somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার কথা -৩১

২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"আমার কথা -৩০" পড়তে হলে এখানে ক্লিক করুনঃ আমার কথা -৩০

কলেজ হাসপাতালে কয়েকদিনঃ
সেই সপ্তম শ্রেণীতে প্রথম টার্মেই গণজ্বরে ভোগার পর আল্লাহ’র রহমতে আমার আর কোনদিন তেমন অসুখ বিসুখ হয় নাই। বন্ধু বান্ধব কিংবা ছোট বড় কেউ কেউ মাঝে মাঝে হাসপাতালে কয়েকটা দিন থেকে এসে খবর দিত, সেখানে থাকতে তাদের খুব ভালো লেগেছে। ওদের কথা শুনে মনে মনে খুব ইচ্ছে হতো, কয়েকটা দিন আমিও যদি হাসপাতালে থেকে আসতে পারতাম! শীঘ্রই সে সুযোগও এসে গেলো। একদিন সন্ধ্যায় গলাব্যথা অনুভব করলাম। তখন নতুন বিল্ডিং এ হাসপাতাল চালু হয়েছে এবং মেডিকেল অফিসার হিসেবে ডাঃ হাফিজুল হাসান যোগদান করেছেন। তিনি সাধারণতঃ টনসিলের ব্যথা হলে “ওরাসিন কে” (মাইল্ড এন্টিবায়োটিক) আর কিছু প্যারাসিটামল টাইপের (তখন নাম ছিলো নভালজিন) ট্যাবলেট দিয়ে তিন দিনের বিশ্রাম (এ্যটেন্ড ‘সি) দিতেন। পরদিন সকালে আমি যখন তাঁর কাছে রিপোর্ট করলাম, তিনি খুব ভাল করে আমার মুখের ভেতরে টর্চ লাইটের আলো ফেলে পরীক্ষা করে বললেন, আমাকে ইনজেকশন নিতে হবে আর হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। শুনে আমি তো মহা খুশী! হাউসে ফিরে এসে কিছু টয়লেট্রী আর লুকিয়ে আনা কিছু গল্পের বই নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে এলাম। আসার সাথে সাথেই প্রথম ইনজেকশনটা আর এন্টি বায়োটিকের ডোজ শুরু হলো। ততক্ষণে জ্বর অনেক বেড়ে গেছে। হাসপাতালে থাকার অন্যতম আকর্ষণ ছিলো কিছুটা উন্নত মানের খাবার আর অঢেল অবসর। কোন প্যারেড পিটি নেই, কোন হোমওয়ার্ক নেই, কোন প্রেপ আওয়ার (বাধ্যতামূলক ঘন্টা ধরে বই খুলে পড়াশুনা করা বা পড়ার ভান করা) নেই। সেখানে এক ধরণের হাল্কা স্যুপ দিত, যা জ্বরের মুখে খুব ভাল লেগেছিলো। হাসপাতালের চারপাশে প্রচুর গুইসাপের আনাগোনা ছিলো। ওগুলো অনেকটা পোষ মানার মত হয়ে গিয়েছিলো, কাউকে ভয় পেত না। নীল, হলুদ বর্ণের অনেক পাখি গাছে গাছে ওড়াওড়ি করতো। দুপুর থেকে সারাটা বিকেল আমি জানালায় বসে বসে এসব দেখতাম আর গল্পের বই পড়তাম। তখনই জীবনের প্রথম ডায়েরি লেখা শুরু করলাম, কারণ লেখার নিশ্চিত নিরাপত্তা ছিল। সারাদিন বলতে গেলে প্রায় একাই থাকি, শুধু ঔষধ পত্র আর পথ্য খাবার সময় হলে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ডাকাডাকি করতো। এ ছাড়া আমি কী লিখছি বা না লিখছি, তা নিয়ে উঁকিঝুঁকি করার মত কেউ ছিলনা। ডর্মে লিখতে পারতাম না বন্ধুদের জ্বালায়। তা ছাড়াও হাউস টিউটর এর ভয়ও তো ছিলই। কবিতাও লিখেছিলাম কয়েকটা, যার একটা একজনকে পাঠিয়েছিলাম এবং সে সেটা খুব এপ্রিশিয়েট করেছিলো। এভাবেই পাঁচ পাঁচটা দিন হাসপাতালে খুব সুখে শান্তিতে কাটিয়ে অবশেষে নিজ ডেরায় ফিরে এসেছিলাম।

সনাক্তকরণ চিহ্নঃ
কলেজে লক্ষ্য করেছিলাম, কালবোশেখীর সময় প্রথম প্রথম বিকেলের দিকে ঝড় ঝঞ্ঝা শুরু হতো। এতে আমাদের বিকেলের খেলাধুলা সব পন্ড হয়ে যেতো। দিনে দিনে ঝড় ওঠার সময়টা একটু একটু করে পিছিয়ে যেতো। একদিন সন্ধ্যায় ব্যাপক ঝড় বাদল শুরু হলো। বিদ্যুত নিমেষে চলে গেলো। পরের দিন একটা পরীক্ষা ছিলো, তাই আমরা মোমবাতি জ্বালিয়ে নিজেরাই সুবোধ বালকের মত পড়তে বসে গেলাম। খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছিলাম। ডিনারের সময় ঘনিয়ে আসছিলো। সাধারণতঃ এরকম সময়টাতে হাউস মাস্টার হাউস টিউটরদের নজরদারি একটু শিথিল হয়ে আসে। আমার এক রুমমেট আমার টেবিলে এসে মোমের আগুনে মূলতঃ টিন দিয়ে তৈরী একটা শু হর্ণ অনেকক্ষণ ধরে গরম করছিলো। আমি পড়ায় গভীর মনোনিবেশ করেছিলাম, তাই তার কার্যকলাপের প্রতি ততটা খেয়াল ছিলনা। হঠাৎ সেই বন্ধুটি দুষ্টুমি করে আমার একটা হাত টেনে সেই তপ্ত শু হর্ণটি আমার হাতে চেপে ধরে। আমি তীব্র চিৎকার করে উঠি। সাথে সাথে সবাই আমার টেবিলের দিকে ছুটে আসে। গরম টিনের পাত যে জায়গাটায় চেপে ধরেছিলো, সেখানকার চামড়া উঠে যায়। খবর পেয়ে একটু পরে হাউস টিউটর যতক্ষণে এলেন, ততক্ষণে ব্যথা কিছুটা সহ্য হয়ে গেছে। তাঁকে কী বলা হবে তা সবাই মিলে আগেই সাব্যস্ত করে রেখেছিলাম।

তাঁকে তাই বলা হলো, অর্থাৎ অসাবধানতা বশতঃ জ্বলন্ত মমবাতি আমার হাতে পড়ে গিয়েছে। তিনি এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করলেন না, আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তিনি দেখতেও চাইলেন না, কোথায় ‘জ্বলন্ত মোমবাতি পড়ে গিয়েছিলো’, বরং যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “এটুকুতেই এত জোরে চীৎকার করতে হয়?” রাতেই বিদ্যুতবিহীন পথে হাসপাতালে হেঁটে গিয়ে হাতটা ড্রেসিং করে এনেছিলাম। ড্রেসিং করার সময় যখন সেখানে টিংচার আয়োডিন লাগায় তখন অসহ্য ব্যথা হয়েছিলো। পরবর্তীতে হাতটা আমাকে বেশ ভুগিয়েছিলো। ঠিকমত পরিচর্যা না হওয়ায় ক্ষতটা পেকে গিয়েছিলো। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অবশেষে সেটা ঠিক হয়ে আসে, কিন্তু জীবনের জন্য একটা কাজ সহজ করে দিয়ে যায়। সেটা হলো, সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া সহ জীবনে যেখানে যত জায়গায় কোন ফর্ম পূরন করেছি, “সনাক্তকরণ চিহ্ন” পূরণ করার সময় বেশী খোঁজাখুঁজি করতে হয়নি। চট করে লিখে দিয়েছি, “বাম হাতে পোড়া দাগ”। বলা বাহুল্য, দাগটি আজ অবধি বিদ্যমান। আর আমার সেই বন্ধুটি, যে আমার অন্যতম বেস্ট ফ্রেন্ডও ছিলো, কিছুকাল আগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে গিয়েছেন এবং আমরা আজও খুব ভাল বন্ধু।

ঢাকা
৩১ জানুয়ারী ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৬
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড় চূড়ায়

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫০

পাহাড় চূড়ায়
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

সে এখন পাহাড় চূড়ায়
স্বপ্ন ছোঁয়া বিজয়ী!
চোখে দেখা প্রথম উল্লসিত
একটি পণ্য বিক্রয় করে হাজার টাকা-
লাভ করে কী যে খুশি!
কিন্তু এখন তার মাসে আয় কোটি
তবুও সে হয় না তৃপ্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান ওয়ার্ল্ড কাপ বয়কট করে নাই কারণ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:০৩


সেখানে একজন আসিফ নজরুল ছিলেন না, আমিনুল ইসলাম বুলবুল ছিলেন না! পুরো বিশ্বজুড়ে এখন ফুটবলের উন্মাদনা। যে সব দেশ মাঠে লড়ছে আর যারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি উত্তেজনা সবখানেই সমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×