এক ব্যর্থ মানুষের বয়ান
হাতের কাছে এই মুহূর্তে কোন ক্যালকুলেটর নেই-থাকলে হিসেব কষে দেখিয়ে দিতাম, আমি আপাদমস্তক কতটা ব্যর্থ মানুষ। অথচ আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ে ব্যর্থতার এতোটুকু চিহ্ন নেই। আমি বেকার নই, আমি সমাজে কারও উপর নির্ভরশীল নই। যদিও আমার নিজের যা ক্রেডিট্যাবিলিটি তার সবটুকুই নামমাত্র মূল্যে বহু আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।
সর্বহারাদের জন্য কল্পিত একটা দারিদ্রের সীমারেখা টানা হলেও আমার বেলায় তা হয়না। কারণ- জামা-কাপড়ে, লেখাপড়ায়, আচার-আচরণে, আহার-বিলাসে আমি যথারীতি কেতাদুরস্ত, ফিটফাট; যথারীতি মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি। বাইরের চলাফেরা, স্মার্টনেস ও নিজেকে উপস্থাপনার ভিত্তিতে আমি উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চ বিত্তদের কাতারে অনায়াসে মিশে যেতে পারি। তার যথেষ্ট কারণও আছে। আমি সরকারি কোন এক সংস্থায় ভাল চাকরি করি। সাধারণ অর্থে পদস্থ কর্মকর্তা। যদিও পনের বছর ধরে আমার কোন প্রমোশন হয়নি। না হবার কারণটাও অজ্ঞাত।
আমার একটাই ব্যর্থতা, গতানুগতিক সিস্টেমের সাথে নিজেকে সেভাবে খাপ খাওয়াতে পারিনি। আমার কাছে কারও কোন প্রত্যাশা পূরণের কোন সম্ভাবনা নেই। কেউ তেমন কিছু আশা করে সুবিধে করতে পারেনা। কারণ আমার কাছে দেবার মতো কিছুই নেই। আমার নিজেরও অন্যের কাছে কোন প্রত্যাশা নেই। নিজের নায্য দাবী আদায়ের ক্ষেত্রেই আমি পুরোপুরি ব্যর্থ সেখানে অন্যের দাবী মেটানোর প্রশ্নই ওঠেনা।
আমার কোন ডেবিট কার্ড নেই। তবে অনেকগুলো ক্রেডিট কার্ড আছে। সেই কার্ডের সুদ গুনতে আমি রীতিমত হিমসিম খাচ্ছি দীর্ঘকাল যাবৎ। ব্যাংক থেকে নিয়মিত তাগাদা পত্র পাঠায়। মোবাইল ও ল্যান্ড ফোনে কল করে। দিচ্ছি দেব করে কাটিয়ে দেই বেশ কিছুদিন। বেশ বিরক্ত হয় বুঝতে পারি। আমার তথাকথিত স্ট্যাটাস বা ডেজিগনেশন আর সংস্থার পরিচয় জেনে তেমন কিছু বলতেও পারেনা। ভাবে আমি হয়তো ইচ্ছে করেই তাদের পেমেন্ট দিচ্ছিনা। আদৌ যে আমি দিতে পারছিনা সেটা তাদের বিশ্বাস হয়না। আমার পরিবারের অনেকেই মনে করে আমি আমার মেধা ও শ্রমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করিনি বা করছিনা। আমার বন্ধু ও মুরুব্বিদের অনেকের ধারণা আমি জিনিয়াস তবে আমার জন্ম ভুল সময়ে ও ভুল জায়গায়। আমার মতো মেধাবী ও সৎ মানুষের মূল্য এখানে কেউ দেবেনা, তাই হয়তো আমি চলমান সিস্টেমে চরমভাবে ব্যর্থ। আর এই ব্যর্থতার গ্লানি আমাকে রাতদিন বয়ে বেড়াতে হয়।
মাঝে মাঝে নিজেকে নিতান্তই মূল্যহীন মনে হয়। স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটি জীবনের বেশ ভাল রেজাল্ট। স্যার ও ক্লাশমেটদের কাছে ভাল ছাত্রের ঝলমলে লেবেল- আমাকে কর্ম ও বাস্তব জীবনে তেমন কোন উচ্চাসনে বসাতে সাহায্য করেনি। চাকরী জীবনের প্রতিটি ইন্টারভিউ-এ প্রথম হওয়া সত্ত্বেও চাকরি পাবার পর বস্ দের কোনভাবেই তুষ্ট করতে পারিনি। আমার কাজের কোন খুঁত তারা ধরতে না পারলেও আমার ব্যাপারে তাদের খুঁতখুঁতানি কম ছিলনা। বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যাপারেও অফিসের ১৩ জন কলিগের মধ্যে সর্বোচ্চ মেধা ও যোগত্যা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আমাকেই আমারিকা না পাঠিয়ে রাশিয়া যেতে বাধ্য করা হয়। কারণ- রাশিয়াতে মানুষ পড়তে যায় আর আমেরিকা মানুষ ঘুরতে যায়। ভাল ছাত্রদের পড়তে যাওয়াই উচিৎ।
এভাবেই চাকরী জীবনে মোট চারটে সরকারী ও আধা-সরকারী সংস্থাতে কাজ করে গেলাম। শেষে যে সংস্থায় এলাম সেখানে এসে দীর্ঘকাল আটকে গেলাম। কারণ এই সংস্থা ছেড়ে অন্য সংস্থায় যাবার মতো সেই বয়স নেই। আর যাবই যদি এবার সরাসরি বিদেশী সংস্থায় যাবো। দেশী সংস্থায় আর নয়। এখানে আমাকে ডিঙ্গিয়ে আমার জুনিয়রের প্রমোশন হয়। সেই প্রমোশন হজম করতে না পেরে তার আবার ডিমোশনও হয়। কী বিচিত্র নিয়ম আর নীতিমালা। ঘেন্না ধরে গেছে। দুর্নীতির কারণে কারও চাকরী চলে গেলে সে আবার সসম্মানে পূনর্বহাল হয়। অপরাধ করে জেলে গেলে তাকে ফুলের মালা দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়। তার সম্মানে খানাপিনার ব্যবস্থা করা হয়। তবে হ্যাঁ সেখানে আমি কখনোই নিমন্ত্রিত নই। এটাও আমার ব্যর্থতা। ব্যর্থতার বয়ান অত জলদি শেষ হবেনা। তাই অন্য একসময় আমার আরো সব ব্যর্থতা নিয়ে হাজির হবো। আপাতত এটুকুই।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



