রাচীরের উপর বসে থাকলাম। ওদিকে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলছে নিরন্তর। আর আমি দেখলাম মানুষ। কত কিসিমের মানুষ। কেউ শিখ, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ ক্রীষ্টান। রাত নয়টায় যখন চার্চের ঘন্টা ঢং ঢং করে বেজে উঠলো, তখন ভাবলাম এবার ফেরার পালা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


