ফিরে আসা (১ম পর্ব)
(একটা উপন্যাস লেখার অপচেষ্টা এভাবেই শুরু করেছিলাম। কিন্তু লেখার আলসেমির কারণে আর এগুতে পারিনি। যতটুকু লিখেছি পাঠকদের সাথে সেটুকুই শেয়ার করছি। একটু কঠোর ও বাস্তবধর্মী মতামত/মন্তব্য আশা করছি।)
অতীত ইতিহাস বলে অঞ্জনের তেমন কিছু ছিলনা। পূবর্পুরুষের স্মৃতি তাকে কখনোই মোহগ্রস্থ করেনি। পুরোনো সবকিছুকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো বিলাসী খেয়াল অঞ্জনের কোনকালেই ছিলনা। মায়ের মৃত্যুর পর এই বাড়ীর বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে থাকা মূল্যবান তৈজসপত্র, বাবার সংগ্রহের তৈলচিত্র, কাঠের আলমিরায় গচ্ছিত দাদীর কিছু সোনাদানা, সব অনেক আগেই হাতছাড়া হয়ে গ্যাছে। শুধু মায়ের ঘরেই ওরা ঢুকতে পারেনি। তার অবর্তমানে দাদীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা অনেককিছুই নিজেদের দখলে নিয়ে গ্যাছে। দাদী বেঁচে থাকতে ছিঁটেফোটা তা’ও কিছু পড়ে ছিল। এখন আর সেসব নেই। একদিন হয়তো চার দেয়াল ছাড়া আর কিছুই থাকবেনা। সবই ওদের ভোগ দখলে চলে যাবে। অঞ্জন জানে সে’ও এখানে থাকবেনা। আবার ফিরে যাবে লন্ডনে। মায়ের কিছু রেখে যাওয়া জিনিষ নিয়ে যেতেই তার ফিরে আসা। অঞ্জনের মা শেষ দিকের কোন এক চিঠিতে লিখেছিলেন তার জন্য কিছু জিনিষ নাকি তিনি যত্ন করে তুলে রেখেছেন। ইচ্ছে ছিল নিজের হাতে সেগুলো অঞ্জনের হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। কি সেই জিনিষ অঞ্জন আজো জানেনা। মা’ও বিস্তারিত কিছু লেখেননি। মাত্র কদিনের জন্যে আসা। এর মধ্যে কি সে খুঁজে পাবে মায়ের সেই গচ্ছিত জিনিষগুলো। কোথায় খুঁজবে সে? দাদী হয়তো জানতেন কোথায় কী আছে। তিনিওতো আজ বেঁচে নেই। অঞ্জনের বিশ্বাস সে খুঁজে পাবেই সেগুলো।
বাড়ীর পুরোনো বাসিন্দা যারা তাদের মুখেই অঞ্জন জেনেছিল বাড়ীর এই ঘরটাতে মা একাই থাকতেন। দাদী থাকতেন মায়ের পাশের ঘরে। মায়ের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আয়েশা খালা মা আর দাদীর দেখাশুনা করতেন। আয়েশা খালাকে অঞ্জন মাত্র দুইবার দেখেছে। ছোটবেলায় একবার নানীর বাড়ীতে আর একবার মায়ের মৃত্যুর আগে যখন সে ছুটিতে এসেছিল। দাদী আর আয়েশা খালা ছাড়া তেমন কেউ মায়ের ঘরে ঢুকতো না। মা অন্য কারো তার ঘরে ঢোকা পছন্দ করতেন না। ঘরটা বাইরে থেকে তালা বদ্ধ ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অঞ্জনের মা এই ঘরেই ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর সময় অঞ্জন বিদেশেই ছিল। তখন তার ফাইনাল এক্সাম চলছিল। মৃত্যুর খবরটা সে পেয়েছে অনেক দেরীতে। নিজের চুল ছেঁড়া ছাড়া তখন আর কিছুই করার ছিলনা। সবকিছু সামাল দিয়ে সময় মতো সে হয়তো আসতে পারতো না। মায়ের চল্লিশার সময় অঞ্জন যখন দেশে এসেছিল তখন তার দাদী মায়ের ঘরের চাবিটা সবার অলক্ষ্যে তার হাত সঁপে দিয়েছিলেন। আজ দ্বিতীয়বারের মতো অঞ্জন মায়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। দাদীর ঘরটাও আজ বন্ধ। সেটাতেও তালা ঝুলছে। কেউ থাকেনা সেই ঘরে। মায়ের ঘরের দরজায় তার হাতে লাগিয়ে যাওয়া তালাটা আজও ঝুলছে। কেউ খোলেনি সেই ঘর। চাবিটা অঞ্জনের কাছেই। যাবার আগে নিজের হাতে তালাটা লাগিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল চাবিটা কারো হাতে দিয়ে যাবে। কিন্তু পরে কী ভেবে তা সে করেনি। চাবিটা সাথে করেই নিয়ে গেছিল। আজ বহুবছর পর মায়ের ঘরে সে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সেই শিশুকালে এই ঘরেই তার বেড়ে ওঠা। বাবাকে তেমন মনে পড়েনা। পড়ার কথাও নয়। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা তাকে ও মাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সেই থেকে মায়ের একমাত্র সঙ্গী অঞ্জন। মায়েরও শেষ অবলম্বন অঞ্জন। অঞ্জনকে ঘিরেই ছিল মায়ের যত স্বপ্ন।
দুপুর গড়ালেও বাইরে এখনো দিনের আলোর তীব্রতা কমেনি। ঘরের বারান্দার খানিকটা জুড়ে নিম গাছের ছায়া। ঘরের ভেতরে প্রবেশের একমাত্র পথ এই দরজা। আলো প্রবেশের পথও এই দরজা। ঘরের পূব ও দখিন দিকে দুটো জানালা আছে। জানালা দুটো দীর্ঘকাল বন্ধ। অঞ্জন চলে যাবার আগে জানালাগুলো ভাল করে বন্ধ করে গেছিল। আর সেই কারণেই বহুকাল এই ঘরে বাহিরের কোন আলো প্রবেশ করতে পারেনি। মায়ের ঘরে সন্ধ্যা প্রদীপও আর কখনো জ্বলেনি। এই ঘরে সব আলোই নিষিদ্ধ ছিল বহুকাল। তালা খুলতে একটু সময় লাগলো। পুরোনো তালাটায় মরচে ধরে গ্যাছে। চাবিটা বেশ কয়েকবার মোচড় দিতে তালাটা খুললো অবশেষে। দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকলো অঞ্জন। বহুকাল পর তার মায়ের ঘরে অনুপ্রবেশ। ঘরে ঢুকতেই এক অন্যরকম অনুভূতি। মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছে সে। শাড়ীর গন্ধ, ন্যাপথলিনের গন্ধ। বেশ তরতাজা সতেজ গন্ধ। ঘরটা জুড়ে মাকড়সার ঝুল। মেঝে, খাট, টেবিল চেয়ার সবকিছুতেই ধূলোর ছাপ। দেয়ালে টাঙ্গানো মা ও বাবার ছবিতেও ধূলোর আস্তর। দরজা দিয়ে ঘরের মেঝেতে মামান্য আলো এসে পড়লো। তবে স্পষ্ট নয়। ঘরটা আগের চেয়েও যেন বেশী বড় মনে হলো। দিনের আলো থাকা সত্ত্বেও ঘরের ভেতরটা কেমন যেন অন্ধকার। অঞ্জনের চোখ কিছুটা ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের সামনেই দেয়ালে মায়ের ছবি টাঙ্গানো। চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়াতে নাকি ধূলো পড়াতে মায়ের মুখটা তেমন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছেনা। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখটা ভাল করে মুছে নিল অঞ্জন।
চলবে----
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



