ঝিনাইদহ, ২৪ জুলাই (আরটিএনএন ডটনেট)-- মাথা থেকে কেটে ফেলার পর চুলের আর কি মূল্যই বা থাকতে পারে? সর্বোচ্চ পরচুলা তৈরির কাজে লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই চুলের রয়েছে যথেষ্ট কদর। কারণ এই চুলকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে তৈরি হচ্ছে মহামূল্যবান হীরা। হীরার এই কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করণে কর্মসংস্থান হয়েছে যশোর, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের শ’ শ’ নারীর।
ঝিনাইদহ শহরে গড়ে উঠেছে চুলের বিশাল বাজার ও প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চুল বেচাকেনা হচ্ছে সেখানে। রীতিমতো ক্রয় অফিস খুলে তা কিনে নিচ্ছেন বিদেশিরা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৫টির বেশি জেলার চুল বিকিকিনি হচ্ছে এখানে। চুল থেকে হীরা তৈরির ব্যাপারটি খুব বেশি জানাজানি না হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা তা কিনছেন নামমাত্র মূল্যে।
বিদেশি ক্রেতাদের ভাষ্য, কেনা চুল দিয়ে ফ্যাক্টরিতে বটিচুল, পরচুলা ও অন্যান্য সৌখিন জিনিস তৈরি করে থাকেন তারা।
তবে ইন্টারনেট সূত্র ও বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি ঘেঁটে পাওয়া যায় অবাক করার মতো তথ্য। তবে অবাক বলাও কেমন যুক্তিযুক্ত নয়। এটা অনেক আগে থেকেই বিশ্বে হয়ে আসছে। মানুষের চুলে থাকা কার্বণ মৌল থেকে ল্যাবরেটরিতে বানানো হচ্ছে মহামূল্যবান হীরা। এতে প্রয়োজন হয় ব্যক্তির দশমিক ৫ থেকে ২ গ্রাম পর্যন্ত চুল। আবার দেহভস্ম দিয়েও এ কাজ করা হচ্ছে। দেহভস্ম হলে প্রয়োজন হয় ১০০ গ্রাম। চুল বা দেহভস্ম থেকে মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে সেখান থেকে কার্বন কণাকে বের করে নেয়া হয়।
পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে প্রাকৃতিক হীরা পাওয়া যায়, সেই একই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় ল্যাবরেটরিতে। মেশিনের ভিতরে কার্বন কণা দিয়ে সেখানে সৃষ্টি করা হয় অতি উচ্চ চাপ ও তাপ। এর সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে চুল ও দেহভস্ম থেকে সংগৃহীত কার্বন পরিণত হচ্ছে হীরায়। তবে যে প্রক্রিয়ায় এ হীরা তৈরি করা হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ ব্যবসার স্বার্থেই প্রকাশে অনীহা উৎপাদকদের। তবে এটুকু নিশ্চিত, এ উপায়ে উৎপাদিত হীরা হয় অনন্য।
একজন ব্যক্তির চুল থেকে যে হীরা তৈরি হয়, তা অন্য ব্যক্তির চুলের হীরার সঙ্গে মেলে না। উৎপাদিত হীরা একজন মানুষের ডিএনএ বহন করে। ফলে মৃত স্বজনের স্মৃতি দরদসহ বহন করার মাধ্যম হিসেবেও কাজে লাগে এই হীরা। এ পদ্ধতিতে হীরা তৈরির জন্য পশ্চিমা বিশ্বে অনেক কোম্পানি গড়ে উঠেছে। তারা এ ব্যবসা করে উপার্জন করছে কোটি কোটি ডলার।
গোড়ার কথা
১৯৫৬ সালে কৃত্রিম উপায়ে হীরা উৎপাদন শুরু করে জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি। ওই সময়ে তারা যে হীরা উৎপাদন করে, তা ছিল ক্ষুদ্র আকারের রত্নপাথর। তবে আরও ১৫ বছর সাধনা করে এই কোম্পানি ১৯৭১ সালে উৎপাদন করে রত্নমানের এক ক্যারেটের হীরা। কৃত্রিম উপায়ে হীরা উৎপাদনের ইতিহাস এখান থেকেই শুরু।
উৎপাদনকারীরা বলছেন, কৃত্রিম উপায়ে এই যে হীরা বানানো হচ্ছে, এগুলো প্রাকৃতিক হীরার মতোই উজ্জ্বল। ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত এসব হীরা কি প্রাকৃতিক হীরার মতো, তা নিয়ে কৌতূহল সবার। তবে কোম্পানিগুলো বলছে- হ্যাঁ, অবিকল একই। কোন পার্থক্য নেই কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত হীরা ও প্রাকৃতিক হীরার মধ্যে।
১৯৮৪ সালে পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন পেপসির বিজ্ঞাপন নির্মাণের সময় তার চুলে আগুন ধরে গেলে সেই পোড়া চুল দিয়ে ১০টি হীরা বানিয়েছিল একটি কোম্পানি। ২০০৭ সালে সঙ্গীতস্রষ্টা বিঠোফেনের চুল থেকেও ৩টি হীরা উৎপাদন করেছে ওই কোম্পনিটি। প্রতিটি হীরা তারা বিক্রি করেছে ২ লাখ ডলার মূল্যে। পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের লাইফজেম নামের ওই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ডিন ভ্যানডেন বেসিন এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন।
ঝিনাইদহে চুলের রমরমা বাজার
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৫টি জেলার চুল বিকিকিনি হয় ঝিনাইদহে। চুল কেনার জন্য বিদেশিরা অফিস খুলেছে এখানে। শহরের স্বর্ণপট্টিতে চীনের জেডসিডি কোম্পানির চুল ক্রয় কেন্দ্রে ভিড় লেগেই থাকে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি চুল সংগ্রহ করা হয়। এক কেজি চুলের মূল্য তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। চুলের কারখানায় কয়েকশ’ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সরজমিনে ঝিনাইদহের ঋষিপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, ঋষি নারীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চুলের কারখানায়। তাদের গ্রামে গড়ে উঠেছে বিশাল কারখানা। যেখানে ফেলে দেয়া ও বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত জটবাঁধা চুলের জট ছাড়ানো হয়।
ঋষি সম্প্রদায়ের নারীরা জানান, আগে স্বামীর অভাবের সংসারে তাদের কিছুই করার ছিল না। ছেলেমেয়েদের মুখে তারা ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে পারতো না। এখন তারা কাজ পেয়েছেন, নিজেরা আয় করছেন।
ঝিনাইদহের ষাটবাড়িয়া গ্রামেও বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। গত এক বছর ধরে তাদের এলাকায় এ চুলের কারখানার কাজ চলছে।
কারখানার মালিক চুয়াডাঙ্গার আজগর আলী জানান, তিনি এই জটছাড়ানো চুল আগে ঢাকায় পাঠাতেন। এখন ঝিনাইদহে বিদেশিরা অফিস খোলায় সেখানে দেন। তিনি জানান, ঋষি সম্প্রদায়ের লোকজন ছাড়া এই কাজে শ্রমিক পাওয়া যায় না। এ কারণে তিনি ঝিনাইদহের এই ঋষি পাড়াকে বেছে নিয়েছেন।
আজগর আলী আরো জানান, তার কারখানায় গড়ে ৭০ জন নারী প্রতিদিন কাজ করে। চুল কেনেন ১৫শ’ টাকা কেজি দরে। জট ছাড়ানোর পর ২৫শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ১২ ইঞ্চির বেশি যত লম্বা হবে, তত বেশি দামে বিক্রি হয়। হীরা ছাড়াও এই চুল দিয়ে নানা ধরনের প্রসাধনী পণ্যও তৈরি হয়।
জেলা শহরের স্বর্ণপট্টিতে গড়ে উঠেছে খুলনা বিভাগের একমাত্র চুল ক্রয় কেন্দ্রের বিদেশি অফিস। চীন দেশের জেডসিডি কোম্পানির ঝিনাইদহ ক্রয় কেন্দ্রের কর্মকর্তা দোভাষীর মাধ্যমে জানান, এসব চুল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পট চুল তৈরি করা হয়। বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে এসব পট চুল বেশি ব্যবহার হয়। এছাড়াও এসব চুল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৌখিন জিনিস তৈরি করা হয়।
বিশেষজ্ঞের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের বলেন, মানুষের চুলে প্রোটিন থাকে। এই চুল যখন মানুষের মাথায় থাকে, তখন অন্যান্য পদার্থের মতো সজীব থাকে। সেলুনে গিয়ে যখন চুল কেটে ফেলা হয় তখন এই প্রোটিন প্রাণহীন হয়ে পড়ে। এই চুলকে পোড়ালে এক প্রকার কার্বন (অঙ্গার) এর সৃষ্টি হয়। কার্বনকে বিশেষ ব্যবস্থায় হীরায় পরিণত করা সম্ভব।
সুত্র:সুত্র:

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



