somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অজানা অদেখা কোন এক নাজমা বেগম এর সমাধিতে....

২৩ শে অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০১৩ এর এপ্রিল থেকে জুন, বেড়াতে গিয়েছিলেম মার্কিণ মুলুকে। সফরের এক পর্যায়ে পাঁচ দিনের জন্য ফ্লোরিডার নেপলসে, এক বন্ধুর (Half JCC half MCC) বাড়ীতে উঠেছিলাম তার বহুদিনের বকেয়া আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে। সেখানে থাকতেই, ২৭ মে ২০১৩ তারিখে তার এক মিসরীয় বন্ধুর অকস্মাৎ মৃত্যুর খবর আসে। দাফন হবে ‘টাম্পা বে’ এর কাছে, ‘স্কাইওয়ে মেমোরিয়াল গার্ডেন্স’ এর এক সমাধিস্থলে, শ্যামলিমায় ঘেরা নীরব প্রান্তরে।

সেটা ছিল বন্ধুর বাড়ী থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেকের ড্রাইভ। বব গ্রাহাম সানশাইন স্কাইওয়ে ব্রীজের পর আরো কিছুদূর যেতে হয়। সেখানে পৌঁছে দেখি দাফন-পর্ব প্রায় শেষের পথে, মাটি দেওয়া হচ্ছে। মরহুম ব্যক্তি জীবনে নিঃসঙ্গ ছিলেন, বহুদিন ধরে তার অস্ট্রিয়ান স্ত্রীকে তালাক দিয়ে একাই থাকতেন। আর বহুবছর ধরে কাকতালীয়ভাবে আমার বন্ধুটির সাথে শুধু জুম্মার নামাজে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই। প্রথমে এভাবেই তাদের অল্প স্বল্প জানাশোনা, পরে সখ্যতা এবং তারও পরে বন্ধুত্ব, যার ভিত্তি ছিল বছর বছর ধরে তেমন কোন কথাবার্তা ছাড়াই পাশাপাশি দাঁঁড়িয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করা।

নিঝুম নিরিবিলি পরিবেশে আমিও একমুঠো মাটি ছড়িয়ে দিলাম, আর শান্তি কামনা করলাম সেখানে শায়িত সকলের জন্যে। অনতিদূরেই একটি সমাধিফলক নজর কেড়ে নিল। সমাধিফলক না বলে বলা উচিৎ কালো মার্বেল পাথরে উৎকীর্ণ একটি নামফলক, কবরের উপরে সেঁটে দেওয়া। সবুজ ঘাসে প্রায় চাপা পড়া প্রস্তর ফলকে উৎকীর্ণ ছিল সম্ভবতঃ এক বাঙালী মায়ের নাম, ‘নাজমা বেগম – জন্ম মার্চ ২৩, ১৯৩৭ – মৃত্যু অগাস্ট ১১, ২০১১’ (ইংরেজীতে লেখা)। জন্ম-মৃত্যুর তারিখ দেখে ঠাওর করেছিলাম, প্রায় ৭৫ বছর বয়সে এ মায়ের মৃত্যু হয় স্বদেশ থেকে দূরে, বিদেশ বিভুঁইয়ে। সেখানেই রয়ে গেছেন তিনি, চিরতরে।

হয়তোবা তিনি তাঁর কোন সন্তানের ডাকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। হয়তো পরিণত বয়সে রোগাক্রান্ত হয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছিলেন। হয়তো কোন কারণে তাঁর দেহ দেশে পাঠানো সম্ভব হয় নাই। তাই ষোল কোটি বাঙালীর দেশের কবরস্থানগুলোর মত জনারণ্য নয় তাঁর শেষ নিবাস। ভাবছিলাম, তারতম্য কি কিছু হবে তাতে?

সেখানে অন্যান্য আরও অনেক ভিন্ন ধর্মালম্বীদেরও সমাধি ছিল। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যেন এক অনন্য নজির। ধারণা হলো, শুধু কবরস্থান পরিদর্শক আর গোরখোদক ছাড়া সেখানে তেমন কারো যাতায়াত নেই। তাই নাজমা বেগমের কবর দেখে মনটা ব্যথিত হলো। তাঁর নামফলক দীর্ঘ ঘাসের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে দেখে মনে হলো, ব্যস্ততার এই দেশে জীবিত লোকদেরই কেউ খবব্র রাখেনা। মৃত ব্যক্তির কবরে কেই বা আসবে দু’দন্ড মৌন সময় কাটাতে! বড় হওয়া ঘাসগুলো কেটে রাখতে! হয়তোবা কেউ কখনো আসেনি, আর আসবেও না।

ব্যথিত হৃদয়ে তার প্রায় ঢাকা পরে যাওয়া কবরের ফলক থেকে কিছু ঘাস উপড়ে দিলাম, একটু পরিস্কার করে দিলাম। আর তার জন্য রেখে এলাম নীরব কিছু আকুতিভরা প্রার্থনা।

(ইতোপূর্বে ফেইসবুক ও অন্য একটি ব্লগে প্রকাশিত)


নেপলস, ফ্লোরিডা
মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র
৩১ মে ২০১৩
(সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত)

নাজমা বেগম এর সমাধি থেকে ঘাস পরিস্কার করে লেখক ছবি তুলছেন। লেখকের আবছায়া ছবিতে প্রতিভাত।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সকল ধর্মালম্বী শান্তিতে একত্রে। কোন সংঘাত নেই, কোন দ্বন্দ্ব নেই।

মরহুমের তালাকপ্রাপ্তা অস্ট্রিয়ান স্ত্রী তার নাবালিকা দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন নিথর দেহকে শেষ বিদায় জানাতে।

মাটি হতে সৃষ্ট, মাটিতে বিলীন। ধরিত্রী মাতার গর্ভে, একসাথে।

(ইতোপূর্বে প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫৫
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবৈধ উপার্জনের সুযোগ ও উৎস বন্ধ করুন - মদ, জুয়া, পতিতাবৃত্তি এমনিতেই কমে যাবে ।

লিখেছেন স্বামী বিশুদ্ধানন্দ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:২৯

দুর্নীতিই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা | আমরা যেমন অক্সিজেনের মধ্যে বসবাস করি বলে এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি না, আমাদের গোটা জাতি এই চরম দুর্নীতির মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রয়েছে বিধায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রভাতী প্রার্থনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৫


প্রভাত বেলার নব রবি কিরণে ঘুচুক আঁধারের যত পাপ ও কালো ,
অনাচার পঙ্কিলতা দূর হোক সব ,ভালোত্ব যত ছড়াক আলো ।

আঁধার রাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৫: যবনিকা পর্ব

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৪১

এর আগের পর্বটিঃ আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৪: বেলা শেষের গান


শ্রীনগর বিমান বন্দর টার্মিনালের মেঝেতে বিচরণরত একটি শালিক পাখি

টার্মিনাল ভবনের প্রবেশ ফটকে এসে দেখলাম, তখনো সময় হয়নি বলে নিরাপত্তা প্রহরীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মপক্ষ সমর্থন

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৫৯



আর কিছুদিন পর সামুতে আমার রেজিস্ট্রেশনের ৮ বছর পূর্ণ হবে।রেজিস্ট্রেশনের আগে সামুতে আমার বিচরণ ছিল। এই পোস্ট সেই পোস্ট দেখে বেড়াতাম। মন্তব্য গুলো মনোযোগ সহকারে পড়তাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালোটাকা দেশে বিপুল পরিমাণে বেকারত্বের সৃষ্টি করছে

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:০৫



কালোটাকা হলো, দেশের উৎপাদনমুখী সেক্টর ও বাজার থেকে সরানো মুদ্রা; কালোটাকা অসৎ মালিকের হাতে পড়ে স্হবির কোন সেক্টরে প্রবেশ করে, কিংবা ক্যাশ হিসেবে সিন্ধুকে আটকা পড়ে, অথবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×