ক'দিন ধরে প্রকৃতি কেবল ভুলিয়ে দিচ্ছে নানান রূপ ধরে । বর্ষা বলে কথা ; এক এক সময়ে এক একরূপ । ব্লগে এক একজনের পোষ্ট দেখে কেবল হারিয়ে যাই , ফিরতে ইচ্ছে করে না ।
প্রকৃতি ডাকে হাতছানি দিয়ে , ঘাড় ফিরিয়ে নেই , স্বার্থপর হতে গিয়ে বঞ্চিত হই । মনে ইচ্ছে জাগে হারিয়ে যেতে , হারাই মনে মনে ।
একটা ছবি আসে মনে , অনেক ছোট ছিলাম , আম্মার নানা বাড়ী গিয়েছিলাম আমার নানা বাড়ী থেকে নৌকায় করে । বর্ষায় বিলের জল কাচের গ্লাসে লাল চায়ের মত রং , স্বচ্ছ , শান্ত । আকাশের ছায়া , বিলের বিভিন্ন গাছের , লতার ছায়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল । বড় হয়ে কাকচক্ষুর মত জল কাকে বলে জেনেছি সেই ছবিটা মনে করে । গন্তব্যে পৌছে আমার পাগল হবার মত অবস্থা ! কত রকমের নাম না জানা গাছ , পাতা , ফুল । লোকে বলে আগাছা । কোনটা রেখে কোনটা তুলি , খেলব ওসব দিয়ে । যেখানে গিয়েছিলাম সেখানে সাজানো পথ দেখিনি , পথ বানিয়ে চলতে হয়েছিল আম্মার হাত ধরে । নিজেকে রূপকথার রাজকন্যা মনে হয়েছিল ,জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা । সেবার পুরো অভিজ্ঞতাটাই অসম্ভব ভাল লাগায় ভরে গিয়েছিল , এখনও আছে । পরবর্তী জীবনে বিভূতি ভূষন পড়তে গিয়ে মনে হল সব আমার জানা । বিভূতি ভুষন আমার সবচেয়ে প্রিয় ক'জন লেখকের একজন , সম্ভবত: তার প্রকৃতি প্রেমের কারনে , প্রকৃতির কাছে নিবেদনের জন্য যে সত্ত্বা লালন করি সেটা উনি শেষ আঁচড়ে সম্পূর্ন করে দিয়েছেন । কিছুদিন আগে একজন পরিচিতা বললেন তাদের ভারতে যে বাড়ি আছে বেড়াবার জন্য সেখানে , লোকেশনটা জেনে বললাম , বারাকপুর , বনগ্রাম তো আপনাদের কাছে , বিভুতিভুষনের বাড়ী । উনি জানালেন , বিভুতি পল্লী নামে এখন আছে , অনেকে যায় তবে আমি যেমন বলছিলাম তেমন নেই , অনেক বদলে গেছে । মনটা বিষন্ন হয়ে গেল । পড়তে পড়তে আজ অনেক বছর ধরে যে বইয়ের পাতাগুলো প্রায় ক্ষয়ে গেছে সেটা হল , "যুই যুথিকা " বিভুতিভুষনের দিনলিপি ধরনের ।
ওনার আরণ্যক পড়ে এখনও হারিয়ে যাই গভীর অরন্যে ।
বেশ কিছুদিন আগে জাপান সরকারের প্রতিনিধিদল এসেছিল বাচ্চাদের ওজন নেয়ার ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা মাথায় রেখে ; তৃনমূল পর্যায়ে তাদের কিছু দেখবার ছিল । গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের একটা জায়গায় গিয়েছি তাদের নিয়ে , যথারীতি অফিসিয়াল আচরন বজায় রেখেছি । এক এক সময় চোখ এবং মন দুটোই চলে যাচ্ছিল বাইরের গাছপালার দিকে । নাকটাও বড় বেয়াড়া , নানান রকম গন্ধে বিভোর হয়ে যাচ্ছিল । কাজের অনেকটা এগিয়ে দিয়ে মিকোকো নামের একজন এবং আরেকজন ৭০ বছরের যুবতী জাপানী অধ্যাপিকাকে ফাকি দিয়ে পাশের জঙ্গলে চলে গেলাম আমার পিওন মহিলাকে সাথে নিয়ে । সে বেচারা আমাকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেল । আমি এ গাছের ডাল ভাঙি , ও গাছের পুরোটাই উপড়ে নেই , উত্তেজনায় স্থান কাল পাত্র ভুলে তাকে চেনাবার চেষ্টা করতে গেলে সে বলে " আপা আমাদের বাড়ী এখান থেকে বেশী দূরে নয় , এ সব আমাদের চেনা ।" যাহোক তথাকথিত আগাছা সংগ্রহ করে হাত ভরে ফেলেছি । সাথের জনকে বললামসেগুলো যত্ন করে নিতে , কেউ জিজ্ঞেস করলে সে বলবে এসব তার কালেকশন , । সে শুধু একটু হাসল ; ফিরব বলে গাড়ীতে উঠেছি সবাই । জাপানী অধ্যাপিকার চোখে পড়ল , উনি ভাল ইংরেজী পারতেন । নাইস নাইস বলে উঠলেন । আমি চুপ । বাঙালী দোভাষী ভদ্রলোক আছেন একজন সাথে । সে কেমন যেন মুচকী হেসে বললেন , " এ সব লতা পাতা আগাছা কে নিয়ে চলল ? কার প্রয়োজন এসবে ?" আমি নিশ্চিত যে আমার নাম আসবে না । কিন্তু আমার সাথে বেঈমানী করে পিওন বলে দিল , " আপা নিয়েছে এ সব , আপা যে কত গাছের নাম জানেন , আমরাও জানি না " । আমি খানিকটা লজ্জায় পড়ে গেলাম , বাচ্চাদের মত কি সব কুড়িয়েছি । বাঙালী ভদ্রলোক বললেন , " আপনার বোটানী পড়বার কথা ছিল বুঝতে পারছি ।" কথাটা মিথ্যে বলেন নি উনি । বোটানী এবং বাংলায় পড়তে পারিনি বলে আক্ষেপ যে হয় না তা নয় । তবে পুষিয়ে নেই বোটানী আর বাংলাকে ভালবেসে ।
আরেকবার উত্তরবঙ্গ থেকে বাসে আসছিলাম , ফেব্রুয়ারী মাস ছিল । রাস্তার দু পাশে দেখতে দেখতে উচ্ছসিত হয়ে পড়ছিলাম । পাশে বসা সহপাঠি জলিকে বিভিন্ন দৃশ্য আর গাছের কথা বলছি , সে বেচারা অনেকক্ষন সয়েছে , পরে বলল , " তুমি মনে হয় জাননা , আমাদের দেশের বাড়ী এ দিকে , বছরে কম করে হলেও একবার আমরা আসি এ রাস্তা ধরে ?" বাঁচা গেল , ওকে আর চেনাতে হল না বাকী পথের প্রকৃতির বিভিন্ন বাহার !
আরেকবার বগুড়া বেড়ালাম , মহাস্থানগড় , বেহুলার বাসরঘর , নবাববাড়ী আরো কয়েকটা জায়গা । বান্ধবীর বাবা জানতে চাইলেন "কি ভাল লেগেছে সবচেয়ে ? " বললাম " পাহাড় " । উনি অবাক হলেন যে পাহাড় কোথায় পেলাম । বান্ধবী চিনিয়ে দিলেন ওনাকে যে বগুড়া রংপুর হাইওয়ের পাশে একটা উঁচু টিলা মত জায়গা আছে সেটার কথা বলেছি আমি ।
আমাদের স্থায়ী ঠিকানায় যে বাড়ীটা আছে সেখান থেকে গেঁথে গেছে প্রকৃতির কাছে হারিয়ে যাওয়ার অসুখ । তার জন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয় । আম্মাকে বলেছি আমি পেছনের গাছপালার মধ্যে যাব । আম্মা না করেননি । বলেছেন , "একটা কাঠি রাখবে , সামনে নেড়ে হাটবে , নাকে মুখে মাকড়সার জাল জড়িয়ে যেতে পারে "। ওইটুকু উদ্বেগ নিয়ে বেরিয়ে দেখি উদ্বেগটাই আনন্দ হয়ে গেছে ! সকালের আলো পড়েছে মাকড়সার জালে , রংধনুর সাত রং খেলা করছে সেখানে । মুগ্ধ হয়ে দাড়িয়ে দেখেছি । দূর থেকে উইঢিবি দেখে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শিউরে ওঠা ! গায়ে কি যেন পড়ল ! দেখি এক দমকা বাতাসে হিজল ফুল আমার মাথায় , কাঁধে , ওড়নায় ! সেই থেকে হিজল ফুলের গোপন প্রনয়ী । আমার টবে শোভা পাচ্ছে হিজল গাছ। উঠোনে ফিরব , দেখি কাপড় টেনে ধরেছে , কেউ নেই পাশে ; নীচু হয়ে তাকিয়ে দেখি বেতস লতা !
আমাদের গেটের কাছে মাধবী লতা আছে অপরাজিতার পাশে জানতাম । একবার নিমন্ত্রন রক্ষা করে ফিরছি বাড়ীর উল্টোদিকের খাল পার দিয়ে । গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে দাড়িয়ে গেলাম । গেটের পাশের বড় শিমুল গাছটা ঢেকে অনেক উচুঁ থেকে নেমে আসছে মাধবী লতা । এক একবার আতা ফুলের কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ মন উড়িয়ে নিয়ে যেত কোন সুদূরে ।
এসব লিখে শেষ করা যাবে না । মাঝে মাঝে বরকে মনে করিয়ে দেই গাছের লিস্ট । ঢাকার অদূরে শ্বশুর প্রদত্ত জায়গায় আমি কি কি গাছ লাগাব । শিমুল , তাল , বাঁশ , হিজল , নিম , নারিকেল , খেঁজুর , বেল , সোনালু , চৈ ,বেত , পলাশ , জিয়ল ,কাগজী লেবু , আম , কাঠাল ,বেল , বরই , জারুল ইত্যাদি ইত্যাদি । সে মনে করিয়ে দেয় জায়গার পরিমান । কি আসে যায় পরিমানে । মনের মধ্যে অনেক জায়গা বাকীগুলো সেখানে লাগাব ।
কলেজ জীবনের একটা কথা সত্যি প্রমানিত হল এ লেখায় , বাংলা ' দিবা অবসান ' প্রবন্ধে একটা লাইন ছিল , " যত ইচ্ছা দেখতে পারি ফুরিয়ে যাবে না " আমার সহপাঠিরা আমাকে বলত " যত ইচ্ছা লিখতে পারি ফুরিয়ে যাবে না " ।
# এলেখার জন্য কৃতজ্ঞতা আমার ছেলে আয়মানের কাছে ,কিছুক্ষন আগে রাতে খাবার টেবিলে সে বলছিল , বড় হয়ে লন্ডন যাবে পড়তে , তখন নাকি তার বউ থাকবে , বাচ্চা থাকবে , বাচ্চার জন্য ব্যাকুগান খেলনা আনবে , আমার জন্য শাড়ী । ওর বোন বলল বউয়ের জন্য কি আনবে ভাইয়া ? জবাব দিল , বউয়ের জন্য আনব গাছ , আম্মুর মত খুশী হবে সে ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

