উম,উম্মুন অর্থ: মাতা, উৎস, ভিত্তি,মূল, শিকড়, উপকরণ, অবস্থান বা ধরে রাখা।
উম্মুল কিতাব অর্থ: গ্রন্থ জননী; আদেশ নিষেধের উৎস স্থল।
উম্মীউন, উম্মীঈন অর্থ: যারা ঐশী গ্রন্থ অনুসরণ করেনা বা পায়নি। দ্বিতীয় অর্থ: যারা লেখা-পড়া জানে না।
উম্মী অর্থ: মাতার অংশ স্বরূপ বা অঙ্গিভূত হওয়া বা অধিকারভুক্ত হওয়া অর্থাৎ মায়ের বুকের শিশু যেমন নির্দোষ নিষ্পাপ; এমন ব্যক্তি যে ঐশী গ্রন্থের অধিকারী নহে। [দ্র: কোরান মজিদ; তাহের আহ্মদ; টিকা নং-১১৩ ক. ৩৮৪,১০৫৮, ১৪৫০, ২৬৪৫।]
কোরানে ‘উম্মী’ শব্দের ব্যবহার:
১. অকুলীল্লাজিনা-আছলামতুম। [৩: ২০] অর্থ: আর বল! যাদের কেতাব দেয়া হয়েছে এবং যাদের কেতাব দেয়া হয়নি [উম্মীঈনা], ‘তোমরা সকলে কি আত্ম সমর্পন করেছ?’ (ভক্ত হয়েছ?)
২. হুয়াল্লাজি - ম্মুবিন। [৬২: ২] অর্থ: তিনিই উম্মীদিগের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাছুলরূপে মনোনিত করেছেন; যে তাদের নিকট তাঁর আয়াত/কেতাব পড়ে শুনায়; তাদের পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত; ইতিপূর্বে তো ইহারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।
৩. অ মিনহুম - লা ইয়াজুন্নুন। [২: ৭৮] অর্থ:তাদের মধ্যে এমন কতক উম্মী লোক আছে যাদের মিথ্যা আশা ব্যতীত কিতাব সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে।
উল্লিখিত ৩টি আয়াতে ‘উম্মী’ শব্দের অর্থ ও ব্যবহার স্বচ্ছ আয়নার মত পরিস্কার। অর্থাৎ এর পূর্বে যাদের প্রতি কোন রাছুল আসেনি, যারা পূর্বে কোন কেতাব বা পথ প্রদর্শক পায়নি, নবিসহ তাদের সকলকেই ‘উম্মী’ হিসাবে সনাক্ত করা হয়েছে।
রাছুল যে পড়তে জানতেন এবং কেতাব পড়া শিখাতেন, বিজ্ঞান সুত্র (হেকমত) শিক্ষা দিতেন তা ২ নং আয়াতটি স্পষ্ট সাক্ষি; এরপরেও সন্দেহ থাকলে আরও প্রমান লক্ষনীয়:
ক. অ কালূ- আছিলান। [২৫: -৫] অর্থ: উহারা বলে, এগুলি তো আদিকালের উপকথা, যা সে (মোহাম্মদ) লিখে রাখে। যেগুলি সকাল সন্ধা তাঁর নিকট আবৃতি (অহি) করা হয়।
খ. একরা-কালাম। [৯৬: ১-৪] অর্থ: তোমার প্রতিপালকের নামে পড়-যিনি লিখিতভাবে /লিখার মাধ্যমে (কলমের সাহায্যে) শিক্ষা দিয়েছেন।
গ. উতলু-কিতাবে- [২৯: ৪৫] অর্থ: তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পড়-।
ঘ. অ মা - মুবতেলূন। [২৯: ৪৮] অর্থ: তুমি তো অতীতের কোন কিতাব (নিজে) লিখনি বা পড়নিও, যাতে মিথ্যাবাদীগণ তোমাকে সন্দেহ করতে পারে।
উল্লিখিত চারটি আয়াতই পরিস্কার সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি লিখতে-পড়তে জানতেন কিন্তু অতীতের গ্রন্থগুলি, যাতে নবি-রাছুল আগমণের ভবিষ্যৎ বাণী এবং কোরানের বিধানই উহাতে উল্লেখ আছে যা’ তিনি নিজে লিখেননি, নিজে পড়েননি, নিজে অনুসরণ করেননি; এমনকি তিনি তখন উপস্থিতও ছিলেন না, যাতে অবিশ্বাসীগণ সন্দেহ করতে পারে যে, মোহাম্মদ উহা নকল করেছে। এমন সত্যটি উপলব্দির জন্য নিম্ন আয়াতটি উল্লেখযোগ্য:
অমা কুন্তা- তাজাক্কারুন। [২৮: ৪৬] অর্থ: মুসাকে যখন আমি আহ্বান করেছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতের পাশে উপস্থিত ছিলে না (অথচ তুমি ইহা এখন অবগত হয়েছ।) বস্তুতঃ ইহা তোমার প্রতিপালকের দয়া স্বরূপ, যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
আদিকাল থেকে রাছুলের নামে কুৎসা রটিত হয়ে আসছে যে, তিনি মূর্খ বকলম ছিলেন এবং বকলম নবির মাধ্যমে কোরান অহি হয়ে প্রকাশ করাকে মোসলমানগণ একটি অন্যতম মোজেজা বলেও বিশ্বময় প্রচার করতে গৌরব বোধ করেন; এবং তার স্বপক্ষে কোরানে উল্লিখিত ‘উম্মী’ শব্দটি ব্যবহার করেন। মূলতঃ ‘উম্মী’ শব্দটির অর্থ প্রধানতঃ সাদাসিধা, নির্দোষ, সরল প্রকৃতির; ইংরাজিতে যাকে ‘ইন্নোছেন্ট’ বলে কিন্তু তিনি ইল্লিটারেট বা ইডিয়ট ছিলেন না।
আল্লাহ কি! অহি কি! কেতাব কি! জিব্রাইল কি! ইত্যাদি সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। এমনকি তিনি অহি পাওয়ার পরেও জানতেন না যে, তিনি নবি হয়েছেন বা হচ্ছেন; এ অর্থেই তিনি উম্মী ছিলেন এবং তাঁর সম্প্রদায়ও উম্মী ছিলেন; যাদের কাছে এর পূর্বে কোন নবি-রাছুল আসেনি, কেতাবও আসেনি। এজন্যই নবিসহ আবুযেহেল, আবু সুফিয়ান এবং তৎকালিন বিখ্যাত সকল কবি-সাহিত্যিক, দার্শনিক, পন্ডিত, রাজনীতিবিদসহ পূর্ণ জাতিটিকেই ‘উম্মী’ বলা হয়েছে।
মূলতঃ তিনি আবুযেহেলদের চেয়েও উন্নত লেখা-পড়া জানতেন এবং গাণিতিক হিসাব নিকাশও জানতেন; নতুবা বিবি খাদিজার আন্তর্জাতিক ব্যবসা কি করে পরিচালনা করতেন! বর্বর, অন্ধকার বিশ্বে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে এবং তা প্রতিষ্ঠা করা একজন অক্ষর জ্ঞানহীন বর্বর, নিরক্ষর মানুষের পক্ষে কল্পনাতীত। অশিক্ষিত, মূর্খ বা উম্মী নবি বলে শরিয়ত অধিক গৌরব অনুভব করেন বলেই শব্দটিকে কেন্দ্র করেই হাদিছ লেখকগণ ‘বকলম/মূর্খ নবি’ বলে সর্বত্রই ধৃষ্ঠতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাই কথিত হয় যে, কোরান কতিপয় লেখক দ্বারা লিখাইতেন এবং উহা জনসাধারণের সন্দেহ মুক্ত ও বিতর্ক এড়াবার জন্য জিব্রাঈল দ্বারা ২বার পরীক্ষা করা হয়েছে বলে কাল্পনিক হাদিছ রচনা করেছেন; আর এ কারণে সন্দেহ আরো বাড়ার কথা। কারণ: অহি করেছে আল্লাহ, বহন করেছে জিব্রাইল, শুনেছেন মোহাম্মদ, লিখেছেন ছাহাবাগণ; অতঃপর ছাহাবাদের লেখা পরীক্ষা করেছে জিব্রাইল। অতএব কোরানের নির্ভূলতা সম্বন্ধে শোনা (গৌণ),কাল্পনিক সাক্ষি ছাড়া মহানবির দেখা বা পড়া (মুখ্য) সাক্ষির কোন নিশ্চয়তা থাকে না; তাদের বিশ্বাস মোহাম্মদের সে যোগ্যতাও ছিল না!
তাদের দেখা উচিৎ যে, কোরানের আয়াতে প্রমান করে যে, মোহাম্মদ লিখতে-পড়তে পারতেন।’ সুতরাং তারা যদি উল্লিখিত আয়াতগুলি অস্বীকার না করতেন তবে: “অহি শুনেছেন মোহাম্মদ, লিখেছেন মোহাম্মদ, প্রচার করেছেন মোহাম্মদ এমনকি পরীক্ষা করেছেন মোহাম্মদ;” এই বাস্তব সুত্রের উপরে বিশ্বাস থাকতো। আর তাতে কাল্পনিক এবং অপ্রামানিক সাক্ষি দেওয়ার জন্য জিব্রাইলকে টেনে আনার দরকার হ’তো না, মহানবিকেও খাটো করার প্রয়োজন হ’তো না! সর্বোপরি কোরানের উপরে কারো সন্দেহের উদ্রেক হ’তো না। শুধু মোহাম্মদই নন, এমন উম্মী ছিলেন আদম থেকে সকল রাছুল-নবিগণ। বিশ্বের অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, বৈজ্ঞানিকগণ; তাই বলে তারা লিখতেও জানতেন না পড়তেও জানতে না এ ধারণা অমূলক। তা’ছাড়া সকল উম্মী নবিগণই কি লোকদ্বারা অহি লিখাতেন? সময় নেই, অসময় নেই গভীর রাতে অহি আসতো আর তিনি লেখকদের খবর দিতেন, অপেক্ষায় থাকতেন লিখাবার জন্য! কোরানে এমন কোন সাক্ষি নেই যে দীর্ঘ ৩০পারা কোরান লিখাতে নবিকে কখনও অহি করেছেন যে, ‘অমুক-অমুক লেখকের সাহায্য নাও বা লেখক ডেকে আনো!’ অথবা ‘অমুক লেখক বিশ্বস্থ এবং অমুক সন্দেহযুক্ত!’ মূলতঃ মহানবি যে লেখা-পড়া জানতেন বা লিখতে পড়তে পারতেন তা’শরিয়তের হাদিছেও প্রমান দেয় যে, তিনি যেখানেই যেতেন সঙ্গে সকল সময়ই কাগজ-কলম রাখতেন। [দ্র: http://www.submission.org]
নিজে কাগজ-কলম সঙ্গে রাখতেন, অথচ লিখতে পারতেন না! আর অহি হলেই পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করে লেখার জন্য অন্যের স্মরণাপন্ন হ’তেন বা হয়েছিলেন! হাদিছে তেমন একটি মাত্র প্রমান পাওয়া যায় না। বিবি খাদিজা, বিবি আয়শাসহ তাঁর অনেক বিবিগণই লেখাপড়া জানতেন বলে ইতিহাস পাওয়া যায়, এবং হাদিছ সাক্ষি দেয় যে, বিবি আয়শার বিছানায় শুইলে নাকি বেশি বেশি অহি আসতো! (দ্র: বোখারী, ৩য় খ. ৮ম সংস্করণ, আ. হক, পৃ: ১১) কিন্তু মহানবি অহি লেখাবার জন্য বিবিগণের স্মরণাপন্ন হয়েছেন বা হ’তেন! গভীর রাতে কাউকে ডেকেছেন বলে কোন ইতিহাস নেই, নেই একটি মাত্র হাদিছ।
ইহা সর্বজনবিদিত যে মহানবির জীবণ সায়াহ্নে লিখিতভাবে (আলীকে) উত্তরাধিকার নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন এজন্য ছাহাবাদের কাছে কাগজ-কলম চেয়ে ছিলেন; কিন্তু হযরত ওমর তাঁর অসুস্থতার অজুহাতে কাগজ-কলম দেননি। বাস্তবিকই যদি তিনি লিখতে না জানতেন তবে কাগজ-কলম চাইতেন না আর ওমরও প্রতিবাদ করতেন না; বরং শরিয়তের ধারণা মতে (বকলম হেতু) তিনি যা লিখতে চেয়েছিলেন তা মৌখিক ঘোষনাই করে দিতেন। কিন্তু তিনি লেখার সুযোগ পাননি বলে মনের কথা ঘোষনাও করেননি।
কথিত হয় যে, মহানবি দেশ-বিদেশের রাজা-বাদশাদের লিখিতভাবে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, যুদ্ধ বিগ্রহের চুক্তি বা সন্ধিপত্র হযরত আলী বা অন্যদের দ্বারা লিখাতেন! কিন্তু তাতে তার নিরক্ষরতার পরিচয় হয় না। কারণ বড় বড় ব্যস্ততম নেতা/লেখকদের এমন সচিব সেক্রেটারী আজও নিযুক্ত করা হয়; মাইকেল মধুশোধন দত্ত আদিকালের বিলাত ফেরৎ/অফেরৎ ছিলেন এবং উপন্যাস লেখার জন্য তিনি ৫ জন শ্রুতি লেখক নিযুক্ত করে ছিলেন; তার অর্থ এই নয় যে, তিনি নিরক্ষর ছিলেন। শিক্ষিত ও সমভ্রান্ত পরিবারের সন্তানগণ এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ না করলেও তারা যে কিছুতেই বকলম থাকতে পারে না তা’হলফ করে বলা যায়। হযরত মোহাম্মদ সর্বোচ্য সমভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং কাবার কর্তৃত্ব ছিল তাদের হাতে এমন পরিবারের সন্তান‘মোহাম্মদ বকলম ছিলেন’ নবির প্রতি এমন আপত্তিকর, ভ্রান্ত/ডাহা মিথ্যা বিশ্বাস/ধারণার অবসান হওয়া উচিৎ। আবুযেহেলদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি ছিল! কোন্ কলেজ-ইউনিভারসিটির ডিগ্রীধারী ছিলেন তা’ও তাদের সনাক্ত করা উচিৎ।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


