খাগড়াছড়িতে আমার খুব চমৎকার একটা সুবিধা আছে। ওখানে গেলে ঘুরে বেড়ানোর একটা সুবিধাজনক বাহন পাই আমি, একটা মটর সাইকেল। আর পাহারী পথে ওটা চালানোর মতো মজা আমি ইদানীং আর কোথাও পাইনি, সে গল্প অন্যদিন, আজ ঝর্ণার গল্প বলি।
তো, সেই ঘুরে বেড়ানোর সুবাদেই পথে অথবা বেপথে যাবার বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিলো আমার। শহর থেকে আলুটিলা পেরিয়ে আর খানিকটা সামনে গেলেই বাঁয়ে চলে গেছে ইট বিছানো একটা পথ। পথের দুপাশে যথারীতি ঝোপের জঙ্গল। শুরুতে কোন সাইনবোর্ড নেই। ছিলো আর্মিদের একটা পরিত্যাক্ত চেকপোস্ট, আর তার দেয়ালে ইটের টুকরা দিয়ে ঘসে ঘসে লেখা 'রাছিং ঝর্না'।
আমার সাথে তখন ফেরদৌস, ক্যাম্পাসের ছোটভাই, মটর সাইকেলে আমার পেছনে। এগিয়ে গেলাম পথ ধরে নানা অজানা আশংকা বুকে। যেতে যেতে দেখলাম পথের দুপাশে গড়ে উঠছে ছড়ানো ছিটানো পাহারী বসতি। আমরা এগুতে থাকলাম, খানিক পরে পরে কাওকে পথ জিজ্ঞাসা করে। একসময় পৌছে গেলাম বসতির শেষ বাড়িটার সামনে। তখনো খুঁজে পাইনি ঝর্ণার দিশা। কথা হলো বাড়ির মালিক রবীন্দ্র'দার সঙ্গে। আমাদের জানালো এই পাহাড় ধরে নেমে গেলে ঝর্ণা পাওয়া যাবে। সে আমাদের একটা পাহাড়ী পায়ে চলা পথও দেখিয়ে দিলো এগিয়ে যাবার। আমরা এগুতে থাকলাম, আর খানিকটা পরেই শুনতে পেলাম ঝর্ণার রুমঝুম শব্দ। তখনও আমরা পাহাড় বেয়ে নামছি, কখনো পড়তে পড়তে সামলে নিচ্ছি নিজেকে। ঝোপ জঙ্গল পেরুচ্ছি আর শুনছি ঝর্ণার গান তীব্র নীরবতা ছাড়িয়ে,এগিয়ে যাচ্ছি সে গানকে কেন্দ্র করে আমরা দুজন। অদ্ভুদ সে সময়, অদ্ভুদ সে নীরবতা, অদ্ভুদ সে অজানা পথ চলা ঝর্ণার তৃষ্ণা নিয়ে।
চলতে চলতেই পেয়ে গেলাম সেই খাল (বা নদী,একে কি নামে ডাকা যায় বুঝতে পারছি না), যেটা ঝর্ণা হয়ে নেমে গেছে পাহাড় বেয়ে। আমরাও এগিয়ে গেলাম স্রোতের সাথে সাথে। এবং প্রথমে পৌছালাম সেখানটায়, ঠিক যেখানটায় স্রোত লাফিয়ে পড়েছে ঝর্না হয়ে। আশপাশে কিছু পাহাড়ী ফুল, ফুটে আছে ঝোপে ঝোপে, পাহাড়ের গায়ে, ঝর্ণার পাশে পাশে। আমার তর সইছিলোনা মোটেও। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিলো ঝর্ণা হতে, ছুটে যেতে শূণ্যে।
নিচে, পানি যেখানে আছড়ে পড়ছে তীব্রতায়, সেখানে বিশাল একটা পাথরের চাতাল। আমরা যে পথ ধরে ঝর্ণার নিচে নেমেছি, বোঝা যায় এই পথটা একসময় ঐ নদীর মতই নদী ছিলো, অথবা বর্ষায় নদীর রুপ নেয়। এ চাতালটাও ঐ নদীরই একটা অংশ, শুকনা। আমরা প্রচুর ক্লান্তিতে শুয়ে পড়লাম ঐ চাতালে। ফেরদৌস লাজলজ্জার বালাই না করে শুধু আন্ডারওয়ার পড়ে দাড়িয়ে পড়লো ঝর্ণার নীচে। লজ্জার বালাই করারও কিছু ছিলো না। আমরা তখন পৃথিবী থেকে আলাদা, কেউই ছিলো না আশপাশে। আমিও ছোঁয়ালাম সে স্রোত চোখে, মুখে। কি অসম্ভব তৃপ্তি, কি অসম্ভব আনন্দ সে জলে!
ফিরতে গিয়ে বুঝলাম কতটা নিচে নেমেছিলাম আমরা। মটর সাইকেল রেখে এসেছি রবীন্দ্র'দার বাসার সামনে, পায়ে চলা পথের শুরুতে। আমাদের তো ফিরতেই হবে ঐ পথে। আমর উঠছি আর উঠছি খাড়া পাহাড় বেয়ে বেয়ে। নামার সময় ভয় ছিলো হঠাৎ পড়ে যাওয়ার, আর এখন আরও যুক্ত হলো দমের। উঠছি তো উঠছি, পথ যেন আর শেষ হয় না। যখন রবীন্দ্র'দার বাড়িতে পৌছালাম, আমার দাড়িয়ে থাকার আর কোন শক্তি ছিলো না। রবীন্দ্র'দাও বুঝেছিলেন বোধহয়, আমাদের ঘরে বসিয়ে গেলেন গরম পানি(!)র ব্যবস্থা করতে। গরম পানি খেলাম, সাথে ঐ নদীতে ধরা ছোট্ট মাছ ভাজা। চমৎকার!
ঐ গরমপানি খেয়েও চমৎকারভাবে মটরসাইকেল চালিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম। ফেরদৌস পেছনে বসে বলছিলো, 'আরে, আপনি তো যাবার সময়ও এতো ভালো চালাননি!'
বিঃ দ্রঃ ছবি আগামীকাল যুক্ত করে দেবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

