জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের মধ্য থেকেই জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে নিঃশর্ত জনগণের গোলামি করাই গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র, যার প্রধান কলেমা ‘ন্যয্য বিচার-বণ্টন; বিশেষ করে পেট ও পিঠের সমাধিকার।‘ ভোটের নয়।
কিন্তু যে দেশের নেতাদের উল্লেখ্য জ্ঞান-গুণ নেই বরং উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যবসা/ভোগের নেশায় রক্তের অণু-পরমাণু পর্যন্ত খাই খাই করে সে দেশের সকল তন্ত্রই দলতন্ত্রের নামান্তর এবং প্রত্যক্ষভাবে একনায়কতন্ত্রের ভোগান্তর। দলতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের চেয়েও বীভৎস; কারণ পরিবারের চেয়ে দলের ভোগ-লালসার ক্ষেত্র হয় বিশাল।
দল মানেই দলাদলি, অসভ্যামী, হানাহানি, খুনাখুনী, কামড়া-কামড়ি আর লাভালাভি, ভাগাভাগী; যেন লা শরিক মড়কের উপরে পশুদের অধিকার।
উন্নত দেশের রচিত গণতন্ত্র অনুন্নত/অভদ্র দেশে প্রয়োগের ফলাফল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে অদ্যাবধি বাংলার ৬৫ টি বছর যাবৎ ভোগ করছে।১৯৪০/৫০ দশকের শিশুগণ জনগণের দাবি ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধারের যে শ্লোগান শুনেছিল তারা আজ মৃত্যুর দুয়ারে পা দিয়ে সেই পুরাতন গান, পুরাতন সুরে, নতুন দেশ, নতুন মূখে স্বাধীন দেশের রাস্তা-ঘাটে আজও অপরিবর্তিত সুরেই শুনছে; সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, এমনি ধারায় চলতে থাকলে কথিত গণতন্ত্র কথিত শরিয়তের বেহেস্তের মতোই অফুরন্ত অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে কালাকাল যাবৎ অতৃপ্ত থেকেই নিষ্পেষিত, নিপীড়িত হতে হবে।
দল মানেই গণ থেকে বিচ্ছিন্ন কতিপয় উচ্চাভিলাসী, দুর্ধর্ষ লোভী, ভোগ-বিলাসীদের সীমাহীন স্বার্থে গঠিত সীমিত একটি দল। এমন দল মানেই দলের জন্য, দলের দ্বারা, দলের স্বার্থে, দল কর্তৃক দলের নির্বাচন, দলের মনোনয়ন, দলের ভোট, দলের এমপি, মন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট, দলের তন্ত্রে দলের ভেদ-বিচার, দলের দেশ, অতঃপর দলের একচেটিয়া অসীম আমোদ-ফুর্তি ও ভোগ-বিলাস মাত্র। এই অস্পৃস্য দলতন্ত্রের কারণেই দেশ কোন কালেই জাতীয় সরকার, প্রেসিডেনট-মন্ত্রীর মূখ দেখেনি।
প্রকৃত গণতন্ত্রকে দলতন্ত্র সমূলে গিলে ফেলেছে। যেমন কোরানকে গিলে ফেলেছে হাদিছ-ফতোয়ায়। সুতরাং প্রকৃত গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে গণস্বার্থের বিপরীতে দল বা দলতন্ত্র শতভাগ অবৈধ, হারাম!
গণতান্ত্রিক সরকার একটি গোলামিমূলক নিঃস্বার্থ দাতব্য সংস্থা; এর সদস্যগণ প্রধানত আদর্শ, নিবেদিত, বিনীত,সৎ ও ভোগ-বিলাসহীন ত্যাগী হতে হয়। পক্ষান্তরে যে কোনো দলতান্ত্রিক সরকার হয় অহংকারী, শ্বেচ্চাচারী, ভোগবাদী। যার যত বেশি অর্থসম্পদ সে তত বড় নেতা; যে যত বড় নেতা তার তত বেশি অর্থসম্পদ। আর এগুলো রক্ষায় দরকার হয় দুর্ধর্ষ, ধুরন্ধর সদস্য সমন্বয়ে গঠিত একটি দল; সুতরাং নেতা-নেতীদের পাশ করিয়ে আনতে হয় জাতিয় স্বার্থ বিচ্ছিন্ন দলবিশ্বস্ত সাহসী সন্ত্রাসী বা খল্ নায়কদের। দীর্ঘ ৬৫ বছর পরেও সেই-ই একক লক্ষ্যে আজকের দলতন্ত্রের মনোনয়ন উল্লেখযোগ্য সাক্ষি:
প্রার্থীদের মধ্যে ১০০ জন খুনের মামলার আসামি
“আসন্ন নির্বাচনে যারা অংশ নিতে যাচ্ছেন তাদের ১০০ জনই খুনের মামলার আসামি। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের মামলার আসামি হওয়া এই প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির ৩৪ জন আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছেন ২৪ জন। কেবল তাই নয় বিএনপির মোট প্রার্থীর ৪৯ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা আছে। অনেক ধারা আছে যাতে জামিন পাওয়া যায় না। কিন্তু আদালত তাদেরকে জামিন দিচ্ছে। - আগের মতো এবারো অধিকাংশ প্রার্থীই পেশায় ব্যবসায়ী।
নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ১০০ জন এসএসসি পাশের নিচে, ৩০৫ জন এইচ এসসি পাস, ৫৫৫ জন স্নাতক পাস, ৫৫৭ জন স্নাতকোত্তর এবং ৩২ জন শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। পেশার ক্ষেত্রে মহাজোটের ২০১ জন ব্যবসায়ী, চারদলীয় জোটের ২৭৫ জন ব্যবসায়ী। মামলার ক্ষেত্রে মহাজোটের ৮৭ জন ও চারদলীয় জোটের ১০২ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভিন্ন মামলা চলছে।” (সূত্র: ভোরের কাগজ, ২৬ ডিসেম্বর ০৮ইং)
বলাবাহুল্য এর চেয়েও বিষাক্ত খবরটি কর্তৃপক্ষ হয়তো উল্লেখ করতে সাহস পায়নি। তা হল বৃহত্তর ৩টি দলেরই মহা নেতা-নেত্রীগণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যসহ বিশাল অংকের ঘুষ, অর্থ পাচারের একাধিক মামলার আসামি। তার চেয়েও লোমহর্ষক খবর হল: বাংলার মহামান্য আদালত এদের বিচার না করে শেষ পর্যন্ত এমনকি কোটি কোটি টাকার ঘুষ, খুন-গুমের আসামিসহ প্রায় সকলকেই মুক্তি দিয়ে বিশ্বময় চমক সৃষ্টি করে পূর্ববৎ প্রতারণা ও শোষণের মহান সুযোগ করে দিয়েছেন!
এই অস্পৃশ্য দলতন্ত্রের কারণেই ভাই-ভাই, বাপ-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ, দেশ-বিদেশ, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বানিজ্য, মসজিদ-মন্দির, রাস্তা-ঘাট, অফিস-আইন-আদালত, শাসন-প্রশাসন, বিচার সবই মুখ থুবড়ে থাকে। সর্বত্রই অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-অবিম্বাস, সন্দেহ- সংশয় আর হতাশায় জর্জরিত; আর আমলা বা কর্তৃপক্ষ দলেরই গোলামি করতে বাধ্য হয়; ফলে দেশটির নৈতিক অবক্ষয় স্থায়ী রূপ ধারণ করে দীর্ঘ ৬৫ বছর যাবৎ পরিণাম ভোগ করছে নিরীহ জনসাধারণ।
দেশীয় দলতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
ক. ১৫ কোটি ভোটার মাত্র কয়েকটি দলের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।
খ. দলটি একক নেতা-নেত্রীর কাছে কেনা গোলাম হয়ে থাকে।
গ. প্রার্থীগণ দলতন্ত্রের চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য ঘুষ, খুন, সন্ত্রাস, ভয়-ভীতি, ছিনতাই, জ্বালাও-পোড়াও, যাবতিয় অন্যায়-অত্যাচারসহ শেষ পর্যন্ত ইসি’র রহমতের ওপর কথিত গণতন্ত্রের ভাগ্য ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ ১৫ কোটি ভোটারের গণতান্ত্রিক ফল নির্ভর করে সরকার ও ইসি’র কয়েকজন মাত্র ভোট গনণার কেরানী/কর্মচারীর করুণার ওপর (প্রধানত); যার কারণে প্রত্যেক নির্বাচনেই এদের মনোনয়ন হয় দলীয় প্রধান ইসু আর পাশবিক টানা-হেঁচড়া।
ঘ. দলের হয়েও দলের মনোনয়ন কিনতে হয় কোটি কোটি টাকার বিনিময়।
ঙ. প্রচলিত দলতন্ত্রে দলের সাইনবোর্ড ছাড়া ভোটারদের প্রার্থী সম্বন্ধে কোনো ধারণাই থাকে না; নির্বাচনের সময় ব্যতীত প্রার্থীর চেহারা দেখতে পায় না, শুনতে পায় মাত্র দলের নাম। নেতাগণের নেতা কখন! কিভাবে কোথায় বসে! কোন এলাকার ভোট কাকে! কত দামে দলের ভোটগুলো অলৌকিকভাবে কেনা-বেচা হয়ে যায়, যা স্বাধীন নাগরিকদের কল্পনারও বাইরে থাকে। উদাহরণ:
‘এরশাদকে ৪ দলীয় জোটে ভেড়াতে ১৫ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েও ব্যর্থ হয়। অতঃপর মহাজোটে যোগ না দিতেও ২০ হাজার ডলার ঘুষের প্রস্তাব দেয়া হয়- (দ্র: দৈ. জনকণ্ঠ, জানুয়ারি ৪, ১০)।
এই জননেতাজী নগদ ১৫ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করার পরেও মাত্রাতিরিক্ত অফার পেয়ে ৪ দলের ঘুষ ফেরত দিয়েছিলেন কি না! তা দৈ. জনকণ্ঠ দলতন্ত্রের স্বার্থেই ব্যাখ্যা করেনি।
এহেন স্থায়ী অবক্ষয় থেকে দেশকে মুক্ত করার একমাত্র পথ অন্তত ১০/১৫ বছরের জন্য অবিচল সামরিক শাসন। কারণ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা গেলেও পাপ দিয়ে পাপ ধোয়া যায় না।(চলবে-২/২)
বিনীত।
২ টি মন্তব্য২০ বার পঠিত,
পোস্টটি ১ জনের ভাল লেগেছে
১. ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১:৩০
কাঙ্গাল মুরশিদ বলেছেন: কথাগুলি মোটামুটি ঠিকই বলেছেন তবে শেষের সুপারিশটি ছাড়া। সামরিক শাসন থাকলে দেশের রাজনীতি ঐসব কলুষ থেকে মুক্ত হবে এর পক্ষে কোন ঐতিহাসিক যুক্তি আছে কি? আমরা গত ৬৫ বছরে যত সামরিক শাসন দেখেছি তার ফলাফল কি রাজনীতির জন্য সত্যিই ইতিবাচক ছিল?? অথবা অন্যান্য যেসকল দেশে সামরিক শাসন জারি আছে তারাও কি খুব উন্নতি করেছে?? আমাদের পাশের দেশ মিয়ানমারের দিকে একটু তাকিয়ে দেখুন না - সেখানে তো বহুদিন ধরে সামরিক শাসন চলছে - তারা কতটা উন্নতি করতে পেরেছে?
আপনি দলীয় লুন্ঠন থেকে জাতিকে রক্ষা করতে চান অথচ আর একটি লুন্ঠনপ্রিয় জবাবদিহিতামুক্ত নিপিড়নমুলক শাসন ব্যাবস্থার প্রতি সমর্থন দেন - এই স্ববিরোধীতার অর্থ কি??
২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:১৮
লেখক বলেছেন: ছালাম,
১. নাই।
২. মূল বক্তব্য ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের মধ্যে দলতন্ত্র অস্পৃস্য,অবৈধ তথা হারাম।
৩. গত ৬৫ বছরে দলীয় শাসনের ফলাফল কি ইতিবাচক ছিল? আছে?? থাকবে???
৪. অন্যান্য দেশের সামরিক শাসন কাবা ঘরের প্রভাব মুক্ত হলেও দলীয় প্রভাবমুক্ত নয়। বাংলাদেশের সামরিক শাসন কাবা ঘরের প্রভাবযুক্ত এবং দলীয় প্রভাব মুক্ত হওয়ার পরামর্শ আছে শেষ পর্বে; এজন্য অপেক্ষা করতে হবে।
৫. প্রকৃত গণতন্ত্রের বিপরীতে হারামী দল-উপদলগুলি মিশিয়ে দেয়ার বিকল্প পথ থাকলে, সম্ভব হলে বরং সেটাই উত্তম হবে। সে ক্ষেত্রে ম জ বাসারের পরামর্শ পাত্তা না দিলেও চলবে। সুতরাং একটি উপায় বাতলে দিন?
৬. সামরিক শাসন মানেই লুণ্ঠন প্রিয় বলাটা সংগত নয়। তারা বৈদেশিক সন্তান বা উপনিবেশীক সন্তান/সংস্থা নয়।
৭. চোর,চোট্টা, দোষী, প্রতারক, ঘুষখোর, বাটপার, খুনী, দাগী বা অন্যায়কারী ব্যতীত সামরিক শাসনকে নিরীহ সাধারণ জনসাধারণ ভয় পায় না বরং আনন্দিত হয়।
৮. মাত্র ১০/১৫ বছরের জন্য বলা হয়েছে; অত:পর হারামী দলহীন 'গনতন্ত্র'কে স্বাগতম জানানোর জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ৬৫ বছর বা আরো শত বছর অপেক্ষা করতে পারলে মাত্র ১৫ বছর অপেক্ষা করতে কোন সমস্যা হওয়ার যুক্তি নেই।
৯. আপনার মন্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞ; আশা করি শেষ পর্ব দেখে পুন মন্তব্য করবেন।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



