বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণ দিবসের কর্মসূচীতে ভাষণ দানকালে বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হয়েছে। আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি।
জাতির এটা দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে, দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে থেকে এতবড় মিথ্যাচার জাতিকে শুনতে হচ্ছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা তার সরকার দেশের মানুষকে কি মনে করেন। তার দলের নেতারাও একইভাবে বলে চলছেন তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে এনেছেন। এটা ঠিক যে, এ সরকার ক্ষমতায় বসার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, সয়াবিন ও পেট্রোলের দাম কমে যাওয়ায় বিশেষ করে চালের বাজারদর কমায় মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তিবোধ ফিরে এসেছিল।
কিন্তু অল্পদিনেই তা স্খায়ী হয়েছে। আবার যা ছিল অবস্খা সবমিলিয়ে তাই হয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে দাম ছিল চালের দাম তার চাইতেও এখন বাড়তি।
প্রধানমন্ত্রীর কথায় দেশবাসী হতবাক! যেখানে বাজারে ডাল, চিনি, ডিম, আলুসহ বেশিরভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে সেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্য নিরসন সম্মেলনের ভাষণে বললেন, অনেক পণ্যের দাম অর্ধেক নামিয়ে আনা হয়েছে এবং সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।
দেশের মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোন সত্যতা খুঁজে পাননি। দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত দেশের মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে তখন এ ধরনের অসত্য উক্তি দেশবাসীর প্রতি উপহাস ছাড়া আর কিছুই না।
২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের বিদায় বেলায় মোটা চালের দাম ছিল ১৭-১৮ টাকা এবং বর্তমান আওয়ামী মহাজোট সরকারের আমলে ২৮ টাকা।
মসুরের ডাল ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষের দিকে ছিল ৬৩-৬৪ টাকা আর বর্তমানে (২০ অক্টোবর, ২০০৯) ১০৬-১১২ টাকা,
পিঁয়াজ ছিল ২২-২৩ টাকা এবং বর্তমানে ৪৪-৪৬ টাকা,
চিনি ৪২-৪৩ টাকা, আর এখন ৬০-৬২ টাকা,
সয়াবিন তেল ৫৫ টাকা এবং বর্তমানে ৮০ টাকা,
আলু ২০-২২ টাকা বর্তমানে ৩০ টাকা,
ডিমের হালি ১৬-১৭ টাকা এবং বর্তমানে ২৮-৩০ টাকা।
রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোর পরিস্খিতি সকলেরই জানা। কচুর লতি থেকে শুরু করে সকল প্রকার সবজির দাম ৩০ টাকার ওপর।
শসার দাম গত সপ্তাহে ৮০ টাকা কেজি, বেগুন ৪০ টাকা, শিম ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ধনিয়া পাতা ২০০ টাকা কেজি, একটি জালি কুমড়া ৩০-৪০ টাকা, একটি ছোট লাউ ৪০-৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া (মাঝারি) ৮০-১০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কমের মধ্যে একমাত্র পেঁপে ১৫ থেকে ২০ টাকা। রসুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি।
আদা, জিরা, গোলমরিচ, এলাচ, লবঙ্গ প্রভৃতি মসল্লার দাম বেড়েছে অনেক। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অর্ধেক কমিয়ে এনেছেন। এই মিথ্যা ভাষণের কি প্রয়োজন ছিল? এতে কি তার বা সরকারেরই সুনাম বা মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে? নিশ্চয়ই না, বরং প্রধানমন্ত্রীর এমন অবাস্তব ও অসত্য ভাষণে তাঁর ও সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। হতে পারে বাজারদর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য দেয়া হচ্ছে না। তার পক্ষে তো বাজারে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম যাচাই করা সম্ভব নয়।
যাই হোক এ ধরনের বড় দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিদের অসত্য ভাষণ জাতির জন্য দু:খজনক। অবশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসত্য কথা বা মিথ্যা আশ্বাস দেয়ায় ঘটনাটা নতুন নয়। আগের বার তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন মক্কা শরীফে অবস্খানকালে ঘোষণা দিয়েছিলেন ছয় মাস আগে জাতীয় নির্বাচন দেবেন। কিন্তু একদিন আগেও তা দেননি।
তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৫৭ বছর বয়স হলে রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন। কিন্তু তা করেননি। এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ডেপুটি স্পীকার পদটি বিরোধীদলকে দেবেন। কিন্তু দেননি।
নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, ১০ টাকা কেজি চাল, বিনামূল্যে সার, প্রতিটি পরিবারে ১টি করে চাকুরি দেবেন। কিন্তু এখন বলছেন ওসব কথা তারা বলেননি।
সরকারের মন্ত্রী এবং দলের নেতারাও অহরহ মিথ্যা বলেন। যেমন এক মন্ত্রী বলে দিলেন, টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, চিনির মূল্য বৃদ্ধির সাথে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্খা করা হচ্ছে। কিন্তু করলেন না।
সরকার অহরহ ঘোষণা দিচ্ছেন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি যারাই করবে তাদের ব্যবস্খা নেয়া হবে। কিন্তু অদ্যাবধি কোন ব্যবস্খাই নেয়া হয়নি। প্রায়ই সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী বা নেতৃস্খানীয় ব্যক্তিরা মিডিয়ায় কথা বলতে গিয়ে মিথ্যাচার করেন, অর্ধসত্য কথা বলেন। যেমন গত ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্খিতির উন্নতি হয়েছে। তিনি যেদিন এ কথাটি বলেছিলেন সেদিনই তার নিজ বাড়ির সামনে এক নির্বাহী প্রকৌশলী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রতিদিন খুন হচ্ছে মানুষ।
জনগণকে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করা বা রাখা আওয়ামী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তান আমলেও তারা এ ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। বলেছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার কর। দেশের জনগণ এ জন্য আন্দোলন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ হবার পর বলেছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র সঠিক ছিল।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনের সময় মরহুম শেখ মুজিব ফরিদপুরের জেলে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে আটক ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী নেতারা দাবি করেন. তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেছেন।
২৫ মার্চ রাতে শেখ সাহেব পাকিস্তান সেনা সরকারের নিকট গ্রেফতার বরণ করেন। আওয়ামী লীগাররা প্রচার করে থাকেন ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তার কোন কণ্ঠ বা কোন বক্তব্য চিঠি কোথাও প্রমাণ হিসেবে নেই। দেশের মানুষ শুনেছে মেজর জিয়ার কণ্ঠ। কিন্তু আওয়ামী লীগের গলা বড় উচ্চকণ্ঠ। তারা মিথ্যা দাবি করে, বক্তব্য দিয়ে, বই-পুস্তক লিখে ওটা প্রমাণ করে ছাড়বেন। টেলিভিশনের টকশো, রাউন্ডটেবিল আলোচনায় ও বক্তব্যে অহরহ আওয়ামী নেতা, বুদ্ধিজীবীগণ একই ধরনের অসত্য কথা নির্জলা সত্যের মত বলছেন।
অথচ তারা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে আদৌ চেষ্টা করছেন না। আজকের একটি জাতীয় পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছে কিভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী ও সরকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ভোলায় মেজর (অব.) জসিম উদ্দীনের সংসদ সদস্য পদ রক্ষার জন্য কেমন মিথ্যা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। এসব যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে বলতেই হবে আমরা পচে গিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর পদ মর্যাদায় থেকে এমনটি করা হবে তা কি জাতি প্রত্যাশা করে?
কুরআন মজিদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন এবং মিথ্যা বলা পরিহার করতে আদেশ করেছেন (সূরা হজ্ব : ৩০)। মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা পরিত্যাগ করে না তার ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা, সে অনুযায়ী কাজ করা এবং অজ্ঞতা ছাড়লো না, তার পানাহার ত্যাগ করার (রোযা রাখার) আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। হাদিসে মিথ্যাবাদীর কঠোর শাস্তির উল্লেখ রয়েছে।
হযরত আবু মাসুদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সততা নেকীর পথ নির্দেশ করে। আর নেকী নির্দেশ করে জান্নাতের পথ। লোকেরা বরাবর সত্য বলতে থাকে এমনকি সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী রূপে চিহ্নিত হয়। আর মিথ্যা খারাবীর পথ নির্দেশ করে। আর খারাবী নির্দেশ করে জাহান্নামের পথ। লোকেরা বরাবার মিথ্যা বলতে থাকে এমনকি সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী রূপে চিহ্নিত হয়। (বুখারী ও মুসলিম)।
এখন প্রশ্ন আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসব জানেন না তা নয়। আওয়ামী লীগের নেতারাও এসব জানেন যে অসত্য কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা গুরুতর অপরাধ বা অন্যায়। দেশের জনগণ অনেক ভুক্তভোগী। মানুষের দু:খ-কষ্টের শেষ নেই। শুধু প্রধানমন্ত্রী বলে কথা নয়। সকল রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের কাছে আমাদের সবিনয় নিবেদন তারা যেন মিথ্যা ভাষণ না দেন। মিথ্যা আশ্বাস বা ওয়াদা যেন না করেন। এতে জনগণের ক্ষতির চাইতে তাদের নিজেদের ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। তারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায়ই নিন্দিত হচ্ছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

