একজন শেখ মুজিবের জন্ম না হলে বাঙালি জাতি একটি রাষ্ট্র পেতো কি না, তা নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। তিনি বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক হয়েই জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতা সে সময় আরো ছিলেন অনেকেই। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাই- এমন ডাক দেবার সাহস কেউ দেখাতে পারেননি। তিনি দেখিয়েছিলেন। এতে একটি মহল মোটেও খুশি ছিল না। সে সময় যারা চীনপন্থী রাজনীতি করতেন, তারাও বেশ নাখোশ হয়েছিলেন। পরোক্ষভাবে তারা যে সেই পাক শোষকদের মতলব সার্ভ করছেন, তারা কি তা সেদিন বুঝতে পারেননি? হাঁ, পেরেছিলেন। তারপরও তারা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা কামনায় ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না।
পঞ্চাশ দশকের শুরুতেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এদেশের জনগণের সংগ্রামকে সাংগঠনিক রূপ দিতে যার অবদান সবচেয়ে উল্লেখের দাবি রাখে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদেশের ছাত্র-যুবক, মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিতে, জনগণকে সকল বিপদে সাহস জোগাতে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মূলধারায় পরিণত করার সবচেয়ে কৃতিত্বের অবদান রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একদিকেÑ স্বৈরাচার-সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা; অপরদিকে গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদা। জনগণের মৌলিক অধিকার ও রুটি-রুজির লড়াই। এই লড়াইয়ের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এক ঐতিহাসিক সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনি একটি চিন্তা-আদর্শের ভিত্তিতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। তাঁর সাহসী ও আপোসহীন নেতৃত্বে ছাত্র-যুবক, মধ্যবিত্ত, কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি ও সংগ্রামী মানুষ আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সংঘবদ্ধ হয়। তিনি বাঙালি জাতিকে স্বকীয়তায় উজ্জীবিত হতে উদ্বুদ্ধ করেন। আন্দোলনকে ধাপে ধাপে জনগণের মুক্তি ও স্বাধীনতার কাছাকাছি নিয়ে যান।
১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে যৌথ নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। যেমনটি বিজয় হয়েছিল ১৯৭০-এর নির্বাচনে। সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ছত্রছায়ায় গড়া পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী জনগণের এ বিজয়কে যেমন মেনে নেয়নি ১৯৫৪ সালে, তেমনি মেনে নেয়নি ১৯৭১-এ। তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কয়েক মাস যেতে না যেতেই কেন্দ্র থেকে গভর্নরের শাসন জারি করে প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে ভেঙে দেয়া হয় মন্ত্রিসভা। হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে করা হয় বন্দী। নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরও এদেশের জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ শাসনের সুযোগ থেকে হয় বঞ্চিত। একচেটিয়া শোষণের মাধ্যমে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পের বিকাশ ঘটে; অথচ পূর্ব বাংলাকে করা হয় সম্পূর্ণ দেউলিয়া। এদেশের অর্থনীতির প্রতি দেখানো হয় চরম অবজ্ঞা। শিক্ষা, শিল্প-কলকারখানা, চাকরি, সামরিক বাহিনী, সর্বক্ষেত্রে বাঙালিদের প্রতি চরম বৈষম্য এদেশের জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে। অধিকারহারা বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে এ জাতিকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে পঙ্গু রাখার ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এভাবে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চরম আঘাত হানা হয়।
সেই মুজিবকেই হত্যা করেছিল একটি চিহ্নিত চক্র। তারা একাত্তরে পরাজয়ের শোধ নিতে চেয়েছিল। আগস্ট মাসটি এলেই নানা বেদনার চিত্র আমার মানসে ফুটে ওঠে। এই মাসটি বাঙালির শোকের মাস। পনেরই আগস্টের সেই কালরাতে যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, তারা চেয়েছিল বাঙালির ইতিহাস পাল্টে দিতে। তারা চেয়েছিল ভেঙে দিতে একটি উন্নয়নশীল জাতির মেরুদ-। আজ চার দশক পর সে প্রশ্নটিই আসে, সেই ষড়যন্ত্রকারীরা কতোটা সফল হয়েছে।
সফল যে তারা হয়নি তা বলা যাবে না। তারা যা চেয়েছিল তার অর্ধেকেরও বেশি তারা পূরণ করতে পেরেছে। হয়তো আরো জঘন্য রূপ নিলে বাংলাদেশ বর্তমান পাকিস্তানের মতো রূপ নিতো। তা নেয়নি। কোনো লাল মসজিদ ট্র্যাজেডি যদিও বাংলাদেশে সংঘটিত হয়নি তবুও ১৭ আগস্টের বোমা হামলার মতো মারাত্মক কাজ তারা করতে পেরেছে বাংলাদেশে। গোটা দেশব্যাপী একযোগে বোমা হামলার মাধ্যমে। আদালত প্রাঙ্গণে বিচারক হত্যার মাধ্যমে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মধ্যমে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে যে পরিবর্তনটি ষড়যন্ত্রকারীরা করতে পেরেছিল, তা কি ঠেকানো যেতো না? আমার বারবার যেন মনে হয় তা ঠেকানোর পথ ছিল। কিন্তু যারা সেদিন সশস্ত্র ক্ষমতাবান ছিলেন তারা ‘রিস্ক’ নিতে চাননি। কেন ‘রিস্ক’ নিলেন না, সে প্রশ্নটি আমি আজো করি। বঙ্গবন্ধু যখন আক্রান্ত হন তখন দেশে একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী বহাল ছিল। সেনা, নৌ, বিমান তিনটি বাহিনীই ছিল জাগ্রত। যারা এই হীন অভ্যুথানের নেতৃত্ব দিয়েছিল এরা ছিল বিপথগামী কিছু সেনা সদস্য। প্রশ্নটি হচ্ছে এই, সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যার পরে হলেও সেনাবাহিনী কেন তাৎক্ষণিক ঐ কতিপয় চক্রান্তকারী সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নিলো না? কেন সেদিনের সেনাবাহিনী প্রধান কে এম সফিউল্লাহ তার বাহিনী নিয়ে জাতির পক্ষে, ষড়যন্ত্রকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন না? যদি তেমনটি হতো তাহলে হয়তো আরো কিছু রক্তপাত হতো। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা পরাজিত হতো। জাতির জনক বেঁচে না থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারী তাজউদ্দিন, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, সামাদ আজাদসহ অন্য নেতারা সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা পেতেন। খন্দকার মুশতাকের মতো নর্দমার কীটদের রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন ভ-ুল হয়ে যেতো। কে এম সফিউল্লাহ যে জবাবই দিন না কেন, তিনি যে ভুলটি করেছিলেন তার মাশুল গোটা জাতিকে দিতে হচ্ছে আজো তিলে তিলে। জাতির এতোই দুর্ভাগ্য, আজ প্রায় চল্লিশ বছর পরও একাত্তরের ঘাতকচক্র এই দেশের সংবিধানকে কটাক্ষ করছে। জাতির জনকের খুনিরা এখনো পালিয়ে আছে বিদেশে।
বিশ্বের কোনো দেশে, কোনো ঐতিহাসিক হত্যাকা-ের বিচারকর্ম বন্ধ কিংবা তা নিয়ে গড়িমসির ঘটনা বোধহয় আর নেই। বাংলাদেশের যিনি স্থপতি, যিনি একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়ার জন্য জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন তার হত্যাকা-ের বিচারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন। তথাকথিত ইনডেমনিটি বিলের নামে হত্যাকা-কে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। জাতীয় শোক দিবস পালনের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একজন মহান নেতার প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধটুকু থাকলে কোনো দল বা নেতা তা করতে পারে? বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির চেয়ে জঘন্য হীনম্মন্যতা বোধহয় আর কিছু নেই। এসব করার পেছনে প্রকারান্তরে একটি কারণ ছিল। আর তা হলো ঘাতকচক্রকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা। সে আশায় আজ যে গুড়েবালি পড়েছে তা হচ্ছে তাদেরই কৃতকর্মের ফল।
শেখ মুজিব এই জাতিকে কী দিতে চেয়েছিলেন? তিনি দিতে চেয়েছিলেন একটি সার্বভৌম চেতনা। আর সেই চেতনা থেকেই পাকিস্তানি আধা-ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দেশ পুনর্গঠনের যথেষ্ট সময় তিনি পাননি। যেকোনো দেশের যেকোনো জাতীয় নেতার মতো মানুষ হিসেবে ও রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ মুজিব ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কোনো নেতার সব রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের শতভাগ মানুষের মনঃপূত হতে পারে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রেও তাঁর বিরুদ্ধবাদী থাকতেই পারে। প্রতিপক্ষ থাকবেই। কিন্তু তাঁকে যারা হত্যা করেছিল, তারা তাঁর শত্রু ছিল না। তারা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের শত্রু।
আমরা জানি, শেখ মুজিব আজীবন লড়াই করেছেন প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে। একজন জাতীয়তাবাদী নেতার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকেই। উপনিবেশবাদবিরোধী জাতীয় নেতাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়েও থাকে বিরুদ্ধ পক্ষ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসে আমাদের ভেবে দেখতে হবে, কেন তিনি জীবন দিলেন। ঘাতকরা কেউই তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। তিনিও ছিলেন না কোনো ঘাতকের শত্রু। দেশে হোক বা দেশের বাইরে হোক, যারা তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের কারো সঙ্গেই বঙ্গবন্ধুর শত্রুতা ছিল না। প্রায় কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেনও না। একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রীয় আদর্শকে হত্যা করার জন্যই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। কারণ তিনি ছিলেন সেই আদর্শের প্রবক্তা। তাঁর হত্যাকা-ের যারা ষড়যন্ত্রকারী তারা জানতো, তাঁকে জীবিত রেখে সেই আদর্শটিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। সুতরাং তিনি জীবন দিয়েছেন তাঁর আদর্শের জন্য, ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে নয়।
খুব স্পষ্ট করেই বলা যায়, এই মাটিই একজন শেখ মুজিব তৈরি করেছিল। পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আগরতলা মামলার সময় থেকে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলার মানুষের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। তিনি ছিলেন তেমন একজন জাতীয় বীর, যাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি কোনো শূন্যতা সৃষ্টি করেনি। বাংলার আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস সবচেয়ে সংকটের সময়। সেই সময়টি তিনি ছিলেন পাকিস্তানি জান্তার হাতে বন্দী। শত্রুর কারাগারে তাঁর বন্দিত্ব বাংলার মানুষকে বিচলিত ও ব্যথিত করলেও তিনিই ছিলেন স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রধান প্রেরণা। তাঁর সহকর্মী ও সহযোগীরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সাধ্যমতো পালন করেছেন, তবে তাঁদের শক্তির উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকতে বঙ্গবন্ধুকে যতোটা অবমূল্যায়ন করতে চাননি, খালেদা জিয়া এবং তার শাসনামলে তা করা হয়েছে বহুগুণে। শেখ মুজিবের সমান্তরালে অন্য কোনো নেতা দাঁড়াবেন কিনা তা মহাকালই বলবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই শেখ মুজিবের জীবদ্দশায় এবং তারও অগ্রজ বেশ কজন নেতা পাকিস্তানি শাসনের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে এসে নতুন রাষ্ট্র গঠনের নেতৃত্বটি দিতে পারেননি। আর পারেননি বলেই শেখ মুজিবকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। এবং তিনি সফলও হয়েছিলেন। আর সে জন্যই তিনি হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। আজ যারা শেখ মুজিবের পাশাপাশি ‘জাতীয় নেতা’র সনদ লাগিয়ে অন্যদের ছবি রাখার কথা বলেন তারা আদৌ বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয় চেয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়।
আমরা লক্ষ করি, জর্জ ওয়াশিংটন কিংবা কামাল আতাতুর্ক কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বা তুরস্কে একজনই। তার সঙ্গে অন্য নেতাদের তুলনামূলক আলোচনায় কখনই যান না সেসব দেশের নাগরিকরা। অথচ বাংলাদেশে শেখ মুজিবের কাতারবন্দী করার জন্য নামের তালিকা শুধু বেড়েই চলেছে। একসময় হয়তো দেরিতে কর দিয়ে অবৈধ অর্থ বৈধ করার নেতানেত্রীরাও শেখ মুজিবের পাশাপাশি আসনে নিজেদের আশ্রয় খুঁজতে উদ্যত হবেন।
কিন্তু তাই বলে কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুছে ফেলা যাবে? না যাবে না। একটি বিষয় সকল চরম ক্রান্তিকালেও প্রমাণিত হয়েছে, যারা প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর চেতনা লালন করেন তারা ভোগবাদী নন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্বল মামলাগুলোতে তার জামিনপ্রাপ্তি এটাও প্রমাণ করছে। তিনি কিংবা তার সহদোরা বঙ্গবন্ধু কন্যা যদি ভোগবাদীই হতেন তবে ধানম-ির ৩২ নম্বরের তাদের একমাত্র বাড়িটি ট্রাস্টে দিয়ে দিতেন না।
বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠের যে অমিত তেজ তা ঢেকে দেয়ার প্রচেষ্টা ’৭৫ সালে করা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। বোমা মেরে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদেরকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে যে জঘন্যতম হামলা করা হয়েছিল, তা ছিল সেই ধারাবাহিকতায়। এরও সুবিচার বাংলার মাটিতে এখন পর্যন্ত হয়নি। এই শোক বহন করেই চলেছে বাংলার মাটি, বাংলার নদীনালা।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সত্য যা তা হলো, তিনি তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের ক্ষমা করেছিলেন, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ বিরুদ্ধবাদীরা তাঁকে ক্ষমা করেনি। মৃত্যুর পরও তারা তাঁর লাশকে ঢেকে দিতে চেয়েছে শীতল অবহেলার কালো চাদরে সেই গ্রামে টুঙ্গিপাড়ায়। তারা তা পেরেছে কি? না পারেনি। তবে তারা নির্বোধ। তারা জানে না, তাঁর লাশ বিস্তৃত বাংলাদেশজুড়ে। তা কোনো মাপের কাপড়ের পক্ষেই ঢেকে দেয়া সম্ভব নয়। তাঁর প্রতিপক্ষ জানে না যে, তাঁর মতো জাতীয় বীরের বিনাশ নেই। এই প্রজন্মের তরুণদের মনে রাখা দরকার, বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পূর্ব দিন পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল তাঁর রাষ্ট্রনীতি। তিনি সব সময় শোষিতের মুক্তি কামনা করেছেন। আজীবন সংগ্রামে যেমন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি; তেমনি স্বাধীন দেশের সমাজকে সব অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত করার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৩ নম্বর দফা ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচিতেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা বলেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আওয়ামী লীগের মাথা কেনার মতো ক্ষমতা পুঁজিপতিদের নেই।’ সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে ১৬ জানুয়ারি তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়াবার চেষ্টা করছে।’ এসব মুনাফাখোর-কালোবাজারি চক্রকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ার করে দেন তিনি। এ সময় তিনি শোষণহীন সমাজ গড়ার জন্য ধৈর্য ধরে কাজ করার কথাও বারবার উল্লেখ করেন।
আমরা এই প্রত্যয় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে লক্ষ করছি, আগস্টের শোক ও বেদনাকে চিত্তে ধারণ করে তারা সোনার বাংলা গড়তেই এগিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের একটি শক্তিশালী বাহুর মতোই মুজিব আবির্ভূত হয়েছিলেন বাঙালি জাতির জন্য। সেই শেখ মুজিব এখন চিরনিদ্রায় শায়িত তার জন্মস্থান সবুজ টুঙ্গিপাড়ায়। তার শয্যাপাশে গিয়ে এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা নিজের শৌর্য, শক্তি এবং রক্তস্রোতেরই সন্ধান করে। কোনো অপশক্তিই এই গতিধারা থামাতে পারবে না। আলোকিত মানুষের জীবনকর্ম, আরেকটি জীবনকে আলোকিত করে। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা হয়েই থাকবেন চিরদিন। বিষয়টি ভাবলে খুবই দুঃখ পাই, বাংলাদেশের রাজনীতিক পরিচয়ধারীরাই হীনস্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে শেখ মুজিবের স্বপ্নগুলোকে নস্যাৎ করতে বিভিন্ন সময় নানাভাবে তৎপর হয়েছেন। এইসব মতলববাজরাও একদিন আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হবেন আগামী প্রজন্মের হাতেই। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগই হবে বাঙালি প্রজন্মের পাথেয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


