স্মৃতির পাতা খেকেঃ হীরো হারমোনিকা
আমার গানের গলা মাশাল্লাহ্। গাইতে শুরু করলে ঘরে মশা মাছি কিছুই থাকেনা। আমার প্রতি মাসে মশার কয়েল ও এসিআই য়্যারোসল বাবদ বেশ কিছু টাকা সাশ্রয় হয়। খুব ছোটবেলা একটু কিছু হলেই খুব জোড়ে চীৎকার করতাম ফলে গলার বারোটা বাজাতে কোন রকম কার্পণ্য করিনি। আর এমনিতেও আমি কথা একটু জোড়েই বলি, তাই গলা দিয়ে মাঝে মাঝে ফাটা বাঁশের মতো অদ্ভূত রকমের ধ্বনি বের হয়। আড্ডায় বা মজলিশে আমি কথা বলা শুরু করলে অনেকে মুখে না বললেও মনে মনে বলে- "থামলে ভাল হয়"”। আমি বেকুব বলেই সেটা বুঝতে পারিনা।
তো সেই আমি ছোটবেলায় কেমন করে যেন বুঝতে পেরেছিলাম আমার দ্বারা গান হবেনা। তাই গান শেখা বা গাওয়ার দিকে তেমন কোন ঝোঁক ছিলনা। তবে গান প্রচুর শুনতাম। গান ছিল আমার জান। এমন কোন দিন নেই যেদিন আমি গান শুনিনি। ফলে কোন গান কার গাওয়া, কোন গান কোন ছায়াছবির, এসব বিষয়ে নিজের পারদর্শিতা দেখে বেশ অবাক হতাম। তাই গান সংক্রান্ত কোন বিষয়ে জানতে হলে সবাই আমাকেই জিজ্ঞেস করতো। আমার গান গাইতে না পারা সেই সাধ আমি গান শুনেই মেটাতাম। বিশেষ করে ভারতীয় আধুনিক বাংলা গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল গীতি ছিল আমার খুব প্রিয়। সব শিল্পীর গানই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম।
সেই বেসুরো আমি যখন ক্লাশ সিক্স কি সেভেনে পড়ি তখন মা-চাচীদের সাথে রাজশাহীর কল্পনা সিনেমা হলে গেলাম "সোলভা সাল" দেখতে। ছবির নায়ক দেবানন্দ। নায়িকা সম্ভবত ওয়াহিদা রহমান। সেইসময় দেবানন্দ বেশ নামকরা হীরো। দেবানন্দের ছবি মানেই সুপার হিট। সেই ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটা বিখ্যাত গান ছিল যা সেই সময় রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে ফিট্ফাট্ ভদ্রলোক সবার মুখেই শোনা যেত। “হ্যায় আপনা দিলতো আওয়ারা, না জানে কিসপে আয়েগা....”, এই সেই বিখ্যাত গান। সিনেমায় ট্যাক্সি ড্রাইভার দেবানন্দ হারমোনিকা (মাউথ অর্গ্যান) বাজিয়ে এই গান গায়। আর তা শুনে বড়লোকের একমাত্র মেয়ে নায়িকা ওয়াহিদা রহমানের চিত্ত ব্যাকুল হয়। সেই পিচ্চি বয়সে আমিও মনে মনে ভাবতাম এই গানই হলো মেয়ে পটানোর মোক্ষম দাওয়া। মনে মনে আমিও গুন গুন করে গাইতে শুরু করলাম। পাড়ার মেয়েদের কাছে হীরো হবার শখ তখন থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। তবে সেই গান কখনোই জোড়ে গাওয়ার সাহস পেতামনা। এমন একটা বিখ্যাত গান আমার বেসুরো গলা দিয়ে এমনভাবে নির্যাতিত হবে সেটা মনে হয় কেউ চাইবেনা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম গান নয়, দেবানন্দের মতো একটা হারমোনিকা আমার চাই’ই চাই। তাহলে আর আমার বেসুরো গলায় ঐ গান গাইতে হবেনা। হারমোনিক বাজিয়ে ঐ গানের সুরে সুরে পাড়ার মেয়েদের পটাতে একটুও অসুবিধে হবেনা। তখন সারা রাজশাহী শহরজুড়ে এই গানের জন্য মানুষ রীতিমত ক্রেজী। একবার যখন আমার মাথায় হারমোনিকা ঢুকেছে আর যায় কোথায়? আব্বা ও মা’র কাছে রাতদিন হারমোনিকার জন্য ঘ্যানোর ঘ্যানোর শুরু করে দিলাম। শেষে বিরক্ত হয়ে আব্বা কথা দিলেন কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা গেলে একটা হারমোনিকা এনে দিবেন। আমি তখন বন্ধুদের কাছে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম চাইনীজ “হীরো” ব্র্যান্ডের হারমোনিকা সবচেয়ে ভাল আর দেখতেও সুন্দর। আব্বাকে লিখে দিলাম ব্র্যান্ডের নাম।
পরের সপ্তাহেই আব্বা ব্যবসার কাজে ঢাকা গেলেন। ফিরবেন একসপ্তাহ পর। যাবার সময় আব্বাকে বার বার হারমোনিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। এরপর প্রতিদিন মা’র কাছে খবর নিতাম আব্বা কবে আসবে? অবশেষে আব্বা এলেন। আমিতো খুশীতে অস্থির। আব্বা বাসায় আসার সাথে সাথে ব্যাগটা নিয়ে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলাম। আব্বা বুঝতে পেরেছেন কেন আমি ব্যাগ নিলাম। আব্বা বললেন, "তোর হারমোনিকা এনেছিরে পাগল। খুলে দ্যাখ কী সুন্দর"! আমি ব্যাগ থেকে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা টাইপের একটা বাক্স বের করলাম। বাক্সের গায়ে বাঁকা করে ইংরেজীতে বড় বড় করে “হীরো” লেখা তার নীচে হাতে লেখার মতো পেঁচানো অক্ষরে লেখা "হারমোনিকা"”। বাক্সটা হাতে নিতেই আমার চোখে মুখে খুশীর ঝিলিক। মনে হলো হাতে স্বর্গ পেলাম। আমাকে আর কে পায়। এরপর ধীরে ধীরে বাক্সটা খুললাম। ভেতরে পাতলা টিস্যু পেপারের মতো কাগজ দিয়ে জড়ানো নীল ময়ুরকন্ঠি রঙের একটা হারমোনিকা। বাক্সের এক কোণায় ভাঁজ করা এক টুকরো ফ্লানেল কাপড়। বুঝলাম সেটা হারমোনিকা মোছার জন্য দিয়েছে। আমি বের করে বাজাতে শুরু করলাম। হারমোনিকা বাজছে ঠিকই কিন্তু সুর বলতে কিছু নেই। আমিতো হারমোনিকা সুরে বাজাতে জানিনা। খোঁজ করতে লাগলাম কে বাজাতে জানে? নাহ্ কেউ পারেনা। হায়রে কপাল! এখন আমার “হ্যায় আপনা দিল...” এই গানের কি হবে? আমি যদি সুরেই হারমোনিকা বাজাতে না পারি তবে আমি হীরো হবো কি করে? হীরো হারমোনিকা বাজিয়ে আমারোতো দেবানন্দের মতো হীরো হবার ইচ্ছে। পাড়ার মেয়েদের কাছে আমার হীরো হওয়া বুঝি হলোনা।
পরেরদিন স্কুলে গিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জানালাম আব্বা আমাকে ঢাকা থেকে হারমোনিকা এনে দিয়েছে। এই ফাঁকে ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কেউ হারমোনিকা বাজাতে জানে কিনা! এমন সময় সিদ্দিক নামে আমার এক বন্ধু বললো সে হারমোনিকা বাজাতে পারে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। সে আমাকে বললো তার বাসায় একটা হারমোনিকা আছে। সেটা সে ভালই বাজাতে পারে। আমি ওর কথা বিশ্বাস করলাম। জিজ্ঞেস করলাম তোর হারমোনিয়ামটা দেখতে কেমন? সিদ্দিক বললো, “লাল রঙের তবে সাইজটা ছোট, এক বিঘতের মতো লম্বা হবে”। আমি বললাম- “আমারটা তাহলে তোরটার চেয়ে বড়, নীল রঙের। আমি তোর কাছে বাজানো শিখবো। তুই আমাকে শিখিয়ে দিস”। ও এক কথাতেই রাজী হলো। আমিতো খুব খুশী! সিদ্দিককে বললাম- “কালকে নিয়ে আসবো হারমোনিকা, টিফিন পিরিয়ডে আর স্কুল ছুটি হলে তুই আমাকে বাজিয়ে শোনাবি। আমি তোর বাজানো দেখে শিখে নেবো”। পরদিন স্কুলে হারমোনিকাটা নিয়ে এলাম। যথারীতি টিফিন পিরিয়ডে সিদ্দিক আমাকে হারমোনিকা বাজিয়ে শুনালো। আমি ওকে “হ্যায় আপনা দিলতো আওয়ারা...” গানের সুরটা বাজিয়ে শোনাতে বললাম। ও আমাকে বাজিয়ে শোনালো। টিফিন পিরিয়ড শেষ হবার পর হারমোনিকাটা স্কুল ব্যাগে রেখে দিলাম।
স্কুল শেষ করে বাসায় এসে বিকেলে রাজশাহী কলেজ মাঠে খেলতে গেলাম। খেলা শেষে হাত-পা-মুখ ধুয়ে পড়তে বসলাম। হোমওয়ার্ক করবো বলে স্কুল ব্যাগটা কাছে টেনে নিলাম। ব্যাগটা খুলতেই মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠলো। স্কুল ব্যাগের ভেতর আমার হারমোনিকা নেই। বাসায় মা-ভাই-বোন সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম কেউ আমার হারমোনিকা নিয়েছে কিনা! ওরা কেউ আমার হারমোনিকা ধরেনি বললো। এমনিতেও বাড়ীর বড় ছেলে হিসেবে আমাকে সবাই খুব ভয় পায় বলে আমার কোনকিছুতে ওরা হাত দেয়না। আমি ভীষণ অস্থির ও পাগলের মতো হয়ে স্কুলব্যাগ খুঁজতে লাগলাম। সমস্ত বুক শেলফ্ তছনছ করে ফেললাম। নাহ্ কোথাও নেই। আমার তখনি মনে হলো স্কুলব্যাগ থেকে হারমোনিকা নিশ্চয়ই কেউ সরিয়েছে। কিন্তু কে সেটা চুরি করেছে। কে নিতে পারে? প্রথমেই সন্দেহ হলো সিদ্দিককে। সন্ধ্যায় আমি আমার চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে সিদ্দিকের বাসায় গেলাম। সিদ্দিক বাসায় ছিল। ওকে হারমোনিকার কথা বলতেই যেন আকাশ থেকে পড়লো। ও খুব জোড় দিয়েই বললো সে কিছু জানেনা। সে হারমোনিকা নেয়নি। মন খারাপ করে বাসায় ফিরে এলাম। রাতে ভয়ে ভয়ে আব্বাকে ঘটনাটা খুলে বললাম। আব্বা ভীষণ রাগ হলেন। কেন শখের জিনিষ স্কুলে নিয়ে গেলাম সেইজন্য গালমন্দ করলেন। স্কুলের হেডমাষ্টার ছিলেন আব্বার বন্ধু। পরদিন আব্বা স্কুলে যেয়ে হেডস্যারের সাথে দেখা করে হারোমনিকার ঘটনা বিস্তারিত বললেন। হেডস্যার প্রতি ক্লাশে এ ব্যাপারে একটা নোটিশ পাঠালেন "যদি কেহ স্কুলের মাঠে কিংবা ক্লাশে একটা নীল রঙের হারমোনিকা পেয়ে থাকে তবে তা যেন অবশ্যই হেড স্যারের দপ্তরে জমা করে। গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যে’ই সেটা জমা করুক তার নাম গোপন রাখা হবে। আর যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ে গোপন করার চেষ্টা করে এবং যদি তা প্রমাণিত হয় তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে"।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, হারমোনিকা আর কোন খোঁজ পাইনি। আমি আজো সেই হারমোনিকার কথা ভুলতে পারিনা। মাত্র ছ’টাকা দামের একটা বস্তু আমার কাছে খুব দুর্লভ একটা কিছু হয়েই রয়ে গেল আজীবন। একসময় অমন শত হারমোনিকা কেনার সামর্থ্য থাকলেও আর কখনো হারমোনিকা কেনার ইচ্ছে হয়নি। কখনো বাজাতেও ইচ্ছে হয়নি। এ যাবৎকাল পর্যন্ত আমি কোন হারমোনিকা স্পর্শ করিনি। আমার আর কখনোই দেবানন্দ হয়ে ওঠা হয়নি। কিশোর বয়সের অনেক স্বপ্নই অধরা থেকে যায়। আজ হেমন্তের সেই গানটার কথাই শুধু মনে পড়ে, “হ্যায় আপনা দিলতো আওয়ারা, না জানে কিসিছে পেয়ার হোগায়া....”। এই গানের বাংলা ভাবানুবাদ করলে অর্থটা মনে হয় এমনি দাঁড়ায়- “হায়রে আমার উদাসী মন, কাকে ভালবেসে ফেলে যখন তখন"।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



