স্মৃতির পাতা খেকেঃ ১১ টাকায় বিমান ভ্রমণ!
ছোটবেলা থেকেই বিমানে চড়ার খুব শখ ছিল আমার। কিন্ত কখনো সেই সুযোগ হয়নি। রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান শহর হলেও বহুকাল পর্যন্ত এই শহরে কোন বিমানবন্দর ছিলনা। ছিল ঈশ্বরদিতে। পরবর্তীতে সৈয়দপুরেও একটা বিমানবন্দর হয়েছিল। পাকশী ব্রীজ তৈরী ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবাদে উত্তরবঙ্গে প্রথম ঈশ্বরদিতেই বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়েছিল। ঢাকা-ঈশ্বরদি-ঢাকা সেই বিমান সার্ভিস চালু ছিল দীর্ঘদিন পর্যন্ত। তখন সম্ভবত “ফোকার” টাইপের দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিমান চালু ছিল।
দেশ তখনো স্বাধীন হয়নি। আমার বয়স তখন প্রায় ১১ বছর। সম্ভবত ক্লাশ সিক্সে পড়ি। একটা ভ্রমণ কাহিনী পড়ে আব্বার কাছে খুব জেদ ধরলাম আমি প্লেনে চড়বো। অনেকদিন জেদাজেদির পর আব্বা একদিন রাজি হলেন প্লেনে চড়াতে। রাজশাহীতে তখন বিমানবন্দর না থাকলেও বিমানের একটা (তখন ছিল পিআইএ) অফিস ছিল। সেখান থেকে বিমানের টিকিট সংগ্রহ করা যেত এবং বিমানের নিজস্ব একটা মিনি বাস ছিল যাতে করে বিমানের প্যাসেঞ্জারদের রাজশাহী থেকে ঈশ্বরদি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হতো নির্দ্দিষ্ট সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবার জন্য। যাই হোক তখন বিমানে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত হাফ টিকেটের ব্যবস্থা ছিল (এখনো আছে হয়তো)। ঈশ্বরদি থেকে ঢাকার বিমান ভাড়া ছিল তখন মাত্র ২২ টাকা। হ্যাঁ মাত্র বাইশ টাকা। আমার ভাড়া লেগেছিল ১১ টাকা। সেই ১১ টাকা ভাড়ায় আমার প্রথম বিমানে ভ্রমণ হয় ঈশ্বরদি থেকে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর পর্যন্ত। সময় লেগেছিল সম্ভবত ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট। প্রথমে খুব ভয় ভয় লাগছিল। আব্বা ভেবেছিলেন বিমানে ওড়াকালীন সময় জার্ণির ধকল সইতে না পেরে হয়তো বমি করবো। কিন্তু আব্বার ধারণা সত্যি হয়নি। আমি বসেছিলাম জানালার পার্শ্বের সিটে। আকাশপথে সুন্দরী এক এয়ার হোস্টেস একটা ট্রেতে করে তখনকার দিনের বিখ্যাত বিপি কোম্পানীর বিভিন্ন ধরণের লজেন্স সবার সামনে দিচ্ছিল। অন্যদের দেখাদেখি আমি একমুঠো ভর্তি লজেন্স নিয়ে পকেটে রেখে দিলাম। এয়ার হোস্টেস আমাকে ছোট বলেই হয়তো আরো কিছু নেবার জন্য ট্রে-টা এগিয়ে দিল। আমি ইতস্তত করে নিয়ে নিলাম আরেক মুঠো। সারা পথ লজেন্স চুষতে চুষতে কখন যে ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম টের পাইনি। প্লেন নামার সময়ে গা’টা কেমন শিরশির করছিল। একটা হালকা ঝাঁকি খেয়ে যখন রানওয়েতে নামলাম মনে হলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ১১ টাকার বিমান ভ্রমণ খুব অল্পতেই শেষ হয়ে গেল। তেজগাঁও বিমানবন্দর পার হয়ে বাইরে এসে আব্বা একটা ঘোড়ায় টানা এক্কাগাড়ী ভাড়া করলো নারিন্দা যাবার জন্য। সেই এক্কাগাড়ীতে করে নারিন্দা এসে নামলাম। মনে হলো দিগ্বিজয় করে ফিরলাম। নানা বাড়ী পৌঁছে মামাদের ও একমাত্র খালার কাছে বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। প্লেনে পাওয়া লজেন্স খেতে দিলাম। আরো কি কি যেন বলেছিলাম। আজ আর সেগুলো মনে নেই। সব ভুলে বসে আছি। শুধু বিমানের ভাড়াটাই মনে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





