আমার খুব ছোট বেলার বান্ধু্বী, একটা নাম দিলাম 'নিপা'’। সেই প্লে গ্রুপ থেকে আমরা এক সাথে লেখা পড়া করে আসছি, আমার স্কুল জীবনের প্রথম বান্ধুবীও নিপাই।
ওরা ছিল দুই বোন এক ভাই। ও মেঝ, বোনটা ছোট আর ওর ভাই, ওর থেকে ৩-৪ বছরের বড় হবে।আজ যে ঘটনাটা বলব তা নিপার ঐ ভাইকে কেন্দ্র করে, খুবই মমান্তিক, বেদনাদায়ক। ভাইটার ও একটা নাম দিই ধরি'বিলাস'’।উনি তখন জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
নিপারা হিন্দু ছিল। ও সবসময় ওর বিলাস দার প্রসংশায় উন্মুখ থাকতো। ওর দাদা এই পারে, ঐপারে,খুব বুদ্ধিমান, রেজাল্ট অনেক ভালো,দৈনিক ১২-১৪ ঘন্টা লেখা পড়া করে এই সব। আমরাও শুনে খুব অভিভুত হতাম।
আসলেই উনি অনেক মেধাবী ছিলেন,ছোট বেলা থেকেই সব ক্লাসে প্রথম হতেন শুনেছি।
এরপর আমরা গার্লস স্কুলে চলে আসি। এই স্কুলের এক ম্যাডামের মেয়ে বিলাস দার ব্যাচ মেট ছিল। বিলাস দার সাথে একই ব্যচে প্রাইভেট পড়ত সে সুবাদে পরিচয়। ঐ ম্যাডাম প্রায়ই ক্লাসে নিপার কাছে ওর ভাইয়ের সম্বন্ধে এটা ওটা জিজ্ঞসা করত। তোমার ভাই কিভাবে এতো ভাল রেজাল্ট করে,কত ঘন্টা লেখা পড়া করে, এবার কত মাক পেল,কয়টায় লেটার পেল এইসব।
বিলাস দা এস.এস.সি, এইস.এস.সি দুইটাতেই অনেক ভালো নাম্বার পান।তারপর ভর্তি হন ময়মনসিং মেডিকেলে।আমরা তখন ক্লাস টেনে, নিপা আর্টসে চলে গিয়েছিল বলে ওর সাথে কথা কম হত।তবুও শুনতাম উনি মেডিকেলেও অনেক ভালো রেজাল্ট করছেন, পজিশনে থাকেন।
আমাদের এইস.এস.সি র পরে নিপা তখন ঢাকাতে কোচিং করছে, আমি আমার শহরে। একদিন বিকালে আমারই অন্য এক বান্ধুবী ফোন করে বলল, "জানিস বিলাস দা না আত্মহত্তা করেছে"।
আমি বললাম “কি বলিস? কোন বিলাস দা”?
ও বলল “আরে, নিপার ভাই বিলাস দা"”।
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম,মুখে কোন কথা সরছে না।
বললাম” কিভাবে হল জানিস কিছু”?
ওদের বাসা নিপাদের বাসার কাছেই ছিল।ও যা বলল তার সারমর্ম এ রকম-
বিলাস দার ব্যাচের ঐ ম্যাডামের মেয়েটাও সে সময় রংপুর মেডিকেলে ভর্তি হয়। উনাদের মধ্যে প্রথমে জানাশোনা থেকে বন্ধুত্ব এবং পরে ভার্সিটিতে যেয়ে ভালোবাসায় রুপান্তরিত হয়।যাকে বলে একদম ট্রু লাভ। ব্যাপারটা দুই পরিবারেই জানাজানি হয়ে যায়, কিন্তু কেউই মেনে নেয় না, বিশেষ করে ধর্মের ভিন্নতার কারণে। ছেলে মেয়ে উভয়ের উপরেই ভিষণ প্রেসার আসতে থাকে,অথচ ওরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল।কেউ কাউকে ছাড়তে পারবে না। অতি আদরের একমাত্র ছেলে বিলাস দাকে উনার বাবা মা বেশ কদিন মার- ধোরও করে, এমন কি নিপাও ওর দাদার গায়ে হাত তোলে!!অথচ এই দাদা বলতে ও একসময় অজ্ঞআন ছিল।
নিপারা ধর্মের ব্যপারে অনেক গোঁড়া টাইপের ছিল। যখন বিলাস দাকে ওরা কিছুতেই ফেরাতে পারছিল না, তখন বাসা থেকে ঘোষনা দেওয়া হয়-'তোমার জন্য এ বাড়ির দড়জা চিরদিনের গ্ন্য বন্ধ, এবার যেন তোমার বদলে তোমার লাশ আমাদের কাছে পৌছায়'’।
অভিমানী বিলাস দা এরপর আত্মহত্তার সিদ্ধান্ত নেয়।উনি তখন হলে।এ সিদ্ধান্ত উনি বাসাতেও জানান,নিপাও জানত। কিন্তু কেউ উনাকে বাধা দেয় নি। শুধু উনার বন্ধুরা কেউ জানত না। এক সন্ধায় ময়মনসিংহে উনার কোন এক পরিচিতের বাসায় যেয়ে ফোনে নিপার সাথে কোন ওষুধের পাওয়ার কেমন এসব কথা বলতে বলতেই হাই পাওয়ার ঘুমের ইঞ্জেকশন শরীরে পুশ করেন।আর এভাবেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক সৎ - সাহসী প্রেমিক, মেধাবী উদিয়মান তরুনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়।
উনার এই অকাল মৃত্তুতে যতনা কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশি অবাক হয়েছি। বাবা হয়ে, মা হয়ে কিভাবে পারল এমন আদরের সন্তানকে চলে যেতে দিতে!! বিলাস দা তো সারা জীবন বাধ্য হয়ে থেকেছে, বাবা মার সব কথা শুনেছে, এবার নাহয় একটু ভুলই করেছে!! কেন মৃত্তুর দিকে ঠেলে দিতে হবে,উনার জন্যে কোন বিকল্পই কি চিন্তা করা যেত না? আমরা আসলে অনেক অনেক বেশি সার্থপর, সবাই সবার জায়গায় নিজ নিজ সার্থ আগলে বসে আছি, এত টুকু ছাড় দিতে আমরা কোন ভাবেই রাজি না।
ঘটনাটা প্রায় ৬-৭ বছর আগের, কিন্তু আজ ও আমাকে নাড়া দেয়, ভাবিয়ে তোলে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


