somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশে 'সন্ত্রাস' বিরোধী অভিযান ও চলমান 'ক্রসফায়ার' প্রসঙ্গে -(তৃতীয় অংশ)

২২ শে জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও নয়া উপনিবেশিক ব্যবস্থাটা কি

এবার আমরা তাদের বিশ্লেষণ ক্যাটাগরি হিসেবে আধা-সামন্ততান্ত্রিক, নয়া-ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা বলতে তারা কোন ধরনের চিত্রসহ শত্রু-মিত্রের ভেদজ্ঞান হাজির করছেন, সেই প্রশ্নে নজর দিতে পারি। তারা তাদের বিশ্লেষণ ক্যাটাগরির উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে বলছে নয়া-ঔপনিবেশিক, আধা-সামন্ততান্ত্রিক। এবং আলোচিত ব্যবস্থার রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তারা সাম্রাজ্যবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও আধা-সামন্ততন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিসহ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে শত্রু রূপে চিহ্নিত করে।

আলোচিত দলগুলো নয়া-উপনিবেশ ও আধা-সামন্ততন্ত্র বলতে যে আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে চিহ্নিত করছে, তার উদ্ভব ও সূচনা হয়েছিল মূলত ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসন পর্বে। এটা তাদের দাবি। অর্থাৎ গত পাঁচশ বছর পশ্চিম ইউরোপ এবং ‘আমেরিকাতে’ সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হিসেবে পুঁজিবাদ গঠনের যে প্রক্রিয়া, পৃথিবীর নানান প্রান্তে তাদের যে ঔপনিবেশিক বলয় সৃষ্টি, উপমহাদেশ হিসেবে ভারত প্রায় দুই শ’বছর তারই প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকেছে। তাদের শাসনাধীনেই উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্পত্তি-সম্পর্ক ও সামাজিক সম্পর্কের রূপকাঠামো বদলে গেছে। তাদের দাবি অণুযায়ী ওই সময়ে ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি গঠনের প্রধান তিনটে স্তর উপনিবেশ আকারে অতিক্রম করতে হয়েছে। অর্থাৎ আদিম পুঁজি সঞ্চয়ানের যুগ, শিল্প পুঁজি গঠন প্রক্রিয়ার যুগ এবং লগ্নি পুঁজির যুগ। একইভাবে আমরা ইতিহাসের অংশ হিসেবে এটাও জানি ইউরোপে সামন্তবাদের গর্ভে যে বণিক পুঁজির জন্ম ও প্রাধান্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই পুঁজির পুষ্টি বিকাশের প্রয়োজনে উপমহাদেশে প্রথম পা রাখে এবং সেটা বাংলাতেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদেরকে এক শ’ বছর শাসন করেছে। তারপর কায়েম হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি শাসনের যুগ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তাদের ওই প্রত্যক্ষ উপনিবেশের যুগ বহাল ছিলো। ’৪৭ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশের শাসন ক্ষমতা দেশীয়দের হাতে হস্তান্তরকে অনেকেই উপমহাদেশের জন্য স্বাধীনতা হিসেবে চিহ্নিত করলেও, আলোচিত দলগুলো বলছে ওই সময় থেকে মূলত নয়া-ঔপনিবেশিক যুগের সূচনা হয়। আর সম্পত্তি-সম্পর্ক হিসাব ভূমি মালিকানার যে ধরন ঔপনিবেশিক পর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজবাদ চাপিয়ে দিয়েছিল সেটাই আধা-সামন্ততন্ত্র। এখন তাদের এই দাবি কতটা যথাযথ এবং বাস্তবসম্মত আমরা সেটাও পর্যালোচনা করতে পারি।

আমরা যদি আমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের পূর্বের বাংলা এবং পরের বাংলার মধ্যে মৌলিকভাবে পৃথক অবস্থান দেখতে পাব। ঔপনিবেশিক শাসনামলের পূর্বে এদেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি ছিলো ভূ-সম্পত্তি এবং ‘স্বয়ংসম্পন্ন’ গ্রামীণ সমাজ। ওই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনায় ভূমিতে প্রধানভাবে ব্যক্তিমালিকানার অনুপস্থিতি ছিলো একটি মৌলিক বিষয়। সে যুগে প্রধান উপার্জনকারী সম্পদ হিসেবে ভূমি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকলেও মালিকানা ছিলো যৌথ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীন সমাজের হাতে। ওই গ্রামীণ সমাজের সদস্য একজন উৎপাদক কৃষক বংশানুক্রমে তা ভোগ করতে পারত। কিন্তু গোষ্ঠীর বাইরে ব্যক্তি হিসেবে তা ভোগ করা সম্ভব ছিলো না। সম্পত্তির গোষ্ঠীগত দখলদারত্বের মধ্যে ব্যক্তি ওই সমাজের সদস্য হিসেবেই ব্যক্তি উদ্যোগের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারত। এই প্রক্রিয়াতে গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যক্তির দখলদারিত্বের স্বীকৃতি ছিলো। এ-ধরনের ভূমি মালিকানার উপর ভিত্তি করে যে সম্পত্তি-সম্পর্ক বিরাজমান ছিলো, সেখানে উৎপাদক কৃষককে সারা বছরের প্রয়োজনীয় কৃষিযন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যদ্রব্য সরবরাহ করেছে অসংখ্য বৃত্তিজীবী সম্প্রদায় এবং বণিক সমাজ। অর্থাৎ কৃষি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে গড়ে উঠেছিল বৃত্তিজীবীদের কুঠির শিল্প এবং সরবারহকারী কাঠামো। পরস্পরের মধ্যে দ্রব্য বিনিময় ছিলো প্রধান। এ-ধরনের সরল উৎপাদন পদ্ধতির গ্রামীণ সমাজ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল শ-শ’ বছর। তখন সমাজ শাসিত হয়েছে গোষ্ঠীপতির দ্বারা। সমাজে পণ্য উৎপাদন এবং শ্রেণী বিভাজন ছিলো অবিকশিত। ওই সমাজেও আমরা জমিদারি প্রথার অস্তিত্ব পাচ্ছি। কিন্তু জমিদার ছিলো সম্রাটের পক্ষে খাজনা আদায়কারী প্রতিনিধি। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে ভারত উপমহাদেশ জুড়ে প্রযুক্তি হিসেবে কৃষিতে বলদে টানা লোহার ফলাযুক্ত লাঙল ব্যাপকভাবে প্রচলন শুরু হওয়ার পর পর উদ্বৃত্ত উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। কৃষি ব্যবস্থার এই উন্নতির উপরে নির্ভর করে বৃত্তি বিভাজিত রাষ্ট্রভিত্তিক সমাজকাঠামো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সেদিন। একইভাবে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত যেমন রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের সহায়ক হয়ে ওঠে, তেমনি উৎপাদনের একটি বড় অংশ (এক-চতুর্থাংশ, এক-ষষ্ঠাংশ, এক অষ্ঠাংশ, এক দশমাংশ) রাজস্ব আকারে শাসক সম্রাটের হাতে কেন্দ্রিভূত হত। যা আবার সম্রাটের সাম্রাজ্যবৃদ্ধি ও শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রিভূত হতে সহায়তা করে। এবং ওই উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের ফলেই সেই সময়ে কৃষিজীবীরা নিজেদেরকে প্রতিপালনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত সম্প্রদায়, অপরাপর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, সমাজের নানান বৃত্তিজীবীসহ পেশাদার সৈনিকদেরও প্রতিপালন করেছে বা উৎপাদক কৃষক তা করতে বাধ্য হয়েছে।

সমাজের কারিগর স্মপ্রদায়সহ বণিক সম্প্রদায়ের মূলধন তারাই যুগিয়েছে। তৎকালীন নগর বা নগরবাসীর উদ্ভব ও সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গেও কৃষির উদ্বৃত্ত আহরণ ছিলো সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এটাই ছিলো তৎকালীন উপমহাদেশ জুড়ে কৃষক সমাজের সর্বনিম্ন ভোগের কারণ। যাবতীয় অসাম্যের উৎসও ছিলো ঠিক এখানে। অর্থাৎ বণ্টননীতিতে। কিন্তু সেদিন সম্পত্তি মালিকানাকে কেন্দ্র করে উৎপাদনকে কুক্ষিগত করার মতো কোনো শক্তিশালী শ্রেণী ছিলো না। স্থানীয় জমিদার, জায়গীরদার, বণিক, মহাজন, প্রশাসক বা পুরহিত সম্প্রদায়সহ অপরাপর বৃত্তিজীবীরা তাদের স্বার্থ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতাকে তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে পারেনি। কারণ গোটা উপমহাদেশ জুড়ে বর্গ হিসেবে ওইসব গোষ্ঠী ভূমি থেকে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত ভোগ করলেও সম্পত্তি-সম্পর্ক হিসেবে ভূমি ভোগের কোনো মালিকানা বা স্বত্বাধিকার তাদের ছিলো না। সামাজিক বর্গ হিসেবেও তাদের উদ্বৃত্ত আহরণের উৎসও ছিলো রাজা বা সম্রাটের কর্তৃত্ব। রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিলো সম্রাটের হাতে। সম্রাটের আইনগত বণ্টননীতির ভিত্তিতেই তাদের প্রাপ্যটুকুই জুটত। এভাবে স্থানিক শাসকবর্গের স্বত্বাধিকারহীনতা, রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো। মোটামুটিভাবে প্রাক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পর্বে প্রধান সম্পত্তি-সম্পর্ক হিসাবে এটাই ছিলো ভূ-সম্পদ ব্যবহারের নীতি। যাকে স্বয়ংসম্পন্ন গ্রামীণ সমাজের চিত্র বলা হয়েছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পর্বে ঔপনিবেশিক শাসকরা নিজস্ব স্বার্থ থেকেই স্বয়ংসম্পন্ন গ্রামীণ সমাজের ভাঙন ঘটায়। একটা নতুন ধরনের সম্পত্তি-সম্পর্ক গড়ে তোলে। সমাজ কাঠামো শ্রেণীভিত্তিক করে তোলে। প্রধানভাবে বাংলাতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে সেটা করা হয়েছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবাস্ত ছিলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণীর সঙ্গে তাদের সৃষ্ট নব্য জমিদার ও ভূস্বামীদের মধ্যকার যে সম্পর্ক, তারই একটি আইনগত কাঠামো। যার সঙ্গে উৎপাদক কৃষক সমাজের কোনো যোগসূত্র ছিলো না। জমিদার ও ভূস্বামীদের উৎপাদক কৃষককে ভূমি থেকে উচ্ছেদের ক্ষমতা দেওয়া হয় এই আইনে। ফলে আইনগতভাবেই কোটি কোটি চাষি পরিবার গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে তাদের বংশানুক্রমিক রায়তীস্বত্ব হারিয়ে ফেলেন।

এই ব্যবস্থায় জমিদারকে ভূমি-প্রকৃতির একচ্ছত্র মালিক বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আর উৎপাদক কৃষককে করা হয় জমিদারের অধীনস্ত প্রজা। যাতে করে জমিদারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভূমি রাজস্ব আদায় করা যায়। এবং ঔপনিবেশিক শাসনের ওই পর্বে রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসই ছিলো কৃষকের উপর চাপানো ভূমিকর। পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি ছাড়া জমিদারকে জমি বন্দক-দান-বিক্রি ও হস্তান্তর করার অধিকার দেওয়া হয়। একইভাবে ওই জমি কিভাবে, কোন প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে না হবে সেই আইনগত অধিকারও ভূস্বামী ও জমিদারের হাতে ন্যাস্ত করা হয়। এইসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনেকগুলো উদ্দেশ্য সাধন করে ব্রিটিশরা।

ক) পূর্বে উৎপাদক কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদের ক্ষমতা কোনো ভূস্বামী বা জমিদারের ছিলো না। এখন নতুন আইনে সেই ক্ষমতা তাদেরকে দেওয়া হলো।

খ) পূর্বে উৎপাদক কৃষক জমিদারের প্রজা হিসেবে গণ্য হত না। এখন উৎপাদক কৃষক জমিদারের অধীনস্ত প্রজায় পরিণত হলো।

গ) জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি করা হলো এবং জমি বিক্রি, বন্দক, হস্তান্তরের অধিকার দিয়ে স্বয়ংসম্পন্ন গ্রামীণ সমাজের স্থিতি ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হলো। ভূ-প্রকৃতিকে পণ্যে পরিণত করা হলো। সেটা বেঁচে থাকার অবলম্বনের বিপরীতে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হয়ে পড়ল।

ঘ) জমি কিভাবে, কোন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে সেই ক্ষমতা জমিদারদের বা ভূস্বামীদের হাতে তুলে দিয়ে উৎপাদক কৃষকের ভোগ-দখলি কর্তা স্বত্বাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হলো। একই সঙ্গে উৎপাদনের উপাদান থেকে প্রত্যক্ষ উৎপাদকের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে কোটি কোটি উৎপাদককে সম্পদচ্যুত ও কর্তৃত্বহীন করা হলো। অর্থাৎ প্রাকৃতিক সম্পদের যে অংশটুকুর উপর সমাজের দুর্বলতম উৎপাদক জনগোষ্ঠীর অধিকার ছিলো। সেটাই ছিনিয়ে নেওয়া হলো। উৎপাদক ও দুর্বলতম জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক সম্পদের যে অংশটুকু নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারত সেই অধিকার থেকে তাদের বহিষ্কার করা হলো। তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মৌলিক সম্পদের উপর যতটুকু স্বত্বাধিকার ছিলো তা ক্রমাগত হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হলো। আবার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ততে যে রাজস্ব ব্যবস্থার স্থায়ীত্ব দেওয়া হলো তা কোনোভাবেই উৎপাদক কৃষক এবং কৃষির উন্নতির সহায়ক হলো না। উৎপাদনের গতি সঞ্চার বা জমির উন্নতির জন্য অতিরিক্ত অর্থ সঞ্চয় দূরে থাকুক নিজেদের জীবন রক্ষা করাই দায় হয়ে উঠল সেদিন থেকে। তাছাড়া চিরস্থায়ী ব্যবস্থাটিতে লক্ষ্য নির্ধারিত করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে কৃষকরা কোনোরূপে বেঁচেবর্তে থাকে। জমিতে বিনিয়োগকৃত পুঁজি থেকে উৎপাদিত মুনাফা যাতে তার ঘরে না-আসে। এমনকি তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত করের একটা ক্ষুদ্র অংশও সেদিন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি বা নব্য ভূমি মালিকরা উৎপাদক কৃষক এবং কৃষি উন্নতির জন্য ব্যয় করল না। এটাকেই মার্ক্স বলেছিলেন ব্রিটিশরা ভারতীয়দের উপরে যে দুর্দশা চাপিয়েছে তা ছিলো হিন্দুস্থানের আগের সমস্ত দুর্দশার চেয়ে মূলগতভাবেই পৃথক। অনেক বেশি তীব্র এবং দানবীয়। এটা হলো ঘটনার একটা দিক।

এর অপর দিকটা হলো, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ভূস্বামী ও জমিদারদের জন্য রাজস্ব প্রদানের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা উৎপাদক কৃষকের কাছ থেকে কতটা রাজস্ব আদায় করতে পারবে তার ঊর্ধ্বসীমা ধার্য করা হয় না। এই নীতির মাধ্যমে কৃষকদেরকে সীমাহীন লুন্ঠনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। একইভাবে জমিদারদের রাজস্ব আদায়ের অধিকারকে অপরের কাছে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে জমিদারী ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ অঙ্গ হিসেবে একটা নতুন মধ্যশ্রেণীর বিকাশ ঘটে, যারা ইজারাদার, উপ ইজারাদার, পত্তনিদার ইত্যাদি নামে খ্যাত।

আবার নগদ অর্থে রাজস্ব প্রদান বাধ্যতামূলক করে উৎপাদক কৃষকদের জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা প্রকট করে তোলা হয়েছিল। ফলে নগদ অর্থের প্রয়োজনে কৃষকরা মহাজনের দারস্ত হতে বাধ্য হয়। মহাজনকে আবার তার পাওনা আদায়ের স্বার্থে কৃষকদের উপর শারীরিক নিপীড়ন চালানোর ক্ষমতাসহ তাদের সহায়সম্পদ ক্রোক করার আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে নতুন গড়ে তোলা কৃষি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সেদিন আরেক ধরনের ক্ষমতার বিন্যাস গড়ে তোলা হয়। যেখানে মহাজনদেরও কাঠামোগত কর্তৃত্বের একটি বিষয় থাকে। যাতে করে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে মহাজনরা তাদের ক্ষমতা স¤প্রসারণ করতে পারে। এভাবে সেদিন অসংখ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারত উপমহাদেশ ব্যাপি যে সম্পত্তিÑসম্পর্ক গড়ে তোলে, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে জমি এক অনুৎপাদক শ্রেণীর হাতে হস্তান্তরের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়। অনুৎপাদক শ্রেণী হিসেবে তারাই উৎপাদনের নিয়ন্ত্রকশক্তি এবং কর্তাশক্তি হয়ে ওঠে। আর উৎপাদক শক্তি হয়ে পড়ে কর্তাস্বত্বাহীন। প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে, নিজস্ব শ্রমের উপর, শ্রমার্জিত সম্পদের উপর থেকে তাদেরকে কর্তৃত্বহীন করে ফেলা হয়।

আবার অনুৎপাদক সম্পত্তিবানদের একটি অংশ মালিকানার স্বত্বাধিকার থেকে বর্গা এবং লিজ প্রথার মতো একটা ব্যবস্থার জন্ম দেয়। তাতে করে সম্পত্তি, কেন্দ্রিক স্বত্বাধিকারের কর্তৃত্বটা এমনই দাঁড়ায় যে, ওই অনুৎপাদক গোষ্ঠী উৎপাদনে কোনোরূপ শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ না করেও লিজ বা বর্গাপ্রথার মাধ্যমে শ্রম এবং শ্রমার্জিত ফসলের বৃহদাংশটি উৎপাদিত ফসল ভাগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজস্ব আকারে লুটে নিতে সক্ষম হয়। এভাবে গড়ে তোলা সম্পত্তি-সম্পর্কের মধ্যেই তারা প্রকৃতি ও শ্রমের উপরে একটা নতুন ধরনের দাসত্বকরণ প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত করে তোলে। ফলে প্রাক ঔপনিবেশিক পর্বে যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে জমি ব্যবহারের নীতি ছিলো মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সেখানে ঔপনিবেশিক পর্বে উৎপাদনের ধরন বদলে যায়। উৎপাদনের আনুসঙ্গিক নীতি হিসেবে প্রকৃতি ও শ্রম, অনুৎপাদক শ্রেণীর দাসে পরিণত হয়। আর নিত্য নতুন মালিকানার লক্ষ্য হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণ। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক পর্বেই সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত যে বিশ্ববাজার গড়ে ওঠে, ওই বাজারে ভারতের কৃষিব্যবস্থা নতুন স্বত্বাধিকার বা নতুন মালিকানা মারফত অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। আর আমরাও প্রবেশ করি দ্রব্য বিনিময়ের আঙিনা ছেড়ে বিশ্ববাজারে বা পণ্য-অর্থ-পণ্যের এক জগতে। এই আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাগে উপমহাদেশের অবস্থান হয় কৃষি পণ্যের যোগানদার রাষ্ট্র হিসেবে। অবশ্য ততদিনে পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের উপরে ভিত্তি করে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রয়োজনে যন্ত্রশিল্পের উদ্ভব ঘটে গেছে। ফলে প্রাক ঔপনিবেশিক ভারত উপমহাদেশের স্বয়ং সম্পন্ন গ্রামীণ সমাজের সম্পূরক হিসেবে যে কুঠির শিল্পের বিকাশ ও উদ্ভব ঘটেছিল। যন্ত্রশিল্পে উৎপাদিত পণ্যের প্রসার ঘটাতে কুঠির শিল্পের উচ্ছেদ সাধিত হয়। এতে করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তার ব্যবহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যদ্রব্যের প্রয়োজনেই শিল্পপণ্যের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমাদের কৃষি, শিল্পপণ্যের যোগানদার হয়ে ওঠে। আবার নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যের প্রয়োজনে আমরা হয়ে উঠি শিল্পপণ্যের আমদানি কারক। এভাবে দুই মেরুতে অবস্থিত দেশগুলোর উৎপাদিত পণ্য যে বাজারে বিকতে উপস্থাপিত হয়, ওই বাজারে ঔপনিবেশিক শক্তির একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকায় একটা অসম বিনিময় প্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটে। কৃষিপণ্য শিল্প পণ্যের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এতে করে কৃষিতে অর্জিত মুনাফা শিল্পপণ্যক্রয়ে পাচার হয়ে যায়। বা কৃষির কর্তাস্বত্বাহীনতার কারণে বাজার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষিতে অর্জিত মুনাফা পাচার হয়ে যায়। উৎপাদক কৃষকরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো একটা শক্তিশালী কর্তারূপ বা শ্রেণী হিসেবে অবির্ভূত হতে ব্যর্থ হয়, যাকে আমরা বুর্জোয়া অর্থসম্পর্কের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি বা শ্রেণী হিসেবে বিচার করতে পারি। এর আরো অন্যতম কারণ হলো-গড়ে তোলা নতুন সম্পত্তি সম্পর্কের ফলাফল হিসেবে উপমহাদেশব্যাপী যে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোত গড়ে উঠেছিল। সেখানে ক্ষুদ্রজোতের মালিক উৎপাদক কৃষকের পক্ষে রাজস্ব প্রদান এবং শিল্পপণ্য ক্রয়ের পর এমন কোনো উদ্বৃত্ত পুঁজি তাদের হাতে কখনো থাকেনি, যা দিয়ে তারা কৃষির উন্নতিতে পুনঃপুনঃ বিনিয়োগ করতে পারে বা বিনিয়োগের জন্য ওই পুঁজি যথেষ্ট। আবার কৃষিতে সম্পত্তির মালিক হিসেবে যে অনুৎপাদক জমিদার, ভূস্বামী ও মহাজনকে সেদিন কর্তৃত্বকারী কর্তাস্বত্বা হিসেবে পয়দা করা হয়, তারাও কৃষির উন্নতির জন্য কোনোরূপ বিনিয়োগ না-করে বর্গা বা লিজ প্রথার উদ্ভব ঘটিয়ে শুধু উদ্বৃত্তটাই লুটে নেয়। মোটামুটিভাবে এটাই হলো প্রাক ঔপনিবেশিক পর্ব থেকে ঔপনিবেশিক পর্বে সম্পত্তি-সম্পর্ক হিসেবে ভূমি মালিকানায় রূপান্তরের সংক্ষিপ্তসার। যে সম্পত্তি-সম্পর্ক ও ব্যবস্থাপনাকে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো তাদের বিশ্লেষণ ক্যাটাগরির উপরে দাঁড়িয়ে সেমি ফিউডালিজম বা বাংলা তরজমায় আধা, সামন্তবাদ বলে দাবি করে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো ঔপনিবেশিক পর্বের সম্পত্তি সম্পর্কের রদবদল কতটা ঘটেছে ’৪৭ অথবা ’৭১ উত্তর বাংলাদেশে এটা অবশ্যই জরুরি প্রশ্ন।

এবার আসা যাক আমলা পুঁজি ও মুৎসুদ্দি পুঁজি সম্পর্কে তাদের মতামত প্রসঙ্গে। মোটামুটিভাবে এসব দলগুলো দাবি করে থাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদের অবসান হয়ে নয়া-ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ গড়ে ওঠে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে। ভারত উপমহাদেশও সেই প্রক্রিয়ার বাইরে ছিলো না কখনো। নয়া-উপনিবেশবাদের এই শাসন ক্ষমতাকে তারা বলে থাকেন আমলা পুঁজি ও মুৎসুদ্দি পুঁজির ক্ষমতা কাঠামোর যুগ। বিশেষত ঔপনিবেশিক বিশ্বে। মূলত নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ক্ষমতায় আমলা পুঁজির দৌরাত্ম বরাবরই প্রবল। আমলারাই এসব দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার নিয়ামক শক্তি। তারাই প্রশাসক, সিদ্ধান্তদাতা ও জাতীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী। জাতীয় অর্থনীতিতে তারা কখনই পুঁজি বিনিয়োগ না-করেও গোটা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যক্ষভাবে আমলা শ্রেণীর সঙ্গে সংযোগ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আলোচিত রাষ্ট্রগুলোকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মূলত প্রকল্পভিত্তিক চুক্তি, ঋণ সাহায্য, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেসামরিক-সামরিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-শিক্ষা সংক্রান্ত চুক্তির মধ্য দিয়ে তাদের এই নিয়ন্ত্রণ কখনো মূর্ত, কখনো বিমূর্তভাবে প্রকাশ পায়। ফলে একটি দেশের শাসন ক্ষমতা আমলা শ্রেণী কুক্ষিগত করে ফেললে, তাদের স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ থেকে যে পুঁজির জন্ম হয় সেটা কেই তারা বলছে আমলা পুঁজি। এই পুঁজির বরাবরই উৎপাদন বিমূখ। এই পুঁজির প্রধানাংশটা অনুৎপাদক খাত হিসাবে প্রধানভাবে বিভিন্ন ভোগ বিলাস ও চোরাকারবারিতে নিয়োজিত হয়ে থাকে। অথবা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহে আমলা পুঁজি সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি ও উপনিবেশবাদ বিরোধী যে কোনো মাত্রার রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির বিপক্ষশক্তি হিসেবে কাজ করে। অনুৎপাদনশীল খাতেই তারা প্রধানত পুঁজি বিনিয়োগ করে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ সম্পদের যথেচ্ছা লুঠপাট, ঘুষ, সরকারি কোষাগার লুঠপাট ও প্রকল্পভিত্তিক ঘুষ গ্রহণ তাদের প্রধান আয়।

একইভাবে নয়া-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে মুৎসুদ্দি পুঁজির (ঈড়সঢ়ৎধফড়ৎ ঈধঢ়রঃধষ) নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধান্য বরাবরই প্রবল। মূলত এসব দেশগুলোতে বুর্জোয়াদের সেই অংশকে তারা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বলছে, যারা ব্যক্তিগত বা যৌথভাবে সাম্রাজবাদী রাষ্ট্রগুলোতে উৎপাদিত শিল্প পণ্য বা বহুজাতিক কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য, স্থানীয় বাজারে বিক্রির এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। কখনো তারা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের শিল্প প্রতিষ্ঠান বা বহুজাতিক কোম্পানির শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়া-উপনিবেশিক রাষ্ট্রের শ্রম ও কাঁচামাল সংগঠিত করে বিদেশী বাজারের প্রয়োজনে শাখা শিল্প স্থাপন করে। মূলত মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারাও প্রধানভাবে বিদেশী বাজারের প্রয়োজনেই উৎপাদন সংগঠিত করে থাকে। এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা স্থানিয় শিল্প সম্পদ ধ্বংস করে দেয়। ফলে আমলা পুঁজির মতই মুৎসুদ্দি পুঁজিও উপনিবেশবাদ বিরোধী রাজনীতি ও জাতীয় অর্থনীতি বিরোধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদের পতন ঘটলেও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহে এই আমলা ও মুৎসুদ্দি পূঁজির দ্বৈত শাসন অনেক দেশেই আজ প্রতিষ্ঠিত। এটাকেই তারা বলছে নয়া উপনিবেশবাদের যুগ। যে যুগে সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যক্ষ শাসন ক্ষমতা বজায় না রেখেও উপরে উল্লেখিত প্রকল্প বা উন্নয়নের রাস্তা ধরে উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাছাড়া, এসব দেশগুলোতে পুঁজিবাদ গড়েই উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে, এবং তাদের দেওয়া সুযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে। যা স্থানীয়দের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের ছাড়পত্র ছিলো। ফলে এসব দেশে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা কে তারা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নির্ভরতা হিসেবে বিবেচনা করে না। অর্থনৈতিক নির্ভরতার থেকে ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ও তারা মনে করে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত আধিপত্য, শ্রেণীর পরিগঠনসহ আরো হাজারো প্রশ্ন জড়িত রয়েছে বলে তারা মনে করেন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির যেসব বৃহৎ শিল্প শাখা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেই শাখার মধ্যে যে শ্রমবিভাজন সেখানে আমাদের অবস্থান, আর আন্তর্জাতিক স্তরে আমাদের কৃষি যে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সেই বাজারের শ্রম বিভাজনে আমাদের যে অবস্থান এই দুইয়ের মধ্যে দেশ বিবেচনায়, একটির সঙ্গে অপরটির আন্তসম্পর্ক নেই। আবার আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনে এসব দেশের অর্থনীতির সংশিষ্টতা থাকলেও সেটা পুরোপুরি অধিনতামূলক। এভাবে বিশ্ব পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী শ্রমবিভাজনের সঙ্গে ঔপনিবেশিক বিশ্বের কৃষি ও শিল্পের শ্রম বিভাজন সম্পর্কিত থাকলেও যেখানে নীতি নির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ আজো নির্ধারক ভূমিকা পালন করে থাকে। তারাই এক একটি দেশের শ্রমবিভাজন নির্দিষ্ট করে দেয়। এবং গোটা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, নাট-বল্টু, কারিগরী জ্ঞান, বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি সরবরাহ করে কাঠামোগত অধিনস্ততা আরো বাড়িয়ে আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোকে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর করে তোলে। ফলে এইসব দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ, কাঁচামাল ও শ্রমের ৯০ শতাংশ, যন্ত্রপাতির ৯০ শতাংশ, জ্ঞান-প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার পুরোটাই আজ সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর। স্বনির্ভর কৃষির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে, স্থানীয় ও জাতীয় সম্পদ হিসেবে শিল্পকারখানা ধ্বংস করে দিয়ে এবং জীবন-যাপনের সমস্ত উপাদানগুলোকে শুকিয়ে মেরে ও তার বিলুপ্তি ঘটিয়ে বিপরীতে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় ঋণ সাহায্যের নামে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা, নির্দিষ্ট জ্ঞান, যন্ত্রপাতি ও আমদানি পণ্যের উপর নির্ভরতা, প্রতিটি অধিনস্ত দেশগুলোতে সেই ঔপনিবেশিক পর্বে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প, জ্ঞান ও ঋণ সাহায্যের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত বরাবরই। তারা শাসন ক্ষমতা প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণে না-নিয়েও এইসব দেশকে কব্জা করে থাকে আলোচিত দুইটি শ্রেণীর মাধ্যমে। আবার অসংখ্য সামরিক চুক্তির সূত্র ধরে সরাসরি এসব দেশকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে প্রধানত ওই দুই শ্রেণীর মধ্য দিয়ে। ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শাসনকালে প্রশাসক হিসেবে এই আমলাশ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছিল সেটাও আমরা জানি। আবার মুৎসুদ্দি পুঁজির জন্মও হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পস্থাপনা ও শিল্পকারখানার শেয়ার কেনার মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ, তাদের (সাম্রাজ্যবাদ) প্রতিষ্ঠিত বাজারের তাগিদ থেকে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সেদিন এই শ্রেণী জন্ম লাভ করে। এর বাইরে ব্যবসা বাণিজ্য তো রয়েছেই। মূলত ভারত উপমহাদেশে নির্ধারক শক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সম্পত্তি-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও পণ্য-অর্থপণ্য সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আলোচিত মুৎসুদ্দি পুঁজি সেদিন জন্ম লাভ করে।

একই সময়ে গ্রামীণ ভারতের অর্থনীতি ছিলো ব্রিটিশ সৃষ্ট জমিদার, ভূস্বামী, জোতদার, বণিক ও মহাজনদের নিয়ন্ত্রণে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠিত সম্পত্তি-সম্পর্ক এবং পণ্য-অর্থ-পন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেদিন শ্রেণী হিসেবে এসব বর্গের উদ্ভব ঘটে। ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামো ও সম্পত্তি-সম্পর্কের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, শ্রেণী হিসেবে এসব বর্গকে ভূমি মালিকানার ভিত্তিতে সংগঠিত করে উৎপাদক কৃষক সমাজের শ্রমফলকে উদ্বৃত্ত (ভূমি খাজনা) আকারে লুট ও ভোগ দখলের ব্যবস্থা করে দেয়। ফলে ওই ব্রিটিশ পর্ব থেকে ভারত উপমহাদেশের পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, জমিদার, জোতদার, মহাজন ও বণিকদের একটি অংশ ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় শিল্প সংস্থাগুলোর শেয়ার কিনছে, কেউবা শিল্পোদ্যোগগুলোতে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু গ্রামীণ জীবনে ভূমি মালিকানা বা সম্পত্তি-সম্পর্কের যে বিন্যাস, তাকেও বহাল রাখার মধ্য দিয়ে শ্রেণী হিসেবে তারা কৃষক স¤প্রদায়ের শ্রমের ফলকে বা উদ্বৃত্তকে রাজস্ব হিসেবে লুঠও করে চলেছে। ভূমি মালিকানার দখলিস্বত্ব বা ভূমির মালিকানার কর্তাস্বত্বার কারণে শ্র্রেণী হিসেবে তারা যখন সাম্রাজ্যবাদী শিল্প ও বাজারের প্রয়োজনে ‘পণ্য উৎপাদন-সরবরাহ’ সংগঠিত করতে সক্ষমতা অর্জন করে, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও উক্ত শ্রেণীর অনুকূলে নতুন নতুন আইন-কানুন সৃষ্টি করে। ফলে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক যুগে আমাদের মতো দেশগুলোতে আমলা, মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, ভূস্বামী, জোতদার, জমিদার, মহাজন ও বণিকদের স্বার্থ সংরক্ষণসহ তাদের উপরেই সম্পত্তি-সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয় এবং সেটা ঘটেছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যুগে। ফলে আলোচিত দলগুলো মানে ’৪৭ পরবর্তী সময়কালে আইনগতভাবে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা হলেও সম্পত্তি-সম্পর্কের অবস্থান থেকে আজো ঔপনিবেশিক বাস্তবতা বহাল রয়েছে। এবং সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সংগঠিত হয়নি। ’৭১ পরবর্তী সময়কালেও ওই একই রূপ বহাল থাকায় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সার্বভৌম অর্জন করতে পারেনি। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তারা কৃষি বিপ্লব বা নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার কথা বলেছেন।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×