হাদিছের স্বরূপ, উৎপত্তির কারণ সম্বন্ধে পরিস্কার ধারণা না থাকলে হাদিছের মূল্যায়ন করা কঠিন। ঐ সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অবস্থা সংক্ষেপে ইসলামের ইতিহাসের দৃষ্টিতে নিম্নরূপ:
“হযরত মুহাম্মদের (সা) অবহিত পরবর্তী উত্তরাধিকারীগণ কর্তৃক রোম সাম্রাজ্যের সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি এবং পারস্য সাম্রাজ্যের দেশসমূহ বিজিত হওয়ার ফলশ্র“তিতে প্রভূত ধন সম্পত্তি, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি তাদের করায়ত্ব হয়। ফলে রাছুলের উত্তরাধিকারী পদটি অসাধারণ মর্যাদা লাভ করে। অপরদিকে মুসলিম সাম্রাজ্য চরম বি¯তৃতি লাভ করার পূর্বেই ‘খলিফা’ পদটি পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাশালী সরকার প্রধান বলে গণ্য হতে থাকে।
হযরত ওসমানের (রা) দ্বাদশ বর্ষব্যাপী খিলাফতকালের শেষ ৬ বৎসর কাল (৩৫ হি
.. অতঃপর হযরত আলী (রা) মদিনার মসজিদে সমবেত মুসলিমগণ খলিফা হিসাবে তার হাতে বয়াত গ্রহণ করেন। ৩৬ হিজরীতে তিনি মদীনা ত্যাগ করে কুফা চলে যান এবং আর ফিরে আসতে পারেননি। বিবি আয়শা, তালহা ও যুবায়ের (রা) হযরত ওসমানের হত্যাকারীদের শাস্তি বিধানের দাবিতে হযরত আলীর (রা) বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি করলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন এবং ছিপ্পিনের মাঠে উষ্ট্র যুদ্ধে সংবদ্ধ দলটিকে পরাজিত করেন। বিবি আয়শাকে (রা) বন্দিনী করে ৪০ জন মহিলাসহ একদল অনুচরের পাহারাধীনে মদিনা প্রেরণ করেন। অতঃপর কুফা থেকে তিনি আল-মাদাইনে গমন করেন। রাক্বা নামক স্থানে ফুরাত নদী পার হলে ছিপ্পিনের প্রান্তরে হযরত মুয়াবীয়ার কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। ৩৫ হিজরী থেকে ৩৭ হি: পর্যন্ত পর পর কয়েকটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। হযরত আলী (রা) যখন চূড়ান্ত জয় লাভ করছিলেন; তখন হযরত মুয়াবীয়ার পরামর্শে ছাহাবা হযরত আমর এবনুল আস্ যুদ্ধে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে সিরিয়ার সৈন্যগণ কর্তৃক কোরানের পৃষ্ঠা বল্লম ও বর্শাগ্রে বিদ্ধ করে উর্দ্ধে উত্তোলন করে, আল্লাহর কেতাব অনুযায়ী বিচার ফয়শালার দাবিতে সন্ধি প্রার্থনা করেন। বলা বাহুল্য, এই সন্ধি প্রার্থনা ছিল চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রমূলক এবং তা ফলপ্রসুও হয়। হযরত আলীর (রা) পক্ষের ইরাকের সৈন্যদলটি এই কূট-কৌশলে বিশ্বাস করে যুদ্ধ বন্ধ করে এবং আলীকে সন্ধির জন্য চাপ প্রয়োগ করে। অতঃপর তিনি বাধ্য হয়েই সন্ধি করেন। হযরত মুয়াবীয়া ও তার প্রধান সেনাপতি হযরত আমর এবনুল আস্কে তার পক্ষে সালিশ নিয়োগ করেন। পক্ষান্তরে, হযরত আলী তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েই আবু মুছা আল আসতারীকে তার পক্ষের সালিশ মেনে নেন। পূর্ণ ক্ষমতা প্রদায়ক লিখিত দলিল প্রাপ্ত হয়ে বিচারকদ্বয় ৩৭ হিজরীতে একত্রে মিলিত হন। হযরত আমরের শঠতা ও চাতুরীতে প্রতারিত হয়ে হযরত আবু মুসা স্বীকার করেন যে, হযরত ওসমান হত্যার প্রতিকারের দাবির ন্যয্য অধিকার হযরত মুয়াবীয়ার রয়েছে, সুতরাং হযরত আবু মুছা হযরত আলীকে খলিফা পদ থেকে পদচ্যুত করার প্রস্তাব মেনে নেন এবং সমবেত জনগণের সম্মুখে তা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণানুসারে আবু মুছার প্রতিবাদ সত্ত্বেও আমর এবনুল আস্ অতঃপর মুয়াবীয়াকে খলিফা পদের যোগ্যতা ও বহাল ঘোষণা করেন। এই অবৈধ ঘোষণায় খেলাফতের প্রশ্নে দুর্লঘ্ন জটিলতার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় হযরত আলীর সেনা দলে আরো ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। হযরত আলী কেন সালিশ প্রস্তাব মেনে নিলেন-এ অজুহাতে অনেক সৈন্যই আলীর সমর্থন প্রত্যাহার করে ও তার দল ত্যাগ করেন। আব্দুল্লাহ এবনে ওহাব আরবাসবির নেতৃত্বে আলীর বিরুদ্ধে অস্র ধারণ করেন। এরাই ইসলামের প্রথম বিভক্তির খারেজী দল বলে পরিচিত।
অতঃপর হযরত আলী কুফায় ফিরে গেলেন। পক্ষান্তরে, সুযোগের পূর্ণ সদ্বব্যবহারের জন্য হযরত মুয়াবীয়া হযরত আলীর বিরুদ্ধে অভিযানের পর অভিযান প্রেরণ করেন।.. অতঃপর আবু বকর ইবনুল মুলজাম- আস্ সারিনী নামক জনৈক ছাহাবা গুপ্তঘাতকের হাতে হযরত আলী নিহত হন। এই ছাহাবা তার দুইজন সমবিশ্বাসীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত তাদের আত্মীয়দের প্রতিশোধ গ্রহণার্থে একই দিনে হযরত আলী, হযরত মুয়াবীয়া ও হযরত আমর এবনুল আস্কে হত্যার পরিকল্পনা করেন। (এ পরিকল্পনায় একমাত্র হযরত আলীই ধরা পড়েন; পক্ষান্তরে, হযরত মুয়াবীয়া ও হযরত আমর এবনুল-আস্ বেঁচে যান।)” [তথ্যসূত্র: সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষের ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ ও ২য় খ. ২য় মুদ্রণে বর্ণিত ৪ খলিফা ও মুয়াবিয়ার ইতিহাস থেকে সংগৃহীত ]
সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা:
হযরত ওসমানের শাসনামলে কেন বিশৃংখলা, অশান্তি ও গোলযোগ দেখা দেয়, তার বিভিন্ন কারণের মধ্যে প্রধান সূচনাটি ছিল নিম্নরূপ:
মিশরের নতুন গভর্ণর হিসাবে খলিফা হযরত ওসমানের স্বাক্ষরিত নিয়োগ পত্র নিয়ে হযরত আবু বকরের ছেলে মুহাম্মদ এবং তার দলবলসহ মিশরে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে এক গুপ্তচর ধরা পড়ে। তার পকেট থেকে খলিফা ওসমানেরই স্বাক্ষরিত ও মোহরাঙ্কিত আর একটি পত্র উদ্ধার করা হয়, তাতে মিশরের গভর্ণরের কাছে লেখা ছিল যে, ‘মুহাম্মদ মিশরের নতুন গভর্ণর হিসাবে তোমার ওখানে যাচ্ছে পৌঁছামাত্রই যেন তাকে হত্যা করা হয়।’ অতঃপর মুহাম্মদ গুপ্তচরকে বন্দী করে আবার মদিনা ফিরে এসে খলিফার কাছে এর প্রতিবাদ জানালে খলিফা তা অস্বীকার করেন। অতঃপর তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, এই ঘৃণ্য জালিয়াতি কাজটি করেছেন হযরত মারওয়ান বিন হাকাম। তিনি খলিফার চাচাতো ভাই তদুপরি মেয়ের জামাই, ঘর জামাই এবং খলিফার ঘরেই থাকেন। মুহাম্মদ ও তার সমর্থকদের তিনটি দাবি ছিল: ১. ঘটনার বিচার কর অথবা ২. মারওয়ানকে দাও নতুবা ৩. খেলাফত থেকে সরে দাড়াও। কিন্তু খলিফা তার কোনটিই পুরণ করতে না পারায় সদ্যজাত মুসলিম বিশ্বে বিদ্রোহের সুচনা হয়।
জনৈক লেখক ফতে মোল্লা বলেন, “ফুলের মত নিষ্কলঙ্ক, মিষ্টি মধুর মহান চরিত্রের হযরত ওসমান (রা) কেন এত বড় একটা অপরাধীকে বুকে আগলে রাখলেন? একটা কাল সাপ বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন এবং মুসলিম উম্মার ভবিষ্যৎ ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দিলেন? সে কি নিজের চাচাতো ভাই বলে? জামাই বলে? নিশ্চয়ই নয়। অবশ্যই নয়। তবে বড় রহস্যের, বড় বেদনাপ্লুত এ রক্তাক্ত নাটক..। ..হযরত ওসমানের রক্তাক্ত জামা আর বিবি নায়লার কাটা আঙ্গুল পাচার হয়ে গেল সিরিয়ার গভর্ণর মাবীয়ার কাছে। বাইশ বছর ধরে শক্ত শিকড় গেড়েছে সে সেখানে। রক্তাক্ত জামা চিরকালই এক অব্যর্থ মারণাস্র।...সে আঙ্গুল, সে জামা আগুন জ্বালালো সিরিয়ায়। আগুন জ্বল্ল ইরাকে, মিশরে, ইয়েমেনে। ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির মতো একটার পর একটা বিষফোঁড়া ফেটে যেতে থাকল এখানে, ওখানে সবখানে। একের পর এক চল্ল কালনাগিনীর মরণ ছোবল। রক্তস্রোত বয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্যে। নেমে এলো ঘোর অমানিশা, সঘন শর্বরী..।”..যে নাটকের পুরস্কার হয়েছিল সেই ছাহাবা মারওয়ান বিন হাকাম যিনি ইসলামের সপ্তম খলিফার পদ অলংকৃত করেছিলেন। [তথ্যসুত্র: আল-ভোঁদড়ের দেশ; ডাঃ ফতে মোল্লা; ‘পোহালে শর্বরী’ অধ্যায়।]
(চলবে-২/২)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


