মা কানা মুহাম্মাদুন--অ খাতামান্নাবীন (৩৩: ৪০) অর্থ: মুহাম্মদ (মহাপুরুষ) কি তোমাদের মধ্যের কারো পিতা নন?(অর্থাত তোমাদের মতই মানুষ নন?) কিন্তু (পার্থক্য হলো) তিনি আল্লাহর মার্কাযুক্ত (নির্ভেজাল)নব-প্রেরণাপ্রাপ্ত।
পর্ব-৫
সকলেরই পুনঃ স্মরণ রাখা দরকার এবং সচেতন থাকা দরকার যে, ইবলিছ যখন বলেছিল, ‘আমি মানুষের অণু-পরমাণুতে অবস্থান করে বিভ্রান্ত করবো(রূপক)।’ অতঃপর আল্লাহ তার দাবির বিরোধিতা না করে বরং তার কর্ম ফলের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করবো।‘
ইবলিছ কখন, কিভাবে, কী অবস্থায় জীবের অণু-পরমাণুতে অবস্থান করে পথভ্রষ্ট করে ফেলে, সে চেতনা নিষ্পাপ নিষ্কলুষ বেহেস্ত নিবাসী পূত-পবিত্র আদম হাওয়ারও ক্ষমতার বাইরে ছিল। আল্লাহ, শয়তান-ফেরেস্তা, জীবন-মৃত্যুর মতোই একক কেন্দ্রে অবস্থান, মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই সত্য-মিথ্যা, সুর-অসুর; পার্থক্য করে একনিষ্ঠ সাধনালব্ধ (ছালাত) প্রেরণা, তত্ত্বজ্ঞান ও চেতনাশক্তি। অতএব প্রত্যেকের আত্ম-সমালোচনা ও আত্ম-সচেতন থাকা মুহূর্তের জন্যও অপরিহার্য।
ধর্ম পালন ও ধারণ নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়, নিতান্ত আপন স্বার্থের জন্য। কিন্তু সর্বদাই সাধারণ মানুষ ব্যক্তি ও দল কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে বাক-বিতণ্ডা ও খুনাখুনি করে আর তাতে ব্যক্তি ও দলের স্বার্থ উদ্ধার হয় মাত্র, সাধারণ মানুষ হয় পরিস্থিতির শিকার, ভাগ্যে হয় শূন্য, ইহকালেও পরকালেও।
২০. রাছুল-নবি পুন পুন আগমনের বিরুদ্ধে শরিয়তের ঘোর আপত্তি থাকলেও বিশ্বের সকল মুছলিমই দৈনিক পাঁচ বার নামাজে নিজের অজ্ঞাতে নবি-রাছুল হওয়ার জন্য আবেদন-নিবেদন করে থাকে:
-ন্যায় পথে চালাইও মোদেরে/চূড়ান্ত ত্বরিত পদ্ধতিতে/যথাযথ পথে তাদের/পুরস্কার বিতড়িছ উপরে যাদের-।(দ্র: ১: ফাতেহা- ৫, ৬)
প্রধানত আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্তগণ যে নবি-রাছুলগণ; তাতে কারো দ্বি-মত নেই; আর সে ন্যায় পথের চূড়ান্ত বা শেষ সীমাও নবি-রাছুল। কিন্তু কোন নামাজীই ২৫, ৫০, কিম্বা ৯০-৯৯% শতাংশ পর্যন্ত ঐ পথে চলে হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে, অতঃপর আর অগ্রসর হবে না বা হলেই পাপ হবে; এমন কোনো অঙ্গীকার নামাজে কেউ করে থাকে না!
২১. নবি-রাছুলগণ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ; তাতে কারো দ্বি-মত নেই; অতঃপর বিশ্বস্ত সৎ পরিশ্রমীগণও যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ; তাতেও কারো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। কারণ: বিশ্বস্থ ও সৎ পরিশ্রমীগণই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। (৯৮: বাইয়েনা- ৬)
প্রকৃত জ্ঞানীগণ উল্লিখিত আয়াতটি দেখে হতবাক হবেন বটে! শরিয়তের দৃষ্টিতে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ একমাত্র মুহাম্মদ; পক্ষান্তরে স্বয়ং সেই মুহাম্মদের মুখেই কোরানে আল্লাহর হাদিছটি মুছলমানগণ শত-লক্ষ বার দেখেও ঈমান আনে না! বরং ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অবজ্ঞা, অস্বীকার করছে! একমাত্র বোখারীদের ওপর ঈমান আনার কারণে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুছলমানগণ যখন এই প্রতারণা বুঝতে পারবে যে, শিয়া উপদল থেকে আগত চার ইমাম ও ইরান থেকে আগত ছয় ইমামগণ (বূখারীগং) মহানবির নাম ভাঙ্গিয়ে হাদিছ রচনা করে কোরানকে সমূলে গিলে ফেলেছে এবং মুছলিম জাতিকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছেন! এযাবৎ কাল তারা বোখারীদের উম্মত হয়েই আছে! তখন থেকেই কোরানিক ইছলামের পুন: সুচনা হবে।
এতকাল কেন নবি আসেননি অথবা এসেছিলেন কিনা! উপরে বর্ণিত আয়াতগুলির উপর বিশ্বাস থাকলে, ‘নবি/রাছুল’ আরবি শব্দদ্বয়ের অর্থ আপন ভাষায় বুঝে স্বীকার করলে প্রশ্নকর্তা নিজেই লজ্জিত হবেন! কিন্তু শরিয়ত এযাবতকাল সে সুযোগ দেয়নি।তদুপরি নিম্নবর্ণিত আলোচনায় কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে:
ক. আমি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমার পূর্বে অসংখ্য রাছুল প্রেরণ করেছি। যাদের কারো কারো কথা তোমার নিকট বলেছি এবং কারো কারো কথা বলিনি। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত অহি (আয়াত) প্রকাশ করা কোন নবির কাজ নয়। আল্লাহর আদেশ হলেই প্রকাশ করেন-। (৪০: মুমীন- ৭৮)
পূর্বের অসংখ্য নবি-রাছুলদের নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি বলেই আদম-পূর্ব ইতিহাসের মতই আমাদের কাছে আজও অজানা রয়েছে। মূছার পরেও ১/২ নয় বরং ক্রমাগত নবি-রাছুল আসছেন (দ্র: ২: বাকারা- ৮৭); কিন্তু সমাজ জানে মাত্র ঈছা ও মুহাম্মদকে।
মানুষের ভাবা উচিত যে, প্রকৃতির কোন কিছুই বন্ধ হয়নি, হয় না। আল্লাহ এখনও মানুষের কথা শোনে, দেখে, রহমত বর্ষণ করে, ভাংগে-গড়ে। কিন্তু মাত্র একটি বিষয়: পূর্বে অহি করতেন কিন্তু ‘মুহাম্মদের পরে আর অহি করবেন না’ এমন বিশ্বাস চূড়ান্ত বর্বরতা মাত্র! তাদের যুক্তি হল: কোরান পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করলাম এবং ইছলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম (দ্র: ৫: মায়েদা- ৩)।’ ইত্যাদি।
আয়াতটিতে শান্তিবাদকে (ইছলামকে) স্থায়ী দ্বীন হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে সেই-ই মহাদেব-আদম, ব্রহ্মা-ইব্রাহিমের আমল থেকেই। সুতরাং আয়াতটিতে নবি-রাছুল আসা না-আসার কোনো বিষয় নেই।
শুধু কোরানই নয়, অতীতের সকল ঐশী গ্রন্থই ইছলাম বা শান্তিবাদ, সকল সমাজের জন্য পূর্ণ হয়েই এসেছে; পূর্ণ কেতাব বিস্মৃত হয়ে বিবর্তনের ধারায় পূর্ণ হয়েই পুনঃ পুনঃ আসে-যায়:
২২. ক. অ লাকাদ-ইউমেনুন। (৭: আরাফ- ৫২) অর্থ: অবশ্য তাদের এমন একখানা কেতাব দিয়েছিলাম যা পূর্ণ জ্ঞান ও বিশদ ব্যাখ্যাসহ এবং যা ছিল মুমীনদের জন্য পথ-নির্দেশ ও দয়া (রহমত) স্বরূপ।
খ. ছুম্মা-ইউমেনুন। (৬: আনআম- ১৫৪) অর্থ: এবং মুছাকে দিয়েছিলাম কিতাব সৎকর্মশীলদের জন্য; যা সমস্ত বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা (পূর্ণ) পথ-নির্দেশ এবং দয়া স্বরূপ- (অর্থাৎ পূর্ববত মুছাও বিশ্বের জন্য রহমত; (রহমাতুল্লিল আলামীন)।
২৩. কখনও অর্ধ নবি, অপূর্ণ গ্রন্থ দেয়া হয়েছে বলে কোরানে সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। লেখা আছে যে, ‘তাদের কেতাবের অংশ দেয়া হয়েছিল।’ কিন্তু কোরানের মৌলিক দর্শন অনুসরণে ‘কেতাবের অংশ’র পরিবর্তে ‘একখন্ড, কেতাব খন্ড, একখানি বা কেতাবখানি’ অনুবাদ করলে সন্দেহের সুযোগ থাকতো না; মুছলিম সমাজ বিভ্রান্ততা থেকে মুক্ত থাকতে পারত; বেদ, শ্রুতি, গীতা, তওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল প্রভৃতি একখানি কেতাব বা কিতাব খন্ড: অপূর্ণ বা আংশিক বলে কোন গ্রন্থেই উল্লেখ নেই; তদ্রুপ কোরানও ‘একখন্ড কেতাব,’ ইত্যাদি।
অতএব ১১৪ টি ছুরায়, ৬,২৩৬ টি আয়াতে আল্লাহর বাণী শেষ হয়ে গেল, পূর্ণ হয়ে গেল, আল্লার আর কোন বাণী নেই, বাণী আসবে না, দরকার নেই ইত্যাদি কোরানের বিরুদ্ধে স্ব-ঘোষিত মন্তব্যগুলো জ্ঞানীদের পুনরায় গবেষণা করা জরুরী।
প্রকৃতির অনবরত আবর্তন-বিবর্তন, পরিবর্তনশীল, কাল ও ভাষাভেদে নামের পরিবর্তন হয়। শরিয়তের মতে পাদ্রী, গোসাই, ঠাকুর, দেবতা, অবতার, ব্রাহ্মণ মুছলমানের মধ্যে কোন দিন আসেনি, দৈবাৎ কোন প্রতিষ্ঠিত পীর, আল্লামা যদি এর একটি খেতাব দাবি করে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই যে বিতর্কিত হবে তাতে সন্দেহ নেই; তাই কখনও মনের ভুলেও আসবে না; মোল্লা, মৌলবী বা গাউস-কুতুব অন্য কোন জাতির মধ্যেও আসে নি, আসবেও না; ইত্যাদির কারণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে কিশোর জ্ঞানীগণও ভাবুক হন, লজ্জিত হন। (চলবে-৭)
বিনীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




