বন্ধুর চিঠি - ১
সুপ্রিয়,
ভাল আছো আশা করি। আমার ভাল থাকা না থাকা প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে তাই আলাদা করে আর ভাল বা মন্দ থাকার কথা লিখছিনা। বেঁচে আছি এটুকুই শান্তনা। জীবনের বহু অংশ খরচ হয়ে গেছে অনেক ভ্রান্তিতে। উপলব্ধির সীমানায় টোকা পড়বার আগেই বয়ে গেছে অনেক জলের ধারা। মেধা, সময়, অর্থ ও ভালবাসা বিলিয়ে যা কিছু অর্জন- আমাদের তথাকথিক সমাজে তার কোন মূল্য নেই। তাই কখনো কোন বন্ধুর প্রার্থনা, মেইল বা এসএমএস পড়ে যখন অকারণে হেসে উঠি তখন সমাজের হিসেবী মানুষগুলো হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবে- “কি রকম বোকা আর পাগল মেয়েরে বাবা”! তারা যদি আজ এই দুঃসময়ের মুখে দাঁড়িয়ে আমার অনুভূতির সামান্যটুকুও ধারণ করতো; তাহলে হয়তো বুঝে নিত একটা ছোট্ট এসএমএস বা এক টুকরো মেইল- কী বিপুল মূল্য নিয়ে হাজির হয় হৃদপিন্ডের উঠোনে।
আমি এই বিরান প্রান্তরে শূন্য উঠোন সাজিয়ে চাতক পাখীর মতো উন্মুখ হয়ে বসে থাকি একটা এসএমএস বা একটা ছোট্ট মেইল অথবা একটা ফোন কলের জন্য। অনেক প্রতীক্ষার পর যখন বৃষ্টি নামে, আমার মনের জমিন তখন ভিজিয়ে দিয়ে যায় এক পশলা আন্তরিক জলের ধারা। আমি সেই জলে মিটিয়ে নেই আমার অনন্ত তৃষ্ণা আর পরক্ষণেই চাপা হাহাকার নিয়ে মনে পড়ে- “একদিন আমিও ছিলাম ঐ জলের উৎসে”। ভাবি কখনো কী ফেরা হবে আবার শিকড়ে, আবার কী জমবে মেলা, আবার কী প্রিয় কোন চেনা মুখের কাঁধে হাত রেখে হেসে উঠতে পারবো সেই ফেলে আসা দিনগুলোর মতো? আমি অদ্ভূত এক দুঃখবোধ সয়ে নীরবে বরণ করে নেই ফেলে আসা সেই সময়ের জ্বলজ্বলে স্মৃতিগুলো। বিষন্ন চিত্তে উচ্চারণ করি-
“যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইবো কত আর....
আর পারিনে রাত জাগতে. হে নাথ, ভাবতে অনির্বার....”।
জানো আনন্দ, আমি এখনো কারো সাথে প্রাণ ভরে কথা বলতে পারিনা। কী এক অদ্ভূত পরিবেশ আমার এখানে। যারা পরিচিত তাদের অধিকাংশই এসেছে নির্দিষ্ট একটা চেনা-জানা গন্ডির আবর্তে ঘুর-পাক খেয়ে। তাদের সাথে মানবিক তফাৎ না থাকলেও রয়েছে বিশাল এক মানসিক বিচ্ছিন্নতা। আর যে দু’একজনকে একটু কাছের বলে মনে হয় তারাও সেই মানসিক পার্থক্যটা বজায় রেখেই চলে। আমিও নির্বিকার থাকার চেষ্টা করি।
আমার জীবন থেকে কবিতা হারিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দকে আমি নির্বাসন দিয়ে রেখেছি মনের গহীনে। আমার সবুজ মনের গালিচায় এখন বিছিয়ে রেখেছি ধূসর পান্ডুলিপি। মাঝে মাঝে অবসন্ন কোন রাত্রিতে বিস্তৃত আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজে ফিরি সেইসব হারিয়ে যাওয়া বইয়ের পাতার চেনা অক্ষরগুলো, সেই আনন্দের উৎসগুলো। কিন্তু কিছুই পাওয়া হয়ে ওঠেনা। নিজের অজান্তেই কেন জানি এক গভীর একাকিত্ব বরণ করে নিয়েছি আমি তা বোঝাতে পারবোনা। হয়তো ভাবছো, সবখানেই একই রকম মানুষ দেখে দেখে আমার এই অবস্থা, সময়ের ব্যবধানে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু আমি জানি, কিছুই ঠিক হবেনা। কেননা এখন আর আগের মতো যুদ্ধ জয়ের সাহস নেই, নেই যুদ্ধ করবার সেই উপযুক্ত ক্ষেত্র, নেই মনের মতো তেমন প্রতিপক্ষ। সবকিছুই কেমন যেন বদলে গেছে।
আমার এখানকার জগৎ একেবারেই আলাদা। আমার চিরকালের ভাললাগার যে ছন্দ, সেই ছন্দ এখানে আমি খুঁজে পাইনা। আমি নিষ্প্রাণ, স্থবির এক জনপদে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে আছি। শান্ত, অবসন্ন, ক্লান্ত এক মানুষ আমি। আমার মন বেদনার রঙ তুলিতে দিনের পর দিন কী সব ছবি এঁকে যায় হৃদয়ের প্রতীতি অনুভবে। আর সেই অনুভব ভাগ করে নেবার মতো কোন সঙ্গী আজ আর নেই। আজ আমার কোন আনন্দ নেই, কোন উল্লাস নেই। আজ আমি শুধুই এক ডানা ভাঙ্গা আহত পাখী। আমার মন জুড়ে নীড় ভেঙ্গে যাওয়ার কষ্ট। সেই কষ্টের ছায়া যেন কখনো তোমাকে স্পর্শ না করে এমন প্রার্থনাই করি সবসময়। যেখানেই থাক, ভাল থেকো।
- অনুরাধা
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



