২১ মার্চ, ২০১০ প্রথম আলোতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নেয়া সম্পর্কে একটি কলাম লিখেছেন। জাফর ইকবাল আমার প্রিয় লেখক হলেও তার কাছে এরকম একটি লেখা আমি মোটেও আশা করিনি। সময় পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু ভুল বক্তব্য দিয়েছেন যা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি।
"এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যেন বিষয়টা লক্ষ রেখে পরীক্ষা দিতে যায়। কারণ ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের কারণে সময়সূচিরও পরিবর্তন হয়ে যাবে।"
- ঘড়ির কাটা পরিবর্তনের খবর হঠাৎ করে বলা হয়নি। ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের খবর আগেই পত্রপত্রিকায় এসেছে এবং খবরেও বলা হয়েছে। দেশে একটা নতুন আইন বা নিয়ম করলে তা সাধারণত খবরে বলা হয় বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়।
যদি সময় পরিবর্তনের কথা কোনো ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে দেয়া হতো, তাহলে সেটা নিয়ে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। সময় পরিবর্তনের কথা অন্যান্য সাধারণ মানুষের জানা সত্ত্বেও, যারা এএইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের কেউই সময় পরিবর্তনের ব্যাপারটা না জানা তাই খুবই অস্বাভাবিক।
"ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন বা বিদেশিদের ভাষায় ‘ডে লাইট সেভিংস’ আসলে বড়লোক দেশের এক ধরনের বিলাসিতা—গ্রীষ্মে দীর্ঘ একটা দিনে বিকেলে দিনের আলোয় তারা বেশি সময় ফুর্তি-ফার্তা করে, সে জন্য ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেয়। শীতকালে সেটাকে আবার পরিবর্তন করতে হয়।"
—কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। যে দেশগুলোতে 'ডে লাইট সেভিংস' সেগুলো (খুব সম্ভবত আসলেই) বড়লোক দেশ এবং তার মাঝে একটি দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষ এবং ধনী দেশগুলোর একটি ধরা হয়। সেখানে প্রেসিডেন্টের ইচ্ছেমতো বা অল্প কোনো নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ইচ্ছে অনুসারে সব কিছু হওয়া সম্ভব না। আমরা সামনা সামনি যতই যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য ধনী দেশকে গালিগালাজ করি না কেন, মনে মনে এ কথা স্বীকার করতে হয় যে সেসব দেশগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত মানের। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় একটি দেশ এবং এদেশের জনসংখ্যাও বাংলাদেশের চাইতে অনেক বেশি। সুতরাং, এতগুলো মানুষের সুযোগ সুবিধাগুলোর দিকে খেয়াল রেখেই সকল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
"বছরে দুবার এই কর্তন-কুর্দন তাদের দেশে মানিয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই দেশে? গত বছর সেটা পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং এ দেশে সেটা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। লঞ্চঘাটে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হতো, কয়টায় লঞ্চ ছাড়বে—অর্ধেক মানুষ বলেছে নয়টায়; অন্য অর্ধেক মানুষ বলেছে ১০টায়।"
- সেটা প্রচারের ক্ষেত্রে লঞ্চযাত্রীর ও লঞ্চঘাটের লোকদের ব্যর্থতা। 'ডে লাইট সেভিংস' - এর আগে যে লঞ্চ সকাল ঘড়িতে ৯টা বাজার সময় ছাড়া হতো সেটি 'ডে লাইট সেভিংস' পরেও ঘড়িতে ৯টা বাজার সময়ই (পুরাতন সময় অনুসারে তখন ৮টা বাজলেও) ছাড়ার কথা এবং যাত্রীদেরও ৯টার আগে লঞ্চঘাটে আসার কথা।। লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে ঘড়ির সময় অনুযায়ী, লঞ্চ ছাড়ার সময় দিয়ে ঘড়ির সময় বিবেচনা করা হচ্ছে না। অর্থাৎ, ঘড়িতে যখন বর্তমান সময় অনুযায়ী ৯টা বাজে, তখনই লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে।
একথা গুলিয়ে ফেললে চলবে না যে - যেহেতু লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে, তার মানে এখন ৯টা বাজে (যেমন - হাতে ঘড়ি না থাকলে ও লঞ্চ ছাড়ার টাইম যে ৯টার সময় তা আগে থেকে জানা থাকলে; কোনো লঞ্চ ছাড়ার সময় আমরা ধরে নেই - যেহেতু এখন লঞ্চ ছাড়ছে, তার মানে এখন ৯টা বাজে।) সুতরাং, ঘড়ির কাটা পরিবর্তন করলেও লঞ্চ নতুন সময়ানুসারে ৯টাতেই ছাড়া উচিত (তখন পুরাতন সময় ৮টা বাজলেও) এবং লঞ্চযাত্রীদেরকেও লঞ্চ ধরার জন্যে ৯টার আগেই লঞ্চঘাটে আসা উচিত।
"বিদ্যুতের সাশ্রয় হয় বলে যে যুক্তি দিয়ে এটা শুরু হয়েছিল, সেটা নেহাতই খোঁড়া যুক্তি।"
- ডে লাইট সেভিংসের পক্ষে এটা মোটেও খোঁড়া যুক্তি নয় বরং খুব শক্ত (আমার মতে প্রথম) একটি যুক্তি।
গ্রীষ্মকালে সূ্র্যাস্ত হয় প্রায় পৌনে সাতটার দিকে। শীতকালে সূর্যাস্ত হয় সোয়া পাঁচটার দিকে। ধরা যাক, একটি পরিবারের সদস্যরা সকাল ৬টার সময় ঘুম থেকে উঠে নামাজ পরে, মুখ ধুয়ে ৭টার সময় নাশতা করে, ৮টার সময় - বাবা অফিসে, ছেলে-মেয়ে স্কুলে গেলো এবং মা বাসায় থাকলো। ছেলে-মেয়ে দুপুরের পরে ফিরে আসলো এবং সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাবাও ফিরে আসলো। ১১টার সময় সবাই ঘুমাতে গেলো। গ্রীষ্মকালে পৌনে ৭টায় সূর্যাস্ত হওয়ার কারণে ঐ বাসাতে লাইট জ্বলবে ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মোট ৪ ঘন্টা এবং শীতকালে সোয়া ৫টায় সূর্যাস্ত হওয়ার কারণে ঐ একই বাসাতে শীতকালে লাইট জ্বলবে সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মোট সাড়ে ৫ ঘন্টা।
সুতরাং, একটা বাড়িতেই বিদ্যুতের খরচ হচ্ছে দেড় ঘন্টা বেশি। কিন্তু শীতকালে যদি সময়কে একঘন্টা এগিয়ে আনা হয় অর্থাৎ ঘড়িতে যখন ৫টা বাজার কথা তখন যদি ৬টা বাজে তখন ঐ বাড়িতে লাইট জ্বলবে সাড়ে ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। সেইরকম মার্কেট, দোকান, রাস্তা সব জায়গাতেই ১ঘন্টা বিদ্যুৎ খরচ কম হবে।
"সরকার ইচ্ছা করলেই ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন না করে শুধু দোকানপাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজের সময়সূচির পরিবর্তন করে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেটা হবে অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।"
- ধরা যাক, ১জন লোক ৯টায় কাজ থাকার কারণে সকাল ৭টায় উঠেন কিংবা ১টি ছেলে ৮টার স্কুলে যাবার জন্যে সাড়ে ৬টায় উঠে।
অফিস কিংবা স্কুলের সময়সূচি পরিবর্তন করে যদি ১ঘন্টা পিছিয়ে আনা হয়, তাহলে অফিসে যাওয়া লোকটিকেও ১ঘন্টা আগে অর্থাৎ ৭টার বদলে ৬টার সময় এবং স্কুলের ছাত্রটিকেও ১ঘন্টা আগে সাড়ে ৬টার বদলে সাড়ে ৫টার সময় ঘুম থেকে উঠতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে, নতুন সময়সূচী অনুসারে যারা আগে ৯টায় অফিস যেতো, তারা ৮টায় অফিস যাবে। আর যারা আগে ৮টায় স্কুলে যেতো, তারা ৭টায় স্কুলে যাবে। ডে লাইট সেভিংসেও একই ব্যাপার ঘটছে, কিন্তু যারা আগে ৯টায় অফিসে যেতো, তারা ৯টাতেই অফিস যাচ্ছে। আর যারা ৮টায় স্কুলে যেতো তারা ৮টাতেই স্কুলে যাচ্ছে। সূর্যের আলো ১ঘন্টা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ১ ঘন্টা কম খরচ হচ্ছে।
একজন বড় মানুষ তার কাছে টাকা থাকার কারণে একসাথে ৩০০টি ডাকটিকেট কিনে ফেলতে পারে। কিন্তু একটি ছোট ছেলে পয়সা না থাকায় ৩০০টি ডাকটিকেট কিনতে পারে না। ৩০০টি ডাকটিকেট জমা করার জন্যে তাকে ১টি করে ডাকটিকেট জমাতে হয়। সারা বিশ্বে বড় মানুষদের মাঝে বাংলাদেশ এখনও একটি ছোট ছেলে। সুতরাং, ১টি ডাকটিকেট সংগ্রহ করার সুযোগ কিছুতেই যেন ছেড়ে দেয়া না হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

