somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যত ইচ্ছা লিখতে পারি ফুরিয়ে যাবে না

০১ লা আগস্ট, ২০০৯ রাত ১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ক'দিন ধরে প্রকৃতি কেবল ভুলিয়ে দিচ্ছে নানান রূপ ধরে । বর্ষা বলে কথা ; এক এক সময়ে এক একরূপ । ব্লগে এক একজনের পোষ্ট দেখে কেবল হারিয়ে যাই , ফিরতে ইচ্ছে করে না ।
প্রকৃতি ডাকে হাতছানি দিয়ে , ঘাড় ফিরিয়ে নেই , স্বার্থপর হতে গিয়ে বঞ্চিত হই । মনে ইচ্ছে জাগে হারিয়ে যেতে , হারাই মনে মনে ।

একটা ছবি আসে মনে , অনেক ছোট ছিলাম , আম্মার নানা বাড়ী গিয়েছিলাম আমার নানা বাড়ী থেকে নৌকায় করে । বর্ষায় বিলের জল কাচের গ্লাসে লাল চায়ের মত রং , স্বচ্ছ , শান্ত । আকাশের ছায়া , বিলের বিভিন্ন গাছের , লতার ছায়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল । বড় হয়ে কাকচক্ষুর মত জল কাকে বলে জেনেছি সেই ছবিটা মনে করে । গন্তব্যে পৌছে আমার পাগল হবার মত অবস্থা ! কত রকমের নাম না জানা গাছ , পাতা , ফুল । লোকে বলে আগাছা । কোনটা রেখে কোনটা তুলি , খেলব ওসব দিয়ে । যেখানে গিয়েছিলাম সেখানে সাজানো পথ দেখিনি , পথ বানিয়ে চলতে হয়েছিল আম্মার হাত ধরে । নিজেকে রূপকথার রাজকন্যা মনে হয়েছিল ,জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা । সেবার পুরো অভিজ্ঞতাটাই অসম্ভব ভাল লাগায় ভরে গিয়েছিল , এখনও আছে । পরবর্তী জীবনে বিভূতি ভূষন পড়তে গিয়ে মনে হল সব আমার জানা । বিভূতি ভুষন আমার সবচেয়ে প্রিয় ক'জন লেখকের একজন , সম্ভবত: তার প্রকৃতি প্রেমের কারনে , প্রকৃতির কাছে নিবেদনের জন্য যে সত্ত্বা লালন করি সেটা উনি শেষ আঁচড়ে সম্পূর্ন করে দিয়েছেন । কিছুদিন আগে একজন পরিচিতা বললেন তাদের ভারতে যে বাড়ি আছে বেড়াবার জন্য সেখানে , লোকেশনটা জেনে বললাম , বারাকপুর , বনগ্রাম তো আপনাদের কাছে , বিভুতিভুষনের বাড়ী । উনি জানালেন , বিভুতি পল্লী নামে এখন আছে , অনেকে যায় তবে আমি যেমন বলছিলাম তেমন নেই , অনেক বদলে গেছে । মনটা বিষন্ন হয়ে গেল । পড়তে পড়তে আজ অনেক বছর ধরে যে বইয়ের পাতাগুলো প্রায় ক্ষয়ে গেছে সেটা হল , "যুই যুথিকা " বিভুতিভুষনের দিনলিপি ধরনের ।
ওনার আরণ্যক পড়ে এখনও হারিয়ে যাই গভীর অরন্যে ।

বেশ কিছুদিন আগে জাপান সরকারের প্রতিনিধিদল এসেছিল বাচ্চাদের ওজন নেয়ার ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা মাথায় রেখে ; তৃনমূল পর্যায়ে তাদের কিছু দেখবার ছিল । গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের একটা জায়গায় গিয়েছি তাদের নিয়ে , যথারীতি অফিসিয়াল আচরন বজায় রেখেছি । এক এক সময় চোখ এবং মন দুটোই চলে যাচ্ছিল বাইরের গাছপালার দিকে । নাকটাও বড় বেয়াড়া , নানান রকম গন্ধে বিভোর হয়ে যাচ্ছিল । কাজের অনেকটা এগিয়ে দিয়ে মিকোকো নামের একজন এবং আরেকজন ৭০ বছরের যুবতী জাপানী অধ্যাপিকাকে ফাকি দিয়ে পাশের জঙ্গলে চলে গেলাম আমার পিওন মহিলাকে সাথে নিয়ে । সে বেচারা আমাকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেল । আমি এ গাছের ডাল ভাঙি , ও গাছের পুরোটাই উপড়ে নেই , উত্তেজনায় স্থান কাল পাত্র ভুলে তাকে চেনাবার চেষ্টা করতে গেলে সে বলে " আপা আমাদের বাড়ী এখান থেকে বেশী দূরে নয় , এ সব আমাদের চেনা ।" যাহোক তথাকথিত আগাছা সংগ্রহ করে হাত ভরে ফেলেছি । সাথের জনকে বললামসেগুলো যত্ন করে নিতে , কেউ জিজ্ঞেস করলে সে বলবে এসব তার কালেকশন , । সে শুধু একটু হাসল ; ফিরব বলে গাড়ীতে উঠেছি সবাই । জাপানী অধ্যাপিকার চোখে পড়ল , উনি ভাল ইংরেজী পারতেন । নাইস নাইস বলে উঠলেন । আমি চুপ । বাঙালী দোভাষী ভদ্রলোক আছেন একজন সাথে । সে কেমন যেন মুচকী হেসে বললেন , " এ সব লতা পাতা আগাছা কে নিয়ে চলল ? কার প্রয়োজন এসবে ?" আমি নিশ্চিত যে আমার নাম আসবে না । কিন্তু আমার সাথে বেঈমানী করে পিওন বলে দিল , " আপা নিয়েছে এ সব , আপা যে কত গাছের নাম জানেন , আমরাও জানি না " । আমি খানিকটা লজ্জায় পড়ে গেলাম , বাচ্চাদের মত কি সব কুড়িয়েছি । বাঙালী ভদ্রলোক বললেন , " আপনার বোটানী পড়বার কথা ছিল বুঝতে পারছি ।" কথাটা মিথ্যে বলেন নি উনি । বোটানী এবং বাংলায় পড়তে পারিনি বলে আক্ষেপ যে হয় না তা নয় । তবে পুষিয়ে নেই বোটানী আর বাংলাকে ভালবেসে ।
আরেকবার উত্তরবঙ্গ থেকে বাসে আসছিলাম , ফেব্রুয়ারী মাস ছিল । রাস্তার দু পাশে দেখতে দেখতে উচ্ছসিত হয়ে পড়ছিলাম । পাশে বসা সহপাঠি জলিকে বিভিন্ন দৃশ্য আর গাছের কথা বলছি , সে বেচারা অনেকক্ষন সয়েছে , পরে বলল , " তুমি মনে হয় জাননা , আমাদের দেশের বাড়ী এ দিকে , বছরে কম করে হলেও একবার আমরা আসি এ রাস্তা ধরে ?" বাঁচা গেল , ওকে আর চেনাতে হল না বাকী পথের প্রকৃতির বিভিন্ন বাহার !
আরেকবার বগুড়া বেড়ালাম , মহাস্থানগড় , বেহুলার বাসরঘর , নবাববাড়ী আরো কয়েকটা জায়গা । বান্ধবীর বাবা জানতে চাইলেন "কি ভাল লেগেছে সবচেয়ে ? " বললাম " পাহাড় " । উনি অবাক হলেন যে পাহাড় কোথায় পেলাম । বান্ধবী চিনিয়ে দিলেন ওনাকে যে বগুড়া রংপুর হাইওয়ের পাশে একটা উঁচু টিলা মত জায়গা আছে সেটার কথা বলেছি আমি ।

আমাদের স্থায়ী ঠিকানায় যে বাড়ীটা আছে সেখান থেকে গেঁথে গেছে প্রকৃতির কাছে হারিয়ে যাওয়ার অসুখ । তার জন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয় । আম্মাকে বলেছি আমি পেছনের গাছপালার মধ্যে যাব । আম্মা না করেননি । বলেছেন , "একটা কাঠি রাখবে , সামনে নেড়ে হাটবে , নাকে মুখে মাকড়সার জাল জড়িয়ে যেতে পারে "। ওইটুকু উদ্বেগ নিয়ে বেরিয়ে দেখি উদ্বেগটাই আনন্দ হয়ে গেছে ! সকালের আলো পড়েছে মাকড়সার জালে , রংধনুর সাত রং খেলা করছে সেখানে । মুগ্ধ হয়ে দাড়িয়ে দেখেছি । দূর থেকে উইঢিবি দেখে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শিউরে ওঠা ! গায়ে কি যেন পড়ল ! দেখি এক দমকা বাতাসে হিজল ফুল আমার মাথায় , কাঁধে , ওড়নায় ! সেই থেকে হিজল ফুলের গোপন প্রনয়ী । আমার টবে শোভা পাচ্ছে হিজল গাছ। উঠোনে ফিরব , দেখি কাপড় টেনে ধরেছে , কেউ নেই পাশে ; নীচু হয়ে তাকিয়ে দেখি বেতস লতা !
আমাদের গেটের কাছে মাধবী লতা আছে অপরাজিতার পাশে জানতাম । একবার নিমন্ত্রন রক্ষা করে ফিরছি বাড়ীর উল্টোদিকের খাল পার দিয়ে । গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে দাড়িয়ে গেলাম । গেটের পাশের বড় শিমুল গাছটা ঢেকে অনেক উচুঁ থেকে নেমে আসছে মাধবী লতা । এক একবার আতা ফুলের কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ মন উড়িয়ে নিয়ে যেত কোন সুদূরে ।

এসব লিখে শেষ করা যাবে না । মাঝে মাঝে বরকে মনে করিয়ে দেই গাছের লিস্ট । ঢাকার অদূরে শ্বশুর প্রদত্ত জায়গায় আমি কি কি গাছ লাগাব । শিমুল , তাল , বাঁশ , হিজল , নিম , নারিকেল , খেঁজুর , বেল , সোনালু , চৈ ,বেত , পলাশ , জিয়ল ,কাগজী লেবু , আম , কাঠাল ,বেল , বরই , জারুল ইত্যাদি ইত্যাদি । সে মনে করিয়ে দেয় জায়গার পরিমান । কি আসে যায় পরিমানে । মনের মধ্যে অনেক জায়গা বাকীগুলো সেখানে লাগাব ।


কলেজ জীবনের একটা কথা সত্যি প্রমানিত হল এ লেখায় , বাংলা ' দিবা অবসান ' প্রবন্ধে একটা লাইন ছিল , " যত ইচ্ছা দেখতে পারি ফুরিয়ে যাবে না " আমার সহপাঠিরা আমাকে বলত " যত ইচ্ছা লিখতে পারি ফুরিয়ে যাবে না " ।

# এলেখার জন্য কৃতজ্ঞতা আমার ছেলে আয়মানের কাছে ,কিছুক্ষন আগে রাতে খাবার টেবিলে সে বলছিল , বড় হয়ে লন্ডন যাবে পড়তে , তখন নাকি তার বউ থাকবে , বাচ্চা থাকবে , বাচ্চার জন্য ব্যাকুগান খেলনা আনবে , আমার জন্য শাড়ী । ওর বোন বলল বউয়ের জন্য কি আনবে ভাইয়া ? জবাব দিল , বউয়ের জন্য আনব গাছ , আম্মুর মত খুশী হবে সে ।।

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০০৯ সকাল ১০:১১
২৯টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×