[জনাব কাংগাল মুরশিদ ও মাই নেম ইজ খানের সৌজন্যে]
প্রায় হাজার বছরের অধিককাল থেকে মুসলিম বিশ্বে কোরানের যে বিধানটির দোহাই দিয়ে একাধিক বিবি ভোগ করে আসছেন সে বিধানটি এই:
১. তোমরা যদি আশংকা কর যে, এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না তবে বিবাহ করবে নারীদের মধ্য থেকে যাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন অথবা চার; আর যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভূক্ত একজন দাসীকে ইহাতে পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর সম্ভাবনা(৪: ৩) ।
ততকালীন মোসলেমগণ নবির নেতৃত্বে একের পর এক যুদ্ধ জয় করছিলেন। তাদের মধ্যে অসংখ্য নারীও বন্দী হয়। যাদের পিতামাতা,স্বামী সকলেই মোসলেমদের হাতে নিহত হয়। অপরদিকে অসংখ্য মোসলেম নারীগণও তাদের স্বামী, মাতা-পিতা তথা অভিভাবক হারায়। উল্লিখিত কোরানের ভাষায় এরা সকলেই এতিম। একমাত্র ঐ সকল অসহায় এতিমদের ব্যাপারেই বর্ণিত আয়াতে বিয়ের নির্দেশনামা।
যুদ্ধের নিয়ম বা রাজনৈতিক বিধান মোতাবেক যুদ্ধ লব্দ অন্যান্য সম্পদের মতই এতিম বা অধিকৃতদের সহায় সম্পদসহ তাদের নিরাপত্তার জন্য সমাজের ক্ষমতাধর কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যে বন্টন করা হতো, যেহেতু তখন কারাগারের সু ব্যবস্থা ছিল না। এদের যাবতিয় দায়-দায়িত্ব, নিরাপত্তাসহ যৌন ভোগেরও অধিকার ছিল। কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হতো না। দেখুন:
২. -এবং লোকেরা তোমার নিকট নারীদের বিষয় জানতে চায়, বল! আল্লাহ তোমাদিগকে তাদের সম্বন্ধে ব্যবস্থা দিয়েছেন। এতিম নারী সম্বন্ধে যাদের প্রাপ্য তোমরা প্রদান কর না অথচ তোমরা তাদের বিয়ে/ভোগ করছো/করতে চাও এবং অসহায় শিশু ও এতিমদের প্রতি তোমাদের ন্যায্য বিচার সম্বন্ধে কেতাবে যা বিধিবদ্ধ হয়েছে, তার উপর কায়েম থাক। যে কোন সত্ কাজ তোমরা করে থাক আল্লাহ তা জানেন(৪: ১২৭) ।
এসমস্ত বিবিধ কারণে নব্য মোসলেমগণ সীমাহীন ও অবাধ নারী ভোগের সুযোগ পায়। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চরম অবক্ষয়ের আশংকায় একটি কঠিন শর্তের অধীনে (সমব্যবহার) উল্লিখিত ঐ এতিম নারীদের মধ্য থেকে ২, ৩ বা ৪ জনকে বিয়ে করার অধিকার দিয়ে তাদের স্ত্রী-মর্যাদা প্রদান করতঃ সীমাহীন অত্যাচার, যৌনাচার সুকঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বিধানটি সাধারণের জন্য অবশ্যই নয়। বরং বিশেষ কাল, বিশেষ অবস্থায় একমাত্র অসহায়, এতিম নারীদের অধিকারী পুরুষদের জন্য একটি বিশেষ বিধান। যা এক্ষণে অমুসলিমগণও এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে, বিধানটি মুলেই মহত্ ও সাম্যবাদী। অথচ আয়াতটির অপ-ব্যাখ্যা করে আদিকাল থেকেই অমুসলিম সমাজে কোরান ও মহানবিকে অশ্লীল বিতর্কে জড়িয়েছে; যদিও ইউরোপ, আমেরিকানগণ যৌন বিষয় পশুর মতই উদার কিন্তু একমাত্র রাষ্ট্র নেতাদের ক্ষেত্রে অসীম ব্যতিক্রম।
চার বিয়ে ফরজ হয় কিভাবে! যুক্তিই বা কি! বরং উহা ‘আনফাল’ ; ‘নফল’ শব্দের বহুবচন। অর্থাত অতিশয় অতিরিক্ত। অতএব মুসলমানগণ আবার যদি কখনও কোন নবির নেতৃত্বে যুদ্ধ করে অসহায় নারীদের বন্দিনী করতে সক্ষম হয়! মুসলমান নারীগণ যদি স্বামী ও পিতামাতা হারিয়ে এতিম হয়; অতঃপর যে সকল সৈন্য ও সমাজপতিগণ, যারা ঐ এতিমদের লালন-পালনের অধিকার প্রাপ্ত হবেন কেবল মাত্র তারাই শর্তের মধ্যে ২, ৩ বা ৪ জন করে বিবি গ্রহণের সুযোগ পাবেন, অন্যথায় একজনের বেশি নয়। কিন্তু ভোগবাদী ইসলামের স্বার্থে বিধানটির অপব্যাখ্যা করে হাজার বছরের অধিককাল যাবত্ মুসলিম বিশ্ব:
ক. অবৈধভাবে একাধিক নারী ভোগ করছেন।
খ. স্বামীর প্রতি স্ত্রীর (১ম স্ত্রীর) ন্যায্য অধিকার পদদলিত করছেন।
গ. কোটি কোটি নারীর (একাধিক স্ত্রীদের) সতীত্ব হরণ করছেন।
ঘ. ততোধিক অবৈধ সন্তান জন্ম দিয়ে কালের বিবর্তনে সমগ্র মোসলেম জাতির রক্ত অপবিত্র করেছেন।
ঙ. অ-মুসলিমদের কাছে ইসলামকে চরমভাবে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করেছেন।
কোরানে পতিতা নারীর যেমন সমর্থন নেই, পতিত পুরুষ হওয়ারও কোন বিধান নেই; কোরান প্রাকৃতিক ও নিখুঁত সাম্যবাদের।
আয়াতটির প্রথম অংশ পুনঃ লক্ষনীয় যে, -এতিম নারীদের প্রতি সুবিচার করতে না পারলে নারীদের মধ্য থেকে পছন্দমত অনুর্দ্ধ ৪ জন বিয়ে করতে পার-, পুনঃ একই কথা বলা হয়েছে: সুবিচার করতে না পারলে একজন-।
‘সুবিচার করতে না পারলে ৪ জন, সুবিচার করতে না পারলে ১ জন’, এই অস্পষ্ট বিষয়টির ফয়শালা না করে শরিয়ত অপ্রাসঙ্গিক ৪ বিবির পক্ষে ঝুঁকে পড়েছেন। অনুবাদকগণ ফুটনোটে লিখেছেন: এ স্থলে (২য় স্থানে) নারী অর্থ স্বাধীনা নারী; কারণ ইহার পরই দাসীর উল্লেখ রহিয়াছে। -এই আয়াতে বলা হইল যে, য়াতীম মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফ করিতে পারিবে না-এই আশংকা থাকিলে ইনসাফের ভিত্তিতে অন্য মেয়েদেরকে অনুর্দ্ধ চার পর্যন্ত বিবাহ করতে পার। (আল-কোরানুল করীম; ইসলামিক ফাউন্ডেসন. ছুরা নিছা,ফুটনোট নং-২৬১, ২৬২)।
এতিম নারীদের প্রতি সুবিচার করতে না পারলে অন-এতিম স্বাধীনা ৪ জন নারী ইনসাফের মাধ্যমে বিয়ে করার যুক্তি অযৌক্তিক, কৌতুককর এবং প্রকাশ্যে বে-ইনসাফী। আয়াতটির বিষয়বস্তু একমাত্র এতিম ও দাসী বিয়ে সম্পর্কে; সাধারণ বা স্বাধীনা নারীদের বিষয় তিল পরিমাণ আকার-ইঙ্তিও সেখানে নেই। অতএব বিশেষ কারণ ছাড়া সাধারণতঃ একাধিক বিয়ে কল্পনাও অবৈধ।
সাধারণ নারীগণ এতিম-দাসীদের মত অসহায়, পরাধীন বা পণ্য নয় যে, চাইলেই বিয়ে করা যায়; সুতরাং প্রচলিত বিধান অপ্রাকৃতিক, অসামাজিক এবং অশ্লীল স্বার্থ প্রণোদিত।
পুনশ্চু: আয়াতে প্রয়োজনবোধে একটি স্ত্রী সংসারে বহাল রাখার জন্য ২য়, ৩য় অথবা ৪র্থ বার পর্যন্ত বিয়ে করতে পারবে অথবা অনুর্দ্ধ মোট ৪ জন স্ত্রী একসঙ্গে বহাল রাখতে পারবে তার কোনটাই স্পষ্ট না থাকলেও প্রথমটি যে যুক্তিসঙ্গত তা আয়াতটির শেষ অংশে সাক্ষ্য বহন করে; তবে পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এই ব্যতিক্রমধর্মী বিধানটি ততকালীন অধিকৃত এতিম ও দাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল; কিন্তু আজ আর সে এতিম বা ক্রিত দাসীদের অস্তিত্ত্ব নেই।
একটি পুরুষের একসঙ্গে চার স্ত্রী গ্রহণ সুশীল ও ভদ্র সমাজে কখনওই গ্রহণীয় নয় এবং অতীতের কোন ধর্মেই তা স্বীকার করে না, কোরানের একটি বিধানও নতুন নয় এবং পক্ষপাতিত্ব ও ভোগ বিলাসী বিধান আল্লাহর হতে পারে না।
আয়াতে Ôএতিম শব্দটি নিয়ে বেশ মতবিরোধ বিদ্বমান। কতিপয় অনুবাদকগণ উহার অর্থ করেছেন: অরফ্যান, মা-বাপহীণ শিশু-কিশোর, আর এ সুযোগে ইসলাম বিরোধীগণ কোরানের অবমূল্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছেন যে, কোরান অমানবিক শিশু বিয়ে বা যৌনাচার অনুমোদন করে। মূলতঃ আয়াতটিতে অসহায় বিবাহযোগ্য এতিমদেরকেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। (২নং ৪: ১২৭)
এখানে এতিম বলতে সহায়-সম্বল হারিয়ে যে সমস্ত নারীগণ অপ্রত্যাশিতভাবে নিদারুণ অসহায় হয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যের দাসী বা অধীনস্থ হয়ে আছে। মন্তব্যটির পক্ষে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়াও আভিধানিক সমর্থনও পাওয়া যায় যেমন: ইয়াতমুন, ইয়াতামুন, ইয়াতীম, ইয়াতীমুন অর্থ যথাক্রমে: নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া, অসহায় হয়ে যাওয়া, ছোট হয়ে যাওয়া, দুর্বল হয়ে পড়া, পিতৃহীণ, অভিভাবকহীণ ইত্যাদি [ আরবি-বাংলা অভিধান; মা. মুহিউদ্দীন খান]
সমব্যবহার এর শর্তে এতিমদের মধ্য থেকে একাধিক বিয়ের কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমব্যবহার করতে যে পারবে না বরং অসম্ভব, অবাস্তব তা নিম্ন আয়াতে স্থায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছে:
৩. -এবং তোমরা যতই চেষ্টা কর না কেন একাধিক স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনওই পারবে না; সুতরাং তোমরা কোন একজনের দিকে ঝুঁকে পড়িও না এবং অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখ না। যদি তোমরা নিজদিগকে সংশোধন কর ও সাবধান হও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু(৪: ১২৯) ।
সংক্ষেপে আয়াতটির মূলার্থ হলো সমব্যবহার একেবারেই অসম্ভব, অতএব একাধিক স্ত্রী অধিকার করে যারা বর্তমান আছো! তারা কোন এক স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে থেকে অপরদের ঝুলিয়ে না রেখে বরং এক্ষণে, অবিলম্বে মুক্ত করে দাও এবং অতিরিক্ত যৌন লালসা সামলাও এবং একজন নিয়েই সন্তুষ্ট থাক। অর্থাত এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ সর্বোতভাবেই অবৈধ বা হারাম।
একমাত্র কোরানের উপর শরিয়ত কিছুতেই সন্তুষ্ট নয়! কোরান পরিপূর্ণ স্বীকার করেও দুনম্বরী গ্রন্থ অত:পর ফতোয়া ছাড়া তাদের ধর্ম অপূর্ণ থাকে; শরিয়তের হেন বিশ্বাস মতে স্বয়ং মহানবিকেও স্বীয় স্ত্রীদের প্রতি অসম ব্যবহারের অপরাধে অভিযুক্ত করে! তিনি প্রকাশ্যে বিবি আয়শার প্রতি ঝুকে ছিলেন! পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন! অতঃপর এ নিয়ে স্ত্রীদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, দলাদলি, বিচার-আচার এমনকি স্বয়ং মেয়ে ফাতিমা বার বার চেষ্টা করেও মীমাংশা করতে ব্যর্থ হন। (হাদিছ বলে) রাছুল ছাপ ছাপ বলে দেন যে, আয়শার বিষয় কেহ যেন নাক না গলায়; কারণ আয়শার বিছানায় শুইলে নাকি বেশি বেশি অহি আসে (দ্র: বোখারী, ৩য় খ. ৮ম সংস্করণ, আজিজুল হক; পৃ: ১১)
[হাদিছটি বিশাল বলে দেয়া হলো না। কারো দরকার হলে জবাবে/মন্তব্যে দেয়া যেতে পারে]
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



