সুচনা: মহানবির দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি ও দলের স্বার্থে-অস্বার্থে তড়িৎ বেগেই হাদিছের সুচনা হয়। মহানবির লাশ মোবারক ৩দিন বিলম্বে সৎকার এবং ইসলামের ১ম খলিফা নির্বাচনে মতভেদের কারণই ইহার অন্যতম প্রধান সাক্ষি।
শরিয়তের ৪ ইমাম পর্যন্ত (রাছুলের মৃত্যুর প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ বছর পর্যন্ত) হাদিছগুলি প্রধানতঃ মৌখিকভাবেই যত্রতত্র প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে; অতঃপর তাদের মৃত্যুর পর স্ব স্ব অনুসারীদের দ্বারা লিখন পদ্দতীর সুচনা হয়; বিশেষ করে ৪র্থ মজহাবী ইমাম হাম্বলের মৃত্যুর পর ( মৃত্যু ২৪১হি.) তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ পিতার মৌখিক ভাষণ মন্থণ করে রাছুলের নামে ২৮/২৯ হাজার হাদিছ সমন্বয় ‘মুসনাদ’ গ্রন্থ রচনা করেন ((স. ই. বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ, পৃ: ৯১; ই. ফা) মতান্তরে ৪০ লক্ষ । কিন্তু ঐ সকল গ্রন্থগুলি সময়মত বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ এবং প্রচার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে বিশ্বময় প্রচার প্রতিষ্ঠা পায়নি। এমন সময় ছেহাছেত্তার লেখকগণের গ্রন্থগুলিই অনুবাদ ও প্রচারের সুযোগে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। সুতরাং হাদিছ বলতে সাধারনতঃ ছেহাছেত্তাকেই বুঝানো হয়।
বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন হাদিছ তথা শরিয়তের সমর্থক, ধারক, বাহক ও রক্ষক। আলোচ্য ছেহাছেত্তার সুচনা সত্যতা, প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বিশ্বকোষে বিশদভাবে লিখিত আছে। উহার মধ্য থেকেই নিম্ন বর্ণিত উল্লেখযোগ্য ধারাগুলি চয়ন করা হয়েছে, যা সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করার বিষয়:
১. প্রথম হতেই ইসলামের মূল নীতিগুলি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ কোরান নবীর (সা) সুন্নাহ এবং তার নিকট থেকে সাক্ষাতভাবে শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাহাবীদের জীবন মুসলমানদের জন্য নীতি ও আদর্শের উৎস রূপে নিঃসন্দেহে নির্দিষ্ট হয়েছিল। কিন্তু স্বার্থপর ব্যক্তিগণ নিজেদের মতবাদের পক্ষে সমর্থন সৃষ্টির উপায়রূপে তথাকথিত হাদিছের আশ্রয় খুঁজতো। এই কারণে পরবর্তীকালে বহু জাল হাদিছের উদ্ভব হয়েছিল।
২. খৃষ্টীয় গ্রন্থাদির মর্ম, খৃষ্টীয় ‘এ্যপস্টল’ গণের উক্তি, খৃষ্টানদের অপ্রামাণ্য গ্রন্থাদির উক্তি, ইয়াহুদিদের ধারণা, গ্রীক দার্শনীকদের মতবাদ প্রভৃতি যা কিছুই কোন সময় কোন মুসলিম এলাকায় কিছুটা প্রচার এবং সমর্থন লাভ করতো, জালিয়াতদের কল্যাণে এরূপ অনেক কিছুই সরাসরি হযরত মুহাম্মদের (সা) উক্তি রূপে হাদিছের পোষাকে আর্বিভূত হতো।
৩. কোরানে যে সকল ঘটনা সংক্ষেপে বিধৃত হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে উপাখ্যান সৃষ্টি কিংবা অমুসলিম সূত্রে প্রাপ্ত উপাদানের উপর নির্ভর করে চমকপ্রদ নতুন মতবাদ এবং ধর্ম মতের প্রচার করার নিমিত্ত্বে হযরতের নাম জড়িত করার ব্যাপারে জালিয়াতদের দ্বিধা সংকোচবোধ ছিল না বললে অত্যুক্তি হয় না -।
৪. সাধারণ উপদেশ বাণী এবং নৈতিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় জাল হাদিছের ছড়াছড়ি ছিল।
৫. নিজেদের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্বে উভয় পক্ষই হাদিস থেকে সমর্থন যোগাড়ের চেষ্টা করতো।
৬. সাধারণভাবে কেবল পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং ধর্মীয় আন্দোলনের গতিধারা সম্পর্কই নয়, বরং যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে যে নতুন সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সে ক্ষেত্রেও জনসাধারণের সমর্থন লাভের জন্য তথা-কথিত ভবিষ্যৎ বাণী সম্বলিত হাদিছ পরিবেশিত হতো।
৭. এক শ্রেণীর লোক সৎকাজের উৎসাহ সৃষ্টি এবং অপকর্মের অশুভ পরিণামের ভীতি উদ্রেক করার সরল উদ্দেশ্যে আপ্ত বচনের সহিত উপযোগী সনদ জুড়ে তাকে হাদিছের পোষাকে প্রচার করতো।
৮. অপর পক্ষের নব দীক্ষিত মুসলিমদের মুখোশ পরিধান করে ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য চক্রান্তমূলক হাদিছ সৃষ্টি করেছিল সুনিপুণভাবে এক শ্রেণীর লোক-।
৯. হযরত আলী এবনে আবু তালিব (রা) এর খেলাফতের সময় যে গৃহযুদ্ধ বাধে, তার ফলে খলিফার যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে যে সব গুণপনার প্রয়োজন, তা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠে এবং কালক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সা¤প্রদায়িক মতবাদ এক একটা নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে।
১০. উমাইয়গণের শাসনকালে খলিফা পদের সহিত ধর্মীয় সম্পর্কের সূত্র শিথিল হয়ে পড়ে।- আব্বাসীয় রাজধানী বাগদাদে পারস্য সম্রাটগণের রীতি-নীতি প্রবর্তন করা হয়।
১১. আরববাসীয় খলিফাগণ গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে জাঁকজমকের সহিত সিংহাসনে উপবেশন করতেন। চতুস্পার্শে দেহ রক্ষীগণ এবং পার্শে উন্মুক্ত তরবারী হস্তে ঘাতক দন্ডায়মান থাকতো। সেই সঙ্গে তারা রাছুলের জুব্বা বলে কথিত একটি জামা পরিধান করে খেলাফতের ধর্মীয় গুরুত্ব রক্ষার প্রয়াস পেতো। রাষ্ট্রিয় দলিল পত্রে স্তুতিকারকদের স্ব প্রশংস নীতির মাধ্যমে রাছুলের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা প্রকাশ করা হতো।
১২. ইসলামের ইতিহাসের সূচনায় রাজনৈতিক কারণে খেলাফত মতবাদের উদ্ভব হয়। ভিন্ন ভিন্ন মনীষীর চিন্তাধারায় এই মতবাদ বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে প্রচারিত হতে থাকে। [দ্র: সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্ব কোষ, ২য় খ. ২য় সংস্করণ; হাদিছ অধ্যায়; পৃ: ৪৭৭; ই. ফা.]
সমালোচনা
ইতিহাস এবং সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষের বর্ণনায়: খেলাফত মতবাদের কারণে ইসলামের ইতিহাসে যেমন রক্তপাত ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়; অন্য কোন ধর্মের কারণে সেরূপ ঘটে নাই। [আংশিক তথ্যসুত্র: সং. ই. বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ,‘আলী’ অধ্যায়]
খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের পরবর্তী যুগে মুসলিম বিশ্বের যে চরম অবক্ষয় হয়েছিল, উপরোল্লিখিত ধারাগুলি নিরপেক্ষ জ্ঞানে বিশ্লেষণ করলে উহার একটি বিভৎস রূপ অঙ্কন করা যায়। জাল হাদিছ রচনা নিরীহ সরল প্রাণ জনসাধারণের পক্ষে কখনও সম্ভবপর নয়। বরং দলের নেতা, বিচক্ষণ, চতুর বুদ্ধিমান ও প্রভাবশালীগণই তা করে থাকেন। আর বলতে বাধা নেই যে, এরা সকলেই শরিয়তী পরিভাষার সুত্রে সাহাবা ও তাবেইন ছিলেন।
ব্যক্তি ও দলের ঘৃণ্য স্বার্থে মহানবির পবিত্র নামের মিথ্যা দোহাই দিয়ে হাদিছ রচনার আদিকালের সেই প্রবণতা আজও দূর হয়নি। ‘মিথ্যার মাধ্যমে সত্য প্রচার’ এটা নাকি সরল উদ্দেশ্য! আল্লাহ-রাছুল তথা কোরানের উপর বিশ্বাসের কতখানি অবনতি হলে আর কতখানি চরিত্রের অবক্ষয় হলে ‘মিথ্যার আশ্রয়কে’ সরল উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করতে পারে! আর এ মন্তব্যটি করেছেন ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্ব কোষের’ বাংলার ১৫ জন শ্রেষ্ঠ আলেম-সম্পাদক!!
সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায়। আর যায় বলেই কোরানে উহা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। (দ্র: ২: ৪২) কিন্তু মিথ্যাকে সত্য দিয়ে ঢাকা যায় না। মিথ্যাকে আর একটি অথবা একাধিক মিথ্যা দিয়েই ঢাকতে হয়।
ইমাম বোখারীগণ কেমন আলেম, কেমন রাবী, কেমন পরিবেশ থেকে হাদিছ সংগ্রহ করেছেন তার একটি সম্যক চিত্র উপরে বর্ণিত হয়েছে। এবারে সেই সমাজের সমূহ রূপ কতখানি বীভৎস ও কলুষিত হয়েছিল, তা তাদেরই বর্ণিত তিনটি হাদিছের আলোকে প্রকৃত ধার্মিকগণ স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন:
১. ছাহাবী ছালেম ও ইমাম যুহরী (রা) সূত্রে বর্ণিত: তিনি বলেন, “উম্মে দারদাকে আমি বলতে শুনেছি যে, একবার আবু দারদা (রা) খুব চিন্তাযুক্ত এবং রাগান্বিত অবস্থায় বাহির থেকে আমার কাছে আসেন। আমি এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ (সা) এর শরিয়তে এমন কিছু নেই যা মানুষের কাছে অজানা-অদেখা রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষ জামাতবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়ে। অর্থাৎ উম্মতে মোহাম্মদীয়ার মধ্যে এত অধিক পরিমাণ পাপ কর্ম এবং শরিয়ত বিরোধী কর্মকান্ড প্রবেশ করেছে যে, তাদের কোন একটি কাজও হুযুরের (সা) তরীকা অনুযায়ী নয়। কেবলমাত্র একটি ব্যাপার ছাড়া। আর তা হচ্ছে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা। এটাও যেন তাদের কাছ থেকে বিদায় হয়ে না যায়। এহেন অবস্থা লক্ষ্য করেই আমার রাগ ও চিন্তা হচ্ছে।” [দ্র: বোখারী, ১ম খন্ড, ১২ সংস্করণ; পৃ: ২০৩; (তিরমিজী) রিয়াদুস সালেহীন, ৩য় খন্ড ৩য় প্রকাশ। [দ্র; ঐ ঐ’ বলতে পূর্বের বর্ণিত দ্রষ্টব্য বুঝায়]
২. ছাহাবী আনাস্ বিন মালিক সূত্রে বর্ণিত: তিনি বলেন, ‘হুযুরে আকরাম (সা) এর জামানায় আমরা দ্বীন ইসলামের যা কিছু পেয়েছি ওসবের কিছুই আজ পরিচিত নয়। অর্থাৎ সবকিছুই মানুষ বিগড়ে দিয়েছে।’ জনৈক শিষ্য প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে আমাদের নামাজ? নামাজও কি ঠিক নেই?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কি তোমাদের নামাজে সে সব করছো না-যা তোমরা নিজেরাও অবগত আছ।’ [দ্র: ঐ, ঐ]
৩. হযরত মুয়াবীয়া (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, হে লোক সকল তোমরা এমন নামাজ আদায় কর যা আমি কখনও রাছুলকে আদায় করতে দেখিনি। অথচ আমি তার ঘনিষ্ট সহচর। তিনি ঐ ২ রাকাত নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন অর্থাৎ আসরের পরে যে ২ রাকাত নামাজ পড়া হয়। [দ্র: বোখারী, ১ম খন্ড; পৃ: ২৬৭, ১২ সংস্করণ ]
হাদিছ ৩টি অস্বীকার করার ক্ষমতা শরিয়তের নেই! আর স্বীকার করলে প্রচলিত নামাজ যে রাছুল স্বয়ং করতেন না তাও স্বীকার করতে হয়! মূলতঃ উহা যে সমগ্র ছেহাছেত্তাকে সন্দেহজনক করে তুলেছে তাও অস্বীকার করার ক্ষমতা তাদের আছে বলে মনে হয় না।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

