আমার খুব ভালোবাসার ইচ্ছে। মনেপ্রাণে প্রস্তুত। বই ঘেঁটে কিছু সুমধুর বাক্যও মুখস্ত করেছি। শুধু ভালোবাসার মানুষটা ঠিক করা বাকী। অবস্থা এমন, কাউকে পেলেই হয়। মনপ্রাণ দিয়ে তাকে ভালোবাসবো। তার প্রেমে হাবুডুবু খাবো এবং বুকের ভেতরটা তাকে চিরতরে দলিল করে দিয়ে দেবো। পৌরুষের প্রশ্নটা বাধা না দিলে তার কেনা গোলাম হয়ে থাকার কথাটাও দলিলে লিখে দিতাম। কিন্তু ভালোবাসাটাই ধরা দিচ্ছেনা।
সব খবর জেনে এক বন্ধু আমার শুভাকাঙ্খীর খাতায় নাম লেখালেন। শুনতে পাই, তিনি নাকি ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে হালে তার সমস্ত ভালোবাসা মদ গাঁজার জন্য বরাদ্দ করেছেন। উপরি হিসাবে নিজের শরীরের যত্ন করার কথা বেমালুম বিস্মৃত হয়েছেন। সেই তিনি আমাকে সবদিক ভেবেচিন্তে ভালোবাসার উপদেশ দিয়েছেন। আবেগের ঠ্যালায় হুট করে ভালোবাসলে কি হয় তা নিজেকে দেখিয়ে নগদ উদাহরণ দিলেন।
এদিকে ভালোবাসা এবং ব্যর্থতা এ দুটো শব্দের মাঝখানে পড়ে আমার অবস্থা অবর্ণনীয়। মনের মধ্যে ভালোবাসার প্রবল ইচ্ছে, তার পাশেই চুপচাপ ব্যর্থতার ভয়টা বসে আছে। না পারি ভালোবাসতে, না পারি ভালোসার কথা ভুলতে। শেষে একদিন ঠিক করলাম, ভালোবাসা কি বস্তু সে তত্ত্ব আগে উদ্ধার করি। তারপর না হয় ভালোবাসবো। সময় তো আর ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। পড়াশোনাটাও শেষ হোক।
তাছাড়া গুরুজনরা বলেছেন, ছাত্রদের ভালোবাসাবাসির আঙ্গিনা না মাড়ানোই উচিৎ। তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হয়, ভবিষ্যৎ একেবারে ঝরঝরে হয়ে যায়। যার ডাক্তার হবার স্বপ্ন তাকে আইনের বই বগলদাবা করে বাসা-আদালত করতে হয়, যার ইন্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন তাকে ঠিকাদারীর দিগদারী সইতে হয়।
ছাত্রদের যু্ক্তিও ফেলনা নয়। গোলমালে পড়ে,পরীক্ষা পিছিয়ে চার বছরের কোর্স সাত বছর গিলে নেয়। এম.এ. পাশ করতেই দু/চার বছর কারচুপি করা বয়সটাও তিরিশ ছুঁয়ে বসে থাকে। বাঙালীদের গড় বয়সও নাকি বেশী নয়। তার ওপর কুড়িতে বুড়ী হতে পারলে বুড়া হতেও বাধা কই ? তাই কোনমতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদানিতে পা দিতে না দিতে ভালোবাসার সাম্পানের গলুই ধরে টানাটানি শুরু করে সবাই। ভালোবাসার লোনা স্বাদের লোভে লালায়িত হয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ে কেউ কেউ নাকি হাইস্কুলে ঢুকেই সহপাঠিনীদের ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে পড়ছে। পাছে আমেরিকা রাশিয়ার পারমানবিক বোমার আঘাতে প্রেমামৃতের স্বাদ পাবার আগেই তার মানবিক জীবন ফুরিয়ে যায় !
আমি তো কলেজে উঠে গেছি। তাই হাইস্কুল পার্টির চেয়ে লায়েক আছি। আমার তো ভালোবাসায় ডুবে যাবার পুরা হক বিদ্যমান। এসব তাজা তাজা ভাবনা বুকে পুষে কলেজ-বাসা করছিলাম। আর পাড়ায় পাড়ায় ভালোবাসার সন্ধানে চন্দ্রাভিযান করছিলাম।
একদিন কলেজের মাঠের পাশে কদমগাছের তলে বসে ভালোবাসার কথা ভাবছিলাম। মনের ভেতর সুর-
প্রাণ সখি রে , ওই শোন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে......
বারবার মনে হচ্ছিলো, ভালোবাসা কি মানুষের হৃদয়ের ভেতরে চুপিচুপি লুকিয়ে থাকে ? কিছু হলেই বুকের ভেতরটা চিন্ চিন্ করে কেন ? একদিন বুক চিরে একটা ছবি তুলে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। ডাক্তার ক্যামেরাম্যানকে দেখিয়ে দিলে চট করে ছবি তুলে নেবেন। সে ছবি নিজে দেখতাম, বন্ধুদেরও দেখাতাম।
এমন সময় এক সহপাঠী এসে দশ টাকা ধার চাইলো। জানতে চাইলাম, কি ব্যাপার ?
বিরক্ত হয়ে বললো, কথা পরে বলবো। সিনেমা শুরু হয়ে যাচ্ছে। দেরী হলে ডার্লিং রাগ করবে। শুনেই মনের ভেতর খুশীর ঢেউ জাগলো। এদের ভেতর নিশ্চয়ই ভালোবাসাবাসির ব্যাপার আছে। দশ টাকার জন্য এমন গুরু পাবার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার কোন মানে হয় না। তাই দশ টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে সুযোগটা নিলাম।
কিন্তু পোড়াকপাল আমার। একটু পর দেখি সহপাঠী মুখ হাঁড়ি করে ফিরে এলো। সিনেমার দুটো টিকেট আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, শালা ! প্রথমে ভড়কে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরতে হাঁফ ছাড়লাম। আমার সাকুল্যে দুটি বোন। একটি স্বামীর বাড়ীতে আরেকটি মায়ের কোলে। আপাতত: রক্ষা ! জানা গেলো ওনার ডার্লিং ওনার দেরী দেখে আরেক জনের সাথে সিনেমায় ঢুকে গেছেন। এর পরের পর্ব নাকি চীনা রেস্তোরাঁয়। তার তিরিশটা টাকাই মাটি !
এমন সময় দেখি প্যাঁচামুখো এক সহপাঠিনী আসছেন। কাছে আসতেই ভালোমানুষী গলায় বললাম, কি ব্যাপার ? মন খারাপ মনে হচ্ছে !
ছ্যাঁৎ করে জ্বলে উঠে বললো, হাসানকে দেখলে বলবে সিনেমা দেখার পয়সা আমারো আছে। আরো বলবে, ভালোবাসি বলে তার প্রতারণা সইতে হবে এমন দিব্যি আমায় কেউ দেয়নি।
- সেরেছে ! যতো মড়া দেখি সব জুটছে আমার কপালে ! হাসান বেচারা বোধহয় পয়সা ম্যানেজ করতে পারেনি। একটু ঠাণ্ডা হবার পর জানতে চাইলাম, তোমাদের কি সানফ্লাওয়ার দেখার কথা ছিলো ?
হাঁড়িমুখ নেড়ে জানালো, হ্যাঁ।
- তা হলে এক কাজ করো, এর কাছে দুটি টিকেট আছে। সাথে যাবার কেউ নেই। আপত্তি না থাকলে ওর সাথে যেতে পারো। ক্লাস থেকে যেহেতু কাট মেরেছো সময়টা বাজে খরচের কাজ কি ? ( বিদ্যাসাগর যতোই বলুন, সদা সত্য কথা বলিও। এখানে ও তত্ত্ব মাঠে মারা যাবে। আসল ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গেলুম।)
কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো। তারপর মুচকি হেসে লক্ষী মেয়ের মতো বললো, কই, চলো।
ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবলাম, ভালোবাসা আসলে কি ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

