সেই শুরু থেকে আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র গুনিদের কারখানা ছিল। আজ যা নেই বললেই চলে। জহির রায়হান,আলমগির কবির, খান আতাউর রহমান, এফ কবির, শেখ নিয়ামত আলী, নারায়ণ ঘোষ মিতা,সুভাষ দত্ত, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, আমজাদ হোসেন, সুবল দাস, সত্য সাহা, গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর মতো সব গুণীদের পদচারনায় মুখর ছিল এফডিসি তথা বাংলা চলচ্চিত্রে। এতসব গুণীর ভিড়ে বাংলা চলচ্চিত্রে আসেন একজন প্রযোজক ও পরিচালক যার নাম এ জে মিন্টু এবং অনেক কালজয়ী গানের সুরকার আলম খান যিনি আমাদের পপসম্রাট আজম খানের বড় ভাই। প্রয়োজক ও পরিচালক এ জে মিন্টু বাংলা চলচ্চিত্রে আলাদা ও অনন্য একটি নাম। যাকে সবাই 'মাস্টার মেকার' নামে চিনতো। আমি খুব ছোট বেলা থেকেই বাংলা ছায়াছবির হলে যাওয়া দর্শক এবং সেই সূত্র ধরে কিশোরবেলায় একটা সময় নিয়মিত রেডিও শুনতাম খুব আনন্দ নিয়ে। রেডিও তে মুক্তি প্রতীক্ষিত বিভিন্ন ছায়াছবির উপর ১০ মিনিটের একটি আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান হতো। সেখানে ভরাট কণ্ঠে মাজহারুল ইসলাম কে প্রায়ই খুব উত্তেজনা ও খুব সম্মানের সহিত বলতে শুনতাম '' মাস্টার মেকার খ্যাত সবার প্রিয় পরিচালক এ জে মিন্টুর ছবি ''অশান্তি'' কখনও বা ''সত্য মিথ্যা''। অর্থাৎ যখন যে ছবি মুক্তি পাবে তার নাম। কিন্তু কখনও ঐ ''মাস্টার মেকার'' উপাধিটা বাদ দিতেন না, এমন কি অন্য কোন পরিচালকের নামের আগেও বলতেন না। শুধু এ জে মিন্টুর বেলায় উপাধিটা বলতেন। সেই মাজহারুল ইসলাম এর কথাটা যে সঠিক তা প্রতিবার মিন্টুর ছবি দেখে প্রমান পেয়েছিলাম। তাঁর ছবি ছিল পুরো বাণিজ্যিক কিন্তু সম্পূর্ণ অশ্লীলতা বিবর্জিত। কাহিনী ছিল কাল্পনিক কিন্তু বাস্তবতা সাদৃশ্য। তাঁর ছবির প্রতিটা সংলাপ ও দৃশ্য ছিল বাস্তবের সাথে মিল রেখে। প্রায় সিনেমায় আমরা দেখি গুন্ডারা নায়িকাকে আক্রমণ করেছে আর মুহূর্তেই আকাশ থেকে লাফিয়ে নায়ক এসে তাদের হাত থেকে নায়িকাকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু নায়ক কোথা থেকে সেখানে আসলো সেই প্রশ্নের জবাব সব ছবিতে আগেও পাইনি এখনও পাই না। শুধুমাত্র যার ছবিতে সবসময় উত্তর পেতাম তিনি এ জে মিন্টু। যিনি প্রতিটা দৃশ্যর সাথে দর্শকের মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর দিতেন । তিনি কখনও খুব অ্যাকশন ধর্মী ছবি দর্শকদের উপহার দিতেন আবার কখনও রোমান্টিক, কখনও পারিবারিক হাসি কান্নার ছবি উপহার দিতেন। যার পারিবারিক গল্পের ছবি দেখে হল ভর্তি মানুষের চোখে জল আসতো। যারা দেখেছে তাঁরা বলতে পারবে এ জে মিন্টু কে ও কেমন। যার প্রযোজিত ও পরিচালিত সবগুলো ছবি কোন না কোন বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। একটিও ছবিও পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়নি। আর বাংলাদেশের যে দুইজন সর্বাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তাদের একজন হলেন এ জে মিন্টু ও অন্যজন হলেন কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। ১৯৮১ সালে 'বাঁধনহারা' ছবি দিয়ে মিন্টু চলচ্চিত্রে পদার্পণ করেন এরপর একে একে ''চ্যালেঞ্জ '' ''লালু মাস্তান'' ''অশান্তি'' ''সত্য মিথ্যা'' '' ন্যায় অন্যায়'', ''পিতা মাতা সন্তান'' ''বাংলার বধূ'' ''প্রথম প্রেম'' '' বাপের টাকা''র মতো সব দারুণ দারুণ ছবি উপহার দিয়ে গেছেন। এরমধ্যে সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায়, পিতা মাতা সন্তান ও বাংলার বধূ, ছবির জন্য মিন্টু একটানা ৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য সত্য মিথ্যা ও বাংলার বঁধুর জন্য লাভ করেন শ্রেষ্ঠ পরিচালক এর পুরস্কার। এসব ছবির সবগুলো মিন্টু পরিচালনা করেছেন। আবার এ জে মিন্টু অনেক ছবি প্রযোজনাও করেছেন সেগুলো হয়েছে প্রশংসিত ,হয়েছে পুরস্কারে ভূষিত। যার মধ্য ৯০এর মাঝামাঝিতে '' সংসারের সুখ দুঃখ'' ছবিটি অন্যতম। এ জে মিন্টুর প্রযোজনা সংস্থার নাম ছিল ''সানফ্লাওয়ার মুভিজ''। যেখান থেকে মিন্টুর অধিকাংশ ছবি মুক্তি পেতো। মিন্টুর আরও একটি পরিচয় ছিল চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন এর ছবি ও নাটকের শুটিং এর বহু পরিচিত ও ব্যবহৃত বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যক্তি মালিকানাধীন শুটিং স্পট '' খতিব খামার বাড়ী'' র কর্ণধার। যে শুটিং স্পট আজও মুখরিত হয়ে থাকে প্রতিদিন। ১৯৯৮ সালের পর থেকে কোন এক নীরব অভিমানে এ জে মিন্টু ছবি তৈরি বন্ধ করে দিলেন যা আজও তাঁর ভক্তসহ সকল বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে রহস্যময় হয়ে আছে। অথচ আজকের অস্থির ও শুন্য চলচ্চিত্রের জন্য এ জে মিন্টুর খুব খুব বেশী প্রয়োজন ছিল। তিনি আজ ছবি তৈরি থেকে বিরত আছেন কিন্তু তাঁর সুযোগ্য তিন ছাত্র (সোহানুর রহমান সোহান, শাহ আলম কিরণ ও মনোয়ার খোকন) তাঁর অবর্তমানে বাংলা সিনেমার আলো হয়ে টিকে আছেন। আর এই প্রিয় এ জে মিন্টুর ছবিতে যে কিংবদন্তীকে পাওয়া যেত তিনি বাংলাদেশের বহু কালজয়ী গানের সুরকার আলম খান। যে জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে কিছু অন্যরকম ও চমৎকার সুন্দর গান দর্শকদের উপহার দিয়েছিলেন। নিচে তেমনই কিছু ছবি ও গান দিলাম ।
আমাদের প্রয়াত পপসম্রাট গুরু আজম খান এর বড় ভাই , বাংলা গানের বহু কালজয়ী গানের সুরকার প্রিয় আলম খান সম্পর্কে মূল্যায়ন করার মতো যোগ্যতা ও সাহস আমার আজও হয়নি । তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলে শুধু তাঁর সুর করা কিছু গান ভিডিও সহ দিলাম। তা দেখেই কল্পনা করে নিন কত উঁচুমানের ও সেরা একজন সুরকার আমরা পেয়েছিলাম।
অন্যরকম একটি বাংলা ব্লগ
শুনুন একটি শিক্ষিত রেডিও
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ ভোর ৫:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


