প্রিয় বান্ধবী - ৬ (শেষ পর্ব)
১৪ ফেব্রুয়ারী। ১৯৯৫। ভ্যালেন্টাইনস্ ডে। সকালে ডর্ম-এ আমার দবজার সামনে রাশি রাশি ফুল আর ফুলের তোড়া। আমিতো দেখে অবাক। পুরো ডর্মের অন্য সব ছেলেদের চোখও ছানাবড়া। মেয়েরা ছেলেদের এতো এতো ফুল দিতে পারে কারও বিশ্বাস হয়নি। ছেলেরাই উল্টো ফুল কিনে কিনে রেখে এসেছে বিভিন্ন মেয়েদের ডর্মের দরজায় দরজায়। ফুলের সাথে নানা রঙের হাতে লেখা চিরকুট আর তাতে লেখা প্রেমময় সব চটুল বাক্য। অনেক চিরকুটে রঙীন কালিতে ছোট বড় হৃদয়ের ছবি আঁকা। কেউ কোন প্রতিদান বা প্রতি উত্তরের কথা না ভেবেই এই সব ফুল আর চিরকুট পাঠিয়েছে। প্রেম বা ভালবাসার ব্যাপারে চিরকালই মেয়েদের প্রকাশ একটু কম বলেই জানি। এখানেও তার কোন ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। অথচ মেয়েদের প্রতি ছেলেদের টান বা আকর্ষণ সবসময়ই একই রকম, একটু বেশীই বলা যায়।
ভ্যালেন্টাইনস্ ডে তে সেটা খুব ভালভাবেই প্রত্যক্ষ করলাম। আমি নিজেই তার প্রমান। রাত আনুমানিক ২টা থেকে আমি আমার সব বন্ধু ও বান্ধবীদের দরজার কড়ায় একটা করে প্রায় ৩০/৪০টা সাদা গোলাপ রেখে আসলাম। সাথে চিরকুট। সবাইকে বন্ধুত্বের শুভেচ্ছা জানাতে পের মনটা ভাল লাগছিল। অথচ ভোরে ঘুম থেকে উঠেই আমার দরজার সামনে এতোসব ফুল দেখে আমি নিজেই বিষ্ময়ে হতবাক। ভালবাসার এমন অর্ঘ্য সবার কপালে জোটে না। আমার জুটেছিল। আমি ধন্য। ধন্য আমার ভালবাসা। দিতে জানলে ভালবাসা ফেরত আসে বহুগুন হয়ে। তাই ভালবাসা দিতে কখনও কার্পন্য করি না। কারো ব্যাপারেই না। কেউ তেমন করে ভাল না বাসলেও না। ভ্যালেন্টাইনস্ ডে উপলক্ষ্যে আমার প্রিয় সব বন্ধু-বান্ধবীরা আমাকে ভালবাসা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা করে গোলাপ পাঠিয়েছিল। কিন্তু ফুলের তোড়ার সাথে বিভিন্ন রঙের একরাশ সাজানো ফুলের সাথে কোন চিরকুট নেই। কে পাঠিয়েছে কিছুই লেখা নেই। তবে খুব যত্ন আর সুন্দর করে ফুলগুলো সাজানো। তাতে রয়েছে বেশ কিছু গোলাপ, বিভিন্ন রঙের অর্কিড সাথে কিছু আকর্ষণীয় অন্যান্য ফুল। ফুলগুলো দেখে মনটা ভরে গেল। আমার পড়ার টেবিলের পাশে যত্ন করে রেখে দিলাম।
সেদিন রাতে ডিনার শেষে বউকে ফোন করলাম। আমার এক ভায়রা সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা। পাইলটদের সাথে খুব খাতির। হয়তো কোন পাইলটের মাধ্যমে আমার বউ তার দুলাভাইকে দিয়ে আমার জন্য ফুল পাঠিয়েছে কি না সেটাই মনে হলো। ফোনে বউকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কী আমাকে কোন ফুল পাঠিয়েছো"? বউ উত্তরে বললো, "তুমি নিজেইতো বলো ব্যাংকক শহরটা ফুলের শহর। কত ফুল চারিদিকে। তোমার ক্যাম্পাসটাও নাকি ফুলে ফুল সাজানো। চরিদিকে শুধু ফুল আর ফুল। এতো ফুলের মধ্যে যার বসবাস তাকে ঢাকা থেকে ফুল পাঠানোর কোন মানে হয়? আমি তোমাকে ফুল পাঠাইনি। ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখো, তোমার কোন প্রিয় বান্ধবী হয়তো তোমাকে ফুল পাঠিয়েছে। তোমাকেতো ফুল দেবার লোকের অভাব নেই। কেউ হয়তো আমার হয়ে তোমাকে ফুল দিয়ে গ্যাছে"।
আমি তো অবাক! তাকিয়ে দেখি ক্যাম্পাসে শত শত ফুল ফুটে আছে। আমি নিজেই সকাল থেকে ফুলের মধ্যে আছি। বউ ফুল পাঠায়নি শুনে একটু অবাক হলাম। রাতে ডিনারে ওয়েন্ডির সাথে দেখা। সারাদিন কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করলাম। বললো বাইরে একটু কাজ ছিল শেষ করলাম। ওয়েন্ডি পাল্টা প্রশ্ন করলো, "ফুলগুলো কেমন ছিল? তোমার পছন্দ হয়েছে? আমার ততক্ষণে সবকিছু বোঝা সারা। কে ফুল পাঠিয়েছে জেনে গেলাম। ওয়েন্ডি বলতে লাগলো, তোমার বউ মনে হয় তোমাকে খুব মিস করছে। বেচারা! এমন দিনে তারওতো সাধ হয় তোমাকে কাছে পাবার। চল, আজ রাতে তুমি আমি দূরে কোথাও গিয়ে খাব। সন্ধ্যায় আমার ওখানে চলে এসো। ডিনারটা তোমার বউয়ের পক্ষ থেকে আমি খাওয়াবো। দেশে ফিরে ডিনারের বিলটা তোমার বউয়ের হাতে ধরিয়ে দিও। আর হ্যাঁ, বলবে ওর হয়ে খাওয়াটা শুধু আমি খেয়েছি বাকি সব কিছু তার জন্য ঠিক তেমনি রেখে দিয়েছি এযমন ছিল"।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথাগুলো শুনে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম ওকে ভাল করে। বিষ্মিত হলাম এই ভেবে মানুষের মন কত উদার আর কত ভাল হতে পারে। ওয়েন্ডি চাইনীজ মেয়ে, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী, স্কার্ট টি-সার্ট পড়ে অভ্যস্ত। অথচ মনে প্রাণে আমাদের মুসলমান মেয়েদের চেযেও অনেক বেশী রক্ষণশীল, অনেক বেশী সংবেদনশীল মনে হলো। সে আমাকে কোন নারীকে নয়, মানুষকে ভালবাসতে শেখালো। তার মনুষত্বের সামনে আমি নিজেই মানুষ হয়ে থেকে গেলাম। কেউ মানুষ হয়ে গেলে তার পুরুষবোধটা মনে হয় এভাবেই হারিয়ে যায়। আমার চোখে ওয়েন্ডি কখনই এতজন প্রকৃত বন্ধু ছাড়া নারী হয়ে উঠতে পারিনি। ডিনার শেষে আমরা ক্যাম্পাসে যখন ফিরলাম তখন একটা দিনের শেষ। রাতের বাকিটা সময় নিজের চাওয়া পাওয়া আর খুশীর হিসেব মিলাতেই ভোর হয়ে গেল। সকালে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মনটা অজানা এক খুশীতে ভরে উঠলো। আমার বউয়ের পক্ষ থেকে আমার প্রিয় বান্ধবী আমাকে এতগুলো চমত্কার ফুল উপহার দিয়েছে। ওয়েন্ডি, আমার প্রিয় বান্ধবী- তোমার মত মেয়েকে কি আমি কখনও ভুলতে পারি?
[আমার প্রিয় ব্লগার আনোয়ার সাদাত শিমুল-এর অনুরোধে এই লেখাটা পুনর্বার পোষ্ট পোষ্ট করলাম। আপনাদের ভাল লাগলেই আমার এই লেখার সার্থকতা]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০০৭ সকাল ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




