মা কানা মুহাম্মাদুন--অ খাতামান্নাবীন (৩৩: ৪০) অর্থ: মুহাম্মদ (মহাপুরুষ) কি তোমাদের মধ্যের কারো পিতা নন?(অর্থাত তোমাদের মতই মানুষ নন?) কিন্তু (পার্থক্য হলো) তিনি আল্লাহর মার্কাযুক্ত (নির্ভেজাল)নব-প্রেরণাপ্রাপ্ত।
পর্ব-৩
পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, আল্লাহর সঙ্গে ইব্রাহিমের চুক্তি: ধরায় পুনঃ পুনঃ নবি-রাছুল আগমনের চিরসূত্রিতার চুক্তি; সে চুক্তি অতীতের কোন ঐশী গ্রন্থ তথা কোরানে বাতিল করেনি! কিম্বা মহানবির ওফাতের প্রায় ৩ শত বৎসর পরে বোখারীগণ বাতিলের অহি পান্নি! আর ভবিষ্যতে আল্লাহর চুক্তি প্রত্যাহার করবেন বলেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই:
১৭. অল্লাজীনা-মুফলেহুন। (২: ৪, ৫) অর্থ: এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হচ্ছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং পরবর্তীতেও (আখের) যারা আস্থাশীল; তারাই তাদের প্রভুর নির্দেশিত পথে রয়েছে/রবে এবং তারাই সফলকামী।
‘আখিরাত’ অর্থ: পববর্তীতে অর্থাৎ ভবিষ্যতে; ‘ইয়াওমিল আখেরাত ‘পরেরকালে’ বা ভবিষ্যত কালে; কিন্তু ‘মৃত্যুর পরের কাল’ বাক্যটি এখানে নেই, উহা শরিয়তের ভুল ও অনধিকার সংযুক্তি।আলোচ্য আয়াতে ‘আখেরাত’ বলতে এ মুহূর্ত থেকে পরবর্তী অর্থাত ‘ভবিষ্যত’ কালকেই বুঝিয়েছে।
আয়াতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের (কেতাব)ওপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখার জোর দেয়া হয়েছে।
একই বাক্যে দুনিয়াবী অতীত, দুনিয়াবী বর্তমান কেতাবের কথা বলার পরেই দুনিয়াবী ভবিষ্যৎ কেতাবের কথা না বলে বরং অসম্পূর্ণ রেখে মরণের পরের বিশ্বাস যুক্ত করা সংগত হয়নি; তাতে ভাষা ও ভাবার্থে অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে, যা আল্লাহর বাণীতে সঙ্গত নয়। আরও স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রধানত কোনো ধর্মেই মৃত্যুর পরের কাল, বিচার আচার, স্বর্গ-নরক সম্বন্ধে অবিশ্বাস নেই; বরং অতীত কাল থেকেই নিশ্চিত হয়ে আছে; সুতরাং এখানে ‘বিলআখিরাত’ অর্থে ‘মৃত্যুর পরের কালকে বুঝানোর কোনোই সুযোগ নেই।
১৮. অ ইজ-ফাছেকুন। (৩: ৮১-৮২) অর্থ: স্মরণ কর! যখন আল্লাহ নবিদের শপথ নিলেন যে, তোমাদের প্রদত্ত কেতাব ও হিকমত (কেতাব, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুত্র) যা কিছু দিয়েছি তার শপথ কর যে, তোমাদের কাছে যা আছে তারই সমর্থক রূপে যখন(ই) কোন রাছুল আসে/আসবে, তখন অবশ্যই তোমরা তার ওপর ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে! তিনি বল্লেন, ‘ তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এসম্বন্ধে আমার অঙ্গীকার গ্রহণ করলে? তারা বল্ল, আমরা স্বীকার করলাম! তিনি বল্লেন, ‘ তোমরা সাক্ষি থাক এবং আমিও তোমাদের সাক্ষি থাকলাম। এরপর যারা বিমুখ হবে, তারাই সত্যত্যাগী ও পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবে।‘
উল্লিখিত আয়াতটির ব্যাখ্যায় শরিয়তের অন্ধ বিশ্বাস যে: লাওহে মাহফুজে অথবা অজানা জায়গায় আল্লাহর সভাপতিত্বে মৃত সকল নবিগণকে ডেকে শেষ নবি মুহাম্মদের ওপর ঈমান আনা ও তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার শপথ করান হয়। অতঃপর উক্ত নবিকে মরা নবিগণসহ যারা অস্বীকার করবে তারাই সত্য ত্যাগী ও পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবে।
ড. রাশাদ খলিফার দর্শন: অলাকির্রাছুলীল্লাহী অ খাতামান্নাবীন (৩৩: ৪০)বাক্যাংশে ‘নবি’ শেষ বলা হলেও ‘রাছুল’ শেষ বলা হয়নি’ এবং সে মতে তিনি নিজকেই রাছুল দাবি করেছিলেন।
আহ্মদিয়াদের দর্শন: ‘নবিদের’ বলতে ঐ সভায় স্বয়ং নবি মোহাম্মদও উপস্থিত ছিলেন, এবং পরবর্তী নবির ওপর ঈমান আনার শপথ করান হয় এবং মির্জা গোলাম আহ্মদই সেই পরবর্তী নবি!
মূলত আয়াতটিতে (সকল) ‘নবিদের’ বলতে জীবিত-মৃত নবিদের সভা-সম্মেলন নয় বরং প্রত্যেক নবির কাছ থেকে স্বতন্ত্রভাবে অর্থাৎ নবি মাত্রই (নবিদের)ঐ একই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে যে, তাঁকে যে সমস্ত সূত্র-বাণী, জ্ঞান, গুণ ও ক্ষমতা দেয়া হয়, পরবর্তীতে তারই সমর্থক অর্থাৎ অনুরূপ গুণ সম্পন্ন কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ প্রেরণাপ্রাপ্ত হলে (রাছুল হলে বা আসলে) তাকে যেন অবশ্যই স্বীকার করে নেয়া হয় এবং প্রচার-প্রতিষ্ঠায় সাহায্য সহযোগিতা করা হয়। ইহাই কুরানিক সঠিক দর্শন, যা নিম্ন আয়াতে সন্দেহহীন করেছে:
১৯. অ এজ-আলীম। (৩৩: ৭, ৮) অর্থ: স্মরণ কর! যখন আমি নবিদের (প্রত্যেক নবির) নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার নিকট থেকেও এবং নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, মরিয়মের পুত্র ঈছা, তাদের নিকট থেকেও গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ অঙ্গীকার। সত্যবাদীদেরকে তাদের সততা সম্বন্ধে জবাবদিহি করার জন্য।
আয়াতে জীবিত-মৃত সকল নবিদের শপথ সম্মেলন যে হয়নি বরং প্রত্যেক রাছুল-নবিকে এমনকি মুহাম্মাদকেও স্বতন্ত্রভাবে শপথ করান হয়েছে, উত্ত আয়াতটিই তার জ্বলন্ত সাক্ষি; ‘সকল’ বলতে প্রত্যেক রাছুল-নবিকেই অনুরূপ শপথ করায়ে ‘খাতাম’ সিল্ বা মার্কা মেরে পাঠানো হয়; এক্ষণে ৩: ৮১’র যাবতীয় ভুল অনুবাদ/তফছির, তর্ক-বিতর্ক বর্ণিত আয়াতটি চিরতরে দূর করে দিয়েছে।
এই গুরত্বপূর্ণ বিষয়টির মূল দর্শন এক্ষণে এভাবেও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, স্বয়ং নবি স্ব-হস্তে তৈরি উত্তরাধিকার নিয়োগ করবে; যাতে পক্ষপাতিত্ব, সংশয়, সন্দেহ বা দলাদলির সুযোগ না থাকে। ‘তোমাদের প্রদত্ত কেতাব, হেকমত বা জ্ঞান-বিজ্ঞান, কলা-কৌশলের বিষয় ‘শপথ কর!’ অর্থাৎ তোমাকে যা দেয়া হয়েছে ঠিক অবিকল সত্য-স্বত্ব তোমার সমর্থক/মনোনীত আর-একজনকে দিয়ে আসবে যেন তিল পরিমাণও কৃপণতা/গোপন করা না হয়; এই অঙ্গীকার রক্ষার্থে রাছুলকে সাবধান করে দেয়া হয়:
ইয়া আইয়ুহারাছুলু-কাফেরীন। (৫: ৬৭) অর্থ: হে রাছুল! তোমার রব্ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দাও; যদি না দাও তবে তো তুমি ব্যর্থ হলে (অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে)-।
নবিদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য যা তাঁরা প্রাপ্ত হয়েছেন ঠিক ঠিক তাইই পৌঁছে দেয়া। নবি-রাছুলদের দেয়া হয় নবীন বা নব-প্রেরণা (নবুয়ত-রেছালত), কেতাব, বাণী বা সূত্র (অহি) এবং জ্ঞান, গুণ, ক্ষমতা (হেকমত)। ‘পৌঁছে দেয়ার’ অর্থ তিনি যা-ই উপলব্দি বা প্রাপ্ত হয়েছেন, ঠিক তাই-ই যোগ্যতাসম্পন্ন অন্যকে ধারণ করিয়ে দেয়া, অর্থাৎ দুনিয়ায় উপযুক্ত পাত্র বা উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া। পৌঁছে দেয়ার মূল বা সহজ সরল শর্ত প্রধানত এটাই; অতঃপর দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হল সাধারণ প্রচার। শুধু বাণী পৌঁছে দেয়ার কোনই মূল্যায়ন নেই কারণ আবুযেহেলদের কাছেও পৌঁছে দেয়া হয়েছিল।
তাছাড়া আয়াতে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে, ‘ছুম্মা যায়াক্বুম রাছুলুন’ অর্থ: ‘অতঃপর তোমাদের মধ্যে কোন রাছুল আসলে;’ এখানে রাছুল শব্দটিআলেমুন= জ্ঞানীলোক, রাজুলুন= মানুষ, অলাদুন= বালক ইত্যাদি শব্দের মতোই অনির্দিষ্ট বিশেষ্য (এছমে নাকেরাতুন) ; এছমে মারেফাত বা নির্দিষ্ট নাম বা নির্দিষ্ট রাছুল বুঝাতে ‘মোহাম্মদ বা ‘আররাছুল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; আর ‘শেষ নবি’র কোন আকার-ইঙ্গিত বা ইসারাও আয়াতে নেই।
বিশেষভাবে স্মরণীয় যে
৩: ৮১ নং আয়াতটি সাময়িক ও নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির জন্য নাজিল হয়নি যে, অমুক নবি আসার পরে উক্ত আয়াতটি অকেজো, পরিত্যক্ত বা গ্রহণযোগ্যতা শেষ হয়ে গেল; বরং তা কালাকালের জন্যই সত্য-সজীব, যেহেতু আল্লাহর ছুন্নতে (নিয়মে) কখনও কোনো ব্যতিক্রম বা রদ-বদল হয় না (দ্র: ১৭: ৭৭; ৩৫: ৪৩; ৪৮: ২৩)।
রাছুলের অহি প্রাপ্তি থেকেই তিনি দিন-রাত প্রতি মুহুর্তে প্রচার কাজে লিপ্ত ছিলেন। তারপরেও ৫:৬৭ নং সহ উক্ত কঠিন সাবধানবাণী কেন! কারণ শুধু বাণীই নয় আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘যা-ই কিছু দেয়া হয়েছে’ অর্থাৎ নবুয়ত, হেকমত সবই পৌঁছে দিতে হবে। সুতরাং শুধু কিতাব পৌঁছে দিলেই অঙ্গীকার পূর্ণ হওয়ার নয়। তাছাড়া দুনিয়ার সকল মানুষ এমনকি সকল দেশেও বাণী পৌঁছে দেয়া কোন নবি-রাছুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল না এবং হয়নি। এহেন ‘পৌঁছানো’র প্রশ্নে শরিয়ত স্বয়ং রাছুলকেও তার দায়িত্ব-কর্তব্য ও বিশ্বজনীনতার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন করে ফেলেছে। (চলবে-৫)
বিনীত
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



