আল-কোরআন মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর অলৌকিক নিদর্শন বা ‘মুযিযা’। এর অলৌকিকত্ব চিরন্তন। এতে বর্ণীত আইন-কানুন থেকে শুরু করে সর্বপ্রকার তথ্য ও তত্ত্বই অলৌকিকতার স্বাক্ষর রাখে। যেমন কিছুদিন পূর্বেও মানুষের মনে প্রশ্ন ছিল- গরু, ভেড়া, ছাগল, ইত্যাদি থেকে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য খাওয়া, জিনিসপত্র ব্যবহার করা ও এগুলোর ব্যবসা করা হালাল এবং এগুলোকে সরাসরি অপবিত্রও বলা হয়নি। কিন্তু আল-কোরআনে সূরা আনআম -এর (০৬ : ১৪৫) নং আয়াতে শূকরকে সরাসরি অপবিত্র হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি এত নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে কেন ? একজন ঈমানদার মুসলমান কিন্তু কোন প্রশ্ন ছাড়াই দ্বিধাহীন চিত্তে আল্লাহতায়ালার যে কোন আদেশ পালন করার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত থাকে। তবে পার্থিব গবেষণার আলোকে যারা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পছন্দ করেন তারা হয়ত অবগত আছেন:- এসব হালাল প্রাণীর তুলনায় শূকরের মধ্যে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদানগুলো অনেকাংশে বেশি থাকে। তাছাড়া গৃহপালিত পশু-পাখী যেমন গরু, ভেড়া, ছাগল, হাঁস, মুরগী ইত্যাদি থেকে কিছু রোগ ( জুনোটিক ডিজিসেস ) সাময়িকভাবে মানবদেহে সংক্রমিত হতে পারে এবং সেগুলো আপনা আপনি বা চিকিৎসা করলে সেরে যায়। তবে শূকর যে সমস্ত ( ব্যাকটেরিয়াল, ভাইরাল ও প্যারাসাইটিক ) রোগে আক্রান্ত হয় ( ব্যালান্টিডিয়াসিস, ব্রুসেলোসিস, সিসটোসারকোসিস, কেম্পাইলোব্যাক্টেরিওসিস, কলিবেসিলোসিস, , ইরাইসিপেলাস, লেপ্টোসপিরোসিস, ট্রাইচিনোসিস, ইয়ারসিনোসিস ইত্যাদি ) তার প্রায় সবগুলোই মানবদেহে অতি সহজেই সংক্রমিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা করার পরও সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হয় না। ফলে এগুলোর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি হয়। বিশেষ করে পোর্ক টেপ-ওয়ার্ম দ্বারা আক্রান্ত হলে সিসটোসারকোসিস নামক রোগ হয় এবং এগুলো মানুষের হৃদপিন্ড, স্পাইনাল-কর্ড ও মস্তিষ্কে পৌছে ক্ষতি সাধন করে। মস্তিষ্ক আক্রান্ত হলে তাকে নিউরোসিসটোসারকোসিস বলে। এর ফলে ইপিলেপ্সি এর মত উপসর্গ দেখা দেয়ার কারণে রোগ নির্ণয়ে ভুল হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমপ্রতি জানা গেছে যে, হাজার হাজার বছর পূর্বেই শূকরের ‘জীন’ এক ধরনের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং তা বংশগতভাবে সমস্ত শূকর প্রজাতির মাঝে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বংশগত সুপ্ত সংক্রমণ থেকে শূকর প্রজাতিকে যে কোন উপায়েই মুক্তি দেয়া সম্ভব নয় সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং তা শূকরের মাধ্যমে মানুষের দেহে সংক্রমণের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়না। তাছাড়া বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে জাপান, ইউএসএ ও নেদারল্যান্ডে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত ইউরোপিয়ান শূকরের কলিজায় হেপাটাইটিস-ই ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান সনাক্ত করেছেন এবং বন্য পুং-শূকরের ক্ষেত্রেও একই রকমের ঝুঁকি রয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং রোগগ্রস্ত (হেপাটাইটিস-ই ভাইরাসে আক্রান্ত) শূকর থেকে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে শূকরের কলিজা খাওয়ার ব্যাপারে এমনকি সরাসরি শূকরের সংস্পর্শে আসার বিষয়েও সাবধান না হলে মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।আল-কোরআন:-সূরা আনয়াম
(৬ : ১৪৫) অর্থ:- আপনি বলে দিন, যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌছেছে তার মধ্যে কোন হারাম খাদ্য আমি পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্য, যা সে ভক্ষন করে; কিন্তু মৃত বা প্রবাহিত রক্ত অথবা শূকরের মাংস - কেননা এ সব অপবিত্র - অথবা যা অবৈধ আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে, তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে তোমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আল-কোরআন:-সূরা আল বাকারা
(০২ : ২১৯) অর্থ:- (হে নবী), এরা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; তুমি বলে দাও, ‘এ দুট জিনিসের মধে বড় ধরনের পাপ (ক্ষতি) এবং মানুষের জন্য সামান্য কিছু উপকারও রয়েছে; কিন্তু এগুলোর পাপ (ক্ষতি) উপকার অপেক্ষা অনেক বেশী।’ তারা তোমাকে (এও) জিজ্ঞাসা করে (আল্লাহর পথে)তারা কি খরচ করবে? বল, ‘যা উদ্বৃত্ত।’ এভাবে আল্লাহ্ তাঁর সকল নিদর্শন (আয়াত সমূহ স্পষ্টরূপে) তোমাদের জন্য বর্ণনা করেন যাতে তোমরা চিন্তা কর.
আল-কোরআন:-সূরা মায়েদা
(০৫ : ৯০) অর্থ:- হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃন্যবস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।
(০৫ : ৯১) অর্থ:- শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায়, এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও নামাজে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত হবে না
{মানবজাতির কতটুকু ভাল বা মন্দ কিসে নিহিত আছে তা স্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালা ভালভাবেই জানেন। তাই তিনি সকল মন্দ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে বার বার সাবধান করে দিয়েছেন। বর্তমানে মাদকাসক্তি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, যা সমাজ তথা গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সর্বনাশা নেশার কবলে পড়ে যে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কেবলমাত্র ধুমপানের মাধ্যমেই ধুমপায়ীরা জীবনে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে। তারা যেমন নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে তেমনি পরিবারে স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে তথা সমাজে তাদের আশেপাশে যারা অবস্থান করে সবার মাঝেই বিষক্রিয়া ছড়ায়। আর এ অপরাধের দায় থেকে তারা কখনই মুক্ত নয়। এ্যলকোহলিজম এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা এখন সবারই জানা আছে। অতিরিক্ত মাত্রায় এ্যলকোহল গ্রহনের ফলে লিভারের ক্ষতি হয় এবং পরিনামে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ায় ধুকে ধুকে মৃত্যু ঘটে। তাছাড়া কিডনী, হৃদপিন্ড, ্লায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক সহ দেহের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মারাত্বক ক্ষতি হতে পারে। যদিও অল্প মাত্রায় এ্যলকোহল সেবন করলে রক্তে কোলেস্টেরোলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের মাত্রায় অর্থাৎ অল্প মাত্রায় এ্যলকোহল সেবন খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ দেখা গেছে যে, খুব কম মানুষই এ্যলকোহল সেবনের পরিমাণ অল্প মাত্রায় ধরে রাখতে পারেন। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই নেশার মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকে। তাছাড়া অল্প মাত্রায় বছরের পর বছর এ্যলকোহল সেবন করলে যে মানব দেহে এর আদৌ কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কারণ অল্প মাত্রায় এ্যলকোহল সেবনের কালচার তো কেবল শুরু হয়েছে মাত্র। বাজারে এখন আনেক ধরনের কোলেস্টেরোল নিয়ন্ত্রনে রাখার ওষুধ পাওয়া যায়। তাই এই হারাম পথে অগ্রসর না হয়ে ওষুধ সেবন করাই ঈমানদারগণের ঈমানের দাবি। আল্লাহর আইন গুটিকয়েক মানুষের জন্য নয়। সমগ্র মানব জাতির স্বভাব, চরিত্র অনুসারে ও তাদের কল্যাণের জন্যই আল্লাহতায়ালা বিধি বিধান প্রেরণ করেন। স্রষ্টা সর্বজ্ঞ মহান আল্লাহ্ এই মাদক তথা এ্যলকোহল এর সামান্য কিছু উপকারের বিষয়টি ভালভাবেই অবগত আছেন। আর তাই তো তিনি অব্যাক্ত না রেখে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বেই আল-কোরআনের সূরা আল বাকারা -এর (০২:১১৯) নং আয়াতে প্রথমত এ্যলকোহলের এর সামান্য কিছু উপকারের বিষয়টি প্রকাশ করেছেন এবং সাথে সাথে যেহেতু এর (শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক) ক্ষতির মাত্রাই অধিক, তাই মদ্যপান হারাম করে দিয়েছেন। মাদকাসক্ত অবস্থায় এবং নেশার চাহিদা মেটাতে গিয়ে একজন মানুষ বিবেকশুন্য হয়ে যায়। তখন সে অতি সহজেই চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, জেনা ও ব্যভিচার সহ নানা রকম অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। ফলে একদিকে যেমন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে, তেমনি লাগামহীন অবৈধ সম্পর্ক এবং একই সিরিঞ্জের মাধ্যমে একই সময়ে অনেকে মাদক গ্রহণের ফলে ‘এইডস্’ সহ নানা রকম সংক্রামক রোগের প্রকপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই সূরা মায়েদাহ এর (০৫ : ৯০) নং আয়াতে এগুলোকে ঘৃন্যবস্তু ও শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। মাদক ও জুয়ার নেশার মন্দ স্বভাব থেকে দূরে থাকার সাথে সাথে এর ভয়ংকর প্রভাব থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য সর্বজ্ঞ আল্ল¬াহতায়ালা ঐশীবাণী প্রেরণের মাধ্যমে বারবার সাবধান করে দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সংক্ষেপে ‘এইডস্’ও একটি। যা এক ধরনের ভাইরাস ( যার নাম সংক্ষেপে এইচ.আই.ভি অর্থাৎ একুয়ার্ড ইমুনো ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) এর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। কোন মানুষ এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে প্রথমত তার দেহে এটি অর্থাৎ ‘এইচআইভি’ বংশবিস্তার করতে থাকে। এই ভাইরাসের প্রধান কাজ হচ্ছে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ( অকেজো করে ফেলা। (ক্রমশঃ চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

