somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমিরাতে বাঙালি নারী শ্রমিক: ফুলবানুরা হারিয়ে যায়

০৭ ই জুলাই, ২০১০ রাত ১০:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের মতো বিদেশের মাটিতেও আমাদের নারী শ্রমিকেরা পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সচল রাখছে সংসারের চাকা। আর দেশকে করছে সমৃদ্ধ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। কিন্তু এসব নারী শ্রমিকের না জানা অনেক ঘটনা ঘটে যায়। যা স্থান পায়না পত্রিকার পাতায়। কেউ রাখেনা তাদের খবর। সংসদে সরকারি দল নিজেদের গুণগান ও বিরোধী দলের সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত। অপরদিকে বিরোধী দলও নানা ইস্যুতে অবরোধ করার অপেক্ষায়। এইতো আমাদের রাজনীতিক গুরদের হালচাল। কিন্তু কেউ খবর রাখেনা সেইসব নারী শ্রমিকদের যারা বৃদ্ধা মা, অসহায় সন্তানাদি কিংবা পরিজনদের মুখে হাসি ফুটাতে পরদেশে পরবাসি হয়ে যায়। নেমে পড়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। অমানুষিক পরিশ্রম আর মাসের শেষে বেতন না পাওয়াতে যাদের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে আত্মচিৎকারে। ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারী শ্রমিকের আমিরাতে আসতে খরচ নাই বল্লেই চলে। অপরদিকে তাদের অবস্থানও ভাল বটে। কিন্তু আমাদের কিছু অসাধু মধ্যভোগী দালালদের প্রতারণা ও দূতাবাসের উদাসীনতায় ঘটে এসব কাজ। আরব আমিরাতে আছেন এমন ক’জন বাঙালি নারী শ্রমিকের দুঃখের কাহিনী নিয়ে এবারের আয়োজন।

কেস স্টাডি-১: থেমে গেল জীবন যাত্রা
মেয়েটির নাম উম্মে কুলছুম (ছদ্ম)। সেই ছোট কালেই মারা গেছেন বাবা। বাবার দেয়া নাম ফুলবানু। মেয়েটি অনেক সুন্দরী তাই বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘ফুলবানু’। বিধবা মায়ের সংসারে মাধ্যমিক শিক্ষা অবসান করতে পারেনি মেয়েটি। কিন্তু ঢাকার মানিকগঞ্জের নিজের এলাকায় ৮ম শ্রেণীতে সেরা মেধাবী হবার গৌরব অর্জন করে। বড় একটি বোন ও এক মা। এই নিয়ে তাদের সংসার। সংসারে লেগেই আছে অভাব-অনটন। হঠাৎ একদিন স্থানীয় দালাল এসে ফুলবানুর মাকে যুক্তি দিল ফুলবানুকে বিদেশ পাঠিয়ে দিলে হাসপাতালে চাকরি পাবে পরিস্কার করার কাজ। বেতন থাকবে মাসে বাংলাদেশী টাকায় ১৮ হাজার আর সাথে খাবার-থাকা সব ফ্রি। অভাবের সংসারে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন মা। দালালের চাহিদা মতো ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকাও দিলেন সুদ করে ও স্বামীর রেখে যাওয়া নিজের ভিটের কিছু অংশ বিক্রি করে। ফুলবানু আসলো দুবাইতে। এখানে খাপ মেরে বসে ছিল দুবাইয়ের স্থানীয় দালাল। এয়াপোর্ট থেকে বের হতেই সে ফুলবানুকে রিসিভ করলো। নিয়ে গেল নিজের একা একটি ফ্ল্যাটে। ফুলবানু জিজ্ঞেস করলো আমার হাসপাতালে কখন যাবো। দালালের পরিকল্পিত উত্তর কাল যাবে। আজ এখানে বিশ্রাম কর। কেমন যেন ফুলবানুর আকাশটা কালো হতে লাগলো। সে আল্লাহকে স্মরণ করতো লাগলো। চোরকি শুনে ধর্মের কাহিনী তাই সেইদিনই ফুলবানুর জীবনে ঘটে যায় অবিশ্বাস্য ঘটনা। হারিয়ে যায় তার বেঁচে থাকার অবলম্বন সতীত্ব। এরকম অনেক দিন চলে তার উপর অত্যাচার। সে বাড়িতে চাইলেও ফোন করতে পারেনা। অপরদিকে মায়ের সুদের টাকার কথা মনে হলে নিজেকে বড়ই অপরাধী লাগে এমনটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন ফুলবানু। এরকম দেড়মাস অত্যাচার চলে তার উপর। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বিপথগামীদের হাতে। নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্বেও ফুলবানু গলাটিপে হত্যা করে নিজের সাধ আহ্লাদকে। সেও হয়ে যায় তাদেরই একজন...

কেস স্টাডি-২: কতদিন ধরে মা ডাক শুনা হয়নি জুলেখার“ভাইরে লেখি আর কি অইব? যা অইবার ত অইগেছে। হেয়ার হরেও লেখেন যাতে অইন্য কেউ এরুকম ন আইয়ে। আই আর মতো এ রুকম কষ্ট না করে”। এমন সিদা সাপ্টা উত্তর মধ্যবয়সী নারী শ্রমিক জুলেখার। পঙ্গু স্বামীর সংসারে সন্তানদের মানুষ করতে ২ বছর আগে এসেছেন আমিরাতের আবুধাবীতে। কাজ করছেন একটি আরবী বাসায়। বিদেশ আসতে তাকে দিতো হয়েছে ১ লক্ষ টাকা। দালাল ভিসাটি ফ্রি পেয়েছে। কিন্তু জুলেখার কাছ থেকে নিয়েছে ক্যাশ টাকা। তাও আবার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে দেনা ও গ্রামীন ব্যাংকের সুদ দিয়ে। সেই ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। আসার সময় দালাল বলেছিল আরবী একটি বাচ্চাকে দেখাশুনার কাজ। কিন্তু এখানে এসে দেখে ঘটেছে তার ব্যতিক্রম। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও মাসের শেষে নিজের ভাগ্যে জুটেনি বেতনটা। দালাল বলেছিল মাসে ৭০০ দেরহাম বেতন পাবে। সাথে ঈদে থাকবে বকশিশ। আসার প্রথম বছরে ৩৫০ দেরহাম করে বেতন পেলেও গত ৩ মাস ধরে বেতনটা পাচ্ছেনা। সেই সাথে সন্তানদের মুখ থেকে মা ডাক শুনা হয়নি ২মাস ধরে। আরবী ঘরে থাকে বিধায় আশেপাশে কোথাও ফোনের সুবিধা নেই। কবে যে তার তার দেনা শোধ হবে আর দেশে ফিরে সন্তানদের মুখ দেখবে এই চিন্তায় কাটে জুলেখার দিনরাত্রি।

কেস স্টাডি-৩: পরিবার গর্বিত মেয়ে তার অফিসে কাজ করে বলে
ঢাকা শহরের মেয়ে স্বপ্না (ছদ্ম)। ভার্সিটিতে পড়–য়া স্বপ্নার শখ ছিল শিক্ষক হবার। কিন্তু ভাইহীন সংসারে পরিবারের চাকা সচল করার আশায় পাড়ি জমায় আমিরাতের শারজাহতে। সে জানে তার ভিসা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের। ভিসায়ও লিখা তাই। কিন্তু এখানে এসেই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে লড়াই করে নাচ করতে হয় তাকে। অন্যের মন ভুলিয়ে নিজের পরিবারের চাকা সচল রাখতে হচ্ছে তাকে। পরিবারের সবাই গর্বিত তার মেয়ে অফিসে কাজ করে বলে। মেয়েও মাসে মাসে টাকা পাঠায় যা দিয়ে চলে যায় তাদের সংসার। কিন্তু তারচে’ দ্বিগুন টাকা চলে যায় মধ্যভোগী দালালের পকেটে। নিজের ভবিষ্যৎ ও মধ্যভোগী দালালের প্রতারণায় বিষণœতায় আছে স্বপ্নারা। না পারছে মুখ ফুটে কিছু বলতে আবার না পারছে এ পথ থেকে ফিরেও আসতে। স্বপ্নারা জানেনা তাদের ভাগ্যে কি আছে?

এতো মাত্র তিনটি দৃশ্য উপস্থাপন করা হল ভিন্ন চিত্রে। এরকম আরো হাজারো দৃশ্যের রূপায়ন ঘটছে আরব আমিরাতের এই মরুর বুকে। ফুলবানু, জুলেখা বা স্বপ্নারা এক অজানা পথে আছে। তারা নিজেই জানেনা কখন শেষ হবে তাদের জীবন নামক নাটকের মঞ্চায়ন। আরবী বাসায় কাজ, হসপিটালের ক্লিনার কিংবা অন্যান্য সাংসারিক সহযোগিতা মুলক কাজে নারী শ্রমিকরা মূলত আসলেই। তাদের কাজ করতে হয় নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে। কেউবা আবার অমানুষিক কাজ করেও বেতনটা না পাওয়াতে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছেন। এ ফিচার লিখা পর্যন্ত দুবাইতে নিযুক্ত লেবার কনস্যুলের নাসরিন জাহানকে একাধিকবার ফোন করলেও উনাকে পাওয়া যায়নি। তবে উনি অনেকদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বলেছেন-সবাইকে সচেতন হয়ে কাজ করলে এবং সবার সমস্যা কনস্যুলেট সহ সচেতন বাঙালিমহল কে জানালে এ বিষয় রোধ করা সম্ভব। অপরদিকে নারী শ্রমিকদের রয়েছে চাপা ক্ষোভ। এরা নিজেরাই চার দেয়ালের বাইরে আসতে পারেনা। তাই কনস্যুলেটকে কিভাবে বিষয়টি অবহিত করবেন এমন কথা আমিরাতে বসবাসরত নির্যাতিত নারীদের। আর কোন প্রতিশ্র“তির ফুলঝুরি নয় বাস্তবে এই কাজগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। যাতে ফুলবানুদের আর হারিয়ে যেতে না হয়। এমন প্রত্যাশা দেশপ্রেমী প্রত্যেক বাঙালির।

লেখক: সম্পাদক, মাসিক মুকুল, দুবাই, আরব আমিরাত।


নতুনদেশ

Click This Link target='_blank' >নিউজবাংলা
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১০ বিকাল ৫:২৬
১২টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×