somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চুলার গল্প

০২ রা জুলাই, ২০০৭ রাত ১১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বউয়ের শরীরের ত্বক যথেষ্ট স্পর্শকাতর। তাপ কিংবা রোদ কোনটাই সহ্য করতে পারে না। এলার্জি হয়। কলেজ থেকে বা মার্কেটিং করে ফিরলে সোজা শোবার ঘরে। ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নিতেই হবে। উপায় নেই। শরীরকে বিশ্রাম না দিলে যে কোন সময় বিগড়ে যেতে পারে। সারাদিন কলেজ সামলে বাসায় ফিরে রান্নাঘর সামলাতে বিরক্ত লাগে। ধকলটাওতো কম নয়। ছুটির দিনগুলোর কথা আলাদা। তখন নিজের পছন্দসই রান্নাগুলো করতে সাধ হয়। অনেক রকম রান্না তার জানা আছে। বিশেষতঃ তার হাতের আচারের তো কোন তুলনাই হয় না। আমার আর ছেলেদের কথা মনে করে রান্নার এই ঝামেলাটুকু পোহাতে তার মন্দ লাগেনা।

রান্না শেষে বউ প্রায়শই আমাকে অভিমান করে বলে, গ্যাসের চুলার তাপে তার শ্যামলা বরণ গায়ের রঙ ছাই বরণ হয়ে যাচ্ছে। ত্বকের ক্ষতি হচ্ছে। হতেই পারে। আদরে মানুষ। বিয়ের আগে কখনও রান্না করতে হয়নি। চার পাঁচটা আয়া দাসী নিয়মিত সেবা করে গ্যাছে। রান্না ঘরের এক্সষ্ট ফ্যানটা নাকি মোটেও কাজ করেনা। হবে হয়তো। এই রান্না ঘরে আমাকেও মাঝে মধ্যে রান্না করতে হয়। না বাধ্য হয়ে নয়, শখ করে রান্না করি। আমি রান্না করতে পছন্দ করি। কখনও বাসায় কোন অনুষ্ঠান থাকলে নিজেই আগ্রহ নিয়ে রান্না করি। তবে বউয়ের যেটা হয় আমার নিজের সেটা হয় না। অর্থাত্ ত্বকের জ্বালাপোড়া বা এলার্জি। নিজ গাত্রের এহেন বর্ণ বৈষম্য চোখে না পড়ায় মনে মনে আমি ভীষণ খুশী। এমনও হতে পারে নিজে পুরুষ বলেই হয়তো সেটা নজরে পড়ে না। তার মানে এই নয় যে আমি নিজের প্রতি উদাসীন। কারন- অফিসে, বাইরে ও বন্ধু মহলে আমি যথেষ্ট স্মার্ট বলে সুখ্যাতি আছে।

আমার মা কিন্তু রীতিমত ফর্সা ও সুন্দরী এক মহিলা। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও সেইকালে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা মন্দির স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। পাশ করার কিছুকাল পরেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় লেখাপড়া আর এগোয়নি। প্রয়োজন ছিল না। বাবার দেশ ছিল সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ শহরে বাবার ছিল ছোট্ট একটা লাইব্রেরী। বই বেচাকেনা করতেন। ঢাকার ইসলামপুরে নানার ছিল নিজস্ব প্রকাশনা কোম্পানী। বাবার সাথে নানার যোগাযোগটা বইয়ের ব্যবসার সুবাদে। বিয়ের কিছুকাল পর বাবা সিরাজগঞ্জের ব্যবসার ভার ছোট চাচার হাতে ছেড়ে রাজশাহী শহরে চলে আসেন। শুরু করেন নতুন ব্যবসা। লাইব্রেরীর সাথে প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা।

মোঃ আব্দুল মইজ্জ তখন রাজশাহী লোকনাথ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তারঁ নিজস্ব একটা ছাপাখানা ছিল। সেটা বাবা কিনে নেন। সেই থেকে বাবা মাকে নিয়ে দীর্ঘকাল ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে সিরাজগঞ্জের ব্যবসা গুটিয়ে ছোট চাচা, চাচীকে সাথে নিয়ে রাজশাহী চলে আসেন। বাবা-মা, চাচা-চাচী যৌথ পরিবারের একটা ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন দীর্ঘকাল পর্যন্ত। আমি কলেজ জীবন শেষ করা অব্দি বাবা-মা, চাচা-চাচী এবং আমরা চাচাতো ভাইবোনরা এক বাসাতেই থাকতাম। ততদিনে আর ভাড়া বাসায় নয়, বাবার পরিশ্রমে গড়া নিজের বাড়ীতে। তখন খড়ির চুলাতেই রান্না হতো সবকিছু। পরিবারের সবার রান্না একসাথে।

সেই মা আমার খড়ির (লাকড়ি) চুলায় রান্না করতেন চাচীকে সাথে নিয়ে। খড়ির যোগান হতো আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল, বরই, শাল গাছের লাকড়ি থেকে। কখনো গাছ কেনা হতো। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গাছ কেটে লাকড়ি করে দিত কাঠুরীয়ারা। গরুর গাড়ী ভর্তি করে এইসব লাকড়ি বা চেড়াই করা কাঠ বিক্রি হতো। আমি ও আমার চাচাতো ভাই প্রতিদিন ভোরে কুড়াল নিয়ে কাঠ চিড়তাম। এটা ছিল আমাদের প্রাত্যহিক ব্যয়াম। বেশ মজা পেতাম। এই লাকড়ি রোদে শুকাতে হতো। কাঁচা খড়ি জ্বলতো না ভাল। ভীষণ ধোঁয়া হতো। চুলার ধোঁয়ায় সবারই চোখ জ্বলতো। বিশেষ করে বর্ষাকালে চুলায় রান্না করা ছিল ভীষণ বিরক্তিকর। চুলা জ্বলতে চাইতো না। কেরোসিন ঢেলে তবেই জ্বালানো যেত। মা-চাচীকে দেখতাম ফুকনী দিয়ে চুলায় ফু দিতে। যে করেই হোক লাকড়ি জ্বলতেই হবে। নইলে রান্না বন্ধ।

মা আমার বাবাকে কখনও এক্সষ্ট ফ্যানের কথা বলেননি। তাঁর অমন সুন্দর ফর্সা ত্বক কালো হচ্ছে কিনা খেয়াল করেননি। তাঁর মুখে কখনো কোন আক্ষেপের কথা ছিল না। মা আমার চিরকাল ঠিক তেমনি ফর্সা রয়ে গেছেন। চুলোর আঁচ তাকে এতোটুকু কালো করতে পারেনি। পারেনি কারন, তিনি নিজের কথা কখনই ভাবতেন না। পরিবারের কথাই ভাবতেন বেশী। চাচা-চাচী তার পরিবার নিয়ে বহু বছর আগেই আলাদা হয়ে গেছেন। থাকেন অন্য এক শহরে। রাজশাহী শহরে বাবার গড়া সেই বাসায় এখন সিলিন্ডারযুক্ত গ্যাসের চুলা জ্বলে। সাথে খড়ির চুলা এখনো তেমনি আছে উঠোনের এক কোণে। সেই চুলা আজও জ্বলে। সেই চুলায় এখনো আগের মতই খড়ি পোড়ে। আমরা সবাই যখন প্রতি ঈদে বাড়ী যাই সেই চুলা জ্বলজ্বল করে জ্বলে। আমরা সবাই তাকিয়ে দেখি। পুরোনো কাজের লোক মকবুলকে সাথে নিয়ে মা সেই চুলাতেই রান্না করেন। ধোঁয়া হয় সেই আগের মতই। তবে চোখে আর জল আসেনা। কসানো মাংশের রসনা তৃপ্ত করা গন্ধে শুধু জিভে জল আসে।


সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০০৭ রাত ১২:০৫
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×