আমাদের সময়
বাইরে প্রচন্ড রোদ। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই করছে। সূর্যটা তখনো পূবের রাস্তায়। রোদের আঁচ বাসের জানালা গলে নিশ্চিন্তে বাসে বসা মানুষগুলোকে তাতাচ্ছে। বাসের পেছনের দিকের সিটে বসা দুজন তরুণ-তরুণী। দুজনেই স্মার্ট ও সুদর্শন। তরুণী বসেছে জানালার ধারে। স্বভাবতই সূর্যের কড়া রোদ তার গাল বেয়ে ঘাম হয়ে ঝরে যাচ্ছে। তাদের দুজনকে দেখে সদ্য বিবাহিত দম্পতি মনে হতে পারে- না’ও হতে পারে। দুজনের বাগদান সম্পন্ন হয়েছে এমনও হতে পারে। দুজনকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাবা যেতে পারে- না’ও পারে। দুজনকে নিকট আত্মীয় বলে মনে হতে পারে- না’ও পারে। সে যাকগে। সম্পর্ক যাই হোকনা কেন সেটা জেনে কারো কোন লাভ-ক্ষতি নেই। তবে দুজনের সম্পর্ক বেশ নিবিড় সেটা অনুমান করে নেয়া যায়।
ছেলেটা যথেষ্ট কেয়ারিং। তার বাম হাতে ধরা একটা বিয়ের কার্ড। সেই কার্ড দিয়ে সে মেয়েটার গালে ছিটকে পড়া সূর্যের কড়া রোদ ফিরিয়ে দেবার চেষ্টায় রত। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছেনা। স্বচ্ছ জানালার কাঁচ বন্ধ করে রোদকে রোধ করার প্রচেষ্টাও কাজে আসছেনা। বরং বাস চলাকালীন সময়ে যে বাতাস আসে সেটাও বন্ধ। মেয়েটা গরমে ঘামছে। ছেলেটা ইচ্ছে করলে নিজে জানালার পাশে যেয়ে বসতে পারে- সেটা তার মাথায় আসেনি। মেয়েটাও অনঢ়। অগত্যা ওভাবেই বাস চলছে।
নেক্সট স্টপেজে এক বাচ্চা হকার ছেলে খবরের কাগজ বিক্রির জন্য বাসে উঠলো। তার হাতে ধরা বেশ কিছু “আমাদের সময়” ও “মানবজমিন” মিনিপত্রিকা। চীৎকার করছে, “এই যে পড়েন আইজকার সব টাটকা খবর। “আমাদের সময়” মাত্র দুই টাকা, আর “মানবজমিন” মাত্র চাইর টাকা।“ হকার ছেলেটা খবরের কাগজ বিক্রির উদ্দেশ্যে বাসের পেছনের দিকে আসতেই তার নজরে পড়লো সেই দুজন তরুণ-তরুণীর দিকে। হকার ছেলেটির এটাও নজরে পড়লো- রোদের হাত থেকে মেয়েটিকে স্বস্তি দেবার জন্য বিয়ের কার্ড দিয়ে ছেলেটা বেশ যত্ন করে বাতাস করছে।
হকার ছেলেটি এইবার তরুণটির পাশে এসে দাঁড়ালো। সিটে বসা তরুণকে উদ্দেশ্য করে বললো- “স্যার এই যে ন্যান- “আমাদের সময়”, মাত্র দুই টাকা”। পড়া শ্যাষ হইলে কাঁচের জানলা দুইটা মইধ্যেখানে আনবেন। তারপর হেই কাঁচের ফাঁকের মইধ্যে খবরের কাগজটা গুঁইজা দিয়েন। তাইলে দেখবেন রোইদও লাগবোনা আবার বাতাসও পাইবেন। আপনে কইলে আমি লাগায়া দিবার পারি। যাইবার সময় খবরের কাগজটা আবার নিয়া যাইতে ভুইলেন না। নাইলে আমি একজন কাষ্টমার হারামু। স্যার কিছু মনে কইরেন না, এখোন আমাগো সময়। পেটের ধান্ধায় কত রহমের বুদ্ধি বাইর করন লাগে। নাইলে বাঁচুম কেমনে”? সিটে বসা তরুন হকার ছেলেটির হাতে পাঁচ টাকা গুঁজে দিয়ে দিয়ে বলে- একটা “মানবজমিন” দাও।
আমার দেশের জমিনেও এমন কিছু মানবসন্তান দরকার, যারা পেটের চিন্তার সাথে সাথে অন্যের ভালও চিন্তা করতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



