(পূর্বাপর)- ২/৬)
কোন ধর্ম গ্রন্থই স্বয়ং আল্লাহ, ফেরেস্তা এমনকি নবিগণও নিজ হাতে লিখেননি, লিখেছেন মানুষ, আর মানুষ মাত্রই কোনক্রমেই ভুলের উর্দ্ধে নয়। কোরান আল্লাহময় রাছুলের (৩: ৭৯) মূখ নিসৃত আল্লাহর হাদিছ/বাণী; নিজ বা অন্যেরদ্বারা লিখিত, ভিন্ন সময় বিভিন্ন লোকদ্বারা সংকলিত।
পক্ষান্তরে, আজকের কোরানে লেখা থাকে ৬,৬৬৬টি আয়াত (বিবি আয়শার মত, কিন্তু তার সংরক্ষিত কোরান নেই), হিসাব করলে পাওয়া যায় ৬,২৩৬টি (কুফী মত) আয়াত। হতবাক হলেও সত্য যে, এই ভুল তথ্যটি আজ দেড় হাজার বছর যাবৎ আল্লাহর পবিত্র কোরান নীরবে ধারণ করে আছে। অতএব, বাকি ৪৩০ টি আয়াত কে, কখন এবং কিভাবে গায়েব করলো বা হলো, তা প্রত্যেকটি মুসলিমের একান্তভাবেই ভেবে দেখা এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করা উচিৎ।
কোরানের আয়াত সম্বন্ধে উল্লিখিত তথ্য দু’টি একে অন্যের বিপরীত তা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। এই বৈপরীত্য ধামাচাপা দেয়ার জন্য অথবা নিরীহ জনসাধারণের দৃষ্টি ভ্রম করার জন্য ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্ব কোষের’ ১৫ জন আলেম-সম্পাদক, যাদের মধ্যে ৫ জন ডক্টরেট, ১জন অধ্যক্ষ, ২ জন অধ্যাপক ও ১ জন হাফেজও রয়েছেন এবং বাকিগণ সকলেই মনীষী, ইসলামিক চিন্তাবিদ ইত্যাদি; তাদের সম্মিলিত মন্তব্য হলো: “আয়াতের আরম্ভ ও শেষ কোথায়, এই সম্বন্ধে মতভেদের কারণে সংখ্যায় এরূপ তারতম্য হয়েছে।” [ দ্র: সং. ই. বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ ‘আয়াত’ অধ্যায় ; পৃ: ৭০; ই. ফা.]
অতএব জিব্রীল (?) কর্তৃক একধিকবার এডিট করার পরও তারতম্য যে হয়েছে তা শরিয়ত একবাক্যেই স্বীকার করছে। বিশ্বকোষের তথ্য দু’টি পরস্পর বিপরীত আর আলেমদের সম্মিলিত মন্তব্যটি ত্রিপরীত বটে! এমন কিশোরসুলভ মন্তব্য তাদের ধর্ম জ্ঞান ও দূরদর্শীতা সম্বন্ধে হতাশা ব্যক্ত করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই। কারণ উপরোক্ত বিবরণের সঙ্গে মন্তব্যটির কোন মিল নেই। এদের সম্বন্ধে কোন মন্তব্য করার দুঃসাহস আমার মত পাঠশালার অধ্যাপকের পক্ষে শোভা পায় না। তবে মরহুম আঁকরাম খাঁ’র ‘মোস্তফা চরিত’ এর লেখা ছোট্ট একটি ঘটনা মনে পড়ে। তিনি লিখেছেন যে, জীবনে একবারই মাত্র আলেমদের সঙ্গে ধর্ম-তর্কে হেরে জান। কোন এক গ্রামে খাঁ সাহেব বাহেজে (ধর্মীয় বিতর্ক সভায়) অবতীর্ণ হন। প্রসঙ্গক্রমে আলেমগণ দাবি করেন যে, হযরত আলী রামের রাজত্বকালে ভারতে এসেছিলেন; তার প্রমাণ স্বরূপ আলেমগণ একখানি বহু পুরানো মস্ত বড় পুঁথি গ্রন্থ এনে খাঁ সাহেবের সামনে পড়ে শোনান। তাতে লেখা ছিল: ‘আলী আর বীর হনুমান/অযোধ্যায় মহা যুদ্ধ/দোনো পলোয়াণ।’ অতঃপর কেউ কাউকে হারাতে পারেনি বলেও তাতে উল্লেখ আছে! কেতাবের এই বয়ান শুনে এবং স্বচক্ষে ঐ মস্তবড় কেতাব দেখে উপস্থিত আলেমগণ সমস্বরে নিজেদের পক্ষে জয় জয় ঘোষণা করেন। [দ্র: মোস্তফা চরিত: আকরাম খাঁ]
বিশ্বকোষের তৃতীয় তথ্য:
৬. তফসিরে বায়দবীতে বলা হয়েছে যে, সুরা বাকারাতে ২৮১ টি আয়াত আছে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, অধিকাংশের মতে কোরান মজিদের অবতীর্ণ শেষ আয়াতটি সম্বন্ধে হযরত (দ
অতএব, সুরা বাকারার আয়াত সংখ্যা হওয়া উচিৎ মোট ২৮১টি। পক্ষান্তরে সেখানে আছে মোট ২৮৬ টি আয়াত। তদুপরি মহানবির নির্দেশ মত সেই শেষ আয়াতটি সেখানে সন্নিবেশিত করা হয়নি। আরো প্রকাশ থাকে যে অতিরিক্ত ৫টি আয়াত সুরা বাকারায় কিভাবে! কি করে! এবং কোথা থেকে ঢুকে পড়লো, কেন পড়লো এই ঐতিহাসিক প্রশ্নটি আজও গোপন রয়েছে।
৭. হযরত উবিয়্যার (রা) প্রতিলিপিতে ২টি সুরা অতিরিক্ত ছিল। [দ্র: ঐ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮]
৮. ইবনে মাসুউদ (রা) এর প্রতিলিপিতে সুরা নং ১১৩ ও ১১৪ বিদ্বমান ছিল না। [ ঐ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮]
৯. শীয়াদের মতে হযরত আলী (রা) ও তার বংশের (নবি বংশের) শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধীয় আয়াতসমূহ এমনকি সুরা সমূহ কোরান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, যথা : (ক) সুরা আল- নুরায়ন ও (খ) সুরা ওয়ালায়া। [সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮; ই. ফা.]
১০. হযরত ওসমান (রা) কোরানের যে প্রতিলিপি প্রস্তুত করিয়াছিলেন- ঐ লিখন পদ্ধতি এখনও প্রচলিত রয়েছে। কোরানের ঐ প্রতিলিপিতে নুক’তা: ও স্বর চিহ্ন ছিল না, ফলে অনআরবদের পক্ষে ঐ কোরান শুদ্ধভাবে পাঠ করা কঠিন ছিল। [ সং. ই. বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮; ই. ফা.]
পরবর্তীতে নোক্তা ও কারক বিভক্তি সংযোজন করা আল্লাহ-রাছুল, জিব্রাইল তথা খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের ইচ্ছা ও কাজের উপর সাধারণ মানুষের অনধিকার হস্তক্ষেপ। কোরানে নোক্তা, কারক বিভক্তি সংযোজন করা হয় খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের প্রায় ১৪০ থেকে ৩৫০ বৎসর পরে।
১১. কোরানের প্রামাণ্য পাঠ সুনির্ধারিত রাখার জন্য উমাইয়া যুগে আরবি বর্ণমালার সমরূপী বর্ণসমূহের বিভিন্নতা সুচক নুক্তা: চিহ্ন (বিন্দু) প্রযুক্ত হয়। এতদ্ব্যতীত স্বরচিহ্নসমূহ ও তানভীন স্ত্রী লিঙ্গ সৃচক অন্ত্য গোল ‘তা’, আলিফের ব্যঞ্জন বর্ণসমূহের দ্বিত্ববোধক চিহ্ন (তাসদিদ) ও প্রচলিত হয়-। [সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮; ই. ফা.]
১২. - পাঠ বিচারের এই মান অনুযায়ী সপ্তকারীর পাঠ ইসলামী সমাজে প্রচলিত ছিল। বর্তমান কালে ইহাদের দু’জনের পাঠ মাত্র প্রচলিত আছে-। মিশর ব্যতীত আফ্রিকার সর্বত্র নাফি’র পাঠ এবং মিশরে ও পৃথিবীর বাকি অংশে হাফ্সে’র পাঠ প্রচলিত। [সং. ই. বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ, পৃ: ৩৩৬, ৩৩৮; ই. ফা.]
(চলবে-৩/৬)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


