আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে বাস করছি আমরা! এ যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়! ‘স্বামী চোর’ এই অপবাদে ৪ সন্তানের জননীকে বেদম পিটিয়েছেন তিনি। রিমান্ডও দিয়েছেন তিনি। পেটাতে পেটাতে বিবস্ত্র করে আবার পেটানো! প্রাণে বাঁচতে জননী মাদ্রাসায় আশ্রয় নিলেন। তারপরও নির্যাতন আর পেটানোর হাত থেকে নিস্তার পেলেন না হতভাগীনি রত্মা বেগম (৩৫)। মৌলভীবাজারে আরেক ‘বাংলাভাই’ সেজে নিজেই রিমান্ড দিয়ে একের পর এক এ কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন মাসুদ আহমদ নামে এক পৌর কাউন্সিলর।
নির্যাতনের সময় কাউন্সিলর মাসুদ সরাসরি বলে ফেললেন এটা আমার নিজস্ব আইন। এদেরকে রিমান্ডে নেওয়া হবে। শুধু তাই নয় চুরির অপবাদে এক যুবককে সপ্তাহ খানেক আগে ধরে নিয়ে যায় মাসুদ কাউন্সিলসহ তার লোকজন। সন্তানের খোঁজ না পেয়ে বৃদ্ধ মা এখন পাগলপ্রায়! কলোনির আতঙ্কিত মানুষজন গত এক সপ্তাহ ধরে রাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরেক ‘বাংলাভাই’ মাসুদ কাউন্সিলরের লোকজনের ভয়ে। মৌলভীবাজার শহরের ৩নং ওয়ার্ডের রঘুনন্দনপুর (রহমানবাগ) এলাকায় মাওলানা আবুল হোসেন খান (৬০) ওরফে উকিলের কলোনিতে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
এদিকে, এই স্বঘোষিত রিমান্ডদাতা কাউন্সিলর মাসুদের নির্যাতনের শিকার রত্মা বেগম (৩৫) বলেন, বৃহস্পতিবার ১৩ অক্টোবর বিকেলে মাসুদ কাউন্সিলরের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে কলোনিতে হামলা চালায়। এ সময় তারা আমার স্বামী জয়নাল মিয়াকে খুঁজতে থাকে। আমার স্বামীকে না পেয়ে তারা আমাকেই পেটাতে শুরু করে। আমার পিঠে, বুকে, হাতে ও পায়ে পেটাতে থাকে। তিনি মুখে কাপড় চেপে কেঁদে বলেন, একপর্যায়ে কাউন্সিলর ও তার লোকজন আমার শরীরের কাপড় খুলে নির্যাতন চালাতে থাকে। ওই অবস্থায় আমি প্রাণে বাঁচার জন্য কলোনির মালিকের মাদ্রাসার ভেতর দৌঁড়ে গিয়ে আশ্রয় নিই। তখনও তারা আমার ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। কলোনির মালিক মাওলানা আবুল হোসেন খান বাধা দিলে তাকেও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তারপর আশেপাশের মানুষজন এগিয়ে এলে আমি প্রাণে রক্ষা পাই।
রত্মা আরো জানান, ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর কলোনির লোকজন আমাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। তারপর মঙ্গলবার আমি মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করি। তিনি জানালেন, গত এক সপ্তাহ চলে গেছে। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের কারো কাছ থেকে কোনো বিচার পাইনি আমি। ঘটনার পর থেকে আমার স্বামী ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর কলোনির মানুষজন আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারছেন না। ভয়ে থাকেন না জানি কখন আবার তাদের ওপর হামলা হয়! রত্মার শাশুড়ি নূরজাহান বেগম (৭০) বলেন, আমার চোখের সামনে মাসুদ কাউন্সিলরের লোকজন ছেলের বউকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করেছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। অপরদিকে, এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ মনি মিয়ার (৩০) মা পাগলপ্রায় রাজিয়া বেগম (৫০) জানালেন, বৃহস্পতিবার সকালে চুরির অপবাদ দিয়ে আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মাসুদ কাউন্সিলর ও তার লোকজন। তারপর আর কিছুই জানি না, আমার ছেলে কোথায়। তিনি ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে খাওয়া-দাওয়া ভুলে পাগলের মতো বিলাপ করছেন শুধু।
এ বিষয়ে কলোনির মালিক মাওলানা আবুল হোসেন খান (৬০) জানান, মাসুদ কাউন্সিলর ও তার লোকজন রত্মাকে কলোনির ভেতরে পেটাতে শুরু করে। বিবস্ত্র অবস্থায় রত্মা যখন আমার মাদ্রাসায় আশ্রয় নিতে আসেন তখনও তারা রত্মার ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। তিনি আরও জানান, নির্যাতনের সময় মাসুদ কাউন্সিলর বলে- ‘এটা আমার নিজস্ব আইন। এদেরকে রিমান্ডে নেওয়া হবে। এ সময় আবুল হোসেন খানকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, গরিব-দিনমজুর শ্রেণীর লোকজন প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কলোনিতে বসবাস করছেন। কাউকে কোনোদিন চুরি বা খারাপ কাজে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে কলোনির লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই ভয়ে কলোনি ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন মাসুদ কাউন্সিলরের ভয়ে। ৩নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর নাহিদ হোসেন বলেন, কেউ চুরি করলে তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা উচিত। কিন্তু এভাবে নির্যাতন করা যায় না। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কাউন্সিলর মাসুদ আহমদ রত্মাকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। আর নিখোঁজ মনির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইলেকট্রিক তার চুরির অপরাধে মনিকে ধরে আনা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে মনি নিখোঁজ-এ কথার জবাবে তিনি বলেন, আমাকে বললে এখনই মনিকে বের করে দিতে পারি।
সূএঃ-বাংলাটাইমস টুয়ন্টিফোর ডটকম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



