কেস স্টাডি-১: থেমে গেল জীবন যাত্রা
মেয়েটির নাম উম্মে কুলছুম (ছদ্ম)। সেই ছোট কালেই মারা গেছেন বাবা। বাবার দেয়া নাম ফুলবানু। মেয়েটি অনেক সুন্দরী তাই বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘ফুলবানু’। বিধবা মায়ের সংসারে মাধ্যমিক শিক্ষা অবসান করতে পারেনি মেয়েটি। কিন্তু ঢাকার মানিকগঞ্জের নিজের এলাকায় ৮ম শ্রেণীতে সেরা মেধাবী হবার গৌরব অর্জন করে। বড় একটি বোন ও এক মা। এই নিয়ে তাদের সংসার। সংসারে লেগেই আছে অভাব-অনটন। হঠাৎ একদিন স্থানীয় দালাল এসে ফুলবানুর মাকে যুক্তি দিল ফুলবানুকে বিদেশ পাঠিয়ে দিলে হাসপাতালে চাকরি পাবে পরিস্কার করার কাজ। বেতন থাকবে মাসে বাংলাদেশী টাকায় ১৮ হাজার আর সাথে খাবার-থাকা সব ফ্রি। অভাবের সংসারে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন মা। দালালের চাহিদা মতো ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকাও দিলেন সুদ করে ও স্বামীর রেখে যাওয়া নিজের ভিটের কিছু অংশ বিক্রি করে। ফুলবানু আসলো দুবাইতে। এখানে খাপ মেরে বসে ছিল দুবাইয়ের স্থানীয় দালাল। এয়াপোর্ট থেকে বের হতেই সে ফুলবানুকে রিসিভ করলো। নিয়ে গেল নিজের একা একটি ফ্ল্যাটে। ফুলবানু জিজ্ঞেস করলো আমার হাসপাতালে কখন যাবো। দালালের পরিকল্পিত উত্তর কাল যাবে। আজ এখানে বিশ্রাম কর। কেমন যেন ফুলবানুর আকাশটা কালো হতে লাগলো। সে আল্লাহকে স্মরণ করতো লাগলো। চোরকি শুনে ধর্মের কাহিনী তাই সেইদিনই ফুলবানুর জীবনে ঘটে যায় অবিশ্বাস্য ঘটনা। হারিয়ে যায় তার বেঁচে থাকার অবলম্বন সতীত্ব। এরকম অনেক দিন চলে তার উপর অত্যাচার। সে বাড়িতে চাইলেও ফোন করতে পারেনা। অপরদিকে মায়ের সুদের টাকার কথা মনে হলে নিজেকে বড়ই অপরাধী লাগে এমনটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন ফুলবানু। এরকম দেড়মাস অত্যাচার চলে তার উপর। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বিপথগামীদের হাতে। নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্বেও ফুলবানু গলাটিপে হত্যা করে নিজের সাধ আহ্লাদকে। সেও হয়ে যায় তাদেরই একজন...
কেস স্টাডি-২: কতদিন ধরে মা ডাক শুনা হয়নি জুলেখার“ভাইরে লেখি আর কি অইব? যা অইবার ত অইগেছে। হেয়ার হরেও লেখেন যাতে অইন্য কেউ এরুকম ন আইয়ে। আই আর মতো এ রুকম কষ্ট না করে”। এমন সিদা সাপ্টা উত্তর মধ্যবয়সী নারী শ্রমিক জুলেখার। পঙ্গু স্বামীর সংসারে সন্তানদের মানুষ করতে ২ বছর আগে এসেছেন আমিরাতের আবুধাবীতে। কাজ করছেন একটি আরবী বাসায়। বিদেশ আসতে তাকে দিতো হয়েছে ১ লক্ষ টাকা। দালাল ভিসাটি ফ্রি পেয়েছে। কিন্তু জুলেখার কাছ থেকে নিয়েছে ক্যাশ টাকা। তাও আবার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে দেনা ও গ্রামীন ব্যাংকের সুদ দিয়ে। সেই ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। আসার সময় দালাল বলেছিল আরবী একটি বাচ্চাকে দেখাশুনার কাজ। কিন্তু এখানে এসে দেখে ঘটেছে তার ব্যতিক্রম। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও মাসের শেষে নিজের ভাগ্যে জুটেনি বেতনটা। দালাল বলেছিল মাসে ৭০০ দেরহাম বেতন পাবে। সাথে ঈদে থাকবে বকশিশ। আসার প্রথম বছরে ৩৫০ দেরহাম করে বেতন পেলেও গত ৩ মাস ধরে বেতনটা পাচ্ছেনা। সেই সাথে সন্তানদের মুখ থেকে মা ডাক শুনা হয়নি ২মাস ধরে। আরবী ঘরে থাকে বিধায় আশেপাশে কোথাও ফোনের সুবিধা নেই। কবে যে তার তার দেনা শোধ হবে আর দেশে ফিরে সন্তানদের মুখ দেখবে এই চিন্তায় কাটে জুলেখার দিনরাত্রি।
কেস স্টাডি-৩: পরিবার গর্বিত মেয়ে তার অফিসে কাজ করে বলে
ঢাকা শহরের মেয়ে স্বপ্না (ছদ্ম)। ভার্সিটিতে পড়–য়া স্বপ্নার শখ ছিল শিক্ষক হবার। কিন্তু ভাইহীন সংসারে পরিবারের চাকা সচল করার আশায় পাড়ি জমায় আমিরাতের শারজাহতে। সে জানে তার ভিসা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের। ভিসায়ও লিখা তাই। কিন্তু এখানে এসেই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে লড়াই করে নাচ করতে হয় তাকে। অন্যের মন ভুলিয়ে নিজের পরিবারের চাকা সচল রাখতে হচ্ছে তাকে। পরিবারের সবাই গর্বিত তার মেয়ে অফিসে কাজ করে বলে। মেয়েও মাসে মাসে টাকা পাঠায় যা দিয়ে চলে যায় তাদের সংসার। কিন্তু তারচে’ দ্বিগুন টাকা চলে যায় মধ্যভোগী দালালের পকেটে। নিজের ভবিষ্যৎ ও মধ্যভোগী দালালের প্রতারণায় বিষণœতায় আছে স্বপ্নারা। না পারছে মুখ ফুটে কিছু বলতে আবার না পারছে এ পথ থেকে ফিরেও আসতে। স্বপ্নারা জানেনা তাদের ভাগ্যে কি আছে?
এতো মাত্র তিনটি দৃশ্য উপস্থাপন করা হল ভিন্ন চিত্রে। এরকম আরো হাজারো দৃশ্যের রূপায়ন ঘটছে আরব আমিরাতের এই মরুর বুকে। ফুলবানু, জুলেখা বা স্বপ্নারা এক অজানা পথে আছে। তারা নিজেই জানেনা কখন শেষ হবে তাদের জীবন নামক নাটকের মঞ্চায়ন। আরবী বাসায় কাজ, হসপিটালের ক্লিনার কিংবা অন্যান্য সাংসারিক সহযোগিতা মুলক কাজে নারী শ্রমিকরা মূলত আসলেই। তাদের কাজ করতে হয় নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে। কেউবা আবার অমানুষিক কাজ করেও বেতনটা না পাওয়াতে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছেন। এ ফিচার লিখা পর্যন্ত দুবাইতে নিযুক্ত লেবার কনস্যুলের নাসরিন জাহানকে একাধিকবার ফোন করলেও উনাকে পাওয়া যায়নি। তবে উনি অনেকদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বলেছেন-সবাইকে সচেতন হয়ে কাজ করলে এবং সবার সমস্যা কনস্যুলেট সহ সচেতন বাঙালিমহল কে জানালে এ বিষয় রোধ করা সম্ভব। অপরদিকে নারী শ্রমিকদের রয়েছে চাপা ক্ষোভ। এরা নিজেরাই চার দেয়ালের বাইরে আসতে পারেনা। তাই কনস্যুলেটকে কিভাবে বিষয়টি অবহিত করবেন এমন কথা আমিরাতে বসবাসরত নির্যাতিত নারীদের। আর কোন প্রতিশ্র“তির ফুলঝুরি নয় বাস্তবে এই কাজগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। যাতে ফুলবানুদের আর হারিয়ে যেতে না হয়। এমন প্রত্যাশা দেশপ্রেমী প্রত্যেক বাঙালির।
লেখক: সম্পাদক, মাসিক মুকুল, দুবাই, আরব আমিরাত।
নতুনদেশ
Click This Link target='_blank' >নিউজবাংলা
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১০ বিকাল ৫:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



