মিতালীর গল্প - শেষ পর্ব
আমি মিতালীকে সব কথা খুলে বললাম। আমি আরো বললাম বজলুকে বিয়ে করলে তুই সুখী হবিনা। কারণ বজলুর মা যতদিন বেঁচে থাকবে এবং আমার ধারণা উনি অনেকদিন বাঁচবেন, ততদিন তুই সুখী হবিনা। বজলুর ধারণা উনি অসুস্থ, আমারও ধারণা উনি অসুস্থ। তবে ওনার অসুস্থতা ঠিক শারীরিক নয় মানসিক। হয়তো স্বামীর মৃত্যুর কারণেই তিনি একরকম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। মানসিকভাবে অসুস্থ এক মানুষের সংসারে তুই কখনোই সুখী হবিনা। তোর জীবনটা নরক হয়ে যাবে। যে মা তার আদরের মেয়েদের নিয়ে এতো চিন্তিত সেই মেয়েরাই যখন তাদের মা'কে কত অনুনয়-বিনয় করেও বুঝাতে সক্ষম হয়নি যে তুইও একটা মেয়ে, তুই বয়সে ওদের চাইতে বড়, তোরও বিয়ের জন্য তোর বাবা-মা চিন্তা করে। এতোকিছু বুঝানোর পরও যখন ওনাকে রাজী করানো যায়নি তখন তোকে আমৃত্যু অপেক্ষা করতে হবে বজলুকে বিয়ে করার জন্য। কারণ বজলু তার মায়ের নির্দেশ ছাড়া কোন সিদ্ধান্তে যেতে পারবেনা। আর বাড়ীটাও বজলুর মায়ের নামে। বজলুকে ঐ বাসায় থাকতে হলে মায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে চলতেই হবে। আর যদি তুই সেটা মেনে নিতে পারিস তবে অপেক্ষা কর। তিনি বেঁচে থাকা অব্দি মেয়েদের বিয়ে না হলে তোদের বিয়ে হবে কিনা সন্দেহ। তবে এর মধ্যে যদি বজলু যদি সুমীর একটা বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে তবে তোর ভাগ্যে শিকা ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে। এখন থেকে আমি আর তোদের বিয়ের কথাবার্তায় নেই। তুই আমার বন্ধু আছিস সেটাই ভাল। আমাকে যতই ভুল বুঝিস আমার আর কিছু করার নেই। আমি কোন মুখ নিয়ে তোর মা বাবার কাছে যেয়ে দাঁড়াবো বল? বজলুর হয়ে প্রস্তাব নিয়ে তাদের কাছে যাবো কোন ভরষায়? যেখানে বজলুর মা নিজেই এখন ছেলের বিয়ে দিতে রাজী নয় সেখানে আমার বা তোর বাবা-মা'র কি'ইবা করার আছে? তবে বজলু যদি তার মায়ের নির্দেশ না মেনে আমার সাথে যেতে চায় তবে আমাকে জানাস। আমার যেতে কোন আপত্তি নেই। তবে মায়ের অমতে কোথাও যাওয়া বা বিয়ে করার মতো সাহস বজলুর আছে কিনা সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এখন তুই ভাল করে ভেবে দেখ কি করবি।
আমার কথা শুনে মিতালী হতাশ হলো। একটা দীর্ঘঃশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর মুখ থেকে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো তারপর আস্তে করে আমাকে বললো কালকেই বাড়ী ফিরে যাচ্ছি। আর কখনো ফিরে আসা হবে কিনা জানিনা। তুই আমার জন্য অনেক করেছিস। তোকে অনেক জ্বালিয়েছি, কিছু মনে করিনসনা। কালকে বজলুর সাথে অনেক কথা হলো। আমি ওকে বলেছি আমি অপেক্ষা করবো। তবে কতদিন অপেক্ষা করবো সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। আরো বলেছি, তোমার মা যেমন তার মেয়েদের নিয়ে ভাবেন আমার বাবা-মাও আমাকে নিয়ে ভাবেন। ভাল কোন প্রস্তাব এলে তারা বসে থাকবেনা না, আমার বিয়ে দিয়ে দেবেন। আর আমিও ভুলে যাবো বজলু নামের কেউ আমার জীবনে ছিল। আমি চাইনা তুমি তোমার মা'কে কষ্ট দিয়ে আমাকে বিয়ে করো। আর আমিও চাইনা আমার মা-বাবাকে কষ্ট দিয়ে কারো গলগ্রহ হয়ে জীবন কাটাই।
মিতালী আমার হাত ধরে বললো- তুই অনেক চেষ্টা করেছিস। তোকে আমার কিছু বলার নেই। তবে তুইও এমন কিছু করিসনা যাতে তোর ঐ পাড়াতুতো প্রেমিকা তোকে ছেড়ে চলে যায়। আমি জানি সে কোথাও যাবেনা। তুইও তাকে ছেড়ে দিবিনা। কাছাকাছি থাকার এই একটা সুবিধে। চোখে চোখে রাখা য়ায়। আমি কাউকে আমার চোখে চোখে রাখতে পারবোনা, সে ক্ষমতা আমার নেই। কারণ এই পোড়া চোখে রাখার মতো আর কেউ থাকলোনা। তবে মনে মনে আমি একজনকে রেখে দেবো ঠিকই। কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটা যদি সব ফেলে কখনো সামনে এসে দাঁড়ায় তবে একটা ভাঙাচোরা মন তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবো- পারবে কি এটা জোড়া লাগাতে? যদি পারো তবে নিজের মতো করে জুড়ে নিও।
সেই প্রথম মিতালীর সাদা মনটা বিষন্ণতায় কালো হতে দেখলাম। একটা কালো মেয়ের সাদা মনে যে পবিত্র আলো ছিল সেটা বজলুর মতো অন্ধ বুঝতে পারেনি। আর অন্ধদের করুণা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আর আমি সব বুঝেও তার সদা বিকশিত সেই পবিত্র আলোটুকু নিতে পারিনি। আমি নিজেইতো একজনের কাছে দায়বদ্ধ। তাই সেদিন নিজেকে ভীষণ "ব্যাড বয়" মনে হচ্ছিল। মিতালীর জন্য আমার শুভ কামনা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি। ভাল থাকার প্রার্থনা রইলো ওর জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


