জমাট অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বিডিআর সদরদপ্তরের দিকে এখনো তাকিয়ে শত শত চোখ। কারো চোখ ভেজা, কারোবা কান্না শুকিয়ে রূদ্রমূর্তি। স্বজনের আহাজারি। কান্নার রোলে বাতাস ভারি হয়ে আসে। গুমোট অন্ধকারে মুখ চেনা যায় না। তবুও কান্নাই বলে দেয় এখানে কারা এসেছেন স্বজনের খোঁজে আর কে উৎসাহে। উৎকণ্ঠিত অথচ উৎসাহি মানুষও উপস্থিত। নানা আলাপ, নানা প্রলাপ।
লাশ মিলছে লাশ। গত বুধবার সকালেও এই লাশগুলো কথা বলেছে। হয়তো কেউ কেউ বউ আর সন্তানকে দিয়ে এসেছেন বায়না পূরণের আশ্বাস। সকালে ঘুম থেকে ওঠে পায়ের মোজা না পেয়ে স্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হয়েছে- এমনও ভুলোমনা কর্মকর্তা হয়তো আছে লাশের তালিকায়।
আমারো এমন হয়। মাঝে মাঝে একপাটি জুতো পাই তো আরেকটা নেই। খুঁজে এনে ‘বীর বউ’ আমার কাছে শোনাতে থাকে সেই বীরত্বের কাহিনী। বাধ্য হয়ে আমাকেও শুনতে হয় ওসব! আমি হাসি। হাসে মহারাণী।
একেকটা লাশের সন্ধান মেলে আর আমার মনে ভেসে ওঠে- গ্রামের বাড়িতে তাদের বাবা মায়ের আহাজারি। সন্তান গিয়েছে তাদের, সন্তান। কারোবা ভাই, কারোবা দাদা। ওরা এখন লাশ। দুদিন আগেও ছিলেন প্রতাপশালী বিডিআর কর্মকর্তা। আজ তারা লাশ। সামনে পদবী। পেছনে প্রথম বন্ধনীতে বয়স।
এক একটা লাশ মেলে আর বুকের মাঝে কেমন কেমন অনুভব হয়। একেই কী বলে কষ্ট? ২২ আগস্টের রাতে সেনা কর্মকর্তারা যেদিন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বেদম মেরেছিলেন সেদিনের কষ্টটা আজ সহানুভূতি হয়ে গেল কী করে। সত্যিই আমি কষ্ট পাচ্ছি। প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের ছোট করে দেয়। যে গেছে সে কি আর ফিরে আসবে আপনজনের মাঝে।
গণকবরে পাওয়া যাচ্ছে লাশ। উৎসুক অথচ আতঙ্কিত মানুষের কৌতুহল- কতটি পাওয়া গেল। ওরা এখন সংখ্যা।
হিসেব মেলে না পত্রিকা অফিসে। আসলেই কতজন গেল। গেল? কে গেল? ওরা যায়নি, ওরা আছে সংবাদ হয়ে। লাল অক্ষরে। বিদ্রোহের রঙও লাল! নামগুলোও জ্বলছে লাল হয়ে, পত্রিকার পাতায়।
‘মানবিক স্টোরি করতে হবে। ওকে ধরতে হবে, ওর স্বামী নাকি মেজর ছিল। ছোট একটা ছেলে আছে। স্টোরি হতে হবে সেরকম। কাঁদতে হবে, কাঁদাতে হবে’- সংবাদ ওয়ালার এভাবেই বলে। বলে বললে ভুল হবে নির্দেশ দেয় কর্মীদের।
অথচ কান্না থামানোর কেউ নেই। আমরা সংখ্যা নিয়ে ব্যস্ত। আমরা শব্দ নিয়ে ব্যস্ত। আমরা মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ত। দম বন্ধ হয়ে আসে এসবে। ভাল্লাগে না। লাগছেও না।
শুনলাম ৪৭টি লাশ পাওয়া গেছে একটি গণকবর থেকে। বিভৎস্য। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করে!
ফটোগ্রাফার ছবি তুলে আনলেন বিডিআর জওয়ানদের। যারা এখনো সেই সদরদপ্তরে আছেন। বাইরে তাদের শোকাতর, উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি। পরিণতি তাদের অজানা। ফোনে কথা বলছেন কেউ কেউ। শেষ কথা হয়তো। শেষ কথা।
কার কথা বলবো? কার পক্ষে যাবো? মৃত্যুর পক্ষে তবু নয়। সব মৃত্যুই আমাকে ছোট করে দেয়। প্রতিটি মৃত্যুই আমাকে জীবনের হাতছানি দেয়।
ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর সৌজন্যে পাওয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


