somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাদিছ সংগ্রহের অভিনব ইতিহাস-১/২

২৬ শে নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছেহাছেত্তা অর্থাৎ ‘ছয়খানি সত্য’ হাদিছের মধ্যে লেখক ইমাম বোখারী ও ইমাম মোসলেম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত বিধায় ঐ দু'জন সম্বন্ধে বিশদ আলোচনার মধ্যেই অন্যান্যদের পরিচয় পাওয়া যাবে।
মহানবির মৃত্যুর প্রায় ৩ শ’ বৎসর পরে, অর্থাৎ ৫/৬ পুরুষ অতিবাহিত হওয়ার পরে, ২১০ হিজরী মাত্র ১৬ বৎসর বয়সে ইমাম বোখারী হাদিছ শাস্র (কোরান নয়) শিক্ষায় মনোযোগ দেন। পরবর্তী ১৬ বৎসর অর্থাৎ ২২৬ হিজরী থেকে সমগ্র এশিয়া আফ্রিকা ভ্রমণ করে দেশে দেশে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে মোট ৬/৩০ লক্ষ হাদিছ সংগ্রহ করেন। প্রকাশ থাকে যে, তখন সাহাবা, তাবেইন এমন কি তাবে-তাবেইনও বেঁচে থাকার কথা নয়।
হাদিছ সংগ্রহ পদ্ধতির নমুনা:
ইমাম বোখারী যার কাছ থেকে হাদিছ শুনেছেন, তিনি যার কাছে এবং উনি যার কাছে এভাবে শোনার ছিল্ ছিলা বা সুত্র পরম্পরার সকলকেই রাবী বা বর্ণনাকারী বলে। এরকম একটি হাদিছের রাবীর সংখ্যা ৭ থেকে ১০০ জন পর্যন্তও আছে, যেমন:
ইমাম বোখারী তার পরিচিত ‘ঝ’ এর কাছে শুনেছেন যে, “রাছুলাল্লাহ (সা) মহল্লার আবর্জনা ফেলবার স্থানের নিকট দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন।” ইমাম বোখারী ‘ঝ’কে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কার কাছে শুনেছো?’-‘জ' এর কাছে।-কোথায় থাকেন ‘জ’?-বসরার অমুক গ্রামে। ইমাম বোখারী অতঃপর বাগদাদ থেকে বসরায় গমণ করলেন। অনেক খোঁজা খুঁজির পরে ‘জ’কে পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি নাকি একটি হাদিছ জানেন?’ - জ্বী!- বর্ণনা করুন; ‘রাছুলাল্লাহ মহল্লার আবর্জনা ফেলবার স্থানের নিকট দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন।’- কার কাছ থেকে শুনেছেন? ‘ছ’র কাছে। - কোথায় থাকেন ‘ছ’?- মদিনায়। ইমাম বোখারী বসরা থেকে মদিনায় গমন করলেন; ‘ছ’কে পেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি নাকি মহানবির একটি হাদিছ বয়ান করে থাকেন?- হ্যাঁ!- আমাকে শুনাবেন? ‘রাছুলাল্লাহ- দাড়িঁয়ে প্রস্রাব করেছেন-।’ কোত্থেকে শুনলেন?- সিরিয়ার ‘চ’এর কাছে। ইমাম বোখারী সিরিয়া গমন করলেন! যথাযথ প্রশ্ন করলেন, শুনলেন। অতঃপর তার পরামর্শ মত ইরানের খুম শহরে ‘ঙ’র সাক্ষাত লাভ করলেন। তার উপদেশ মত রাজধানী তেহরানে গিয়ে ‘ঘ’র সঙ্গে মোলাকাত করলেন। সেখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে মক্কায় ‘গ’র বাড়ীতে তসরীফ নিলেন। ‘গ’র উপদেশ মত ‘খ’র বাড়ী রিয়াদে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে পুনরায় এজিদের রাজধানী দামেস্কে গিয়ে ‘ক’ এর স্মরণাপন্ন হলেন। যথা বিহিত সম্মান প্রদর্শন পূর্বক প্রশ্নের উত্তরে ‘ক’ বললেন, “আমি মরহুম ‘অ’কে বলতে শুনেছি যে, তিনি শুনেছেন তাবেইন অমুকের কাছে, অমুক শুনেছেন ছাহাবা হোযায়ফার (রা) কাছে। ছাহাবা হোযায়ফা বলেছেন যে, “আমি একদা হযরতের সঙ্গে কোথাও যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে তিনি মহল্লার আবর্জনা ফেলবার স্থানের নিকট এসে একটি দেয়াল মুখী হয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেন। আমি দূরে সরে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে ইশারা করে কাছে ডাকলেন। আমি নিকটে হাজির হয়ে তাঁহার (পিঠের প্রতি পিঠ দিয়ে বিপরীত মুখী) পায়ের নিকটবর্তী দাঁড়িয়ে থাকলাম; সম্মুখের দিকে পর্দা ছিল দেয়াল এবং পিছনের দিকে হোযায়ফাকে (রা) দাঁড় করিয়ে রাছুলাল্লাহ ছাল্লেল্লাহু আলাইহে অছাল্লাম পর্দার ব্যবস্থা করলেন; দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার দরুন কাপড় একটু বেশি উঠিবে)। [দ্র: বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ: ১৩৮,১২ সংস্করণ]
উল্লিখিত হাদিছে ‘ঝ’ থেকে ছাহাবী হোযায়ফা পর্যন্ত মাত্র ১২ জন রাবী। পক্ষান্তরে, এমন হাদিছ আছে যার রাবীর সংখ্যা ১ শত জন; আর সর্বনিম্ন সংখ্যা ৭ জন, যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। হাদিছ সংগ্রহে সূত্র পরম্পরা রাবীদের মধ্যে এক বা একাধিক রাবীর সাক্ষাত পাওয়া যায় নি অথবা বর্ণনায় তিল মাত্র পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে অথবা কোন রাবীর কথায় বা কাজে মিথ্যা, ভুল অথবা সন্দেহ হলে ইমাম বোখারীগণ তাঁর বর্ণিত হাদিছটি আর গ্রহণ করেন নি বরং তৎক্ষণাৎ তা বর্জন করেছেন বলে কথিত হয়। উদাহরণ স্বরূপ:
ইমাম বোখারী কোন এক হাদিছের খোঁজে নির্দিষ্ট রাবীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে, তিনি দেখতে পান বাগানে সেই রাবী ছুটে যাওয়া ঘোড়াকে ধরার জন্য বাল্তিতে খাবার রেখে ঘোড়াকে ডাকছেন। ইমাম বোখারী কাছে গিয়ে দেখতে পান বাল্তিটির মধ্যে কোন খাবার নেই একেবারে শুন্য। অতএব ঘোড়াকে প্রতারিত করার অপরাধে উক্ত রাবীর বর্ণিত হাদিছটি না শুনেই ইমাম বোখারী ফেরৎ চলে আসেন!
কথিত এহেন সতর্কতার সহিত ইমাম বোখারী মিশর, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন ও সৌদি আরবে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ভ্রমণ করে করে অতি সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৬ লক্ষ হাদিছের সঙ্গে কোটি কোটি রাবীর নাম, ঠিকানা ও তাদের জীবনেতিহাস শোনা মাত্র মৌখিকভাবে এবং মুখস্ত করে সংগ্রহ করেন। অতঃপর মদিনায় মহানবির রওজা মোবারকের আশপাশে বসে কন্ঠস্থ হাদিছগুলি রোমন্থন করে করে নিজ বিবেক, বিচার বিশ্লেষণ করে অনুমান ৫ লক্ষ ৯২ হাজার ২ শত ২৫টি হাদিছ মিথ্যা, ভুল, জাল ইত্যাদি সন্দেহ করে বর্জন করেন এবং প্রায় ৩ হাজার, মতান্তরে ৭ হাজারটি হাদিছ সত্য বলে গ্রহণ করেন; অতঃপর সত্য মহা সত্য বলে নিজের নামে প্রকাশ ও প্রচার করেন। এতদসঙ্গে মুখস্থকৃত কোটি কোটি রাবীদের নাম ঠিকানা ও তাদের সারা জীবনের সত্য কথা-কাজের স্বপক্ষে বাছনি করে মাত্র ১,৮০০ শত রাবীর জীবনী ‘ইসনাদ’ নামে দলিল রচনা করেন।
একই পন্থায় ছেহাছেত্তার ইমামগণ সর্বমোট ৩০ লক্ষ হাদিছ সংগ্রহ করেন, উহার মধ্য থেকে বাছনি করে আনুমানিক: ইমাম বোখারী-৭,২৭৫; ইমাম মোসলেম-৪,০০০; আবু দাউদ-৪,৮০০; তিরমিজী-৩,৮১২; ইবনে মাজাহ্-৪,৩৪১; এবং নাছাই ৪,০০০টি হাদিছ গ্রহণ করেন। ছোহাছেত্তা ছাড়াও বহু হাদিছ গ্রন্থ আছে, যা পর্যাপ্ত সাগরেদ ও প্রচারের অভাবে পরিচয় লাভ করতে পারে নি। সেগুলির সংখ্যা ৪০ লক্ষেরও উর্ধে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
[তথ্যসুত্র: সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ, ১ম খ. ৩য় মুদ্রণ; ২য় খ. ২য় সংস্করণ (স্ব স্ব নামের অধ্যায়); হাদিছ সংকলনের ইতিহাস, খায়রুন প্রকাশনী, ১ম প্রকাশ, পৃ: ৩৭৮-৩৯৫]
সমালোচনা
১. অতি সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ এবং কঠিণ সতর্কতার সাথে আনুমানিক ৩০ লক্ষ হাদিছ সত্য বলেই গ্রহণ করেছিলেন; এত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করার পরেই আনুমানিক ২৯ লক্ষ ৯২ হাজার ৭ শত হাদিছ মিথ্যা বলে আবার বর্জনও করেছেন। অতএব পাঠকদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, হাদিছ সংগ্রহ, বিচার বিশ্লেষণ, রক্ষন-বর্জন সবই প্রহসন বলেই মনে হয়!
২. হাদিছ সূত্র অনুযায়ী মহানবির নামে কেহ মিথ্যা রচনা করলে এবং তাঁর সত্য বাণী গোপন অথবা ত্যাগ করলে অবশ্যই সে জাহান্নামী হবে। এক্ষণে তাদের সংগৃহীত ছহিহ্ (সত্য) নামের প্রায় ৭,৩০০টি হাদিছের মধ্যে একটি হাদিছও যদি মিথ্যা বা ভুল প্রমাণিত হয়! তবে ২৯, ৯২,৭০০ শতটির মধ্যে দু’চারটি যে অবশ্যই সত্য ছিল তা চোখ বুজেই বলা যায়। আর যদি তাই-ই হয় তবে হাদিছের ধারা মোতাবেক সংগ্রাহক ইমাম মোহাদ্দেসগণ হাদিছ গ্রহণ বর্জন, অর্থাৎ উভয় পক্ষ থেকেই জাহান্নামী হওয়ার সম্ভাবনাই নয় বরং নিশ্চিৎ বটে! (চলবে-২/২)
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×