[৪: ৪৩] হে বিশ্বাসী/বিশ্বস্থগণ! তোমরা নেশাখোরের মত নমাজের কাছেও যেও না। যতক্ষণ না বুঝতে পার যা তোমরা বলছো।
উল্লিখিত আয়াতটির সরলার্থ গ্রহণ না করে বরং তার শানে-নজুল অর্থাত আয়াতটির জন্ম ইতিহাস রচনা করে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, কথিত হয় একদা হযরত আলী মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় নমাজ পড়তে গিয়ে অমুক ছুরা আবৃতি করতে গিয়ে অমুক ছুরা আবৃতি করেছিলেন। তখন এই আয়াত নাজিল হয়; অতঃপর মদ হারাম হওয়ার আয়াত নাজিল হয়। এখানেই আয়াতটি বন্দী করে রেখেছেন।
আল্লাহর নবি ছোট বেলা থেকেই সুন্দর, মার্জিত, সু-শৃংখল, ভদ্র, নম্র, এবং বলিষ্ঠ আদর্শবান ছিলেন। মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাজিল হোক বা না হোক, তিনি কখনও মদ খেয়েছেন, জুয়া খেলেছেন, বালিকাদের সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি করেছেন, মিথ্যা বলেছেন, আমানতের খেয়ানত করেছেন; এমন কোন ইতিহাস সম্ভবতঃ অমুসলিমদেরও জানা নেই। তাঁরই জীবন-মরনের বন্ধু, সহচর, চরম বিশ্বস্থ, ভক্ত, মেয়ে জামাই আলী এমন কি মুসলিম হওয়ার পরেও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নামাজ পড়েছিলেন! অতঃপর নমাজে অমুক আয়াতের পরিবর্তে তমুক আয়াত আবৃতি করেছিলেন! প্রকৃত মোসলেমদের এমন বিশ্বাস করতে কষ্ট হওয়ার কথা।
কারণ:
১. তিনি মাতাল হয়ে উল্টো-সিধে আয়াত আবৃতি করছিলেন, অথচ ইমাম আবুবকর অথবা হ. মুহাম্মদ স্বয়ং আলীকে ধমক দিয়েছেন কি সতর্ক করেছেন বা মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছেন; এমন কোন প্রমান নেই।
২. শরিয়তের ধারা মতে, জামাতের নামাজে মুসল্লীদের তেলাওয়াত নিষিদ্ধ, তাই তারা কিছুই বলেন না। অতএব মুসল্লী হয়ে হযরত আলীর তেলাওয়াত করার কথা নয়। পক্ষান্তরে তিনি তেলাওয়াতের জন্য অভিযুক্ত হননি, অভিযুক্ত হয়েছেন ’অমুক ছুরা তেলাওয়াত করতে গিয়ে তমুক ছুরা তেলাওয়াত করে ফেলেছেন!’ সুতরাং বিষয়টি ভাববার বিষয় বটে!
৩. রাছুলের জীবিতাবস্থায় ছুরার নামকরণ হয়নি এবং নির্দিষ্ট করে ১১৪টি ভাগ করাও হয়নি; ভাগ য়ো ছুরার নামকরণ হয় ৩য় খলিফা হ. উসমানের আমলে। অতএব `অমুক ছুরা বলতে গিয়ে অমুক ছুরা তেলাওয়াত করেছেন’ উক্তিটি আরো সন্দেহজনক বটে!
৪. শরিয়তের মতে নমাজে ছুরা ফাতেহার পরে যে কোন ছুরার যে কোন অন্যুন ৩টি আয়াত আবৃতি করার বিধান আছে। অতএব আলী যদি এমন কিছু করেই থাকেন তাতে আল্লাহর আপত্তি থাকার কোন যুক্তিই নেই।
মূল কথা হলো:
হযরত আলী মদ খাক বা না খাক, আর যে কারণেই আয়াতটি নাজিল হোক না কেন, তার মূল ও মৌলিক নির্দেশ হলো: নমাজে যা বলা হবে, নমাজে যাওয়ার পূর্বেই তা জানতে হবে, বুঝতে হবে যে, সে কি বলবে। অর্থাত শপথ নামাটি পড়ে, জেনে, বুঝে, হৃদয়ঙ্গম করে, স্বীকার করতঃ এবং তা বলবত রাখার অঙ্গিকারে সুস্থ মস্তিষ্কে বলতে হবে। নেশাখোর, মাতাল কি বলে আর কি করে তা নিজেই জানে না; পরক্ষণে বা নেশা কেটে গেলে তার কিছুই মনেও থাকে না বলেই নেশাখোরের উদাহরণটি দেয়া হয়েছে মাত্র। নমাজে আল্লাহর কাছে কি চাইলাম, কি শপথ বা অঙ্গিকার করলাম! তার কিছুই জানি না, বুঝি না; অতএব, তা বাস্তবয়ণের কোন প্রশ্নই ওঠে না! অর্থাত মাতাল, নেশাখোরের মতই তো বটে!! আর এখানেই শেষ নয়:
`নমাজ' পারর্শী শব্দ। ইংরেজিতে প্রেয়ার, আরবিতে `ছালাত' এবং বাংলায় প্রার্থনা, উপাসনা বা পূজা। ইসলাম অথবা যে কোন ধর্মের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানাদির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিষয় ছালাত প্রার্থনা বা পূজা। ইংরেজগণ বলেন, ডু প্রেয়ার, হিন্দুগণ বলেন, পুজা করি, আর আমরা বলি নামাজ পড়ি; যদি একরাচ্ছালাত কোরানের কোথাও নেই; আছে `আকিমুচ্ছালাত, যার অর্থ প্রার্থনা প্রতিষ্ঠিত বা বলবত রাখা; অর্থাত প্রার্থনায় যা বলা/চাওয়া হবে ঠিক সে অনুযায়ী দৈনিন্দন জীবনে কর্ম করে প্রার্থনা বাস্তবায়ণে রত থাকতে হবে।
নামাজ শব্দের মতই শরিয়তি বিশ্বে উল্লেখযোগ্য কিছু হিন্দি, ফারসী, উর্দ্দু শব্দ প্রচলিত রাখা হয়েছে; যার অর্থ কারো জানা নেই, পক্ষান্তরে তার তফসীর, ব্যাখ্যা ফজিলত সম্বন্ধে ভুরি ভুরি কেতাব পর্যন্ত লিখিত আছে; কিন্তু শব্দের অর্থ লেখা নেই; আর থাকলেও ইসলামিক পরিভাষার দোহাই দিয়ে আরোপিত তফছির ছাড়া মূলার্থে গুরুত্ব দেয়া হয় না; যেমন: সুন্নত অর্থ বিধান, নিয়ম বা আইন; অতএব মুসলিমদের একমাত্র সুন্নত হলো কোরান কিন্তু কথিত ইসলামিক পরিভাষায় সুন্নতের অর্থ নেই, আছে তফছির: `রাছুল, ছাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনগণ যা করেছেন, অন্যকে করতে দেখেছেন কিন্তু বাধা দেননি তাইই সুন্নত!' দল-উপদলিয় সমগ্র শরিয়ত হাদিছ ও কথিত `ইসলামিক পরিভাষা’ যার অপর নাম উপভাষা/দলিয় ভাষা বা আরোপিত নকল অর্থের উপরেই দন্ডায়মান। সাধারণত বিদেশী শব্দের স্ব স্ব ভাষায় অর্থ না জানলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা খুবই সহজ; এই সহজ যাঁতাকলে অনারব মুসলিম বিশ্ব প্রতারিত এবং বিভ্রান্তিত। আর এজন্য দায়ি আরব/ইরান পুষ্ঠ কতিপয় স্ব স্ব দেশীয় রাজনীতিক ইমাম নেতাগণ। শব্দের দলিয় তফসীর, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পরম্পরায় কল্পনা ও আনুমানিক বিশ্বাসে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফলে দল-উপদলিয় ইসলামের যাবতিয় ধর্ম-কর্মের পরিণতি বেয়াদবী, আহাম্মুকী, কুফুরী তথা জাহান্নামীর ইন্দন বহন করছে।
যে কোন বিদেশী ভাষা বা শব্দ সর্বজনীনভাবে জানা-বোঝা থাকলে হাজার হাজার বিদেশী শব্দ আসুক বা যাক, তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু জানা নেই, বোঝা নেই বলেই তো বলছি 'নামাজ পড়ি!' মানুষ পড়ে শেখার জন্য, শেখা হয়ে গেলে পড়ার আর প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় করার। তাই এমনকি গন্ড মূর্খগণও বলেন না যে, প্রার্থনা পড়ি, অজু-গোসল পড়ি, রোজা পড়ি, মোনাজাত পড়ি বা পায়খানা-প্রস্রাব পড়ি ইত্যাদি। অতএব ব্যাকরণের ধারায় ছোট হোক বড় হোক, ভুল যে বলছি তা অনস্বীকার্য। আর এই ভুলটিই মুসলিম বিশ্বকে চরমভাবে পথ ভ্রষ্ট করেছে। আর এখানেই শেষ নয়; প্রার্থনার সাথে দৈনিন্দন কাজ-কর্মের মিল, সমর্থন, সহযোগিতা না থাকলে প্রার্থনা গৃহীত হওয়ার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা থাকে না।
বিচারকের কাছে কিছু প্রার্থনা করলে বা ক্ষমা চাইলে বিচারক ক্ষমা করতে পারেন বটে, কিন্তু সে চাওয়া পাওয়ার বা ক্ষমা চাওয়ার বিষয়বস্তুগুলি কি কি তা ঠিক ঠিক বর্ণনা করতে হবে এবং বিচারক কর্তৃক অর্পিত শর্তগুলি কি কি তাও নিখুঁতভাবে বুঝতে হবে। তবেই না উহা কর্ম জীবনে রক্ষা করে চলা সম্ভব হবে; অতঃপর প্রার্থনা পূরণ হওয়ার আশা করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে, নামাজে কি চাইলাম! কি ওয়াদা করলাম! কি বললাম! হৃদয়ের চাওয়াগুলি ঠিক ঠিক বর্ণনা করতে পারলাম কি না! যে আয়াতগুলি তেলাওয়াত করলাম তাতে আমার অভাব অভিযোগগুলি লিখিত আছে কি না! অতঃপর কি কি শর্তের অধীনে আমাকে চলতে হবে, তার বিন্দু বিসর্গ পর্যন্ত জানা নেই, বোঝা নেই বলেই তা প্রতিষ্ঠিত রাখা কারো পক্ষে সম্ভব হয় না। সে মনের অজান্তে বার বার প্রার্থনা করবে, বার বার ক্ষমা চাইবে, বারবার ওয়াদা করবে কিন্তু কর্মে তা বলবত করতে পারে না বা বারবার তা ভঙ্গ করবে, এটা নিতান্ত স্বাভাবিক; কারণ নমাজীর বক্তব্য সম্বন্ধে নমাজীর কোন জানা-বুঝা নেই। অর্থাত নেশা খোর, মাতালের মতই কাজটি সমাধা করা হয় বলেই নামাজ শেষে, হজ্জ শেষে পূর্ববত এবং ততোধিক অন্যায়, অবিচার পাপ করেই থাকি। মুসলিম বিশ্বের অধঃপতনের ইহাই অন্যতম প্রধান কারণ! অতএব সে যতই নমাজ করে, মনের অজান্তে ততই পাপ বৃদ্ধি করে, ততই সে মোনাফেকের দলভূক্ত হয়।
এদের সম্বন্ধে কোরানের হুশিয়ারী লক্ষ্যণীয়:
১. [৪: ১৩৭] যারা ঈমান আনে অতঃপর কুফুরী করে, আবার ঈমান আনে আবার কুফুরী করে; অতঃপর তাদের কুফুরী এরূপ বাড়তেই থাকে। আল্লাহ তাদের কিছুতেই ক্ষমা করবেন না, পথও দেখাবেন না।
২. [২: ২৭] যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গিকার করার পরে উহা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ দিয়েছেন তা ভঙ্গ করে এবং দুনিয়ার বুকে অশান্তি, গোলযোগ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্থ।
নমাজে যা বলা হয় তা আপন ভাষায় বুঝতে না পারলে, হৃদয় নিংড়ানো প্রেরণা, অনুভূতি, আগ্রহ, একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতার উদয় হয় না। ফলে দাঁড়াবার ভাব, ভঙ্গি, আওয়াজ, সুর, নম্রতা ও আদর্শ (মোসলেম) ভাবধারা দৈনিন্দন জীবণে ধারণ করা সম্ভব হয় না। চাওয়া-পাওয়া ও বাস্তব কর্ম জীবনের লাভ লোকসানের যোগ বিয়োগ বা মূল্যায়ণ ও সংশোধন কিছুই সম্ভব হয় না। যার পরিণতি দাঁড়ায় নিম্নরূপ:
(২/৫)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


