যদিও কোরানে স্বয়ং আল্লাহ অসংখ্যবার ঘোষণা করেন যে, কোরান পূর্ণ, কোরান পরিপূর্ণ জীবন-মরণ ব্যবস্থা/বিধান (ছুন্নত)। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের এহেন বিশ্বাস চূড়ান্তভাবেই মৌখিক ও শ্লোগান সর্বস্ব; বাস্তবতার সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। কারণ পরক্ষণেই আমাদের পুনঃ পুনঃ পুনঃ বিশ্বাস যে, কোরানে যা নেই, তা হাদিছে ; হাদিছে যা নেই, তা ফেকহায় ; ফেকহায় যা নেই তা এজমায় ; এজমায় যা নেই তা কেয়াছে ; কেয়াছে যা নেই তা ফতোয়ায়, তাতে যা নেই তা আলেম-মুফতীদের মূখে ! অর্থাৎ আল্লাহর কেতাবে যা নেই তা মনুষ্য রচিত উপ-ধর্মগ্রন্থে থাকে! আর সেখানেও যদি না থাকে তবে আলেমদের মুখের ফতোয়া এবং ইহাই চুড়ান্ত! (তাজ্জব বটে!)
এ সকল উপ-ধর্ম গ্রন্থাদির স্বপক্ষে মাত্র গুটি কয়েক অতি সাধারণ এবং অতি গৌণ যুক্তি উত্থাপণ করেন, যেমন: (ক) নামাজ কিভাবে পড়বো (খ) কত রাকাত পড়বো (গ) কি পড়বো (ঘ) জাকাত কত অংশ দিব (ঙ) দাঁড়ি কয় ইঞ্চি বা ফুট রাখবো (চ) ঋতুবতী বিবি থেকে কত হাত দূরে থাকবো ইত্যাদি। এরকম কিছু গৌণ বা ফাল্তু প্রশ্নের অজুহাতে কোরানের পাশাপাশি পর পর ৫ খানি উপ-ধর্মগ্রন্থ, অর্থাৎ দু’নম্বরী থেকে পাঁচ নম্বরী গ্রন্থ রচিত হয়েছে। যা বহন করতে গাড়ি-ঘোড়ার প্রয়োজন হয়। ৬২৩৬টি আয়াতের বিপরিতে ৭ হাজার থেকে ৩০ হাজার এমনকি মতান্তরে ৪০ হাজার বা লক্ষ হাদিছ রচিত হয়েছে। অর্থাৎ শরিয়ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এটাই ঘোষনা করে যে, কোরানের একটি বাণীও পূর্ণ নয়! পক্ষান্তরে আল্লাহর মতে এমন কোন প্রশ্ন বা বিষয় নেই; যার সমাধান কোরানে নেই:
১. -মা ফাররাৎনা-মুবিন-ইউহশারুন। [৬ঃ ৩৮] অর্থ: -কিতাবে কোন কিছুই আমি বাদ দেই নি।
২. অ-ইন্দাহু -বিম্মুবীন। [৬: ৫৯] অর্থ:- মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট (বাস্তব) কিতাবে নেই।
৩. অমা-বিম্মুবিন। [১০: ৬১] অর্থ: দৃশ্য-অদৃশ্যে (আকাশ-জমিনে) তিল পরিমাণও তোমার রবের অগোচরে নহে। আর উহা অপেক্ষাও ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ সবকিছুই সুস্পস্ট (বাস্তব) কেতাবে লিখিত আছে।
৪. অ-লীল মুসলেমীন। [১৬: ৮৯] অর্থ: আমি মুসলিমদের জন্য (নিবেদিত) জন্য প্রত্যেকটি বিষয় স্পষ্ট ব্যাখ্যাসহ কল্যাণ, পথ নির্দেশ ও সু-সংবাদরূপে তোমার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করিলাম।
৫. অ লাক্বাদ- ইল্লা কুফু-রা। [১৭: ৮৯] অর্থ: আমি এই কোরানে মানুষের জন্য সকল বিষয় এবং বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু বেশির ভাগ লোকই তা অস্বীকার করে।
৬.অইন্না রাব্বাকা - ফি কিতা-বিম্মুবিন। [২৭: ৭৪,৭৫] অর্থ: স্ব-স্ব অন্তরে যা কিছু গোপন বা প্রকাশ করে যাচ্ছে, তা আপন পালনকর্তা অবশ্যই জানে। দৃশ্য-অদৃশ্যের এমন কিছু নেই যার উল্লেখ এই কেতাবে নেই।
আয়াতে ব্যবহৃত ‘কেতাবুম্মুবিন’ অর্থাৎ ‘সুস্পষ্ট কেতাব’ বলতে এই কেতাবকেই বুঝায়; কিন্তু শরিয়ত অজ্ঞতা বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়েই তা সরাসরি অগ্রাহ্য করে কল্পিত ‘লাওহে মাহফুজে’র অস্পষ্ট ও কাল্পনিক
কেতাবকে বুঝাতে চায়। (দ্র: টিকা নং ৪০৭ (৮৫: ২২) ই. ফা. অনুদিত কোরান); কিন্তু ঐ কাল্পনিক কেতাব নবি-রাছুল, গাউস কুতুব, মুসলিম অমুসলিম সকলের কাছেই কালাকালের জন্য অদৃশ্য ও অস্পষ্ট। লাওহুন= শিলা, পাথর, লেখা যায় এমন বস্তু, স্পষ্ট, ফলক,(মরিচিকা); মাহফুজ= হাফেজ থেকে মাহফুজ=সুরক্ষিত, সংরক্ষিত; অর্থাৎ স্পষ্ট লিখিতভাবে রক্ষিত। অতএব ‘লাওহে মাহফুজের কোরান’ বলতে ‘এই
স্পষ্ট কোরানকেই বুঝায়।। তা’ছাড়াও ৫ নং আয়াতে ‘এই কিতাব’ বলে ১৪শ বছরের কাল্পনিক লাওহে মাহফুজের কিতাব সম্বন্ধিয় ধারণাকে ভূল প্রমান করছে। এরপরেও যদি কিছু থেকে থাকে! বরং উহাই অস্পষ্ট
এবং আদি-অনাদিকাল যাবৎ ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
কোরান পূর্ণ, পূর্ণভাবেই পরিপূর্ণ; এতে কোন সন্দেহ বা কোনই ফাঁক-ফোকড় নেই, নেই কোন য়োজর আপত্তি।
পক্ষান্তরে শরিয়ত সাক্ষি দিচ্ছে যে, কোরান আকার, ইঙ্গিত বা সংক্ষেপে লেখা তো বটেই এমনকি আয়াতের দিক থেকেও অপূর্ণ যা স্বয়ং আল্লাহও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হননি! যেমন:
“ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে পাথর মেরে হত্যা করার আয়াতটি স্বয়ং রাছুলের সময়ই কোরানে লেখা ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যু পরে বিবি আয়শার ঘরে একটি ছাগল ঢুকে কাগজে লেখা ঐ আয়াতটি খেয়ে ফেলেছে। [দ্র: ইবনে মাজাহ ২য় খ. হা. নং-১৯৪৪, ইসলামিক ফাউন্ডেসন]
কোরান সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল এবং বিস্তারিত বিবরণ ও পূর্ণ ব্যাখ্যাসহ (তফসীর) নাজিল করা আছে; যা উপরোল্লিখিত অসংখ্য দলিল প্রমাণ দ্বারা সুঠামভাবেই প্রতিষ্ঠিত। কোন একটি বা একাধিক বিষয় না বুঝলে তার অর্থ এ নয় যে, তা অসম্পূর্ণ বা সংক্ষেপ। সুতরাং কোরানকে দায়ি না করে বরং আপন আপন জ্ঞানকে দায়ি করে সাধ্যমত কোরান পড়তে হবে, গভীর চিন্তা-গবেষণায় বোঝার চেষ্টা করতে হবে; বুঝে না আসলে কায়মন বাক্যে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে; আর তা প্রধানতঃ আপন আপন ভাষায়ই সম্ভব।
কথিত হয় যে, কোরান বুঝতে হাদিছ, ফেকহা ইত্যাদি অপরিহার্য। এই ‘অপরিহার্য’ অর্থই অত্যাবশ্যকীয়, যাকে আরবিতে ফরজের ফরজ বা ওয়াজিব বলে। অতএব ফরজ কোরান বুঝতে ফরজের ফরজ ‘হাদিছ’ প্রধান ও পূর্বশর্ত হিসাবে শরিয়ত মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


