আজ ১৩ই ফেব্রুয়ারী , ১লা ফাল্গুন ২০১২এর সবচেয়ে নির্মম সত্য একটি সংবাদ দিয়ে আমাদের বসন্তের ফুলে রাঙানো দিনটি শুরু হলো। আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা ও বাংলার মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। প্রতি বছর এই দিনে হয়তো আমরা আমাদের প্রিয় শিল্পীকে মনে করবো ফাল্গুলনের প্রথম দিনের হলুদ গাঁদা ফুল দিয়ে যা হয়তো প্রকৃতি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন।
ফরিদী কি এবং কেমন অভিনেতা ছিলেন তা লিখে প্রকাশ করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। শুধু এইটুকু বলবো সেই ছোট বেলায় যেদিন ঈদের নাটক ' হঠাৎ একদিন' দেখি সেইদিন থেকে এই অভিনেতা আমার শৈশবের মনের কোঠায় ঠাই পেয়ে গিয়েছিলেন। এরপর 'সংশপ্তক' নাটকের কান কাটা রমজান কে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে এই লোকটি এতো খারাপ তাই ভেবে! তবুও সেই খারাপ 'কান কাটা রমজান' কে ঘৃণা করতে পারিনি শুধু এই ফরিদীর জন্য। যিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন ভালো ও কমেডি চরিত্রে তিনি যেমন সফল আবার খুব খারাপ/ বদলোকের চরিত্রেও তিনি সফল।সেই 'কান কাটা রমজান' এতো বেশী জনপ্রিয় হয়েছিল যে ৯০ সালে সেই রমজান এর কাহিনী নিয়ে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের নবীন এক সদস্য ;ড্রিমল্যান্ড' ব্যান্ড একটি জনপ্রিয় গানও তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করে যা তাদেরকে জনপ্রিয়তার কাতারে দাঁড় করায়। সেই গান এমনই আলোচিত ও জনপ্রিয় গান হয়ে গেলো যা আজ পর্যন্ত কোন অভিনেতার অভিনীত চরিত্র নিয়ে হয়নি। সেটাই প্রথম সেটাই শেষ। এই গানটির জন্য আজও আমরা 'ড্রিমল্যান্ড' ব্যান্ড কে স্ররন করি। এই গান আমি ও আমার বন্ধু মাহিদ ষষ্ঠ শ্রেণির বিদায়ী ক্লাসের অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করলে উপস্থিত শিক্ষিকা বৃন্দ আমাদের প্রধান শিক্ষিকার রুমে ধরে নিয়ে যান। আমরা তো ভয়ে অস্থির যে গান গেয়ে কি বিপদে না পড়লাম যার জন্য শাস্তি পেতে হবে! কারন আমাদের তৎকালীন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন খুবই কঠোর যার কারনে সবাই ভয় পেতো। উনার জন্যই আমাদের স্কুলের সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অন্যতম এবং সিলেট জেলার প্রথম স্থান অধিকারী ছিল আমাদের স্কুল। যাই হোক প্রধান শিক্ষিকার রুমে যাওয়া মাত্রই যা ঘটলো তা আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পষ্ট মনে থাকবে। আমাদের ধরে নিয়ে আসা শিক্ষিকা বৃন্দ প্রধান শিক্ষিকাকে বললেন '' আপা এই ২জন একটা গান শুনিয়েছে আমাদের, আপনাকে সেই গানটা শোনানোর জন্য ওদের ধরে নিয়ে আসলাম''। প্রধান শিক্ষিকা বললেন '' কিরে ? কি গান গেয়েছিস? শোনা তো"। আমরা ২দুজন তখন কাঁদো কাঁদো অবস্থায় বললাম '' টিচার আমাদের ভুল হয়ে গেছে , আমরা আর গান গাইবো না, আমাদের ক্ষমা করে দিন''। আমাদের কথা শুনে রুমে থাকা প্রধান শিক্ষিকা সহ উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন। আমাদের ধরে নিয়ে আসা সুনন্দা ম্যাডাম বললেন "তোদের ভঁয় নাই, অনুষ্ঠানে যেমন গেয়েছিস তেমনই করে গেয়ে শোনা সবাইকে।" এরপর আমরা দুই বন্ধু আবার সেই 'কান কাটা রমজান '' এর গান গাইলাম এবং সেদিন উপস্থিত সবাই আমাদের গান শুনে মুগ্ধ তো হলেনই সেই থেকে আমরা ২ বন্ধু রাতারাতি সব শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে অতি বাদর / দুষ্ট বালক থেকে '' কান কাটা রমজান'' গানের ক্ষুদে গায়ক হয়ে গেলাম। আজ বারবার সেই স্মৃতি মনে পড়ছে আর চোখ দিয়ে জল ঝড়ছে। যে মানুষটি শুধু নিজেই জনপ্রিয় ছিলেন না তাঁকে নিয়ে কিছু করতে গেলে কিশোর তরুণ রাও জনপ্রিয় হয়ে যায় এমনই এক 'আইকন' ছিলেন প্রিয় হুমায়ূন ফরিদী । এরপর টেলিভিশন ছেড়ে চলে গেলেন চলচ্চিত্রে। আমিও তখন দুরন্ত কিশোর যে তাঁর দলবল নিয়ে বাংলা সিনেমা দেখতে নিয়মিত হলে হানা দেয়। হলে হানা দেয়ার পেছনেও এই ফরিদীর প্ররোচনা ছিল প্রবলভাবে। কারন আমরা তখন ফরিদির অভিনয়ের পাগল ভক্ত। সেই দুর্দান্ত সব নায়ক প্রধান ছবির বাজারে আমার দলবল সহ আরও বহু মানুষ 'হুমায়ূন ফরিদী' নামক একটি ভালোবাসার কাছে জিম্মি। তিনি যে ছবিতে আছেন সেই ছবি দেখতেই হবে এমনই ছিল তখন আমাদের ভালোবাসার সম্পর্ক। এমন অনেক ছবি হলে দেখতে গিয়েছিলাম যেখানে আমার প্রিয় নায়ক নায়িকা নেই কিন্তু আছে 'হুমায়ূন ফরিদী' নামক এক ঝড়। একেক ছবিতে একেক রূপে হাজির হয় আর আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যান একেক ডায়লগ । যেমন অপহরণ ছবিতে '' আই আই ও '' ,'' সতর্ক শয়তান'' ছবিতে বুকে ব্যথার ভান করে '' উহ উহ আহ'', ''হিংসা' ছবিতে ''পাশার ভাষা ওরে বুঝাইয়া দে'', ''চোখের পানি' ছবিতে '' ওর রক্ত দিয়া আমি শরবত বানাইয়া খামু , শরবত! শরবত! শরবত!, ''প্রেম দিওয়ানা'' ছবিতে '' কন্যা সাজিল সাজিল, এইরকম অসংখ্য ছবির দুর্দান্ত সব চরিত্র দিয়ে আমাদের হলের পর্দায় দৃষ্টি ধরে রাখতেন এই এই হুমায়ূন ফরিদি। ছবি শুরু হওয়ার পর থেকে কখন হুমায়ূন ফরিদি আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতাম। তাঁকে না দেখা পর্যন্ত ছবিতে কোন আকর্ষণই পেতাম না। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের প্রজন্ম তাঁর সব সেরা কাজ দেখে যেতে পেরেছে আর এই প্রজন্মের জন্য বড়ই দুর্ভাগ্য যে এই প্রজন্ম তাঁর কিছুই পায়নি। এমনিতেই এই প্রজন্ম কোন কিংবদন্তীর সেরা সময় পায়নি তাঁর উপর এভাবে চলে গিয়ে বিরাট ধাক্কা দিয়ে গেলেন। আর কথা না বাড়িয়ে হুমায়ূন ফরিদী আমাদের সেই সময়ে কেমন ছিলেন তাঁর কিছু নমুনা নিচে দেয়া হলো। তিনি পুরোপুরি বাণিজ্যিক ছবিতে কেমন করে দর্শকদের একাই ধরে রাখতেন ? কেন আমরা তাঁকে এতো ভালোবাসি? এবং আজ আমরা কি হারালাম সেই প্রশ্নগুলোর জবাব পেয়ে যাবেন আমাদের সংগ্রহশালা থেকে বাছাইকৃত এই ভিডিওগুলো দেখে। আল্লাহ যেন তাঁকে আমাদের ভালো রাখেন এই দোয়া করি।
রমজান চোরটার কান কাইটাছে- স্বপন চৌধুরী ( ড্রিমল্যান্ড ১৯৯০)
হুমায়ূন ফরিদির আরও সংগ্রহ দেখতে চাইলে ও পেতে চাইলে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করতে পারেন।
রেডিও বিজি২৪ / বাংলার দুর্লভ সংগ্রহশালা
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১০:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


